ক্রীড়াপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী হকিতে এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। হকির প্রাক্তন সভাপতির এ সফল প্রচেষ্টা অভিনন্দনযোগ্য।

এই অনুদানেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। কিন্তু নিস্তরঙ্গ হকিতে কিছুটা হলেও তা প্রাণের ছোঁয়া আনবে। অথচ আমাদের হকির যে ঐতিহ্য, তাতে খেলাটি আরও ভালো জায়গায় থাকার কথা ছিল।

ঢাকাতে হকি খেলা এসেছে ১৯০৭/০৮ সালে। নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কলকাতার ‌‘হোয়াইট ওয়েজ' ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে হকি স্টিক দেখে নবাব বাড়ির যুবকদের জন্য নিয়ে আসেন। নবাব বাড়ির ছেলেরা তাঁকে নিরাশ করেনি। ইউসুফ রেজা স্থান পেয়েছিলেন ধ্যানচাঁদের ভারতীয় অলিম্পিক দলে। বিশ্ব যুদ্ধের জন্য অলিম্পিক না হওয়াতে ঢাকা অলিম্পিক স্বর্ণবঞ্চিত হয়। ইউসুফ রেজা এত দক্ষ ছিলেন যে, তাঁকে সমগ্র ভারত বলত 'হকির মলমল’।

হকির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তারকা ধ্যানচাঁদ তাঁর ইউনিট 'ঝাঁসি হিরোস্' নিয়ে ঢাকার পিলখানায় ছিলেন। তাঁর ভাইও অলিম্পিয়ান রূপচাঁদ একই ইউনিটে ছিলেন পিলখানায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে 'ঝাঁসি হিরোজ' অনুশীলন করত, আমার বাবা মরহুম শামসুদ্দিন চাকলাদার তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দলের অধিনায়ক, হকি ’ব্লু’ও ছিলেন। ধ্যানচাঁদ তাঁর হকি টিম নিয়ে মাঝে মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় দলের সাথে ম্যাচ খেলত আর ১৪/১৫টা করে গোল দিত।

 হকির বিবর্ণতায় দিনকে দিন গ্যালারিও হয়ে পড়েছে দর্শকশূন্য। ছবি: গেটি ইমেজেস

ঢাকার হকির ঐতিহ্য থাকলেও নেই ধারাবাহিকতা। পূর্ব পাকিস্তান হকি দল সমৃদ্ধ ছিল আবদুস সাদেক, ইব্রাহিম সাবের, বশির আহমেদ, শামসুল বারী, এহতেশাম, প্রতাপ শংকরের মতো প্রাতঃস্মরণীয় তারকাদের নিয়ে। আবদুস সাদেক এবং ইব্রাহিম সাবের বার্সেলোনা অলিম্পিকে পাকিস্তান দলের সাথে 'অবজার্ভার' হিসেবে গিয়েছিলেন। বিশ্ব  ট্যুরে পাকিস্তান হকি দলের সদস্য ছিলেন আবদুস সাদেক । ১৯৭০ সালে পাকিস্তান বনাম পূর্ব পাকিস্তান হকি দলের প্রদর্শনী ম্যাচ হয়েছিল ঢাকা স্টেডিয়ামে। পাকিস্তান তখন বিশ্বজয়ী, আমি গ্যালারিতে বসে খেলা দেখেছিলাম। পাকিস্তান দল জিতেছিল ১-০ গোলে, কিন্তু বহুত নাকানি চুবানির পর। পূর্ব পাকিস্তান তখন জ্বলছে বৈষম্যের আগুনে। সেই বৈষম্যের ছাপ ক্রীড়াঙ্গনেও…জনগন সোচ্চার হলো, কেন পূর্ব পাকিস্তানের কোনো খেলোয়াড় জাতীয় হকি দলে নেই? 

ওই যে বললাম, হকিতে ধারাবাহিকতা নেই। সেই ’৭০ সালের পর আবার '৮৫ সালে বাংলাদেশ মখোমুখি হয়েছিল পাকিস্তান হকি দলের। খেলায় প্রাধান্য ছিল বাংলাদেশের। খেলা শেষের ছয় মিনিট আগে বিশ্বজয়ী পাকিস্তান গোল করে মর্যাদা বাঁচায়। তবে সমগ্র দেশ এই  সাড়া জাগানো খেলায় এতটাই অনুপ্রাণিত হয় যে, গ্রামে গঞ্জে গাছ কেটে হকি স্টিক বানিয়ে ধুমসে হকি খেলা শুরু করে ।

তারপর শুরু হয় ক্রীড়া নোংরামি। দলীয় অধিনায়ক সমগ্র দলটিকে এক সূতোয় বেঁধে রেখেছিলেন। কিন্তু অজানা কারণে তাঁকে আর দলের সাথে থাকতেই দেয়া হলো না। হকি তার ছন্দ হারাল, আর হারাল দর্শক।

তারপর…যে-ই কে সেই, উৎসাহ-উদ্দীপনার অভাবে জেলাগুলোয় হকি নেই, হকি খেলা গুটাতে গুটাতে মওলানা ভাসানি হকি স্টেডিয়ামের ভেতর হাঁটি হাঁটি পা পা করছে। যে কোনো খেলার সবচেয়ে বড় অক্সিজেন হলো দর্শক। কিন্তু ’৮৫-এর মতো দর্শক কোথায়? এখন হকির দর্শক হলো ফেডারেশনের সদস্যরা। মুষ্টিমেয়। জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে হকি। বলেছিলাম খেলার প্রথম কথাই হলো দর্শক। হকি সেই দর্শক টানতে পুরোপুরি ব্যর্থ । 

আন্তর্জাতিক মানের হকি খেলোয়াড় দেশে আছে। কিন্তু নেই উপযুক্ত এমন কেউ, যিনি দলটিকে এক ছন্দে বেধে রাখবেন। ফলে যে কোনো টুর্নামেন্টে হচ্ছে হতাশাজনক ফলাফল ।

প্রাক্তন সভাপতি এক কোটি টাকা অনুদান এনেছেন। সালাম পাবার যোগ্য তিনি। তবে অভাবের সংসারে এই টাকা পদ্ম পাতায় শিশির বিন্দুর মতো অপ্রতুল। এ টাকা হকি ক্লাবগুলোর মধ্যে বন্টন হবে। লিগ হবে, খেলোয়াড়েরা কিছু টাকা হাতে পাবে । তারপর ...। আগামী লিগ কি করে হবে? টুর্নামেন্টে শুধু সার্ভিসেস দল খেলে। ব্যাংক খেলে। ক্লাব যোগ দেয় না কেন? টাকা নাই বলে! অনুদানের এই এক কোটি টাকা কত বছর ক্লাবগুলোর অক্সিজেনের কাজ দেবে?

নতুন সভাপতির কাছে আমার কিছু সুপারিশ তুলে ধরলাম। হকি উন্নয়নের স্বার্থেই সেগুলোর বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে মনে করি আমি-

১. হকিতে স্পন্সর আনার রাস্তা তৈরি করুন।

২. জেলা পর্যায়ে সারা বছর লিগ ও টুর্নামেন্ট শুরুর পদক্ষেপ নিন।

৩. বছরব্যাপী বয়সভিত্তিক হকির অনুশীলনের ক্যালেন্ডার তৈরি করুন।

৪. বিদেশি হকি দল বছরে অন্তত ৫/৬ বার নিয়ে আসুন, এতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের মান যাচাই করা সম্ভব হবে এবং বিদেশে দল পাঠানোর পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা নষ্ট হবে না। আর এতে দর্শকও হকির প্রতি আগ্রহী হবে।

৫. বিদেশি আম্পায়ার এনে বাংলাদেশের আম্পায়ারদের ট্রেনিংয়ের বন্দোবস্ত করুন । 

৬. কোচদের ট্রেনিংও বিদেশ থেকে কোচ এনে ঢাকাতেই করার ব্যবস্থা করুন ।

৭. মহিলা হকির জন্য অনুশীলন চালু করুন।

৮. আধুনিক হকি টার্ফ নির্ভর। যত হকি টার্ফ, সবই ঢাকাতে। টার্ফ ব্যয়বহুল হলেও মানসম্পন্ন ‘হকি দেশ’ গড়তে টার্ফের বিকল্প নেই । দেশের হকি উন্নয়নে অন্তত আরও চারটি টার্ফ এনে ঢাকার বাইরে স্থাপন করার ব্যবস্থা করুন।

প্রধানমন্ত্রী ক্রীড়াপ্রেমী। হকি সভাপতিকে অনুরোধ করব, হকির ভবিষ্যতকে শক্ত কাঠামোর উপর প্রতিষ্ঠিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ঐতিহ্যবাহী এই খেলার জন্য পনের কোটি টাকা অনুদান নিয়ে আসার। এ টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করে রাখলে, জেলা থেকে আরম্ভ করে হকির সব সমস্যাই সমাধান করা যাবে। কোনো কিছুই অবাস্তব নয়, যদি তা ভবিষ্যতকে সুদৃঢ় করে।

হকিতে বিকেএসপি কিছুদিন আগেও দেশসেরা ছিল। তাদের কী নেই, টার্ফ, কোচ, প্লেয়ারদের পড়াশোনা, থাকার ব্যবস্থা—সবই আছে। তারপরও ফলাফল নিম্নমুখী। ওই যে বললাম, আমাদের ধারাবাহিকতার অভাব।

টাকা বা সব সুযোগ থাকলেই হবে না, শক্ত প্রশাসন হলো ফলাফল ভালো করার প্রথম শর্ত। হকি উন্নয়নে তাই সভাপতি আপনার কাছে অনমনীয় দৃঢ়তা চাই ।

* লেখক সাবেক জাতীয় হকি দলের অধিনায়ক এবং জাতীয় পুরস্কার প্রাপ্ত ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব।