গত এক দশকে ব্যাটসম্যানদের কথা উঠলেই যেমন শচীন টেন্ডুলকার আর ব্রায়ান লারা নাম উচ্চারিত হয়েছে; ইনজামাম-উল-হক মনে করেন, আগামী দু বছরের মধ্যে তেমন একটা জায়গায় চলে যাবেন ইউসুফ ইয়োহানা। বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে সবাই ইউসুফ ইয়োহানার নাম বলবেন—এটি শুধুই সময়ের ব্যাপার বলে ইনজামামের ধারণা। এই ধারণার সঙ্গে একমত এমন লোকের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে এই একজনের ব্যাটিংই রীতিমতো হীনম্মন্যতার জন্ম দিচ্ছে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মনে। ‘বড় বেশি ভালো ব্যাট করে’—ইয়োহানা সম্পর্কে এই যে কথা কতজনের মুখে শুনলাম। গত পরশু রাওয়ালপিন্ডিতে বাংলাদেশ আর জয়ের মাঝে ব্যবধান হয়ে দাঁড়ালেন এই ইউসুফ ইয়োহানাই। অপরাজিত ৯৪ রানের এক ইনিংস হয়ে দাঁড়াল স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের নিয়ামক। গতকাল দুপুরে রাওয়ালপিন্ডি থেকে করাচি পৌঁছার পরপরই হোটেল লবিতে বসে আগের দিনের সেই ইনিংস এবং আরও নানা প্রসঙ্গে কথা হলো ইউসুফ ইয়োহানার সঙ্গে।

উৎপল শুভ্র: কাল আপনার অপরাজিত ৯৪ রানের যে ইনিংসটি পাকিস্তানকে জিতিয়ে দিল, সেটিতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে আপনার নিরুদ্বিগ্ন থাকাটা। অমন চাপের মধ্যেও টেনশনের কোনো চিহ্ন খূঁজে পাওয়া যায়নি আপনার মধ্যে। কিন্তু টেনশন তো নিশ্চয়ই হয়েছে, তাই না?

ইউসুফ ইয়োহানা: খেলায় তো টেনশন থাকেই। তবে আমি আত্মবিশ্বাসী ছিলাম। ইনজামাম আউট হয়ে যাওয়ার পরও আমি জানতাম, এরপর শোয়েব মালিক আছে, রাজ্জাক আছে, কামরান আকমল আছে। শেষ দিকের ওভারে একটি চার বা একটি ছয় মারলেই ম্যাচটা সহজ হয়ে যাবে, এটাও জানতাম। যদিও কাল তা হয়নি। ম্যাচটা খুব ক্লোজ হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বোলাররা ভালো বোলিং করেছে, তবে আমাদের জিততে এত কষ্ট হয়েছে বাংলাদেশের ফিল্ডিংয়ের জন্য। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের এ ধরনের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচায় নেই, ওদের অনভিজ্ঞতাই আমাদের জিততে সাহায্য করেছে।

বাংলাদেশের বিপক্ষে অপরাজিত ৯৪ রানের ইনিংস খেলার পথে ইয়োহানা। রাওয়ালপিন্ডি, ২০০৩। ছবি: গেটি ইমেজেস

শুভ্র: আপনার খেলা স্মরণীয় ইনিংসগুলোর তালিকায় এই অপরাজিত ৯৪-কে কোথায় রাখবেন?

ইউসুফ: এই ইনিংসটি খেলে আমি আনন্দ পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি এই ইনিংসটি পাকিস্তানকে ম্যাচ জিতিয়েছে বলে। সেঞ্চুরি হয়নি, কিন্তু দলকে জিতিয়েছি বলে আমার কাছে সেঞ্চুরির চেয়েও বেশি মূল্যবান এই ইনিংস।

শুভ্র: বাংলাদেশের বোলিং তো আপনাকে কোনো সমস্যায় ফেলতে পারছে বলে মনে হচ্ছে না।

ইউসুফ: না না, বাংলাদেশের বোলিং আগের চেয়ে অনেক ভালো হয়েছে। রফিক তো খুবই ভালো বল করেছে। তবে আমাদের ওপেনাররা একদমই অনভিজ্ঞ। ওরা দলকে খুব একটা ভালো শুরু দিতে পারছে না বলে বাড়তি চাপ নিয়েই ব্যাট করতে হচ্ছে আমাকে।

শুভ্র: এই বাড়তি চাপের প্রসঙ্গটাতেই আসছিলাম। বিশ্বকাপের পর পাকিস্তান দলে যে ওলটপালট হলো, তাতে হঠাৎ করেই ব্যাটিংয়ের পুরো ভারটা এসে পড়েছে আপনার আর ইনজামামের ওপর। এই বাড়তি দায়িত্বটাকে কি চাপ বলে মনে হচ্ছে? 

ইউসুফ: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চাপ সবসময়ই আছে। এটা ঠিক, পাকিস্তান দলে আগে সাঈদ আনোয়ার ছিল, আরও অনেক বড় ব্যাটসম্যান ছিল। সে সময় দল আমার ওপর নির্ভর করত না। এখন আমি আর ইনজি (ইনজামাম-উল-হক) দলের সবচেয়ে সিনিয়র ব্যাটসম্যান হয়ে গেছি, বাড়তি একটা দায়িত্ব তো অবশ্যই আছে। এ কারণেই আমি আর ইনজি ঠিক করেছি, আমাদের একজনকে শেষ পর্যন্ত উইকেটে থাকতে হবে। আর এই সিরিজে আমার ভালো ব্যাটিংয়ের পেছনে আর একটি ব্যাপার কাজ করছে। অধিনায়ক যখন আপনার ওপর আস্থা রাখবে, আপনার আত্মবিশ্বাসটাই অন্যরকম হয়ে যাবে। আপনিই আমাকে জানিয়েছিলেন, ইনজামাম আমার সম্পর্কে কী বলেছে (সিরিজের শুরুতে এই প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইনজামাম বলেছিলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে টেন্ডুলকার-লারার পর্যায়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে ইয়োহানার)। ইনজামামের মতো অত বড় ব্যাটসম্যান, অনেক দিন থেকেই যিনি পাকিস্তানের এক নম্বর ব্যাটসম্যান, তার মুখ থেকে অমন একটা কথা শুনে আত্মবিশ্বাস অনেক বেড়ে গেছে। এটা আমাকে আরও ভালো খেলতেঅনুপ্রাণিত করেছে।

শুভ্র: ’৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সময়ে আপনার ব্যাটিংয়ের সঙ্গে এখনকার ব্যাটিংয়ের কী পার্থক্য খুঁজে পান? টেকনিক্যাল কিছু পরিবর্তন তো অবশ্যই হয়েছে।

ইউসুফ: তখন আমি খুব বেশি তাড়াহুড়ো করতাম। ২৫-৩০-৪০ রান করে আউট হয়ে যেতাম। আর এখন আমি ৩৫ করলে প্রতিজ্ঞা করি, সেঞ্চুরি করে বেরোব। ৪০-৫০ সব ব্যাটসম্যানই করে। সাধারণ ব্যাটসম্যানের সঙ্গে ভালো ব্যাটসম্যানের পার্থক্য হলো, ভালো ব্যাটসম্যানরা ৪০-৫০কে সেঞ্চুরি বানায়।

ইউসুফ ইয়োহানার কাছে জাভেদ মিয়াঁদাদই ব্যাটিংয়ের শেষ কথা। ছবি: গেটি ইমেজ

শুভ্র: আপনার প্রিয় ব্যাটসম্যান কে?

ইউসুফ: জাভেদ মিয়াঁদাদ। আমার কাছে জাভেদ মিয়াঁদাদই ব্যাটিংয়ের শেষ কথা।

শুভ্র: আর বর্তমান সময়ের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে?

ইউসুফ: সাঈদ আনোয়ারকে ভালো লাগত। এখন ভালো লাগে স্টিভ ওয়াহ আর ব্রায়ান লারাকে।

শুভ্র: স্টিভ ওয়াহ আর ব্রায়ান লারার ব্যাটিংয়ের কোন দিকটি আপনার পছন্দ?

ইউসুফ: ওরা ম্যাচ উইনিং ব্যাটসম্যান। ম্যাচ জয়ের মতো অবস্থা সৃষ্টি করেই ওরা দায়িত্ব শেষ বলে মনে করে না, ম্যাচ জিতিয়ে তারপর বেরিয়ে আসে। বোলিং ভালো না খারাপ, তাদের ওদের কিছু যায় আসে না।

শুভ্র: বোলারদের মধ্যে এমন কেউ আছে যাঁকে খেলতে সমস্যা হয়েছে বা হয়?

ইউসুফ: আমার চোখে ওয়াসিম আকরামের কোনো তুলনা নেই। আমি ভাগ্যবান, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ওয়াসিম আকরামের বোলিং আমাকে খেলতে হয়নি। ডোমেস্টিক ক্রিকেটেও ওয়াসিম আর আমি এক দলেই খেলেছি ( দুজনই খেলতেন পিআইএ-তে, ইউসুফ এখন খেলেন ন্যাশনাল ব্যাংকে)। তবে নেটে ওয়াসিম আকরামকে খেলেই বুঝেছি, ও বত বড় বোলার। ওয়াকার ইউনিস, শোয়েব আখতার, সামি কারও বোলিংয়েই আমার কোনো সমস্যা হয় না, কিন্তু ওয়াসিম আকরামকে খেলতে আমার সবসময়ই সমস্যা হয়েছে। এমন বোলার আর কোনো দিন আসবে কি না, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।

এটা অনেক পরের ছবি। ততদিনে তিনি ইউসুফ ইয়োহানা থেকে মোহাম্মদ ইউসুফ

শুভ্র: নির্দিষ্ট কিছু অর্জনের লক্ষ্য আছে?

ইউসুফ: পাকিস্তানকে যত বেশি সম্ভব ম্যাচ জেতাতে চাই। ১০ হাজার রান করতে হবে, ১৫ হাজার রান করতে হবে—এমন কোনো লক্ষ্য নেই আমার। দল না জিতলে রান করে লাভ কী? সাঈদ আনোয়ার, ইনজামাম-উল-হককে দেখুন, টেস্টে ওদের এমন বেশি রান নয়। কিন্তু ওরা পাকিস্তানকে কত ম্যাচ জিতিয়েছে। আমিও এ রকম ম্যাচ জেতাতে চাই। স্টিভ ওয়াহ, ব্রায়ান লারার কথা তো আগেই বলেছি। ওরা হলো ম্যাচ উইনিং ব্যাটসম্যান। এমন হওয়াই আমার লক্ষ্য। রেকর্ড-টেকর্ড নিয়ে আমি ভাবি না।

আরও পড়ুন:

ইউসুফ ইয়োহানা: শেষ বলে ছক্কা মেরে সেঞ্চুরির নায়ক