ইয়াদ আলীই য়া দ আ লী 
ই য়া দ আ লী 
ই য়া দ আ লী....... 

সারা মাঠ কাঁপিয়ে স্লোগানের মতো করে ছন্দিত তালে তালে শোনা যেত এই একটি নাম। যেন মাঠে খেলছেন একজনই। আর কেউ নেই। তা কি কখনো হয়? মাঠে দুই দলই সমানতালে খেলত। কিন্তু সবাইকে ছাপিয়ে যখন একটি নাম বার বার উচ্চারিত হয়, তখন বোঝা যায় তাঁর জনপ্রিয়তা, তাঁর ক্যারিশমা, তাঁর খেলোয়াড়ি দক্ষতাও। সত্তর ও আশির দশকে ইয়াদ আলী ছিলেন বাংলাদেশের ভলিবলের সুপারস্টার। শুধু দশকের হিসেবেই বা কেন, পরবর্তীকালে আর কোনো খেলোয়াড়ই তাঁর মতো জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেননি। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনেও দারুণভাবে আলোচিত ছিলেন মো. ইয়াদ আলী। ফুটবলে খেলোয়াড় হিসেবে যেমন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ছিলেন কাজী সালাউদ্দীন, ভলিবলেও তিনি ছিলেন তা-ই। 

এখন শুনে অনেকেই অবাক হবেন, সেই সময়ে বাংলাদেশে ফুটবলের পর সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিল ভলিবল। এমনই যে, দর্শক লাইন দিয়ে টিকিট কেটে খেলা দেখতেন। ভলিবলের গ্যালারির পরিসর খুব বেশি বিস্তৃত ছিল না। এ কারণে খেলা দেখতে না পেয়ে অনেক দর্শককে ফিরে যেতে হতো। এখন কি এটি কল্পনা করা যায়? কীভাবে যাবে? একটা সময় জীবনের বিনিময়ে হলেও ফুটবল খেলা দেখতে দর্শক বা সমর্থকদের স্টেডিয়ামমুখী মিছিল ছুটত। অথচ এক সময়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের গ্যালারি এখন থাকে অনেকটাই দর্শকশূন্য। ফুটবল নিয়ে মানুষের সেই উম্মাদনা বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেকটা রূপকথার গল্প। সেক্ষেত্রে ভলিবল খেলার জনপ্রিয়তা কতটা অনুধাবন করানো যাবে?

ইয়াদ আলীর খেলার দিন দর্শকে পরিপূর্ণ হয়ে যেত স্টেডিয়াম। তাঁর ছিল নিজস্ব একটা দর্শকগোষ্ঠী। যেদিন তাঁর খেলা থাকত, সেদিন তাঁরা ছুটে আসতেন। বাংলাদেশের বর্তমান ভলিবল দিয়ে সেই সময়ের ভলিবল এবং ইয়াদ আলীর জনপ্রিয়তা অনুমান করা যাবে না। ভলিবলের মতো খেলায় যেভাবে তিনি দর্শকদের হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন, তা ছিল এক কথায় অবিশ্বাস্য। নিজস্ব একটা স্টাইল ছিল তাঁর।  তাঁর প্রতিটি মুভমেন্ট ছিল ম্যাজিকের মতো। তিনি যেভাবে জাম্প করে অনেক উপরে উঠতেন কিংবা হাতের মোচড় দিয়ে বল নেটের ওপাশের কোর্টের যেখানে ইচ্ছা পাঠিয়ে দিতেন, তেমনটা সচরাচর দেখা যেত না। খেলার প্রতি মুহূর্তে তিনি থাকতেন দর্শকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। যেকোনো ভূমিকাতেই তাঁর ছিল সমান দাপট। সার্ভ, পাস, সেট, অ্যাটাক, ব্লক ও ডিগ করার কলাকৌশলে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর সার্ভ, তাঁর স্ম্যাশ, তাঁর ডিফেন্স ছিল অসাধারণ। তাঁর স্ট্যামিনা, স্ট্রেন্থ ও জাম্প ছিল মুগ্ধ হয়ে দেখার মতো। সহজাত প্রতিভা না থাকলে কারও পক্ষে এমন খেলোয়াড় হওয়া সম্ভব বলে মনে হয় না।

১৯৮৪-৮৫ সালে ভারতের হায়দরাবাদে কোচ মনিরুল হকের সঙ্গে ইয়াদ আলী (বাঁয়ে) ও বিমল ঘোষ

ছয় ফুট উচ্চতার কারণে বাড়তি সুবিধা পেতেন ইয়াদ আলী। সুদেহী এই খেলোয়াড়কে মাঠে আলাদাভাবে চিনে নিতে কষ্ট হতো না। তাঁকে ঘিরে রীতিমতো ক্রেজ তৈরি হয়েছিল সেই সময়। ঢাকার বাইরে খ্যাপ খেলানোর জন্য হুড়োহুড়ি লেগে যেত। বড় অঙ্কের টাকার অফার নিয়ে এসেও তাঁকে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ত। তাঁর সংস্পর্শে আসার জন্য অনেকেই উদগ্রীব হয়ে থাকতেন। দর্শকরা তো বটেই উঠতি ও সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়রা তাঁর 'ম্যাজিক টাচ' পাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। অনেকেই মনে করতেন, তাঁকে একটু স্পর্শ করতে পারলে তারাও তাঁর মতো খেলোয়াড় হতে পারবেন। 

ইয়াদ আলীর পরিবার বসবাস করতেন মাদারটেক এলাকায়। সেখানে ভলিবল খেলার ব্যাপক চল ছিল। তাঁর বাবা, চাচা, চাচাতো ভাইয়েরা খেলতেন। তাঁর ছয় ভাই ও এক বোনের মধ্যে পাঁচ ভাই ক্লাব পর্যায়ে খেলেছেন। প্রাথমিক অবস্থায় তিনি দর্শক হিসেবে উপভোগ করতেন খেলা এবং বল কুড়িয়ে দিতেন। তারপর নিজেই একদিন খেলা শুরু করেন। চাঁদনি রাতে খেলা হতো এলাকার সিনিয়র আর জুনিয়রদের মধ্যে। সেই খেলায় সিনিয়রদের হারিয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা রেখে তিনি প্রথম সবার নজর কাড়েন৷ 

ছোটবেলা থেকেই তাঁর দৈহিক কাঠামো ছিল চোখে পড়ার মতো। যে কোনো খেলোয়াড়ের জন্য এমন গড়ন স্বপ্নের মতো। তাঁদের এলাকায় থাকতেন জাতীয় ভলিবল কোচ এ এস এম সামসুদ্দিন। তাঁর জহুরি চোখ ইয়াদ আলীর মধ্যে অমিত সম্ভাবনা দেখতে পায়। ভারতের পাতিয়ালা থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসার পর ১৯৭৫ সালে তিনি ইয়াদ আলীকে গড়ে তোলার জন্য ধনুর্ভঙ্গ পণ করেন। লোহা পুড়িয়ে যেভাবে ধারালো অস্ত্র তৈরি করা হয়, তেমনিভাবে ইয়াদ আলীকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে পরিণত করেন নিখাদ সোনায়। রোদ নেই, বৃষ্টি নেই, কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে তাঁকে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নেন। খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর যাতে কোনো খামতি না থাকে, তা নিশ্চিত করতে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে সব দিক দিয়ে তিনি তাঁকে গড়েপিটে তোলেন।

১৯৮০ সালে তুরস্কের ইজমিরে ইসলামী গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় দলের সঙ্গে ইয়াদ আলী (দাঁড়ানো, বাঁ থেকে দ্বিতীয়)

কোচ সামসুদ্দিনের প্রশিক্ষণে এলাকার খেলাগুলোতে আলোড়ন তোলেন ইয়াদ আলী। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে কোচের ক্লাব মাদারটেক মিতালী সংঘের হয়ে প্রথম বিভাগ ভলিবল লিগে তাঁর অভিষেক হয়। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১৪। নিজেকে আলাদা করে চেনাতে একটুও সময় নেননি। যে কারণে পরের বছরেই জাতীয় দলে ডাক পেয়ে যান। ঢাকার দুই শক্তিশালী দল পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং ওয়ারীর হয়ে ভলিবল লিগ, জাতীয় প্রতিযোগিতা, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় তাঁর নান্দনিক ক্রীড়াশৈলী দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেন। সে সময় তাঁর জনপ্রিয়তা ও কদর কতটা ছিল, তা অনুধাবন করা যায় একটি ঘটনা থেকেই। ১৯৭৮-৭৯ মৌসুমের জন্য ওয়ারী ক্লাব তাঁকে পারিশ্রমিক দেয় ৭৫ হাজার টাকা। সেই মৌসুমে ফুটবলের সুপারস্টার আবাহনী ক্রীড়া চক্রের কাজী সালাউদ্দীন এক লাখ টাকা পেয়েছিলেন বলে শোনা যায়। তখনকার দিনে একজন ভলিবল খেলোয়াড় এত টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছেন, ভাবতে কেমন অবাক লাগে! যদিও পরবর্তীকালে দুই খেলোয়াড়ের পারিশ্রমিকের মধ্যে বিস্তর ব্যবধান গড়ে ওঠে।  

১৯৮৩ সালে ইয়াদ আলী অনেকটা ঘটনাচক্রে যোগ দেন বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে। কিন্তু এরপর আর লিগে আর খেলা হয়নি। কী কারণে যেন তখন থেকে সার্ভিসেস টিমগুলোকে লিগে খেলার পথ রুদ্ধ করে দেয় ভলিবল ফেডারেশন। লিগে তাঁর ক্রীড়াশৈলী থেকে বঞ্চিত হন দর্শকরা। তবে জাতীয় ভলিবল প্রতিযোগিতায় নোয়াখালী, ঢাকা, টাঙ্গাইল, ওয়াপদা ও নৌবাহিনীর হয়ে তিনি অসাধারণ খেলেন। ২০০১ সাল পর্যন্ত খেলেন নৌবাহিনীতে। ১৯৮১ সাল ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা একটি বছর। সে বছর প্রথম বিভাগ লিগ, জাতীয় ভলিবলসহ প্রতিটি টুর্নামেন্টে অসাধারণ খেলেন। বিশেষ করে খুলনায় জাতীয় ভলিবল প্রতিযোগিতায় বিডিআরের বিপক্ষে ওয়াপদার হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স সবার মুখে মুখে ফিরেছে। এ রকম অনেক প্রতিযোগিতায় তিনি তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছেন। অসংখ্যবার হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়।

১৯৮১ সালে খুলনায় অনুষ্ঠিত জাতীয় ভলিবলে ওয়াপদাকে চ্যাম্পিয়ন করায় বড় ভূমিকা ছিল  ইয়াদ আলীর (দাঁড়িয়ে বাঁ থেকে চতুর্থ)

বাংলাদেশ জাতীয় দলের অপরিহার্য খেলোয়াড় ছিলেন ইয়াদ আলী। ১৯৭৭ সালে সফরকারী রাশিয়ার কিরগিজ দলের বিপক্ষে প্রথম খেলেন। এরপর ১৯৭৮ সালে ব্যাংককে অষ্টম এশিয়ান গেমস, ১৯৭৯ সালে সফরকারী রাশিয়ার উজবেকিস্তান দল, একই বছর রাশিয়া সফর, ১৯৮০ সালে তুরস্কের ইজমিরে প্রথম ইসলামিক সলিডারিটি গেমস, ১৯৮২ সালে ভারতের দিল্লিতে নবম এশিয়ান গেমস, ১৯৮৬ সালে ভারতের হায়দরাবাদে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট, ১৯৮৯ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে পঞ্চম এশিয়ান ভলিবল প্রতিযোগিতা এবং পাকিস্তানের ইসলামাবাদে চতুর্থ সাফ গেমসে বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৮০ সালে তুরস্কে প্রথম ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে সহ-অধিনায়ক এবং ১৯৮২ সালে দিল্লিতে এশিয়ান গেমস ও ১৯৮৯ সালে সিউলে পঞ্চম এশিয়ান ভলিবলে অধিনায়কত্ব করেন। দিল্লি এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ সাফল্য না পেলেও ব্যক্তিগত ঔজ্জ্বল্য দিয়ে তিনি ঠিকই নিজেকে আলাদা করে রাখতে সক্ষম হন। বিদেশি দলের হয়ে খেলার লোভনীয় আমন্ত্রণ পেলেও তাঁর খেলা হয়ে ওঠেনি। তবে ওয়ারীর হয়ে থাইল্যান্ডে এবং ওয়াপদার হয়ে শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক ভলিবল প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন তিনি। 

ফুটবলার হিসেবেও ইয়াদ আলীর গড়ে উঠার সম্ভাবনা ছিল। ফুটবলটা খারাপ খেলতেন না। ব্রাদার্স ইউনিয়নের কোচ গফুর বালুচের কাছে তিনি বছরখানেক দীক্ষাও নিয়েছিলেন। ব্রাদার্সে তাঁর খেলাও চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় বাংলাদেশ দলকে ট্রেনিং দিতে আসা সোভিয়েত ইউনিয়নের একজন ভলিবল কোচের নজরে পড়েন তিনি। কোচের কারণে তাঁর আর ফুটবলার হওয়া হয়নি। তিনি তাঁকে ভলিবলে থাকতে অনুরোধ করায় সেটাকেই শিরোধার্য হিসেবে মেনে নেন ইয়াদ আলী।

১৯৮৯ সালে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে ইয়াদ আলী (সর্বডানে, দাঁড়ানো)

১৯৯১-৯২ সালে ভারতের পাতিয়ালা থেকে ভলিবলের ওপর এক বছরের ডিপ্লোমা কোচেস ট্রেনিং করে এসে ইয়াদ আলী কোচ হিসেবেও বাংলাদেশের ভলিবলে অবদান রাখেন। ১৯৯৫ সালে ভারতের মাদ্রাজে সপ্তম সাফ গেমস, ২০০৯ সালে এফআইভি বিশ্ব ভলিবল প্রতিযোগিতা এবং সর্বশেষ ২০১০ সালে বাংলাদেশে আয়োজিত এস এ গেমসে তিনি বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন। নৌবাহিনীর কোচ হিসেবেও তাঁর অনেক সাফল্য। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ও ১৯৮২ সালে বিএসজেএ থেকে সেরা ভলিবল খেলোয়াড়ের পুরস্কার পেয়েছেন, ১৯৮৮ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ পুরস্কার। 

ভলিবলে ইয়াদ আলীর মতো দর্শকনন্দিত খেলোয়াড়ের দেখা সহজে মেলে না। বাংলাদেশের ভলিবলে তাঁর মতো আর আসবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্টই সংশয় আছে। ইয়াদ আলী খেলা ছাড়ার পর তাঁর মতো আরেকজন দর্শকনন্দিত খেলোয়াড় যেমন দেখা যায়নি, তেমনি ভলিবলে সেই জনপ্রিয়তাও আর ফিরে আসেনি।