প্রমীলা ফুটবলের ছিটেফোঁটা খোঁজখবর রাখলেও তাঁর দুরন্ত গোলশিকারি ক্ষমতার কথা শোনার কথা আপনার। আরেকটু নিবিড় দর্শক হলে টেলিপর্দায় পোর্টল্যান্ড থর্নস, ম্যানচেস্টার সিটির পর প্যারিস সেন্ট-জার্মেইর জার্সি গায়ে তাঁকে হয়তো মাঠও মাতাতে দেখেছেন। এর বাইরে তাঁর দিনের বেশির ভাগ সময় কেটে যায় দাতব্য কাজ করে, দূতিয়ালি করছেন জাতিসংঘেরও। শিখছেন নিত্যনতুন ভাষা, এখনই অনর্গল কথা বলতে পারেন নয়টি ভাষায়। এত সব কাজ করার পর রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারিতে ট্রেনিং নেওয়ার সময় বের করেছেন তিনি, ফুটবল ছাড়ার পরে পুরোদমে নেমে পড়বেন ওই পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে। নাদিয়া নাদিমকে তাই কেবলই আরেকজন ফুটবলার ভাবার ভুলটা আপনি নিশ্চয়ই করবেন না।

কিন্তু এসব কিছু নয়, নাদিয়া 'অন্যতম' থেকে 'অনন্যা' হয়ে উঠছেন আরেকটি কারণে। তাঁর বর্তমান ক্লাব পিএসজি আর ক্লাবুর (শরণার্থী শিবিরে স্পোর্টস ক্লাব তৈরি করা আমস্টারডাম-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা) সঙ্গে মিলে নাদিয়া সর্বশেষ হাত দিয়েছেন বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শরণার্থী শিবিরগুলোতে স্পোর্টস ক্লাব গড়ে তুলতে। প্রাথমিক লক্ষ্যটাও নির্ধারণ করে ফেলেছেন তাঁরা, অন্তত ১০ হাজার শরণার্থী শিশুর কাছে খেলাধুলার সুতো বেয়ে পৌঁছে যাওয়া। কাজটা করতে গিয়ে নাদিয়া আলাদা এক প্রশান্তি অনুভব করছেন নিশ্চিত। শরণার্থী শিবিরের কানাগলিতে ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতি তাঁর নিজেরও আছে কি না!

নাদিয়া ছুটছেন। ছবি: সিএনএন

জন্মেছিলেন আফগানিস্তানে। কিন্তু বয়স ১১ না হতেই মা আর চার বোনের সঙ্গে জাল পাসপোর্ট বানিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন পাকিস্তানে। বাবাকে অবশ্য রেখে যেতে হয়েছিল আফগানিস্তানে। নেবেন কী করে? তালেবান সৈন্যরা এর আগেই মেরে ফেলেছিল তাঁকে। দিনকয়েক আগে সিএনএনের সঙ্গে আলাপচারিতায় নাদিয়া রোমন্থন করছিলেন সেই বীভৎস দিনগুলোর স্মৃতি, 'তখন কেবল একটা কথাই ভাবছিলাম, বেঁচে থাকতে হবে। আঁতিপাঁতি করে হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম এই প্রশ্নগুলোর উত্তর, "এখন কী হবে? এর পরের মুহূর্তে কী হবে? কাল সকাল পর্যন্ত কীভাবে বেঁচে থাকব!'

পাকিস্তান কিছুদিন পালিয়ে পালিয়ে বেড়িয়ে পরিবারের সঙ্গে নাদিয়া পৌঁছেছিলেন ডেনমার্কের এক শরণার্থী শিবিরে, যে দেশকে তিনি এখন ঘর বলেই মানেন। আফগানিস্তানের যুদ্ধ-বিগ্রহের দিনগুলো পেছনে ফেলে এসে নাদিম পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন এখানেই, আবিষ্কার করেছিলেন খেলাধুলার অবারিত দুনিয়া। অবশেষে না পাওয়া শৈশবের আনন্দটা ধরা দিয়েছিল নাদিয়ার কাছে।

ওই শরণার্থী শিবিরেই নাদিয়া আবিষ্কার করেছিলেন তাঁর বাকি জীবনের ভালোবাসাকে। শরণার্থী শিবিরের মাঠে একটা গোল বল দিয়ে কিছু বাচ্চাকে খেলতে দেখেছিলেন তিনি, 'প্রথম দর্শনেই প্রেম'-এর মতো নাদিয়া মজে গেলেন খেলাটার প্রেমে। পরে জানলেন, খেলাটাকে ফুটবল বলে।

'প্রথম দেখাতেই আমার মনে হয়েছিল, "আরে, দারুণ তো! আমাকেও এটা খেলতে হবে”।’ সেদিন থেকে ফুটবলটাই আমার ধ্যান-জ্ঞান হয়ে গেল। আর দেখুন না, ফুটবলটা আজ আমাকে কোথায় তুলে এনেছে! প্যারিস সেন্ট জার্মেই।'

ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স

আর দশজন বাচ্চা-কাচ্চার যেমন হয়, নাদিয়াও তেমনি 'যে যেভাবে পারছে বলে লাথি মারছে, সবাই সবার পেছনে দৌড়াচ্ছে, যেন সবাই সবার প্রতিপক্ষ', ভঙ্গিতেই খেলতে শুরু করেছিলেন। তবে তাঁদের শরণার্থী শিবিরের পাশেই একটা ক্লাব ছিল, সেখানে খেলা দেখতে দেখতেই ফুটবলের ফর্মেশন, কখন কোথায় বল গেলে কী করতে হবে--এসব জ্ঞানগুলো আয়ত্তে এসেছিল তাঁর।

এ কারণেই রিফিউজি ক্যাম্পের দিনগুলোকে 'জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত' বলে অভিহিত করেন নাদিয়া। তবে সেটা শুধু ফুটবল পায়ে সময়টুকুই। নইলে টিভিতে-পত্রিকায় শরণার্থী জীবন সম্পর্কে যা জানানো হয়, পরিস্থিতি এর চেয়েও বহুগুণ ভয়াবহ। 'যে না থেকেছে, সে কখনো ওখানকার ভয়াবহতা বুঝতে পারবে না। আমার মনে হয়, ওই রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতে যারা থাকে, তাদের সবারই অভিজ্ঞতা মোটামুটি এমন। ওখানে প্রতি মুহূর্তে বেঁচে থাকার সংগ্রামে নামতে হয় আপনাকে। কেবল একটি আশাকে সঙ্গী করে বেঁচে থাকেন আপনি, "কাল সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে"।'

দুঃসহ অভিজ্ঞতাটা নিজের বলেই হয়তো ওইসব মানুষদের জন্য একটা কিছু করার তাড়না ছিল নাদিয়ার। ক্লাবুর জরিপ বলছে, বিশ্বজুড়ে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ৮০ মিলিয়নেরও বেশি শরণার্থী, সংখ্যাটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে সর্বোচ্চ। এবং এদের মাঝে প্রায় অর্ধেকই শিশু। এই শিশুদের শৈশবকে আনন্দময় করতেই পিএসজি আর ক্লাবুর সঙ্গে জুটি গড়েছেন নাদিয়া।

নাদিয়া মনে করেন, কৌতূহলটা মানুষ, বিশেষ করে শিশুদের জন্মগত। নতুন কিছু দেখলেই তারা নিজেরা সেটা অনুকরণের চেষ্টা করে। তাই, শরণার্থী শিবিরে বেড়ে ওঠা শিশুদের খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়াটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

ছবি: ডিবিইউ

এই সুযোগটা করে দিতেই কক্সবাজারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে একটি 'ক্লাব সেন্টার' গড়ে তুলবে পিএসজি আর ক্লাবু। নাদিয়ার সঙ্গে জুটি গড়ে তাদের প্রথম প্রকল্প হতে যাচ্ছে এটাই। ক্লাব সেন্টারে খেলাধুলার যাবতীয় সরঞ্জামাদি তো মিলবেই, শিশুদের জন্য আয়োজন করা হবে ট্রেনিং সেশন থেকে শুরু করে টুর্নামেন্টও।

'আমি জানি না সেখানে আসলে কী অবস্থা! তবে ভেবে দেখুন, কক্সবাজারে (বিশ্বের সর্ববৃহৎ রিফিউজি ক্যাম্প) যে লক্ষাধিক শরণার্থী আছে, এই প্রকল্প শুরু করার কারণে সেখান থেকে দুজন, তিনজন, চারজন বা আরও বেশ কিছু ফুটবলার উঠেও আসতে পারেন।'

নিজের অভিজ্ঞতাতেই জানেন, সময়টা শিশুদের জন্য সহজ নয় মোটেই, তবে এই খারাপ সময়েও যথাসম্ভব ইতিবাচকতা খুঁজে নেওয়ার চেষ্টাতেই তাঁর এই উদ্যোগ। 'খুবই মানবেতর জীবনযাপন করছে ওরা। খেলাধুলার মাধ্যমে আমরা সেখানে আশার আলো পৌঁছে দিতে চাইছি। বাস্তবতা থেকে দুয়েক ঘণ্টার জন্য যদি আমরা ওদেরকে বের করে আনতে পারি, একটা ভবিষ্যৎ স্বপ্নের বীজ বুনে দিতে পারি, দুর্দান্ত একটা ব্যাপার হবে।'

এই প্রকল্পটা ক্যাম্পে থাকা বাবা-মাদেরও একটু স্বস্তির শ্বাস ফেলার অবকাশ করে দেবে মনে করছেন নাদিয়া৷ নিজের মায়ের কথা ভেবে এখন মায়াই লাগে তাঁর, 'অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ওই সময়টা শারীরিকভাবেই যথেষ্ট কঠিন, কিন্তু মানসিকভাবে…. রীতিমতো দুর্বিষহ।' নাদিয়া তাই নেমেছেন অন্য মায়েদের দুঃখ নিবারণের মিশনে। ফুটবল পায়ে সুখ ছড়িয়ে দিতে চাইছেন বাংলাদেশ থেকে কেনিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোতে।

ফুটবল ক্যারিয়ারে নাদিয়া নাদিম কখনো জিতেছেন, কখনো বা হেরেছেন। কিন্তু মানুষে মানুষে ভেদাভেদ-হানাহানির এ সময়টায় খুশি ফেরি করার যে সাহস দেখিয়েছেন নাদিয়া, তাতে বিজয়ীর মুকুটটা তাঁর গলায় পরিয়ে দিতে হচ্ছে ধ্রুব ভাবেই।

*সিএনএন অবলম্বনে।