কী বলবেন তাঁকে? সাহসী? নাকি আরেকটু দরাজ হয়ে দুঃসাহসীই বলে ফেলবেন! লর্ডসে টেস্ট অভিষেক হলো ঘণ্টা ছয়েক আগেই, দলের মূল ভরসা যে তিন ব্যাটসম্যান, তাঁরা ড্রেসিংরুমে ফেরত গেছেন তাঁকে ক্রিজে রেখেই, নিজে দাঁড়িয়ে ৯৮ রানে, স্কয়ার লেগের ফিল্ডারটাও ওৎ পেতে আছেন ক্যাচের অপেক্ষায়--এ সব সমীকরণ মাথায় রেখেও যিনি পায়ের ওপরের বলে অবলীলায় খেলে ফেলতে পারেন ফ্লিক শট, 'সাহসী', 'দুঃসাহসী' কোনো বিশেষণেই তো তাঁকে আঁটানো যাচ্ছে না। অবশ্য ডেভন কনওয়ের ক্যারিয়ারের ধারাটা যাঁরা জানেন, তাঁরা ওই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে অমন ফ্লিক শট খেলতে দেখে অবাক হয়েছেন বলে মনে হয় না।

***

জোহানেসবার্গের এক স্থানীয় ক্লাবের ফুটবল কোচের ঘরে জন্মেছিলেন, প্রথম প্রেমটা তাই ফুটবলই ছিল। তবে বারো বছর বয়সে এসে সিদ্ধান্ত নিলেন ক্রিকেটার হবেন। কারণ একটাই, ক্যারিয়ার হিসেবে ফুটবলের চাইতে এর স্থায়িত্ব বেশি। কিন্তু এভাবে দৈবগণনাতেই যদি ক্যারিয়ার বেছে নেওয়া যেত, তাহলে তো পৃথিবীটা ফুলশয্যাই হতো৷ হয়নি বলেই ক্রিকেটে এসে খাবি খেতে শুরু করেছিলেন কনওয়ে। ডলফিনসের অনূর্ধ্ব-১৮ দলে জায়গা হলেও টিকতে পারেননি এক বছরও। জোহানেসবার্গে ফেরত এসে চেষ্টা করেন লায়ন্সের দলে ঢোকার, তবে সেখানেও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বারংবার। যে ম্যাচগুলোতে সুযোগ পাচ্ছিলেন, সামর্থ্যটা পারফরম্যান্সে অনূদিত করতে পারছিলেন না সেখানেও। প্রভিন্সিয়াল লেভেলে রানের ফুলঝুরি ছোটালেও লায়ন্সের হয়ে ১২ ম্যাচ খেলে হাফ-সেঞ্চুরি করতে পেরেছিলেন একটি, ব্যাটিং গড় মাত্র ২১.২৯। ছয় বছর চেষ্টা করেও তাই দলে জায়গা পাকা হয়নি তাঁর। যেন মেনে নিতে শুরু করেন সমালোচকদের ওই কথাটাই, 'তোমার দৌড় প্রভিন্সিয়াল লেভেল (দ্বিতীয় বিভাগ) পর্যন্তই, এই সামর্থ্য নিয়ে ফ্র‍্যাঞ্চাইজি লেভেলে (প্রথম বিভাগ) জায়গা হবে না।'

লর্ডসে রূপকথা লিখে সেঞ্চুরির পরও উদযাপনটা হলো পরিমিত। জীবনযুদ্ধে পোড় খাওয়া সৈনিক বলেই হয়তো

এমন মুহূর্তে সবচেয়ে সহজ হতো ক্রিকেটটাই ছেড়ে ছুড়ে ভিন্ন কিছুর চেষ্টা করা, বেশির ভাগ লোক হয়তো তাই করতেন। কিন্তু ডেভন কনওয়ে তো ক্রিকেট খেলার আনন্দেই এই জীবনটা কাটাতে চেয়েছিলেন! ক্রিকেটকে আঁকড়ে রাখার স্বপ্নে কনওয়ে তাই সিদ্ধান্ত নিলেন, দেশান্তরী হবেন। পার্টনার কিমের সঙ্গে আলাপচারিতার পর জানলেন, আপত্তি নেই তাঁরও।

কোন দেশে যাবেন, সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ হয়ে গেল ম্যালকম নোফাল আর মাইকেল রিপনের জন্য। কনওয়ে তাঁদেরকে বন্ধু বলেই দাবি করেন এবং কনওয়ের আগেই দক্ষিণ আফ্রিকা ছেড়ে দুজনই নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ক্রিকেট খেলবেন বলে। তাঁদের পরামর্শেই ২০১৭ সালের আগস্টে কনওয়ে ধরলেন ওয়েলিংটনের উড়ান। সাহসের বীজটা কনওয়ের ভেতরে খুব সম্ভবত ঈশ্বরই পুঁতে দিয়েছিলেন, নইলে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার আগে সমস্ত সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করবেন কেন!

***

ওয়েলিংটনে এসে চার দিনের মধ্যেই পেয়ে গিয়েছিলেন ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি ক্রিকেট ক্লাবের খোঁজ, সেখানে ক্রিকেটার কাম কোচ হিসেবেই জায়গা হয় তাঁর। এমনিতে ক্লাব ক্রিকেটের রানগুলো নজরে আসে না খুব একটা, কিন্তু রানবন্যা বইয়ে দিলে তো দৃষ্টি না দিয়ে উপায় থাকে না। কনওয়ে ঠিক সে কাজটাই করেছিলেন ওই ক্লাবের হয়ে। ওয়েলিংটনের প্রধান কোচ ব্রুস এডগারও তাই শুনেছিলেন একজন দক্ষিণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত ব্যাটসম্যানের কথা, যিনি উইকেট কিপিংটাও করতে পারেন। ওয়েলিংটনের নিয়মিত উইকেটকিপার টম ব্লান্ডল তাই নিউজিল্যান্ড দলে ডাক পেলে শিঁকে ছেড়ে কনওয়ের। ওয়েলিংটনের দলে তিন ম্যাচের জন্য সুযোগ দেওয়া হবে তাঁকে, এই খবরটাকে কনওয়ে সে মুহূর্তে ঐশ্বরিক বাণীই ভেবেছিলেন খুব সম্ভবত।

অভিষেকে ৩০-এর কিছু বেশি, দ্বিতীয় ম্যাচে ৭৪ বলে ৭৮ আর তৃতীয় ম্যাচে লকি ফার্গুসনের দলের বিপক্ষে দ্রুতগতির ৫০--তিন ম্যাচের ওই অগ্নিপরীক্ষায় কনওয়ে খারাপ করেননি খুব একটা। টম ব্লান্ডলের অনুপস্থিতিতে ওয়েলিংটন দলে যে ডাক পড়বে কনওয়ের, সেটাও যেন লেখা হয়ে যায় ওই পারফরম্যান্সেই। 'ওঠ্ ছুড়ি তোর বিয়ে'-এর মতো করে হওয়া টি-২০ অভিষেক কিংবা ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচের মাঝপথে দ্বাদশ খেলোয়াড় থেকে কনওয়ের ডেব্যু হওয়ার কারণ ছিল একটাই, ব্লান্ডল খেলতে পারছেন না। 'যদি একটা বই লিখি, একটা চ্যাপ্টার তাতে টম ব্লান্ডলের জন্য বরাদ্দ থাকবেই', কনওয়ে কথাটা তো আর সাধে বলেননি।

অষ্টম ক্রিকেটার হিসেবে নিউজিল্যান্ডে করেছেন ফার্স্ট ক্লাস ট্রিপল হান্ড্রেড

***

আর ২ জুনের পরে ব্লান্ডলকে আলাদা একটা বই উৎসর্গ করা তো কর্তব্যই হয়ে গেছে কনওয়ের জন্য। নেটে ওয়েলিংটনের সহকারী কোচ গ্লেন পোকনালের সঙ্গে নিবিড় পরিশ্রম আর বিরাট কোহলি-এবি ডি ভিলিয়ার্সদের ট্রিগার মুভমেন্ট আর ফুটওয়ার্ক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় ব্যয় করে নিজের ব্যাটিং টেকনিকটা মোটামুটি দুর্ভেদ্যই বানিয়ে নিয়েছেন মাঝের সময়টায়। সুপার স্ম্যাশে আর নিউজিল্যান্ডের ঘরোয়া ওয়ানডে টুর্নামেন্টে রানবন্যা বইয়ে দিয়ে ডাক পেয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের ওয়ানডে আর টি-২০ দলেও। বাংলাদেশের বিপক্ষে তিন ওয়ানডেতে গড় পৌঁছেছে ৭৫-এ, ১৪ টি-টোয়েন্টি খেলার পরেও অ্যাভারেজ ঘুরঘুর করছে ষাটের আশেপাশে।

রান করছিলেন প্লাঙ্কেট শিল্ডেও, শেষ এক বছরে ওয়েলিংটনের হয়ে ৯ ইনিংস খেলে ৫০.৬৬ গড়ে রান করেছেন ৪৫৬। অবশ্য ওয়েলিংটন ফায়ারবার্ডসের হয়ে কনওয়ের আবির্ভাবের স্মৃতিটা মনে আছে যাদের, তাদের কাছে এই পরিসংখ্যানগুলো মলিনই লাগার কথা। ওয়েলিংটনের হয়ে প্রথম ১৭টি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচের পর কনওয়ের গড় ছিল ৭২.৬৩, চারটি হান্ড্রেডের মধ্যে একটি ছিল ট্রিপল। ক্যান্টারবুরির বিপক্ষে খেলা ওই ৩২৭ রানের ইনিংসটা ছিল নিউজিল্যান্ডের মাটিতে মাত্র অষ্টম ট্রিপল হান্ড্রেড।

এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে ডাক পেলেন নিউজিল্যান্ডের টেস্ট দলে। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে অভিষেকটা হলো জুনের ২ তারিখ, ক্রিকেটের তীর্থভূমি লর্ডসে। অভিষেকটা কার জায়গায় হলো, নামটা আন্দাজ করে ফেলার কথা এতক্ষণে। কনওয়ের সঙ্গে টম ব্লান্ডল ছাড়া আর কার নামই বা জড়াবে!

টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরির পথে

জীবনের রোলার কোস্টার রাইডে চড়া হয়ে গেছে এর আগেই। অভিষেকের উত্তেজনার ছিটেফোঁটাও তাই দেখা যায়নি ব্যাটিংয়ে। ইংলিশ সামারের প্রথম দিনের খেলায়, জেমস অ্যান্ডারসন কিংবা স্টুয়ার্ট ব্রডের সুইংয়ের সামনে পর্যদুস্ত মনে হচ্ছিল রস টেলর, হেনরি নিকোলসদের মতো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট গুলে খাওয়া ব্যাটসম্যানদেরও। ডেভন কনওয়ে যেন ব্যাটিং করলেন অন্য কারও বিপক্ষে, মার্ক উডের দুটি বাউন্সার ছাড়া সারাদিনে তাঁকে চাপে ফেলেছে এমন বলই তো খুঁজে পাওয়া গেল না।

১৬ চার আর ৮২ শতাংশ নিয়ন্ত্রণের ইনিংসে এরই মধ্যে তুলে নিয়েছেন সেঞ্চুরি, লর্ডসে মাত্র তৃতীয় সফররত ব্যাটসম্যান হিসেবে। দিনের খেলা শেষে অপরাজিত আছেন ১৩৬ রানে। বিদেশের মাটিতে কোনো কিউই অভিষিক্তর ব্যাটে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড গড়া হয়ে গেছে এতেই, ১৩১ রান করে এর আগে যে কৃতিত্ব ছিল তাঁর এখনকার অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের। কাকতালীয়ভাবে এত দিন লর্ডসে অভিষেকে কোনো ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ রানও ছিল ১৩১। ১৯৯৬ সালে যা করেছিলেন সৌরভ গাঙ্গুলী। কাকতালের তো এখানেই শেষ নয়। যাঁর রেকর্ড ভেঙেছেন, সেই সৌরভ গাঙ্গুলীর মতো ডেভন কনওয়ের জন্মদিনও ৮ জুলাই!

ক্রিকইনফো তাঁদের দিনের ধারাভাষ্যের ইতি টেনেছে 'কনওয়েস ডে' বলে। কেমন কাটল টেস্ট অভিষেকের প্রথম দিন জানতে চাইলে কনওয়ে খুব সম্ভবত মুচকি হেসে বলবেন, 'দক্ষিণ আফ্রিকার দ্বিতীয় বিভাগের লিগেও খেলে বেড়িয়েছি তো এমন একটা লর্ডস-রূপকথা লিখব বলে।'