আমরা ছিলাম ফুটবল পাগল মানুষ। তরুণ বয়সে ম্যারাডোনা বা পাওলো রসি না, আমাদের নায়ক ছিল সালাউদ্দীন-চুন্নু-টুটুল-এনায়েত-ওয়াসিম-সাব্বির। সক্রেটিস বা ফ্রাঙ্কো বারেসি না, আমাদের বেশি ভালো লাগত আশীষ ভদ্র বা নান্নুর খেলা। 

আমি ছিলাম আবাহনীর সমর্থক। কঠিন সমর্থক। এজন্য জীবনে বহু মূল্য দিতে হয়েছে আমাকে। একটার কথা বলি। তখন আমি এইট-নাইনে পড়ি, ৭৭ বা ৭৮ সালের ঘটনা। আমরা থাকতাম পুরানো ঢাকার এক সরু গলিতে, এতই সরু যে. জানালা দিয়ে তরকারিওয়ালার টুকরি থেকে লাউ তুলে নিলেও টের পেত না কেউ। 

সেই সরু গলি দিয়ে বিচিত্র এক আক্রমণ শুরু হলো আমার ওপর ওয়ারীর কাছে আবাহনী এক মৌসুমে দুবার হারার পর।  গলি দিয়ে যে-ই যায়, তার অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়াল 'ওয়ারী আইলো' বলে একবার হাঁক দেয়া। সারাদিন জানালা দিয়ে 'ওয়ারী আইলো' শুনতে শুনতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাম। যথেষ্ট পরিমাণে অতিষ্ঠ হলাম কি না, এ নিয়ে অবশ্য কারও কারও সন্দেহ ছিল।  ও... য়ারী আই লোও ওওওওও...এই ধরনের বিচিত্র সুরে আমাকে খেপাতে শুরু করল তারা। 

আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচে গ্যালারি উপচে পড়ত দর্শকে

এরপর আবাহনী-ওয়ারী খেলার দিন পালিয়ে থাকতাম, কাছের লালবাগ শাহী মসজিদে গিয়ে দোয়া পড়তাম, পরাজয়ের সিরিয়াল ভেঙে পরেরবার আবাহনী ওয়ারীর সাথে ড্র করার পর আনন্দে কেঁদে ফেললাম। সেবছর আবাহনী চ্যাম্পিয়ন হলো। কিন্তু 'ওয়ারী আইলো' শোনা থেকে রক্ষা পাইনি বহু বছর।  

২. 
ফুটবল নিয়ে আমার গল্পের শেষ নেই। মজার একটা গল্প আছে পরিণত বয়সের। ১৯৯১ সাল বোধ হয় তখন। আমার গালে একটা সিস্ট বা ছোট গুটলির মতো ছিল অনেকদিন। ক্যান্সার হয় কি না, এ সন্দেহে পরম স্নেহময়ী জাহানারা ইমাম একদিন জোর করে পাঠালেন সেই সিস্ট অপারেশন করাতে। অপারেশন করার পর গালে আড়াআড়ি ব্যান্ডেজ বাধা হলো। আমি বিচিত্রা অফিসে এসে দেখি, আমার অপেক্ষায় অধীর হয়ে আছে সবাই। 

অপেক্ষায় থাকার কারণ, সেদিন ছিল আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল খেলা। আমি কাজ করতাম সাপ্তাহিক বিচিত্রায়, কিন্তু আমাদের আড্ডা ছিল সহযোগী প্রতিষ্ঠান আনন্দ বিচিত্রাতেও। দুই পত্রিকার পাঁচজন মিলে খেলা দেখতে যেতাম মিরপুর স্টেডিয়ামে। আমি, অরুণ চৌধুরী, মাহফুজুর রহমান, আরিফ রহমান শিবলী আর শামসুল হক। পাঁচজনই যেতাম এক স্কুটারে করে। শামসু ভাই সামনে, আমার চারজন পেছনে। এতো গাদাগাদি করে বসতাম যে, কেউ হেসে ফেললে পাশের জনের পুরো বডি কাঁপতে থাকত সেই হাসির দমকে। 

বিপুল পরিমাণ হাসাহাসি করেই সেদিন আমরা মিরপুর স্টেডিয়ামে পৌছালাম। গিয়ে দেখি, লোকে লোকারণ্য অবস্থা, ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষজন ছোটাছুটি করছে ঢোকার সুযোগের জন্য। 

আমাদের সাংবাদিক পাস ছিল। কিন্তু তারপরও ভিড়ে ঢোকা দুঃসাধ্য মনে হলো। লাইনে দাঁড়িয়ে আমি এক হাত দিয়ে আড়াল করে রাখলাম গালের ব্যান্ডেজ। একটু খোঁচা লাগলে রক্ত বের হওয়া শুরু করবে, তখন আমি খেলা দেখব কিভাবে! 

আমার বন্ধু মাহফুজ ছিল স্বাস্থ্যবান যুবক। সে ষাঁড়ের মতো সবাইকে গুঁতিয়ে ভেতরে ঢুকলো। আমি কোনোমতে তার কাছে যাওয়া মাত্র সে আমার হাত ধরে টানতে লাগল। পেছন থেকে টানছে গাল আড়াল করে রাখা হাতের কনুই ধরে একজন পুলিশ। যা থাকে কপালে ভেবে আমি সেই হাত প্রসারিত করে পুলিশের বুকে ধাক্কা দিলাম। মাহফুজের টানে এক পলকে ভেতরে ঢুকে গেলাম। 

মাঠে খেলোয়াড়েরা নেমে গেছে। প্রেসবক্স লোকে লোকারণ্য, তাদের ঠেলেঠুলে কোনোমতে বসার জায়গা করে নিয়েছি। খেলা মাত্র শুরু হয়েছে। গ্যালারির মানুষ সমুদ্রের স্রোতের মতো নেচে উঠছে উত্তেজনায়। প্রথম মিনিটে বল পেয়েই আবাহনীর আসলাম কিক নিল, বল গেল পোস্টের অনেক দূর দিয়ে। ততক্ষণে উত্তেজনায় সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। 

সবাই ডুবে আছে খেলায়। হঠাৎ দেখি, শুধু পাশের জন খেলা রেখে আমার গালের দিকে তাকিয়ে আছে। হাত দিয়ে দেখি ব্যান্ডেজ আলগা হয়ে গেছে। তার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করি। সে অবাক হয়ে আমাকে বলে: ওই মিয়া, খেলা তো সুরু ভি  হয়নি। আপনের চোপা ফাটাইলো কেডা!  

উপচে পড়া গ্যালারি থেকে কাঁটাতার টপকে মাঠে ঢোকার চেষ্টা করছে দর্শক। ঢাকাই ফুটবলের স্বর্ণযুগের অমর ছবি

খেলার মাঠে আমার চোপা (গাল) কোনোদিন কেউ ফাটায়নি । তবে খেলা দেখতে গিয়ে অন্য দলের সমর্থকদের পেশাবে ভিজেছি, ভিড়ের চাপে বুকের হাড্ডি ব্যথায় টনটন করেছে, স্যান্ডেল ছিঁড়েছে, বৃষ্টির মতো ধেয়ে আসা ইটের টুকরোর দু'একটা গায়ে লেগেছে, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে 'ওরে বাবা রে' বলে প্রাণপণে পালিয়েছি। 

কী যে আনন্দের স্মৃতি এসব। 

৩. 
আমাদের তরুণ সময় কেটেছে ফুটবলের স্বর্ণযুগে। সেই সময় আবাহনী-মোহামেডান ফুটবল খেলার দিন সারা দেশে উড়ত দুই দলের পতাকা। খেলার টিকিট কেনার জন্য মানুষ লাইন ধরত ভোররাত থেকে। খেলার সময় স্টেডিয়াম উপচে পড়ত দর্শকে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যেত রেডিওর ধারাভাষ্য শোনার জন্য। 

শুধু কি আবাহনী মোহামেডান? ব্রাদার্স ইউনিয়ন, রহমতগঞ্জ, ওয়ান্ডারার্স, বিজেএমসি এসব দলেরও তখন সমর্থক ছিল। ফুটবল তারকারা তখন ছিলেন দেশের সবচেয়ে বড় মেগাস্টার! সেরা ক্রিকেটারদের মধ্যে তখন ছিলেন ওমর খালেদ রুমী, সৈয়দ আশরাফুল হক, দীপু রায় চৌধুরী, নেহাল হাসনাইন প্রমুখ। কিন্তু জনপ্রিয়তার পাল্লায় তাঁরা তো দূরের কথা, সে সময়ের সেনসেশন দাবার গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদও ধারেকাছে ছিলেন না ফুটবলারদের। 

মেজর হাফিজ, সালাউদ্দীন, চুন্নু, এনায়েত, সান্টু বা নান্নু-মঞ্জু ছিলেন তখন লাখো ফুটবলামোদীদের কাছে অতিমানব ধরনের  কিছু! পরের প্রজন্মের মুন্না, কায়সার হামিদ বা সালাম মুর্শেদীদেরও ছিল আকাঁশছোয়া জনপ্রিয়তা। ২৫ বছর আগে এক মৌসুমে মুন্নাকে ১৮ লক্ষ টাকা দিয়ে সাইন করিয়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল আবাহনী। ব্রাদার্স নাকি এর চেয়েও বেশি অফার করেছিল মুন্নাকে। মুন্না তখন দুই বাংলারই মেগাস্টার, কলকাতার ইস্টবেঙ্গলে খেলে জয় করে নিয়েছেন ভারতীয়দের মনও। সালাউদ্দীন এর আগেই পেশাদার ফুটবল খেলে এসেছেন হংকংয়ে। 

কিন্তু ফুটবলের সেই স্বর্ণযুগে আঞ্চলিক পর্যায়েও উল্লেখ করার মতো সাফল্য ছিল হাতে গোনা। পৃথিবীর সকল মহাদেশের মধ্যে তখনও এশিয়া ছিল ফুটবলে নিচের কাতারে। আবার এশিয়ার মধ্যে নিচের কাতারে ছিল দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবল। সেখানেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল মাঝামাঝি পর্যায়ে! ফুটবলে কোনোদিন বাংলাদেশ বিশ্বের সেরা ১২৫টি দেশের কাতারেও ঢুকতে পারেনি। 

তাতে কি! আমার মা মলিন হলে কি তাকে ভালোবাসি না আমরা? দেশের ফুটবলকে আমরা ভালোবাসতাম এভাবেই!