ভিভ রিচার্ডস তখন কোথায় ছিলেন? অ্যান্টিগার বাড়িতে, যে বাড়ির সামনের রাস্তাটির নাম ‘ভিভ রিচার্ডস স্ট্রিট’! করাচির সকালে যখন খেলা শুরু হলো, অ্যান্টিগায় তখন রাত। রিচার্ডস কি দুরু-দুরু বুকে বসেছিলেন টেলিভিশনের সামনে?

মুখে বলেন, রেকর্ড-টেকর্ড ভেবে কখনো খেলেননি। এখনো তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। মুখের কথাটা মনের কথা কি না, তা নিয়ে সংশয় থাকছেই। এ কারণেই সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে বসে তাঁর রেকর্ড ভেঙে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখে থাকলে রিচার্ডসের কী অনুভূতি হয়েছে, তা অনুমান করতে পারছি না। ৩০ বছর ধরে সঙ্গী হয়ে থাকা রেকর্ডটি হারিয়ে একটুও কি খালি-খালি লাগছে না তাঁর?

টেস্ট ক্রিকেটে এক পঞ্জিকাবর্ষে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড, যে রেকর্ড কোনোদিনই ভাঙবে না বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অনেকে। ভিভ রিচার্ডস করেছিলেন ১৭১০ রান, তা নিয়েই যদি এমন বলা হয়ে থাকে; মোহাম্মদ ইউসুফের ১৭৮৮ রান নিয়ে তো ঘোষণাটা আরও উচ্চকিত হওয়ার কথা—এই রেকর্ড ভাঙবে না কোনোদিন!

১৯৭৬-কে 'ভিভ রিচার্ডস বর্ষ' ঘোষণা করলে তা মোটেই বাড়াবাড়ি হবে না! ছবি: গেটি ইমেজেস

ভিভের প্রতিক্রিয়া এখনো জানা যায়নি। তিনি কী বলতে পারেন, অনুমান করার চেষ্টা করছি। রেকর্ডের জন্মই হয় ভেঙে যাওয়ার জন্য—পরিচিত এই আপ্তবাক্য? তবে এটা অনুমান করা একদমই কঠিন হচ্ছে না যে, বারবার হয়তো ভিভের মনে হচ্ছে ১৯৭৬ সালের লর্ডস টেস্টটির কথা। অসুস্থতার জন্য সেটিতে খেলতে পারেননি, সিরিজের বাকি চার টেস্টে করেছিলেন ৮২৯ রান। ওভালে শেষ টেস্টে মহাকাব্যিক ২৯১, নটিংহামে প্রথম টেস্টে ছিল আরেক ডাবল সেঞ্চুরি (২৩২)। অমন ‘খুনে’ ফর্মে থাকা রিচার্ডস লর্ডসে খেলতে পারলে রান করাটাকে খাওয়া-ঘুমোনোর মতো প্রাত্যহিক কাজ বানিয়ে ফেলা মোহাম্মদ ইউসুফের জন্যও তাঁর নাগাল পাওয়াটা কঠিনই হতো।

ইউসুফ অবশ্য বলতেই পারেন, টেস্ট বলুন বা ইনিংস বলুন, কোনোটিই তো আমি রিচার্ডসের চেয়ে বেশি খেলিনি। বলবেন না। বরাবরই একটু অন্তর্মুখী স্বভাবের, এখন তো ধর্মান্তরিত ইউসুফ আরও বেশি নরম-সরম। যাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন, তাঁর সঙ্গে মিলটা তাই শুধুই রান করায়।

রিচার্ডসের ব্যাটিংয়ের মতোই বিখ্যাত হয়ে আছে তাঁর শরীরী ভাষা। চুইংগাম চিবোতে চিবোতে ব্যাট করতে নামতেন, সাজানো ফিল্ডিংয়ের দিকে এমন তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকাতেন যে, অনুচ্চারিত কথাগুলো পড়ে নিতে সমস্যা হতো না—‘এদের সঙ্গে আমি কী খেলব!’ ১৯৭৬ সালে রিচার্ডস ২৪ বছরের টগবগে যুবক। সেই ইংল্যান্ড সফরে আরও টগবগ করেই ফুটেছে তাঁর রক্ত। সেই সিরিজের আগে ইংল্যান্ড-অধিনায়ক টনি গ্রেগ সতীর্থদের উদ্দীপ্ত করতে বলে বসেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানদের আমরা নতজানু হতে বাধ্য করব।'

টনি গ্রেগ জাতিতে দক্ষিণ আফ্রিকান, যে দেশে তখন কালোরা অচ্ছুত বলে বিবেচিত। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ওই দল নিজেদের ভাবত কালো মানুষের প্রতিনিধি। গ্রেগের ওই কথা তাই আগুন জ্বালিয়ে দেয় তাঁদের রক্তে। ফলাফল পাঁচ টেস্টের সিরিজে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ৩-০-তে জয়। টনি গ্রেগের জন্য আরও বিশেষ কিছু বরাদ্দ ছিল। উইকেটে যাওয়া মাত্র ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেস ব্যাটারিরা কেমন অভ্যর্থনা জানাত, সেটি এখনো ভুলতে পারেনি টনি গ্রেগ। রিচার্ডস ছিলেন সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের প্রতীক।

২০০৬ সালের মোহাম্মদ ইউসুফ। বছর শেষ করবেন ৭৮৮ রান নিয়ে। ছবি: গেটি ইমেজেস

আর ইউসুফ? তাঁর ব্যাটে শুধু রানের বন্যাই নয়, তা থেকে বিচ্ছুরিত হয় সৌন্দর্যও। অথচ এখনো বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যানদের দলে তাঁর নামটি রাখতে মনেই থাকে না কারও। এতে তাঁর নরম-সরম ব্যক্তিত্বেরও ভূমিকা না থেকেই পারে না। তবে একজন কিন্তু ইউসুফকে সব সময়ই বিশ্বসেরাদের পাশে দাঁড় করিয়ে এসেছেন। তিনি ইনজামাম-উল হক। ২০০৩ সালে বাংলাদেশের পাকিস্তান সফরের সময় ইনজামামের সঙ্গে লারা-টেন্ডুলকার প্রসঙ্গে কথা বলতে বলতে তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, লারা-টেন্ডুলকার যেমন সন্দেহাতীতভাবে গত এক-দেড় দশকের সেরা ব্যাটসম্যান, কার সম্ভাবনা আছে আগামী দশকটা এমন নিজের করে নেওয়ার?

ইনজামাম একটুও না ভেবে বলে দিয়েছিলেন, ‘ইউসুফ ইয়োহানা!’ (তখন তাঁর এই নামই ছিল)।

এটা শুনে ইউসুফের প্রতিক্রিয়া কী ছিল শুনবেন? ‘সত্যি ইনজি ভাই এ কথা বলেছে! তুমি রসিকতা করছ না তো!’

তাঁর সম্পর্কে কেউ এমন প্রশংসা করেছেন, ভিভ রিচার্ডসকে তা জানালে কী প্রতিক্রিয়া হতো, তা অনুমান করা একটুও কঠিন নয়। এমনভাবে তাকাতেন যে, মনে হতো—‘তাই তো, এটা আবার বলার মতো কী হলো! এ তো সবাই জানে!’