পাকিস্তান ক্রিকেটের ‘নবতম পেস বিস্ময়’ হিসেবে ওয়াকার ইউনিস যখন প্রথম টেস্ট খেলতে নামেন, তত দিনে ২৫টি টেস্ট খেলা হয়ে গেছে ওয়াসিম আকরামের। ২৫ টেস্টে ৭৬ উইকেট। অবসর থেকে ফিরে আসা ইমরান খান তখনো আছেন এবং তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মোটামুটি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন ওয়াসিম আকরাম। ’৮৯-এর নভেম্বরে করাচিতে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক টেস্টেই ওয়াকার ইউনিস (তখন এবং এরপরও অনেক দিন পরিচিত হয়েছেন ওয়াকার ইউনুস নামে) বুঝিয়ে দিলেন, ইমরান চলে যাওয়ার পরও তেমন দুশ্চিন্তা নেই। ওয়াসিম আকরামের দীর্ঘকালীন পেস পার্টনার হতেই এসেছেন তিনি।

বুঝিয়ে দিয়েছিলেন এরও আগে শারজায় ওয়ানডে টুর্নামেন্টটিতেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়াকারের অভিষেক ম্যাচটিতেই ওয়ানডেতে তাঁর দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন ওয়াসিম আকরাম। তবে সেই টুর্নামেন্টের আসল তারকা ওয়াকার ইউনিসই। সবাই তাঁকে আলাদা করে চিনল ইংলিশ আম্পায়ার ডিকি বার্ডের মন্তব্যে। ক্যারিবীয় পেস ব্যাটারিরা ছিল সেই টুর্নামেন্টে, তারপরও ডিকি বার্ড রায় দিলেন, ‘পাকিস্তানের ওই ছেলেটিই এই টুর্নামেন্টের দ্রুততম বোলার।’ সেই বোলারটিকে যেন গাছ থেকে এনেছিল পাকিস্তান, আরও নির্দিষ্ট করে বললে পেড়ে এনেছিলেন ইমরান খান। হাসপাতালে রোগশয্যায় শুয়ে পাকিস্তানের ঘরোয়া উইলস ট্রফির খেলা দেখছিলেন পাকিস্তান অধিনায়ক। ওয়াকারকে টিভি পর্দায় দেখেই ডেকে নিলেন পাকিস্তান দলে। ওয়াসিম আকরামের গল্পটাও তো অনেকটা এরকমই। এবার ইমরানের জায়গায় জাভেদ মিয়াঁদাদ, নেটে লিকলিকে লম্বা বাঁহাতি বোলারটিকে দেখেই ‘বড়ে মিয়াঁ’ বুঝে ফেলেন এ অন্য জিনিস। ইমরানকে বললেন এবং এরপর দেখা গেল ১৯৮৪-৮৫-তে নিউজিল্যান্ড সফরে মাত্র দ্বিতীয় টেস্টেই ১০ উইকেট নিয়ে ফেলেছে ১৮ বছরের সেই তরুণ।

ইমরান খান, 'টু ডব্লিউ'-এর ক্যারিয়ারে বড় ভূমিকা তাঁর। ছবি: ডন

টেস্ট ক্রিকেট ‘দুই ডব্লিউ’কে প্রথম একসঙ্গে দেখল করাচি টেস্টে। দুজনের উইকেট নেওয়ার লড়াইটার শুরুও প্রথম থেকেই। দুই ওপেনার কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত ও নভজ্যোত সিং সিধুকে ফিরিয়ে দিয়ে ওয়াসিম আকরাম তাতিয়ে দিয়ে থাকবেন ওয়াকারকে। সঞ্জয় মাঞ্জরেকারকে উইকেটকিপার সেলিম ইউসুফের ক্যাচ বানিয়ে ওয়াকারও নামলেন নিধনযজ্ঞে। মাঞ্জরেকারের পর মনোজ প্রভাকর, ওই টেস্টেই অভিষিক্ত ভবিষ্যতের ‘গ্রেট’ শচীন টেন্ডুলকার এবং তখনই গ্রেট কপিল দেবকে ড্রেসিংরুমের পথ ধরিয়ে ওয়াসিম আকরামকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন ওয়াকার। পরে স্বভাবমতো দুই টেল এন্ডারকে উড়িয়ে দিয়ে ওয়াসিম আকরাম ধরে ফেললেন তাঁকে। পাকিস্তানের ক্রিকেটে ‘ডব্লিউ যুগে’র সূচনা হলো যে টেস্টে, তাতে প্রথম ইনিংসে দুজনই সমানে সমান। দুজনই পেলেন ৪টি করে উইকেট (ওয়াসিম আকরাম ২৬.২-৪-৮৩-৪, ওয়াকার ইউনিস ১৯-১-৮০-৪)। দ্বিতীয় ইনিংসে ভারতের ৩টি উইকেটই পড়েছিল, এর ১টি ওয়াসিম আকরামের। ওয়াকার খুব কম সময়ই ছিলেন মাঠে, ২ ওভার বোলিং করার পরই ইনজুরির কারণে মাঠে ছাড়তে হয় তাঁকে।

প্রথম টেস্টেই উইকেট নেওয়ার ক্ষমতার মতো ইনজুরি প্রবণতারও যে প্রমাণ রেখেছিলেন ওয়াকার, পরের ১১ বছর সেই পথ ধরেই হেঁটেছে তাঁর ক্যারিয়ার। সব সময়ই উইকেট নেওয়ার লক্ষ্যে বল করা আক্রমণাত্মক এক বোলার তিনি, ওয়াসিম আকরামও তা-ই। তবে শুধু ডানহাতি-বাঁহাতি ছাড়াও দুজনের বোলিং স্টাইলে পার্থক্য আছে আরও। ওয়াসিম চার-পাঁচ পা দৌড়ে এসেও ব্যাটসম্যানকে চমকে দেওয়া গতিতে বল করতে পারেন, ম্যাকলাম মার্শালের পর ক্রিকেটে দ্রুততম আর্ম অ্যাকশনই করে চূড়ান্ত কাজটা।

ওয়াকারের বোলিংয়ে রান আপটার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, তিনি অনেক বেশি রিদম বোলার। ফাস্ট বোলার বলতেই যে বন্য একটা আক্রমণাত্মক ছবি ভেসে ওঠে চোখে, ওয়াকার ইউনিস ঠিক তা-ই। ওয়াকারের বোলিং শরীরকে তাই বড় বেশি জানান দিয়ে যায়। তবে ছন্দে থাকলে তাঁর চেয়ে ভয়ঙ্কর বোলার খুব বেশি নেই। ছন্দে না থাকলে কখনো খুব বেশি খরুচে। কারণ ফুলার লেংথে বল করে তিনি ড্রাইভ করতে প্ররোচিত করেন ব্যাটসম্যানদের। অন্যদিকে ওয়াসিম আকরামের সব কিছু ঠিকঠাক মতো না হলেও দেখা গেল, দর্শকেরা হয়তো সেটি বুঝতেই পারলেন না। তাঁর বলে রান তোলা বরাবরই কঠিন। ড্রাইভ করার মতো বল দেন খুব কম, ব্যাকফুটে গিয়ে দেখা যায় প্রায় গুড লেংথ থেকে বল ধেয়ে আসছে পাঁজরের দিকে। বল হাতে এই বাঁহাতি রীতিমতো এক শিল্পী, ক্ষমতা রাখেন যা ইচ্ছে তা-ই করার এবং মাঠের বাইরের সব সমস্যা, সব বিতর্ককে উজ্জীবনী শক্তি হিসেবে কাজে লাগানোর অবিশ্বাস্য এক ক্ষমতা আছে তাঁর।

উদাহরণ আছে অসংখ্যা। তবে এতদিন পরও সবচেয়ে জ্বলজ্বলে বলে মনে হয় ’৯৪-এর নিউজিল্যান্ড সফরকে। খেলোয়াড়দের বিদ্রোহে অধিনায়কত্ব হারানো ওয়াসিম আকরাম সেই সফরে না যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে সেই সিদ্ধান্ত বদলান এবং বলতে গেলে একাই দুটি টেস্ট জেতান পাকিস্তানকে। সেই টেস্টগুলোর ভিডিও ক্লিপিংস দেখেছি। উইকেট পাওয়ার পর অভ্যাসবশে সতীর্থদের দিকে দৌড়ে যেতে যেতে নিজেকে সামলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন ওয়াসিম আকরাম। বলতে গেলে দলের বাকি সবার সঙ্গেই কথাবার্তা বন্ধ ছিল তাঁর। অথচ দলে এক ঘরে হয়ে থাকাটাও বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি তাঁর মাঠের পারফরম্যান্সে।

সহ-খেলোয়াড়দের সেই বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তখনকার সহ-অধিনায়ক ওয়াকার ইউনিস। ওয়াসিম আকরাম সরাসরিই তাঁর সাম বলেছিলেন, ‘অধিনায়ক হওয়ার লোভে ওয়াকার আমার পিঠে ছুরি মেরেছে।’ ওয়ানিম ও ওয়াকার ইউনিস নাম দুটি তাই এমনিতেই যত অবিচ্ছেদ্যই মনে হোক না কেন, শুরুর বছর তিনেক ছাড়া দুজনের সম্পর্কটাকে টেনেটুনেও মোটামুটি বলার উপায় ছিল না কোনো। এখনো তাই। এই কিছুদিন আগে অস্ট্রেলিয়া সফর শেষে ওয়াকার যেভাবে ওয়াসিম আকরামকে আক্রমণ করেছিলেন আর ওয়াসিম আকরাম যে জবাব দিয়েছেন, তাতে মাঠে কখনো কখনো তাঁদের বুক মেলানোর দৃশ্রটিএ কৃত্রিম মনে হতে বাধ্য। 

দুজনের রেষারেষির আগুনে পুড়েছে কেবল প্রতিপক্ষ ব্যাটসম্যানরাই। ওভাল, ১৯৯২। ছবি: অলস্পোর্ট

এমনই একটি বুক মেলানোর দৃশ্যই ‘দুই ডব্লিউ’কে নিয়ে এই লেখা লিখতে বসার কারণ। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে কলম্বো টেস্টে ‘দুই ড’ব্লিউ' বুক মিলিয়েছেন বড় নাটকীয় পরিস্থিতিতে। ওয়াসিম আকরাম যখন ৪০০তম উইকেটটি নেওয়ার জন্য তাঁর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সাড়ে ১৪ বছরের অভিজ্ঞতার সবটা উজাড় করে দিচ্ছেন, তখন হাত নিশপিশ করছে ওয়াকারের। ‘বুরেওয়ালা এক্সপ্রেস’ও যে তখন নিঃশ্বাস ফেলছেন একটি মাইলফলকের গায়ে।

টেস্টে ৩০০ উইকেট পেতে তাঁরও প্রয়োজন ছিল একটি উইকেটই। শেষ পর্যন্ত ওয়াসিম আকরামের ৪০০-এর আগে ওয়াকারই পেলেন ৩০০তম উইকেট। মজার ব্যাপার হলো, ক্যাচটি নিলেন স্বয়ং ওয়াসিম আকরাম। ৩০০ উই্কেটে নেওয়ার জন্যই হয়তো দীর্ঘদিনের পার্টনারকে অভিনন্দন জানাতেন তিনি, ক্যাচটি ধরার পর বোলার আর ফিল্ডারের প্রথাগত আলিঙ্গণের মধ্য দিয়েই সেটি সেরে ফেললেন ওয়াসিম আকরাম। পরদিন ৪০০ উইকেটের মাইলফলকেও পা পড়ল তাঁর। ওয়াকারের যখন অভিষেক, তখন ওয়াসিম আকরামের ২৫ টেস্টে ৭৬ উইকেট পাওয়া হয়ে গেছে। এ কথা মনে রাখলে ওয়াকারের ৩০০ উইকেট পেতে খুব একটা দেরি হয়েছে বলে মনে হয় না। অথচ ঘটনা হলো, ইনজুরি বারবার এভাবে থাবা বাড়িয়ে না দিলে ওয়াসিম আকরামের সঙ্গেই হয়তো ৪০০ উইকেট পেয়ে যেতেন ওয়াকার! এমনই বিস্ময়কর তাঁর স্ট্রাইক রেট। ১০০ উইকেট পতে ২০ টেস্ট খেলতে হয়েছিল তাঁকে, পরের ১০০ এসেছিল মাত্র ১৮ টেস্টে, অথচ ২০০ থেকে ৩০০-তে পৌঁছতে ওয়াকারকে খেলতে হয়েছে ২৭টি টেস্ট! বোঝাই যাচ্ছে, গত কিছুদিন পরিপূর্ণ মহিমায় দেখা যায়নি তাঁকে, তারপরও এখনো হিসাব করলে দেখা যায়, গড়ে ৪২ বলে ১টি করে উইকেট পেয়েছেন ওয়াকার। ওয়ানডেতে কখনো কখনো বেশি রান দিয়ে ফেলেন বলে অভিযোগ, অথচ ৩০৯ উইকেটের জন্য গড়ে তাঁর খরচ মাত্র ২৩.৫৫ রান। প্রতি ৩০.৯ বলে একটি করে উইকেট! কে বলে, ওয়ানডেতে উইকেট নেওয়াটা বোলারদের লক্ষ্য নয়।

এতে কাজ হয়েছে কিনা কে জানে, তবে মনে হচ্ছে হয়তো দুজনের মধ্যকার তিক্ততা দূর করে দিতেই একই টেস্টে দুই পেস পার্টনারের দুটি স্মরণীয় মাইলফলক ছোঁয়া নির্ধারণ করে দিয়েছিল নিয়তি। ‘দুই ডব্লিউ' সংক্রান্ত যেকোনো আলোচনায় ওই পেস পার্টনার শব্দ যুগলের মাহাত্ম্য অনেক। আলাদা আলাদাভাবেই তাঁরা দুজনই ‘গ্রেট’দের সারিতে জায়গা পেয়ে গেছেন, তবে পেস জুটি হিসেবে আরও নিশ্চিত তাঁদের অমরত্ব। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টের পর টেস্ট ক্রিকেটে এই দুজনের মিলিত শিকার সংখ্যা ৭০৫। ওয়ানডেতে সংখ্যাটি আরও চমকে দেওয়ার মতো—৭৩৬!

পেস বোলারদের নাকি জুটি বেঁধে শিকার করতেই বেশি পছন্দ। কিথ মিলার-রে লিন্ডওয়াল, ফ্রেড ট্রুম্যান-ব্রায়ান স্ট্যাথাম, ওয়েস হল-চার্লি গ্রিফিথ, ডেনিস লিলি-জেফ টমসন—ক্রিকেট ইতিহাসের বিখ্যাত সব পেস জুটি বলতে এগুলোই্। তবে এঁদের কেউই নয়, অনেক দিন একসঙ্গে খেলা, জেতানো ম্যাচের সংখ্যা, দুই ধরনের ক্রিকেটেই কার্যকারিতা—এসব বিবেচনায় ওয়াসিম আকরাম-ওয়াকার ইউনিস জুটির প্রতিদ্বন্দ্বী আছে একটাই—কার্টলি অ্যামব্রোস ও কোর্টনি ওয়ালশ! উইকেট সংখ্যার দিক থেকে ক্যারিবীয়রাই এগিয়ে, তবে ওয়ানডেও যখন বিবেচনায় নেওয়া হবে, তখন এক নম্বর আসনটি ছেড়ে দিতে হবে দুই ডব্লিউকেই। এটিকে আরও তর্কাতীত করে তোলার পথে ভালোই্ এগোচ্ছেন তাঁরা। মাঝখানে দুজনকেই বাতিল বলে রায় দিয়ে দিয়েছিলেন অনেকে। দুজনই ফিরেছেন দোর্দন্ড প্রতাপে। ওয়াকারের ফেরাটাকেই বলতে হবে বেশি বিস্ময়কর। প্রায় দেড় বছর দলের বাইরে থাকার পর উঠে আসা অসংখ্য তরুণ বোলারকে টপকে আবারও নতুন বল হাতে পেয়েছেন এক সময়কার বিশ্বের দ্রুততম বোলার এবং ক্রিকেটের এক অসহ্য সময়ে এটিকে বলতে হবে এক ঝলক সুবাতাস। কারণ নতুন বল হাতে নিয়ে দুপ্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ওয়াসিম আকরাম ও ওয়াকার ইউনিস—ক্রিকেট দর্শকদের জন্য এরচেয়ে রোমাঞ্চকর দৃশ্য আর কিছুই হতে পারে না।

একমাত্র ব্যাটসম্যানদেরই ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছে না!

সংযোজন: ক্যারিয়ার শেষে টেস্ট ক্রিকেটে দুই ডব্লিউর মিলিত উইকেট-সংখ্যা ৭৮৭, ওয়ানডেতে ৯১৮।