এখন তো মনে হচ্ছে, আধুনিক ক্রিকেটের বিস্ময় কী, এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর নামটাই সবার আগে বলতে হবে। বিস্ময় নয় তো কী! একজন পেস বোলার ১৬১তম টেস্ট ম্যাচ খেলতে নেমেছেন, ক্রিকেটে এর চেয়ে বড় বিস্ময় আর কী হতে পারে! কিন্তু এখানেই সব বিস্ময় শেষ করে ফেললে পরে কী করবেন! এই গল্প তো এখনো শেষ হয়নি। নিকট ভবিষ্যতে হবে বলে কোনো আভাসও পাওয়া যাচ্ছে না।

ইংলিশ সামারে ইংল্যান্ডের সাতটি টেস্টই খেলার আকাঙ্ক্ষা জানিয়ে দিয়েছেন, যা হয়তো পূরণ হওয়ার নয়। হলে ১৬৭ টেস্ট হয়ে যায়। সামনে থাকেন শুধু তিনজন। যাঁরা অবশ্যই ব্যাটসম্যান। শচীন টেন্ডুলকারকে (২০০) হয়তো ছোঁয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বছরের শেষে অস্ট্রেলিয়ায় অ্যাশেজ সিরিজটা খেলে ফেললে, যাতে ভালো করার জন্য এখন থেকেই তিনি তড়পাচ্ছেন, সামনে থাকবেন শুধুই টেন্ডুলকার। পেছনে পড়ে যাবেন স্টিভ ওয়াহ ও রিকি পন্টিং (১৬৮ টেস্ট)। একজন পেসারের জন্য কী অবাস্তব সব সংখ্যা!    

জেমস অ্যান্ডারসন নামের রত্নকে যত্নে রাখতে সব টেস্ট তাঁকে খেলতে দেওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবে প্রিয় হান্টিং গ্রাউন্ড লর্ডসে তাঁকে না খেলানোর কোনো প্রশ্নই ওঠেনি। খেলতে নেমেই ছুঁয়ে ফেলেছেন আরেকটি রেকর্ড। রেকর্ডটি ইংল্যান্ডের পক্ষে সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলার। এত দিন যেটিতে ছিল তাঁর প্রিয় বন্ধু অ্যালিস্টার কুকের একক অধিকার। যথারীতি তিনিও নির্ভেজাল ব্যাটসম্যান।

ব্যাটসম্যানই হওয়ার কথা। পেসারদের পক্ষে এত টেস্ট খেলা সম্ভব না কি! জেমস অ্যান্ডারসনের আগে কেউ তা সম্ভব বলে প্রমাণ করা দূরে থাক, কল্পনাও করতে পেরেছেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। কোর্টনি ওয়ালশের ১৩২ টেস্ট খেলা নিয়ে বিস্ময়সূচক আহা-উহু শোনা গেছে, কপিল দেবের ১৩১ টেস্ট নিয়েও। পরিস্থিতির দাবিকে বুড়ো আঙুল দেখানো এক শট খেলার শাস্তি হিসেবে একটা টেস্টে বাদ না পড়লে কপিলেরও ১৩২টি টেস্ট খেলা হতো এবং তা হতো টানা ১৩২ টেস্ট। সবচেয়ে বেশি টেস্ট খেলা প্রসঙ্গে পেসারদের নিয়ে কথা হলে বিস্ময়ের রিখ্টার স্কেল চূড়ান্ত মাত্রা ছুঁত এই দুজনের নামেই। একটু দম নিয়ে হয়তো উচ্চারিত হতো ১২৪ টেস্ট খেলা গ্লেন ম্যাকগ্রার নাম।

সেখানে জেমস অ্যান্ডারসন তাঁদের ছাড়িয়ে অনেক দূর চলে যাওয়ার পরও এখনো যেন সেই প্রথম দিনের মতোই টগবগে এক তরুণ। বোলিং করে যাওয়াতেই যাঁর আনন্দ। জুড়িও পেয়েছেন ভালোই। অ্যান্ডারসনের টেস্ট সংখ্যা ক্রমশই অতিপ্রাকৃত রূপ ধারণ করছে বলে স্টুয়ার্ট ব্রডের নামটা এত পরে এল। নইলে তিনিও খুব যান না কি! লর্ডসে খেলতে নেমেছেন ১৪৭তম টেস্ট। ইংল্যান্ডের রোটেশন রীতির কারণে না খেলালে এখনো যাঁর প্রচন্ড রাগ হয় এবং পরের টেস্টগুলোতে সেটির চরম মূল্য দিতে হয় প্রতিপক্ষকে। ঘটনাটা মাত্রই গত ইংলিশ সামারের বলে তা আর সবিস্তারে বলছি না। যাঁদের বোঝার, তাঁরা বুঝে নিয়েছেন।

স্টুয়ার্ট ব্রডের সঙ্গে জেমস অ্যান্ডারসন। ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা বোলিং জুটি যদি  না-ও বলেন, সফলতম তো বলতেই হচ্ছে। ছবি: স্কাই স্পোর্টস

দুই প্রান্ত থেকে অ্যান্ডারসন-ব্রডকে বোলিং করতে দেখার স্বর্গীয় দৃশ্য দেখা থেকে বঞ্চিত হওয়ার মূলেও ইংল্যান্ডের ওই রোটেশন পলিসি আর যত বেশি দিন সম্ভব এই দুজনকে ধরে রাখার চেষ্টা। গত ইংলিশ উইন্টারে উপমহাদেশ সফরেই তো ছয় টেস্টের মাত্র একটিতেই দেখা গেছে অ্যান্ডারসন-ব্রড জুটিকে। কে জানে, সেটিও হয়তো আহমেদাবাদের নতুন স্টেডিয়ামে টেস্টটা হয়েছিল বলে। সেই টেস্টের রং যে ছিল ‘গোলাপি’, এটাও নিশ্চয়ই এতে ভূমিকা রেখে থাকবে।

ইংলিশ মিডিয়া থেকে পাওয়া আভাস সত্যি করে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডস টেস্টে দুজনই খেলছেন। ইংল্যান্ড দলে জফরা আর্চার নেই, নিউজিল্যান্ড দলে ট্রেন্ট বোল্ট। টেস্ট ক্রিকেটের একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে অ্যান্ডারসন-ব্রডের থাকাটাকে তাই আরও বেশি জরুরি বলে মনে হচ্ছিল। বোল্টও থাকলে লর্ডস টেস্টে সুইং বোলিংয়ের মাস্টারক্লাস দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি রোমাঞ্চ জাগাত মনে। একদিকে অ্যান্ডারসন-ব্রড, অন্যদিকে বোল্ট-সাউদি…আহা!

এক্সপ্রেস ফাস্ট বোলিং দেখার মধ্যে একটা বন্য উত্তেজনা আছে। আর সুইং বোলিং দেখার মধ্যে আছে শিল্পিত আনন্দ। ইংলিশ গ্রীষ্মের প্রথমভাগে লর্ডসে খেলা, বোল্টও থাকলে সেই আনন্দটা পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার প্রস্তুতি নিয়ে টিভির সামনে বসা যেত। 

যাক্, যা হয়নি, তা নিয়ে আফসোস করে তো লাভ নেই। আমরা বরং জেমস অ্যান্ডারসনে ফিরি। কিছুটা স্টুয়ার্ট ব্রডেও। এই দুজনে ফিরতে হলে অবশ্য বেশ কয়েক বছর পেছনে ফিরতে হয়। ইংল্যান্ড ২০১৯ বিশ্বকাপ জেতার পর আগের বিশ্বকাপে অ্যাডিলেড ওভালের একটা সংবাদ সম্মেলন নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। যেটির মূল প্রতিপাদ্য ছিল একটা পর্যবেক্ষণ, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ জয়ের বীজটা পোতা হয়েছিল অ্যাডিলেডের ওই ম্যাচে। যেটিতে না হারলে ইংল্যান্ড তাদের ওয়ানডে দর্শন তো বটেই, ওয়ানডে দলের খোলনলচেও ওভাবে বদলে ফেলত না। এতক্ষণে আপনার বুঝে ফেলার কথা, ২০১৫ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের কথা হচ্ছে। যেটিতে না হারলে ইংল্যান্ড হয়তো ওই বিপ্লবের পথে হাঁটে না। জেমস অ্যান্ডারসন আর স্টুয়ার্ট ব্রডও এমন বিস্ময় হয়ে দেখা দেন না। সেটি কীভাবে? 

ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলের খোলনলচে বদলে ফেলার কথা বলছিলাম না, সেই বদলে কোপ পড়েছিল এই দুজনের ওপরও। পড়েছিল বলেই আজ জেমস অ্যান্ডারসন ১৬১তম টেস্ট খেলতে নামেন, স্টুয়ার্ট ব্রড অপেক্ষায় থাকেন ১৪৭তম টেস্ট খেলার। তখন দুজনেরই খুব রাগ হয়েছিল। এখন পেছন ফিরে তাকিয়ে ওয়ানডে দলে ব্রাত্য হয়ে যাওয়াটাকে তাঁদের কাছে আশীর্বাদ বলে মনে হয়। জেমস অ্যান্ডারসন কদিন আগেই যা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকারও করেছেন।

সেই থেকে সাদা বলের ক্রিকেট ভুলে গিয়ে শুধুই টেস্ট খেলে যাচ্ছেন, তারপরও ৩৮টি বসন্ত পেরিয়ে আসার পরও অ্যান্ডারসনের ক্রমশ উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হওয়াটা বিস্ময় না জাগিয়ে পারে না। এসব ক্ষেত্রে অবধারিত যে তুলনাটা করতে প্ররোচনা জাগে, অ্যান্ডারসনের ক্ষেত্রে তা দারুণ খেটে যায়। ওই যে ওয়াইন সংক্রান্ত কথাটা আর কি! যতই বয়স বাড়ে, ততই ভালো। ক্রিকেটে শুধু স্পিনারদের ক্ষেত্রেই এতদিন যা ব্যবহৃত হতো। ও হ্যাঁ, কোর্টনি ওয়ালশ সম্পর্কেও কখনো কখনো বলা হয়েছে এমন। বয়স ৩০ পেরোনোর পর সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডটাও এক সময় ওয়ালশেরই ছিল। এখন আর নেই, কারণ ৩৩২ উইকেটের রেকর্ডটাকে এরই মধ্যে ৩৪৬-এ নিয়ে গেছেন অ্যান্ডারসন। খেলা ছাড়ার সময় তা যেখানে রেখে যাবেন, ভবিষ্যতে কেউ তার নাগাল পাবেন বলে মনে হয় না। 

২০০৩ সালে শুরু অ্যান্ডারসনের ক্যারিয়ারের প্রথম বেশ কয়েক বছর রিওয়াইন্ড করে দেখলে দেখবেন, ধারাবাহিকতা বলে কিছু ছিল না। এই খুব ভালো তো এই যা-তা খারাপ! হট অ্যান্ড কোল্ড যাকে বলে। ১৮ বছর আগে এই লর্ডসেই অভিষেক টেস্টটাও যার প্রমাণ। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট, দ্বিতীয় ইনিংসে একটাও না। প্রথম ২০ টেস্টে বোলিং অ্যাভারেজ ছিল ৩৯.২। ৪৬ টেস্ট শেষে ৩৪.৮১। এরপর ক্রমশই তা ভালো থেকে আরও ভালো হয়েছে। এখন যা ২৬.৪৬। 

৩৮টি বসন্ত পেরিয়ে এসেও এখনো ব্যাটসম্যানদের দুঃস্বপ্ন 'উপহার' দিয়ে যাচ্ছেন অ্যান্ডারসন। গত ভারত সফরে । ছবি: বিসিসিআই

অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে এক সময় ধারাবাহিক হয়েছেন, পা রেখেছেন নতুন নতুন শৃঙ্গে। লর্ডস যার বেশ কয়েকটির সাক্ষী। এই মাঠে অ্যান্ডারসনের আজ ২৪তম টেস্ট। আগের ২৩ টেস্টে ২৩.৮৯ গড়ে ১০৩ উইকেট। ইনিংসে ৫ উইকেট ছয়বার। স্মরণীয় দুটি মাইলফলকও ছুঁয়েছেন এখানেই। ২০১৩ সালে ৩০০তম উইকেট। চার বছর পর ৫০০তম। তখন বলতে হয়েছিল, ওয়ালশ ও ম্যাকগ্রার পর তৃতীয় পেসার হিসেবে এই অর্জন।

ওই দুজনকেই পেছনে ফেলে প্রথম পেসার হিসেবে ছুঁয়েছেন ৬০০ উইকেটের একদা অবিশ্বাস্য মাইলফলক। টেস্টে সবচেয়ে উইকেটের প্রশ্নে অ্যান্ডারসনের সামনে এখন শুধুই তিন স্পিনার। এঁদের মধ্যে একমাত্র মুত্তিয়া মুরালিধরনই একটু নিরাপদে আছেন বলে মনে হচ্ছে। অনিল কুম্বলে তো এই টেস্টেই পেছনে পড়ে যেতে পারেন, অ্যান্ডারসনের মাত্র ৬ উইকেটই তো লাগে এজন্য। শেন ওয়ার্ন এখনো অনেক দূরে। দূরত্বটা উইকেট সংখ্যায় মাপলে হয় ৯৪। অনেক দূরে তো বটেই, তবে অ্যান্ডারসনের জন্য এই দূরত্বও তো কি অনতিক্রম্য কিছু? তাঁর হাবভাব, তাঁর কথাবার্তা, তাঁর বোলিং দেখে তো তা মনে হয় না।

কী মনে হয়, তা বলতে গিয়ে ক্রিকইনফোতে জর্জ ডোবেলের লেখায় পড়া মজার একটা লাইন মনে পড়ে গেল। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এক হাজার উইকেটের মাইলফলক ছুঁতে অ্যান্ডারসনের চাই আর মাত্র ৮ উইকেট। এই প্রসঙ্গেই এসেছে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি উইকেট নেওয়ার রেকর্ডের কথা। উইলফ্রেড রোডসের ৪২০৪ উইকেটের যে রেকর্ড ব্র্যাডম্যানের টেস্ট ব্যাটিং গড়ের মতোই অমরত্ব নিশ্চিত করে রেখেছে। তখন এক মৌসুমে রোডস অনেক বেশি ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ খেলতেন আর অ্যান্ডারসন খেলেছেন অনেক কম, এ কথা বলতে গিয়ে ডোবেল জানাচ্ছেন, বর্তমান হারে খেললে রোডসের রেকর্ড ভাঙতে অ্যান্ডারসনকে এক শ বছর বয়স পর্যন্ত খেলতে হবে।

এ পর্যন্ত ঠিক আছে। আমি হো হো করে হাসলাম পরের লাইনটা পড়ে। সেটি এরকম: 'কারও সন্দেহ হতেই পারে যে, অ্যান্ডারসনের পক্ষে হয়তো এটাও সম্ভব।' 

হোয়াট আ লাইন! অ্যান্ডারসনের দীর্ঘস্থায়িত্ব বোঝাতে আর কী লাগে!