কাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গ্র্যাঞ্জ সিটি হোটেলের লবিতে গিজগিজে ভিড়। বাংলাদেশ দল লন্ডন থেকে কার্ডিফ যাচ্ছে। হোটেলের সামনে বাস আসবে। সেটি আসতে একটু দেরি করছে। লবিতে সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে। কেউবা দাঁড়িয়ে। তুমুল আড্ডা চলছে।

ক্রিকেটাররা আছেন। ক্রিকেট বোর্ডের কয়েকজন পরিচালকও। বাচ্চাদের কলকাকলিতেও মুখর চারপাশ। ক্রিকেটারদের বেশ কয়েকজনের পরিবার তাঁদের সফরসঙ্গী। সাকিবের স্ত্রী-মেয়ে সেই আয়ারল্যান্ড থেকেই আছেন। মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহর স্ত্রী সম্পর্কে আপন বোন, মাহমুদউল্লাহর ছেলেকে নিয়ে তাঁরা দুজন এসেছেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির আগেই। মাশরাফি বিন মুর্তজার স্ত্রী-ছেলেমেয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর। ইমরুল কায়েসের সদ্য ডাক্তারি পাস করা স্ত্রীও তাঁর সঙ্গে। ইংল্যান্ডে সস্ত্রীক আছেন চ্যাম্পিয়নস ট্রফির স্কোয়াডের সঙ্গে ব্যাকআপ হিসেবে রেখে দেওয়া উইকেটকিপার নুরুল হাসানও। বাচ্চারা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। দল বেঁধে ছবি তুলছে। সাকিবের ছোট মেয়েটা স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে এক সুখী পরিবারের ছবি।

সাকিবের পরিবার তাঁকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন আয়ারল্যান্ড থেকেই। ছবি: অনলাইন

সকাল থেকেই লন্ডনে বৃষ্টি পড়ছে। সঙ্গে কনকনে বাতাস। ঝপ করেই নেমে গেছে তাপমাত্রা। এ নিয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের কোনো অভিযোগ নেই। বৃষ্টি বরং তাঁদের কাছে এখন ‘উপকারী বন্ধু’র মর্যাদা পাচ্ছে। বাংলাদেশ দলকে যে সুখী পরিবারের মতো দেখাচ্ছে, তাতেও ওই বৃষ্টির বড় অবদান। সাকিব আল হাসান চোখ নাচিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘দেখেছেন, অস্ট্রেলিয়া আমাদের জন্য সব সময়ই গুডলাক।’

২০১৫ বিশ্বকাপে ব্রিসবেনে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ম্যাচটা ভাসিয়ে দিয়েছিল বৃষ্টি। সেই ম্যাচ থেকে পাওয়া ১ পয়েন্ট বড় ভূমিকা রেখেছিল বাংলাদেশের কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তরণে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে বৃষ্টির কল্যাণে পাওয়া ১ পয়েন্টও খুলে দিয়েছে সম্ভাবনার দুয়ার। আর অস্ট্রেলিয়াকে ঠেলে দিয়েছে খাদের কিনারায়। ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর স্টিভ স্মিথকে ‘হার্ড লাক’ বলায় অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক কেমন রাগত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, আগের রাতে মাশরাফি সেটির সরস বর্ণনা করছিলেন। বোলিং করার সময় যতটা সম্ভব দেরি করা যায়, সেই চেষ্টার কথা বলতে গিয়েও মাশরাফির হাসি আর থামে না। কাল সকালেও তাঁর মাথায় ঘুরছে আগের দিনের ম্যাচ। ‘১৮ ওভার হলেই কিন্তু আম্পায়াররা আর দুই ওভার খেলিয়ে দিত’—মাশরাফি বলেন আর হাসেন।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে বৃষ্টিটা আর চার ওভার পর এলেই বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমির স্বপ্ন শেষ হয়ে যেত। ছবি: গেটি ইমেজেস

আর চারটি ওভার খেলা হলেই অস্ট্রেলিয়া জিতে যায়। বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি শেষ হয়ে যায় এদিনই। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা তারপরও থাকত। একই সময়ে কার্ডিফ যেত বাংলাদেশ দল। সেই দলকে নিশ্চয়ই এখন এত ফুরফুরে লাগত না।

বাস এসে হোটেলের সামনে দাঁড়াল। ক্রিকেটাররা একে একে বাসে উঠলেন। সবার পরিবার-পরিজন নিয়ে মাশরাফি একটা মাইক্রোবাসে। ইংল্যান্ডে এই একটা সুবিধা। এক ভেন্যু থেকে আরেক ভেন্যুতে যেতে এয়ারপোর্টে দৌড়াতে হয় না। প্লেনে ওঠা মানেই তো হাজারো ঝামেলা। ইংল্যান্ডে টিম বাসই এক শহর থেকে আরেক শহরে নিয়ে যায়। বাংলাদেশ দলকে যেমন নিয়ে গেল কার্ডিফে। যেখানে পৌঁছানোর পরও মাশরাফির অস্ট্রেলিয়ার কথা মনে পড়বে। ওভালে বৃষ্টির আনুকূল্য পাওয়া ম্যাচটির কারণে নয়, বারো বছর আগেই এই কার্ডিফেই যে রচিত হয়েছিল বাংলাদেশের ক্রিকেটের অমর এক কাব্য। সে সময়কার অজেয় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় এখনো ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঘটনগুলোর একটি বলে বিবেচিত।

নিয়তি কেমন, আবার সেই কার্ডিফেই এমন একটা ম্যাচে নামিয়ে দিচ্ছে বাংলাদেশকে, যেটিতে জিততে পারলে খুলে যেতে পারে চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালের দুয়ার। ব্যাপারটা অবশ্য এত সরল নয়। বাংলাদেশের জয়ের সঙ্গে আরও কিছু শর্ত পূরণের ব্যাপারও আছে। পরশুর ম্যাচের পর সবচেয়ে সরল সমীকরণটা ছিল, বাংলাদেশ যদি নিউজিল্যান্ডকে হারায় আর ইংল্যান্ড যদি বাকি দুই ম্যাচে জেতে, তাহলেই হয়ে যাবে। অন্য কিছু হলেও সেটি সম্ভব কি না, বাংলাদেশ দলে সেই গবেষণা তখনই হয়ে গেছে। নইলে ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়ে যাওয়ার পর মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে এসে সাকিব আল হাসান কেন বলবেন, ‘ইংল্যান্ডের বিপক্ষে নিউজিল্যান্ড জিতলেও আমাদের চান্স আছে।’

আসলেই আছে। তখন বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ডকে হারালে এই দুই দলেরই পয়েন্ট হয়ে যাবে ৩। ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের জয়ী দল সেমিফাইনালে যাবে আর যাবে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে যে দল নেট রানরেটে এগিয়ে থাকবে। সমস্যা হলো, সব হিসাব-নিকাশই ওলটপালট করে দিতে পারে বৃষ্টি।

কার্ডিফের বাসে ওঠার আগে লন্ডনের গ্যাঞ্জ সিটি হোটেলে ক্যামেরাবন্দি সাব্বির, মুশফিক, তামিম ও মাহমুদউল্লাহ। ছবি: উৎপল শুভ্র

কাল সকালে বাংলাদেশ দল যখন লবিতে, একটা সোফায় মোটা জ্যাকেট আর গলায় মাফলার জড়ানো এক ভদ্রলোক বসে। খেলোয়াড়ি জীবনে যাঁকে সবাই ‘হোয়াইট লাইটনিং’ নামে চিনত। সাবেক দক্ষিণ আফ্রিকান ফাস্ট বোলার অ্যালান ডোনাল্ড দুই মাসের চুক্তিতে এখন শ্রীলঙ্কা দলের বোলিং কোচ। বাইরে ঝরতে থাকা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘আগামী সপ্তাহজুড়েই তো বৃষ্টির পূর্বাভাস। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিটা না বরবাদ হয়ে যায়!’

কাউন্টি ক্রিকেটে খেলেছেন অনেক বছর। ইংলিশ আবহাওয়ার খামখেয়ালির সঙ্গে তাই খুব পরিচিত। ডোনাল্ড সমস্যা দেখছেন টুর্নামেন্টের সময়টাতেই, ‘ইংল্যান্ডের জুন মাস সব সময়ই এমন। আর কার্ডিফ যাচ্ছেন তো? এখানে যা দেখছেন, ওখানে অবস্থা আরও খারাপ। লন্ডনের চেয়ে চার ডিগ্রি কম ধরে নিন। ২০১৩ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচটার কথা এখনো ভুলতে পারি না। উফ্, কী ঠান্ডা যে ছিল! ৭ ডিগ্রি!’

ঠান্ডা জয় করেও নাহয় ক্রিকেট খেলা যায়। কিন্তু বৃষ্টিতে তো নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বৃষ্টি চেয়েছিল বাংলাদেশ। নিউজিল্যান্ড ম্যাচে চাইবে উল্টোটা। বৃষ্টি যেন সেদিন দূরে থাকে।

এই ম্যাচ যে হতে পারে স্বপ্নপূরণের বৈতরণি!