সালটা সঠিক মনে নেই। অনেক বিষয় থাকে বা ঘটনা ঘটে, যার কোনোটা মনে আছে, আবার কোনোটা মনে নেই। আমি তখন ক্লাস সিক্সে উঠেছি। বাবার প্রিয় খেলা ছিল ভলিবল। বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করতেন। অফিস শেষে নিজে খেলতেন এবং পাড়া মহল্লায় ছোট-বড় সবাইকে ভলিবল খেলায় উৎসাহিত করতেন। নিজে নেট-বল কিনে খেলার আয়োজন করতেন।

পঞ্চাশ দশকে হাজারীবাগের নীলাম্বর সাহা রোডে প্রতিষ্ঠিত মডার্ন ক্লাব মূলত এলাকার সামাজিক বিচার সালিশ আর ব্রিজ-কার্ড খেলায় মেতে থাকত। বাবা সেই মডার্ন ক্লাবকে ভলিবলসহ নানা খেলায় যুক্ত করান। এলাকার ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে প্রথমে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মাঠ, পরে হাজারীবাগ পার্কের পশ্চিম কর্ণারে (বর্তমানে যেখানে পানির পাম্প) প্রতিদিন অফিস শেষে বিকেলে ভলিবল খেলতেন। বিকেল হলেই শত শত দর্শক অপেক্ষা করতেন কখন খেলা শুরু হবে। আগেই বলেছি সাল-তারিখটা সুনির্দিষ্টভাবে মনে নেই। ৩/৪ দিন ধরেই খুব আনন্দ লাগছিল, বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী ক্রীড়াচক্রের সঙ্গে মডার্ন ক্লাবের প্রীতি ভলিবল ম্যাচ দেখব বলে। খেলা হবে আবাহনী মাঠেই। কী আনন্দ, আবাহনীর সঙ্গে খেলা! মাঠে যাব, খেলা দেখব। বাবার অফিস ছুটি। সকাল থেকেই খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে সব খেলোয়াড়েরা। আমিও যথারীতি বাবার বন্ধুদের সঙ্গে মটর বাইকের পেছনে বসে খেলা দেখতে যাব। প্রথমবারের মতো যাব আবাহনী ক্লাবে।

বলে রাখা দরকার, পুরান ঢাকার ঐতিহ্য অনুযায়ী বাপ-দাদাদের মতোই আমিও মোহামেডানের সমর্থক। তবে বাংলাদেশে নতুন ধারার ফুটবল খেলা আবাহনীর প্রতি আলাদা একটা ভালবাসা তৈরী হয়েছিল কীভাবে জানি না। তাই আবাহনী মাঠে আবাহনীর  সঙ্গে প্রদর্শনী খেলা দেখার জন্য তর সইছিল না। বিকেল তিন কি চারটার মধ্যে মাঠে পৌঁছল সবাই। ধানমন্ডির বিশাল এক মাঠ। চার পাশে  ইট দিয়ে বাউন্ডারি করা। কিন্তু হতাশ হলাম এই দৃশ্য দেখে গোটা মাঠটাই আধলা আর ভাঙা ইটে ভরা। মাঠের মাঝখানে মোবাইল টাওয়ারের মতো দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি দুটি তাল গাছে। এই কংক্রিট মাঠের যেন সার্চ টাওয়ার! তাল গাছের নিচে ভলিবল খেলার জন্য যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু জায়গার ইট সরিয়েই খেলার কোর্ট তৈরী করা হয়েছে। গেট দিয়ে ঢোকার ডান পাশেই একটি বড় ফুটবল খেলার মাঠ। বিশাল মাঠের মাঝখানে তালগাছের নিচে ইট পরিষ্কার করা জায়গায় ভলিবল কোর্টে খেলা শুরু হয়ে গেল।

পয়েন্ট বলার সময় রেফারি মর্ডান ক্লাব ৩ আবাহনী ০ বলার সময় খেলোয়াড়েরা রেফারিকে থামিয়ে বললেন, ‘আমরা মাঠ পরিষ্কার করে স্থানীয়রা এখানে ভলিবল খেলি। আমরা আসলে আবাহনী ক্রীড়াচক্রের টিম নই। আবাহনীর ভলিবল টিম নেই।’

তখন রেফারি বললেন, ‘অসুবিধা নেই, মাঠ তো আবাহনীর।’

এ নিয়ে মাঠে থাকা দর্শক ও দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে কিছু সময় হাসাহাসি হলো। স্থানীয়রা বললেন, 'আমরা হেরে গেলে আবাহনীর বদনাম হবে, যেহেতু আমরা আবাহনীর টিম নই।’ বড়দের খেলা চলাকালেই মাঠে থাকা দর্শকদের কাছে জানতে চাইলাম, আবাহনী ক্লাবটা কোন পাশে। কাউকে কিছু না বলে আমি চলে গেলাম মাঠের উত্তর-পশ্চিম কোনায় সিরামিক ইটে তৈরি অসম্পূর্ণ একতলা দালানটির কাছে। গেটে জিজ্ঞেস করতেই একজন বললেন, 'হ্যাঁ, খোকা এটাই আবাহনী ক্লাব।’ প্রথমেই গেটে দাঁড়িয়ে পুরো ক্লাবটার মাস্টার শ্যুট নিলাম খালি চোখে (মনোযোগ দিয়ে দেখলাম আর কি)। ক্লাব ভবনে ঢালাই করার জন্য বাঁশ-কাঠের সাটারিং করা, ক্লাবের সামনেই খোয়া বা সুরকির স্তুপ। এত ঢালাই করার মাল-সামান দেখে একটু হতভম্ব হয়ে গেলাম।

কারণ যে আবাহনী বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক, সেই ক্লাবের এমন অগোছালো চেহারা আশা করিনি। আধুনিক ফুটবলের সঙ্গে ক্লাব ভবনও আধুনিক হবে ভেবে ছিলাম। এরই মধ্যে ক্লাবের মাঝখানে চেয়ারে বসা এক ভদ্রলোক ডাকলেন, ‘কী দেখছ? কাউকে খুঁজছ, বাবু?’ 

বললাম, ‘না স্যার। ক্লাবটা দেখছি।’

আদরের সঙ্গে কাছে ডাকলেন উনি। জানতে চাইলেন নাম কী, বাসা কোথায়? বললাম, ‘বাবার সঙ্গে এসেছি। বাবা মাঠে ভলিবল খেলছে এই ফাঁকে আমি আবাহনী ক্লাবটা দেখতে এসেছি।’  তিনিই পাশে একটি চেয়ার টেনে বসালেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ক্লাবটার এই অবস্থা কেন স্যার, ছাদ ঢালাই হয়নি?’

আমার প্রশ্নটf শুনেই তাঁর চোখ ছলছল করে উঠল, কিছুক্ষন নীরব হয়ে কী যেন ভাবলেন। মনে হলো কোনো স্মৃতিতে হারিয়ে গিয়েছিলেন। চোখ মুছে বললেন, ‘আমার নাম অমলেশ। আমি এই ক্লাবেরই খেলোয়াড়।’ আমি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লাম। বললাম, ‘স্যার, আপনার নাম আমার বাবার মুখে শুনেছি। আপনি অনেক ভালো ফুটবল খেলেন।’ আমার কথা শুনে তিনি বেশ আনন্দিত হলেন। বললাম, ‘আপনার খেলা আমি আগাখান গোল্ডকাপে বাবার সঙ্গে স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে দেখেছি। তবে কাছ থেকে আপনাকে এই  প্রথম দেখলাম।’

আমরা পাশাপাশি বসে আছি, ভাবতেই রোমাঞ্চিত হই। এবার জানতে চাইলাম, ক্লাবের এই অবস্থা কেন? এর মধ্যেই একটি ছেলে এসে জিজ্ঞেস করল, 'দাদা কিছু লাগবে?' তিনি আবার আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি কিছু খাব কি না। জানালাম, না। তখনই মনে হলো, ভলিবল মাঠে যাঁর কাছে আবাহনী ক্লাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি ক্লাবটা দেখিয়ে বলেছিলেন, সেখানে গেলেই দাদাকে পাওয়া যাবে। এই সেই দাদা--আবাহনীর ফুটবলার অমলেশ সেন। সবাই ওনাকে দাদা বলে ডাকেন। তখনো দাদার পুরো নাম জানতাম না। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাদা বলতে শুরু করলেন ক্লাবের কথা। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট সারা দিন  শ্রমিকরা ছাদ ঢালাইয়ের জন্য সাটারিং এর কাজ শেষ করে। বিকেলে শেখ কামাল দেখেও যান ঢালাই কাজের অগ্রগতি। কিন্তু তাঁর আর আসা হয়নি ক্লাবে। রাতেই তিনি সপরিবারে শহীদ হন। আবারও তিনি নীরব হয়ে গেলেন। দীর্ঘশ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘পরদিন আমাদের ক্লাবের ছাদও আর ঢালাই দেয়া হয়নি। শ্রমিকরাও আর ফিরে আসেনি। ১৫ আগস্ট সকাল বেলায় ছাদ ঢালাই জন্য সব প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।’

আবাহনী ক্লাবের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন অমলেশ সেন

আমি দাদার দিকে তাকাই, অশ্রুসজল তাঁর চোখ। যা দেখে আমার খুব খারাপ লাগছিল। আমি প্রশ্ন করে কষ্ট দিলাম দাদাকে। তিনি চেয়ারে বসেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেখিয়ে বলছিলেন, শেখ কামাল আসলে কোথায় দাঁড়াতেন, কীভাবে খেলোয়াড়দের খোঁজ-খবর নিতেন। এরপর বললেন, ‘১৫ আগস্টের সকাল আমাদের ক্লাবে আনন্দের বদলে শোক বয়ে নিয়ে এলো। ক্লাবের খেলোয়াড়েরা সবাই ভয়ে চলে গেল। বন্ধ হয়ে গেল চলমান আগা খান গোল্ড কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। সব শেষ হয়ে গেল।' জিজ্ঞেস করলাম, 'আপনি কি একাই থাকেন ক্লাবে?' উত্তরে বললেন, ‘সেই দিন থেকে আমি একদিনের জন্যও ক্লাব ছেড়ে যাইনি। এই ক্লাবই আমার সব।’

বাবা আবাহনী মাঠে খেলতে যাবেন জেনে তিন চার দিন আগে থেকে আমার মধ্যে যে আনন্দ উচ্ছ্বাস ছিল, তা  মুহূর্তেই বিলীন, অনেকটা স্তব্ধও হয়ে গিয়েছিলাম। এরই মাঝে দাদাই বলে উঠলেন, ‘ দেখো, খেলা মনে হয় শেষ হয়ে গেছে।’ মাঠ থেকে আসার সময় আমি শরীফ চাচাকে (বাবার বন্ধু) আমি আবাহনী ক্লাব দেখতে যাওয়ার কথা বলে এসেছিলাম। ভলিবল খেলা শেষে সবাই আসল আবাহনী ক্লাব দেখতে। বাবা, বাবার বন্ধুদেরকেও অমলেশ দাদা বললেন সব। খেলায় আমাদের টিম মডার্ন ক্লাব ৩-০ গেমে জিতলেও আবাহনী ক্লাবের ছাদ ঢালাই না হওয়ার কারণ জেনে সবার মন থেকে আনন্দ উধাও হয়ে গেল। সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে গিয়েছিল। বাবা মোহামেডানের সমর্থক হলেও এই ঘটনা শুনে সেই দিন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। এরপর দুই দিন মাঠে খেলতেও যাননি।

কয়েক বছর পরের কথা, আমি নিজেই তখন নিয়মিত ফুটবল খেলি। আমার উচ্চতা ৪ ফুট ১০ ইঞ্চির কম। হাজারীবাগ লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ মাঠে ১৯৮০ সালে নান্নু সর্দার স্মৃতি কিশোর ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলায় প্রধান অতিথি করা হয় আবাহনীর ফুটবলার অমলেশ সেনকে। খেলা শুরুর আগে মাইকে ঘোষণা দিলেন দাদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এই টুর্নামেন্টের আয়োজক হাজারীবাগের ব্যবসায়ী সাইদুর রহমান সাইদুল। ফাইনাল খেলা দেখে অমলেশ দাদা নিজে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করবেন। এতে মাঠে উপস্থিত সকল খেলোয়াড় ও দর্শকের মনে আলাদা একটা মাত্রা যোগ হয়েছিল।

আমাদের দলের সংগঠক জয়নাল আমাকে বললেন, ‘দাদাকে আজকে তোমার খেলাটা দেখিয়ে দিতে হবে।’  আমার ভাগ্নে বকুল বলল, ‘মামু, আজ তোর খেলা দাদা দেখবে, সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কারটা তুই পাবি বললাম।’ সবার কথায় আমার আত্মবিশ্বাস বেড়ে গিয়েছিল। এলাকায় আমার ভালো খেলোয়াড় হিসেবে সুনাম আছে। আমিও সেই দিন স্ট্রাইকার হিসেবে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে খেলে যাই। আমার দেয়া দুটি গোলে আমার টিম চ্যাম্পিয়ন হয়। অমলেশ দাদা নিজে পুরো খেলা দেখে আমার নামই সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ঘোষণা করলেন। মাঠে দর্শকদের প্রত্যাশাও তাঁর নির্বাচনের সঙ্গে মিলে গিয়েছিল। দাদার হাত থেকে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নেয়ার সময় তিনি বার বার আমাকে দেখছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে দাদার সঙ্গে দেখা করে বললাম, ‘আমিই সেদিন আবাহনী ক্লাবে গিয়ে ক্লাবের ছাদ ঢালাই না হওয়ার কথা জেনেছিলাম আপনার কাছ থেকে। আজ আপনাকে কাছে পেয়ে আমি ফুটবল খেলায় অনুপ্রাণিত ও উৎসাহিত হয়েছি। আজ আপনিই আমাকে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচন করলেন।’ অমলেশ সেন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তোমাকে আমি প্রশিক্ষণ দেব, তুমি খুব ভালো খেলো। ক্লাবে এসে আমার সঙ্গে দেখা করবে।’ 

আমার আর ফুটবলার হিসেবে দাদার সঙ্গে দেখা করা হয়নি। ১৯৮৩ সালে নিউজ ম্যাগাজিন সাপ্তাহিক রিপোর্টার-এ ক্রীড়া সাংবাদিক এবং ক্রীড়া লেখক হিসেবে কাজ শুরু করার পর বহুবার সাক্ষাৎকার নিয়েছি দাদার। যেই দিনই আবাহনী ক্লাবে সিরামিকের ইট ঘেরা ভবনে প্রবেশ করেছি, আমার স্মৃতিতে ভেসে উঠেছে সব কিছু ঠিকঠাক থাকার পরও  ক্লাবের ছাদ ঢালাই না হওয়ার দিনটির কথা। বাংলাদেশে আধুনিক ফুটবলের প্রবর্তক আবাহনী ক্লাবের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ কামালের কথা। অমলেশ দাদার অশ্রুসজল বর্ণনার কথা। আজ সেই আবাহনী ক্রীড়াচক্র দেশসেরা ক্লাব। আবাহনী আজ লাখ লাখ ক্রীড়াপ্রেমীর নয়নের মণি। আবাহনী আজ প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি। আছে বহুতল ক্লাব টেন্ট। নেই শুধু প্রতিষ্ঠাতা।

এই ক্লাবকেই জীবন মনে করা অমলেশ সেনও নেই। তবে আমার মনে তাঁর স্মৃতি আঁকা থাকবে চিরদিনই।