১৯৪৮ সালের ওভাল টেস্টে আরও অনেক কিছুই হয়েছে। কে আর মনে রেখেছে সে সব। '১৯৪৮ সালের ওভাল'-এর একটাই অর্থ 'স্যার ডন ব্র্যাডম্যানের শেষ টেস্ট'। ব্যাটিং গড়টাকে পুরোপুরি ১০০ করতে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৪টি রানের, যাঁর ব্যাট থেকে সারা জীবন রানের ফোয়ারা ছুটেছে, সেই স্যার ডন ব্র্যাডম্যানকে শূন্য রানেই ফিরিয়ে দিল এরিক হলিস নামের এক লেগ স্পিনারের গুগলি। 'মাত্র' ৯৯.৯৪ গড় নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হলো স্যার ডনকে।

‘১৯৪৮ সালের ওভাল' উচ্চারিত হওয়ার অর্থই এই স্মৃতির ঝাঁপি খুলে যাওয়া। ২০০৪ সালের সিডনিরও কি এ রকম কোনো অর্থ হবে? আজ থেকে কয়েক বছর পরও এই টেস্টের কথা উঠলেই বাকি সবকিছু ছাপিয়ে প্রথমেই মনে হবে, স্যার ডনের দেশের আরেক কীর্তিমানের শেষ টেস্ট ছিল এটি!

শেষ টেস্টে স্যার ডন ব্যাট করতে নামার সময় পুরো দলকে একত্র করে 'থ্রি চিয়ার্স' দিয়েছিলেন ইংলিশ অধিনায়ক নরম্যান ইয়ার্ডলি। আউট হয়ে ফেরার পথেও স্যার ডনের সঙ্গী হয়েছিল ইংল্যান্ড দলের তুমুল করতালি। স্টিভ ওয়াহর জন্য সৌরভ গাঙ্গুলীও এমন কোনো সংবর্ধনার আয়োজন রেখেছেন কি না, জানি না!

সৌরভ যদি তা না-ও রেখে থাকেন, স্টিভ ওয়াহর সংবর্ধনার কোনো অভাব অন্তত হচ্ছে না । নিজের শহরে খেলছেন ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট এবং স্মরণকালের মধ্যে আর কোনো ক্রিকেটারের শেষ টেস্ট নিয়ে এমন উন্মাদনার উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমন অসাধারণ এক সিরিজ খেলছে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া, কিন্তু বাকি সব কিছু ছাপিয়ে শুরু থেকেই এই সিরিজের একটিই নাম—'স্টিভ ওয়াহর শেষ সিরিজ'।

‘স্টিভ-ম্যানিয়া’ এমনই এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অনেকের কাছেই তা মনে হচ্ছে বাড়াবাড়ি। স্টিভ ওয়াহর ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ভূমিকাও দেখতে পাচ্ছেন কোনো কোনো সাবেক। ঈর্ষাকাতর প্রতিক্রিয়া ছাড়া আর কিছু মনে হচ্ছে না সেগুলোকে। ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি বাজার গরম করার কৌশল নিতেই পারে, কিন্তু সাধারণ মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করার সাধ্য কোথায় তাদের! শুধু সিডনি বা অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, পুরো ক্রিকেটবিশ্বই যে সমস্বরে বিদায়ী সম্ভাষণ জানাচ্ছে স্টিভ ওয়াহকে, এটা তো আর কেউ ঠিক করে দিতে পারে না!

স্যার ডন ব্র্যাডম্যান তিনি অবশ্যই নন, কিন্তু কোনো কোনো বিচারে স্টিভ ওয়াহকেও যে স্যার ডনের মতোই অনন্য বলে মানতে হয়। ১৬৮ টেস্টের ক্যারিয়ার, টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি, জয়-পরাজয়ের বিচারে টেস্ট ইতিহাসের সফলতম অধিনায়ক–শুধু এসব রেকর্ডের সাধ্য কোথায় স্টিভ ওয়াহকে ধরে রাখে। স্টিভ ওয়াহ যে হয়ে উঠেছিলেন 'ক্রিকেটের রাষ্ট্রদূত’, ক্রিকেটবিশ্বের সত্যিকার এক নেতা।

টেস্ট ক্রিকেটকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছে স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া

টেস্ট ক্রিকেটের চরিত্রও যে চিরদিনের মতো বদলে গেল, সেটিও তো তাঁরই অবদান। ওভারে ৩ রান করে তুলতে পারাটাকেই যেখানে টেস্ট ক্রিকেটের বেঞ্চমার্ক বলে মানা হয়ে এসেছে এত দিন, সেটিকে এক ঝটকায় অনেক ওপরে তুলে নিয়ে গেছে স্টিভ ওয়াহর অস্ট্রেলিয়া। শুধু রান করলেই হবে না, সেটি করতে হবে দ্রুত—এই বিশ্বাসে দীক্ষিত তাঁর দল ওভারপ্রতি ৪ রান করাটাকে এমনই স্বাভাবিক এবং নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত করেছিল যে, অন্য দলগুলোকেও সংক্রমিত করেছে সেটি। বদলে গেছে টেস্ট ক্রিকেটের চেহারাই। স্টিভ ওয়াহ যাচ্ছেন, কিন্তু তাঁর ছায়াটা ঠিকই থাকছে।

এক দিকে আধুনিকতার চর্চা, অন্য দিকে ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা। একদিকে মাঠে বিনা যুদ্ধে সুচ্যগ্র মেদিনীর অধিকার ছাড়তেও নারাজ এক সেনাপতি, অন্যদিকে মাঠের বাইরে কুষ্ঠপীড়িত শিশুদের একটু ভালো রাখার চেষ্টায় নিজেকে উজাড় করে দেওয়া । নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় স্টিভ ওয়াহকে ধরা এক কথায় অসম্ভব। ১৯৯৯ বিশ্বকাপের সময় ওয়াহ যমজকে ছোটবেলা থেকে দেখে আসা ক্রিকেট লেখক মাইক কাওয়ার্ড দুজনের পার্থক্য বোঝাতে যা বলেছিলেন, সেটিকেই মনে হয় আসল কথা । তা কী বলেছিলেন কাওয়ার্ড? 'মার্ক ওয়াহ ইজ অ্যা ক্রিকেট প্লেয়ার, স্টিভ ওয়াহ ইজ অ্যা ক্রিকেট পার্সোনালিটি।'

‘ক্রিকেট পার্সোনালিটি' তিনি আগে থেকেই হয়ে উঠছিলেন, তবে ক্রিকেট অধিনায়ক হয়ে ওঠার শুরু ওই ১৯৯৯ বিশ্বকাপ থেকেই। ক্রিকেট অধিনায়কত্বকে মার্ক টেলর এমন একটা উচ্চতায় তুলে নিয়েছিলেন যে, টেলরের দীর্ঘ ছায়া থেকে বেরোনোটাই ছিল তাঁর উত্তরসূরির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ জিততে স্টিভ ওয়াহরও একটু সময় লেগেছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজে টেস্ট সিরিজ ড্র করে ফেরার পর বিশ্বকাপে দুঃস্বপ্নের মতো শুরু–টেলরের পর ওয়াহ নন, অধিনায়ক হওয়া উচিত ছিল শেন ওয়ার্নের, এই মতে বিশ্বাসীরা তখন হাসছেন। ইয়ান চ্যাপেলের মতো দু-একজন তা পত্রপত্রিকায় লিখেও জানাচ্ছেন।

‘চাপ' শব্দটার সবসময়ই অন্য অর্থ তাঁর অভিধানে । দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থাতেই বেরিয়ে আসে তাঁর সেরা খেলাটা। এবারও বেরোল। হেডিংলিতে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সুপার সিক্সের শেষ ম্যাচে মুমূর্ষু অস্ট্রেলিয়াকে অক্সিজেন যোগাল স্টিভ ওয়াহর মহাকাব্যিক এক ইনিংস। হেডিংলির ড্রেসিংরুমের ব্যালকনির ঠিক পাশেই প্রেসবক্স, মাঝখানে একটি কাঁচের দেয়ালের ব্যবধান। ব্যাট করতে নামার আগে সেই ব্যালকনিতে নিষ্কম্প মূর্তি হয়ে বসে থাকা স্টিভ ওয়াহর ছবিটা এখনো পরিষ্কার দেখতে পাই।

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেই বেরিয়ে আসত তাঁর সেরাটা, যেমন এসেছিল '৯৯-এর হেডিংলিতে। ছবি: অলস্পোর্ট

তার চেয়েও বেশি পরিষ্কার অন্য একটি ছবি। চেস্টার-লি-স্ট্রিটের রিভারসাইড মাঠে পরদিন বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ। আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের পর স্টিভ ওয়াহর সঙ্গে আলাদা কথা বলার ব্যবস্থা করা গেল। ১৯৯২ বিশ্বকাপে ফেবারিট হিসেবে শুরু করে অস্ট্রেলিয়ার যে অবস্থা, এবারও তাই ফেভারিট হওয়ার চাপই কি এমন ভেঙে পড়ার মূলে? প্রশ্নটা খুব মন দিয়ে শুনলেন, তারপরের দৃশ্যটা এমনই এক ছবি হয়ে মনে গেঁথে আছে যে, এত দিন পরও তা একেবারে পরিষ্কার দেখতে পাই। মাথায় একটু ত্যারচা করে বসানো প্রিয় ব্যাগি গ্রিন ক্যাপ, ঠোঁটের কোনায় রহস্যময় এক হাসি, স্টিভ ওয়াহর শীতল কণ্ঠ এখনো কানে বাজে, 'আর কদিন পরই আপনি আমাকে অন্য প্রশ্ন করবেন!'

তা-ই করতে হয়েছে। অস্ট্রেলিয়াকে সবাই যখন বাতিলের খাতায় ফেলে দিয়েছে, বিশ্বকাপ জিততে হলে যেখানে পরের সাতটি ম্যাচের একটিতেও না হারার মতো 'অসম্ভব' কাজটি করতে হবে, সেই অবস্থায় কতটা আত্মবিশ্বাস থাকলে কোনো অধিনায়ক এমন বলতে পারেন! বাড়াবাড়ি শোনাতে পারে, তবে কথাটায় কোনো অতিরঞ্জন নেই। সেদিন থেকেই লর্ডসের ব্যালকনিতে বিশ্বকাপ হাতে স্টিভ ওয়াহকে দেখার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলাম।

‘মার্ক টেলরের দল’ থেকে অস্ট্রেলিয়ার ' স্টিভ ওয়াহর দল' হয়ে ওঠার শুরুও সেই বিশ্বকাপ । খেলোয়াড়দের ক্যাপের পেছনে সংখ্যা (অস্ট্রেলিয়ার কততম খেলোয়াড় তা বোঝাতে), প্রতি ম্যাচের আগে পুরো দলকে উজ্জীবিত করার জন্য কোনো না কোনো খেলোয়াড়ের কবিতা লেখা (ফাইনালের আগে লিখেছিলেন স্বয়ং স্টিভ ওয়াহ, সেটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য লাইন : কিছু পশ্চাৎদেশে লাথি মারার সময় হয়েছে, শুরুটা হোক শোয়েব আখতারকে দিয়েই), অন্য খেলার কৃতীদের টিম মিটিংয়ে এনে তাঁদের কথা শুনিয়ে খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করা—স্টিভ ওয়াহ আস্তে আস্তে অনপনেয় ছাপ ফেলছিলেন দলে।

সিডনিতে বিদায় সম্পন্ন হয়েছিল এই ছবি দিয়ে

এই সব কিছুরই ফসল আজকের এই সর্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া। অ্যালান বোর্ডার যদি ভিত্তিপ্রস্তর গড়ে থাকেন, মার্ক টেলর তার ওপর গড়েছেন দোতলা বিল্ডিং, আর স্টিভ ওয়াহ সেটিকেই রূপ দিয়েছেন স্কাইক্র্যাপারে 

সব কিছুই একদিন শেষ হয়। ওয়ানডে ক্যারিয়ারের শেষটা তাঁর ইচ্ছেমতো হয়নি। টেস্ট ক্রিকেটে তা হলো। গত এক বছরে তাঁর অবসর নিয়ে পল্লবিত হাজারো গুঞ্জনকে উড়িয়ে দিয়ে সব সময়ই বলেছেন, 'আমার সিদ্ধান্তটা আমিই নেব।'

তা না নিতে পারলে বড় দুঃখের ব্যাপার হতো!