ক্রিকেটে বাংলাদেশের উত্থানের মতো ক্রিকেটকে ঘিরে বাংলাদেশের উৎসাহও লক্ষণীয়। আর দেশের ক্রিকেটকে আজ এই জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য হাবিবুল বাশারই বলুন, মাশরাফি মুর্তজা, বা সাকিব আল হাসানের মতো একই রকম উল্লেখযোগ্য নাম উৎপল শুভ্রও। বাংলাদেশের ক্রিকেটকে, তামিম ইকবালদের মতো প্রতিভাবানদের, দেশের রান্নাঘরে পৌঁছে দিয়েছে উৎপল শুভ্র। সর্বোচ্চ পর্যায়ের ক্রিকেট না খেললে ক্রিকেট নিয়ে লেখা সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছায় না, এমন একটা কথা প্রচলিত আছে বিশ্বজুড়ে। বলা যেতে পারে একটা অলিখিত যুদ্ধই। আমাদের মতো উৎপলের কাছেও যা প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু সেই বাধা অনায়াসে কাটিয়ে নিজেকে এই উচ্চতায় তুলে ধরার কাজটা সত্যিই খুব কঠিন। সে জন্যও সাধুবাদ প্রাপ্য উৎপলের।

একই সঙ্গে নাম বলতে চাই মোস্তফা মামুনেরও। একসঙ্গে কাজ করত একটা সময়। পরে আলাদা কাগজে। স্বাভাবিকভাবেই নিজের সংস্থার কাগজকে উঁচুতে তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ওদের কলম। একে অপরকে ছাপিয়ে যাওয়ার এই চেষ্টায় লড়াই থেকেছে তার নিজের জায়গায়। তার বাইরে থেকে গিয়েছে অন্যের কাজের প্রতি শ্রদ্ধা, যা ওদের দুজনকে তো উপকৃত করেছেই, সবচেয়ে বেশি উপকৃত হয়েছে বাংলাদেশে ক্রিকেটের প্রসার, সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশের দৈনন্দিন ক্রিকেট-সাহিত্য, যা ঝলমলে হয়েছে আরও।

বিভিন্ন কাগজে পত্রপত্রিকায় উৎপলের লেখা পড়েছি, ওর বক্তব্য শুনেছি টেলিভিশনে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশের ক্রিকেটের মুখ হয়ে উঠেছে বিশ্বের দরবারে, বিদেশি ক্রিকেট পত্রিকায়ও নিয়মিত লিখে থাকে দেশের ক্রিকেট নিয়ে। কাজটা মোটেও সহজ নয়। পড়ুয়া, প্রচুর পড়ে। এবং শুধু ক্রিকেট নয়, সব খেলা নিয়েই পড়াশোনা মনে রাখার মতো। বার দুয়েক তো ফুটবলের বিশ্বকাপও করেছে এবং একই রকম নজরকাড়া পারফরম্যান্স সেখানেও। আমার ছায়াসঙ্গী কাশীনাথ ভট্টাচার্যর সঙ্গে ব্রাজিলে বিশ্বকাপ কাভার করতে যাওয়ার বহু গল্প শুনেছি ওদের মুখে। সান্তোসে মিউজিয়ামে যাওয়ার গল্প, পেলে-জাদুঘর দেখে আসার অভিজ্ঞতা। গোটা তিনেক ফুটবল বিশ্বকাপ কাভার করলেও ব্রাজিল যাওয়াটা হয়নি। কাশী আর উৎপলের সে সুযোগ হয়েছিল, ফুটবলের তীর্থস্থান দর্শনের। যে বয়সে এখন পৌঁছেছি, হয়তো ব্রাজিলে যাওয়া আর হবে না। কিন্তু ইচ্ছেটা শেষ দিন পর্যন্ত থেকেই যাবে। পেলেকে  অবশ্য মিট করেছিলাম, একেবারেই ওয়ান-টু-ওয়ান, লস অ্যাঞ্জেলেসে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের সময়। সে অন্য গল্প, বড় গল্প, হয়তো কখনো লিখব। তবু ওদের ব্রাজিলে ফুটবলের তীর্থদর্শনের গল্পগুলো ভোলা যাবে না।

কোনো এক প্রেসবক্সে দেবাশিস দত্তের সঙ্গে উৎপল শুভ্র

উৎপলের সঙ্গে কত ট্যুর! ক্রিকেট যে যে দেশে খেলা হয়েছে, সর্বত্রই গিয়েছি, সে-ও গিয়েছে। সে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা–সব জায়গায়। একই বিমানে যাতায়াত, এক হোটেলে থাকা, কখনো কখনো একই রুমেও। একটা অদ্ভুত ঘটনা মনে পড়ছে। অ্যান্টিগা-তে বাজারের মধ্যে একটা দোকান আছে, নাম ‘রোটিঘর’। রুটি পাওয়া যায়। এক রাতে দেখা গেল, রুটি কেনার লাইনে আমরা তিনজন। সামনে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্রিকেট লিখিয়ে শিল্ড বেরি, পেছনে বাংলাদেশের উৎপল আর আমি উৎপলের পেছনে। রুটি কেনার লাইনে তিনটি দেশের তিন ক্রিকেট-লিখিয়ে, আর সেই লাইনে দাঁড়িয়ে তিনজনের আড্ডা–সেই দিনগুলোর কথা কি আর ভোলা যায়!

বাংলাদেশে উৎপলের বাড়িও গিয়েছি। ওই একই কমপ্লেক্সে তখন থাকতেন আকরাম খান, বাংলাদেশের প্রাক্তন অধিনায়ক। দেখেছি উৎপলের দুই ছেলেকেই। দুষ্টুমিভরা চোখে বুদ্ধির ঝিলিক। ওরাও এখন বড় হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ক্রিকেটলেখক বাবার সুনামকেও ছাপিয়ে ওরা নিজেদের মতো করে নিজেদের পথ খুঁজে নেবে ঠিক, পৌঁছবে নিজেদের পেশার মগডালে, জানি। আমাদের আসলে সমস্যাটা অন্য রকম। দেশ-বিদেশে সারাক্ষণ নিজেদের কাজের কারণে আমরা পরিবারকে সময় দিতে পারিনি সেভাবে। এই অভিযোগ আমাদের ক্ষেত্রে একফোঁটা মিথ্যে তো নয়ই, পুরোপুরি সত্যি। এখন এই অতিমারির কারণে একটু বেশি বাড়িতে থাকতে পারছে, স্ত্রী এবং ছেলেদের সময়ও দিতে পারছে, যা নিশ্চিতভাবেই উপভোগ করছে ওর পরিবার এবং অবশ্যই উৎপল নিজেও। ওর স্ত্রীর কথা তো বলতেই হবে, এত ভালো মেয়ে এবং পরিবারটাকে একার হাতে টেনে গিয়েছে। উৎপল তো ক্রিকেট আর লেখালেখি নিয়েই কাটিয়ে গেল দিন-মাস-বছর, বছরের পর বছর!

নতুন কাজে হাত দিয়েছে উৎপল। এতদিন সংবাদপত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। এবার আরও ডালপালা বিস্তৃত করে নিজের নামের ওয়েবসাইটে। উৎপল কিন্তু বরাবরই আধুনিক। বৈদ্যুতিক মাধ্যম বলে শুধু নয়, প্রযুক্তির সঙ্গেও ওর আত্মিক যোগাযোগ। আমি যেমন কোনোকালেই পারি না কিছু। দুটো মোবাইলের সবুজ আর লাল বোতাম দুটো টিপেই কাটিয়ে দিলাম! উৎপলরা আগে হাতের লেখায় কাগজে ঝড় তুলত যেমন, এখন তোলে ল্যাপটপে। আর ওর এই নতুন উদ্যোগ আমাকে পাশে থাকতে বলেছে, লিখতে বলেছে নিয়মিত। জানি না কতটা পারব, তবু চেষ্টা তো করবই।

তবে শুরুতেই এত দেরি করে ফেললাম যে, নিজেকে অপরাধীই মনে হচ্ছে। আমরা স্পষ্ট কথার লোক। কেউ যখন তা বলে না, সমালোচনা করি হাত খুলে। তাই, উৎপলের অনুরোধ এত দিন না রাখতে পারার জন্য নিজেকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে আমি অন্তত একবারও পিছু হাঁটব না! আসলে নানা ধরনের সমস্যায় জর্জরিত এই কোভিড অতিমারিতে। সম্প্রতি মাকে হারিয়েছি। নিজের শরীরও একেবারেই ভালো নয়। বাড়িতে একাই থাকতে হচ্ছে এখন। ছোট মেয়ে পড়ার জন্য অক্সফোর্ডে গিয়েছে, সঙ্গে ওর মা-ও। আর বড় মেয়ের সংসার পুনেতে। ফলে কলকাতায় একাই থাকছি। তারই মধ্যে আবার এই অতিমারির দাপট। কিন্তু তা-ও রোজকার কাজ তো করতেই হবে। আর উৎপলকে কথা দিয়েছি যখন, দেরি হলেও কথা রাখার দায় তো আমারই।

প্রথম লেখাটা সুনীল গাভাস্কারকে নিয়ে লেখার কথা উৎপলই আমাকে বলেছিল, নাকি আমিই উৎপলকে, তা ঠিক মনে নেই। সেটাই লিখতে চেয়েছিলাম। তবে লিখতে বসে উৎপল, ওর ওয়েবসাইট আর আমাদের সাংবাদিক জীবন নিয়ে কথা বলতে বলতে অনেক কথাই বলে ফেললাম। সুনীল গাভাস্কারকে নিয়ে তাহলে পরেই লিখি। এই লেখার মধ্যে তাঁকে টেনে আনাটা ঠিক সুবিচার হবে না।