কেন উইলিয়ামসন আজ যখন টস করতে নামবেন, মনে পড়বে না ২৩ মাস আগের সেই দিন? ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই? পড়বে, অবশ্যই মনে পড়বে। প্রশ্ন হতে পারে বরং একটাই, উইলিয়ামসনের মনে ফিরে আসার জন্য বিশ্বকাপ ফাইনালের দুঃসহ সেই স্মৃতি টস পর্যন্ত অপেক্ষাই বা কেন করবে! 

আবার লর্ডসে পা রাখার পরই নিশ্চয়ই উইলিয়ামসনের মনে পড়েছে, ওয়ানডে ইতিহাসের সবচেয়ে নাটকীয় সেই ম্যাচ। ইংল্যান্ডের সমান রান করেও শুধু কম চার মারার ‘অপরাধে’ ধরা দিতে দিতে বিশ্বকাপ ট্রফিটার মরীচিকার মতো মিলিয়ে যাওয়া। 

লর্ডসে পা রাখার প্রয়োজন পড়েনি, সাউদাম্পটনের অ্যাজিয়াস বোওলে ট্রেনিং ক্যাম্প শুরুর দিন হোটেলে ঢুকেই উইলিয়ামসনরা দেখেছেন, টেলিভিশনে ২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখাচ্ছে। স্কাই স্পোর্টস তা প্ল্যান করেই করেছে কি না, কে জানে! 

সেদিন তাঁর গায়ে ছিল রঙিন পোশাক। আজ সাদা। সেদিন এউইন মরগ্যানের সঙ্গে টস করতে নেমেছিলেন, আজ তাঁর সঙ্গী জো রুট। তারপরও মহানাটকীয় সেই ফাইনালের পর লর্ডসে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে বাধ্য। ব্যক্তিগত একটা বড় অর্জনও যেদিন দলীয় হতাশায় কোনো প্রলেপ দিতে পারেনি। যদিও ফাইনাল শেষে বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে উইলিয়ামসনের নাম ঘোষণা করার সময়ই আমার মনে হয়েছিল, এটা বোধ হয় সান্ত্বনা পুরস্কার। নিউজিল্যান্ড জিতলে হয়তো, হয়তো যা পেতেন ৬০৬ রান এবং ১১ উইকেটের অভূতপূর্ব এক যুগলবন্দির স্রষ্টা এক অলরাউন্ডার। যাঁর নাম আপনারা সবাই জানেন।

ভিন্ন ফরম্যাট, ভিন্ন প্রেক্ষাপট, জয়-পরাজয়ের তাৎপর্যও ভিন্ন। লর্ডস টেস্ট জিতলেও তাই লর্ডস নামের ক্রিকেট-তীর্থ চিরদিন দুঃখের অন্য নামই হয়ে থাকবে উইলিয়ামসনের জন্য। বারবার উইলিয়ামসন-উইলিয়ামসন করছি তিনি অধিনায়ক বলে। নইলে নিউজিল্যান্ডের ১৯ জনের স্কোয়াডের নয়জনই তো ছিলেন সেদিন লর্ডসে ছিলেন। যাঁদের সাতজন খেলেছেন ওই ফাইনালে। 

আশ্চর্যই বলতে হবে, বিশ্বকাপজয়ী সেই ইংল্যান্ড দলের মাত্র একজনই আছেন এই টেস্টে। অধিনায়ক জো রুট। সেই ফাইনালের মহানায়ক বেন স্টোকস নেই, নেই সুপার ওভারের নায়ক জফরা আর্চার। শুধু রুটই আছেন বলে দেওয়ার পর বোঝাই যাচ্ছে, না-থাকাদের নাম বলতে গেলে তা আর সহজে শেষ হওয়ার নয়।

২০১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের পর হতাশ-হতভম্ব-স্তম্ভিত নিউজিল্যান্ড দল। সেই দিনের স্মৃতি নিশ্চয়ই ফিরে এসেছেন কেন উইলিয়ামসনের মনে

স্টোকস-আর্চার নেই ইনজুরির কারণে। বাকিদের অনেকে নেই তাঁরা আইপিএল প্রত্যাগত বলে। ওসব দেশে তো আর স্টার-সুপার স্টারদের জন্য কোয়ারেন্টিনের নীতিমালা দুমড়ে মুচড়ে ফেলা হয় না। নিয়ম বলুন বা আইন, তা সবার জন্যই সমান। এই টেস্টের ইংল্যান্ড দল তাই অনেকটাই কচি কাঁচার আসর। ইংল্যান্ডের প্রথম সাত ব্যাটসম্যানের মধ্যে ১০৩ টেস্ট জো রুটের পর সবচেয়ে অভিজ্ঞ রোরি বার্নসের টেস্ট অভিজ্ঞতা ২৫ ম্যাচের। তারপরও রুট ঘোষণা করে দিয়েছেন, ইংলিশ সামারের সাতটি টেস্টই জিতে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় যেতে চান। অস্ট্রেলিয়ায় কেন যাবেন, তা তো আর বলার প্রয়োজন পড়ছে না। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দুই টেস্ট, এরপর ভারতের বিপক্ষে পাঁচ…এই সাত টেস্টের ম্যারাথন শুরুর আগেও যে ইংল্যান্ড-অধিনায়কের মাথায় ঘুরছে অ্যাশেজ। ইংলিশ ক্রিকেটারদের কাছে তা এমনই ‘হোলি গ্রেইল’ যে, বিশ্বের সেরা দুই টেস্ট দলের বিপক্ষে সিরিজও অ্যাশেজের মেইন কোর্সের আগে নিছকই অ্যাপিটাইজার।

বিশ্বের সেরা দুই দল বলছি, ব্যাপারটা অফিসিয়াল বলেই। এই সিরিজের পরই তো প্রথম ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে মুখোমুখি হবে কেন উইলিয়ামসনের নিউজিল্যান্ড আর বিরাট কোহলির ভারত। একটিতে ইংল্যান্ড না থাকলেও এটি তাই আট টেস্টের ইংলিশ সামার। সঙ্গে আবার আছে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ। এমন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটময় গ্রীষ্ম ইংল্যান্ড আগে কখনো দেখেছে বলে মনে পড়ছে না। এই ঠাসা সূচির মধ্যে এই সিরিজটা আসলে বোনাস। এফটিপি মানে ফিউচার ট্যুর প্রোগ্রামে এটি ছিল না, ডব্লিউটিসি অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপেরও অংশ নয়। গত জানুয়ারিতে চূড়ান্ত দ্বিপক্ষীয় সমঝোতায় জন্ম হওয়া এই সিরিজে ক্রিকেটীয় ভ্রাতৃত্ববোধের প্রকাশ আছে, সঙ্গে অবশ্যম্ভাবীভাবেই বাণিজ্য। দ্বিতীয়টার কথাই আগে বলে নিই। গত মৌসুমে ইংল্যান্ডে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হলেও টিভি ব্রডকাস্টারদের কাছে প্রতিশ্রুত এক শ বলের খেলা ‘হান্ড্রেড’ আয়োজন করা যায়নি। স্কাই স্পোর্টস তারপরও যে পুরো টাকাই দিয়েছে, তারই কৃতজ্ঞতা হিসেবে তাদেরকে ইসিবির উপহার এই সিরিজ। ভ্রাতৃত্ববোধের যে প্রকাশের কথা বলছিলাম, তা হলো ২০১৯ সালের শেষে ইংল্যান্ডও এমন পূর্ব নির্ধারিত সূচি বহির্ভূত একটা ট্যুর করেছিল নিউজিল্যান্ডে। কিউইদেরও তাই কিছু ঋণ শোধ করার ছিল।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালের প্রস্তুতির দিক থেকে কেন উইলিয়ামসনকে ঈর্ষাই করার কথা বিরাট কোহলির

ঋণ শোধ করার সঙ্গে হয়তো টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালটাও মাথায় ছিল। এই সিরিজ চূড়ান্ত হওয়ার সময় নিউজিল্যান্ডের ফাইনালে উত্তরণ নিশ্চিত হয়নি। তবে সম্ভাবনার পালে জোরালো হাওয়া তো লেগেছিলই ততদিনে। বলছিলাম, লর্ডসে এই টেস্টে নিউজিল্যান্ড জিতলও তা ২৩ মাস আগে লর্ডসের বিশ্বকাপ ফাইনালের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারবে না। তবে লর্ডসে না হয়ে সাউদাম্পটনে হলেও প্রথম টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে জয় অবশ্যই তা দেবে। ওয়ানডেতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চাইতে টেস্টের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাকে শ্রেয়তর মনে করেন, এমন মানুষেরও তো অভাব নেই পৃথিবীতে। 

যা বলতে গিয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠল নিল ওয়াগনারের মুখ। সাদা বলের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এই কিউই ফাস্ট বোলারের কাছে অচেনা এক ভুবন। বিশ্বকাপ ফাইনালে নিশ্চয়ই নিউজিল্যান্ডের জয় কামনা করেছেন। তবে ওয়ানডের বিশ্বকাপ আর টেস্ট ক্রিকেটে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নেওয়ার অপশন দিলে ওয়াগনারের উত্তর কী হতো, তা অনুমান করার জন্য কোনো পুরস্কার নেই।

টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে উপমহাদেশের এক দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে দুটি টেস্ট ম্যাচ খেলার সুযোগ তো স্বপ্নে গুপ্তধনের খোঁজ পাওয়ার মতো ব্যাপার। শুধু উইকেট-মাঠ-আবহাওয়ার সঙ্গেই নয়, ডিউক বলের সঙ্গেও একটু সখ্য গড়ার সুযোগ হয়ে এসেছে এই টেস্ট সিরিজ। দেশে যে নিউজিল্যান্ড এই বল দিয়ে খেলে না। বিরাট কোহলির তাই এই সিরিজটা পছন্দ করার কোনোই কারণ নেই। সুযোগ থাকলে তিনি নিশ্চিতভাবেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ টেস্টের দুটি ফাইনালের আগে খেলতে চাইতেন।

উল্টো কোয়ারেন্টিনে থেকে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে প্রতিপক্ষের আদর্শ প্রস্তুতি নেওয়াটা দেখতে হবে তাঁকে। সূচি বহির্ভূত যে সিরিজ নিয়ে ক্রিকেট বিশ্বেই তুমুল আগ্রহ। এমনিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজ নিয়ে বাকি বিশ্বের আগ্রহের কথা এক সময় অকল্পনীয়ই ছিল। বহু বছর বিশ্ব ক্রিকেটের পুরোনো দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আনগ্ল্যামারাসের তকমা লেগে ছিল নিউজিল্যান্ডের গায়ে। রিচার্ড হ্যাডলি-মার্টিন ক্রোরা তাঁদের মতো করে গ্রেটনেসের দাবি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তবে নিউজিল্যান্ডকে সত্যিকার রোমাঞ্চকর এক দলে পরিণত করার কৃতিত্বটা দিতে হবে ব্রেন্ডন ম্যাককালামকে। উইলিয়ামসনরাও সেই উত্তরাধিকার বহন করে এখন রোমাঞ্চকর ক্রিকেটই খেলেন। রোমাঞ্চের কথা ওঠায় একটা আক্ষেপও জাগল মনে। দুই দলের দুই সেরা ফাস্ট বোলার ট্রেন্ট বোল্ট আর জফরা আর্চারই তো নেই।

গ্যালারিতে দর্শক ফিরছে, তাঁদেরকে বিনোদিত করতে চান ইংল্যান্ড অধিনায়ক জো রুট। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে টেস্ট শুরুর আগের দিন লর্ডসে

বোল্ট-আর্চারের শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়, তবে প্রায় দুই বছর পর গ্যালারিতে দর্শকের উপস্থিতি তা কিছুটা হলেও পুষিয়ে দিচ্ছে। লর্ডসের গ্যালারিতে ক্যাপাসিটির ২৫ শতাংশের বেশি দর্শকের প্রবেশাধিকার মিলছে না। হিসেব করলে যা দাঁড়ায় প্রতিদিন সাড়ে সাত হাজারের মতো। এজবাস্টনে দ্বিতীয় টেস্টে যা বেড়ে হবে ৭০ শতাংশ, যা ১৭ হাজারেরও বেশি। ক্রিকেটাররাও যা ভেবে রোমাঞ্চিত। জো রুট তো সব টেস্ট জয়ের সঙ্গে গ্যালারিতে ফেরা দর্শককে বিনোদিত করাটাকেও তাঁর প্রায়োরিটি লিস্টে রেখেছেন।

মাঠে দর্শকের প্রবেশাধিকার থাকা না-থাকায় এমনিতে আমার-আপনার কিছু আসে যায় না। আমরা তো সেই টেলিভিশনেই খেলা দেখব। তবে আমি আমার কথা বলতে পারি। দর্শকহীন মাঠে খেলা দেখতে দেখতে বিরক্ত দুই চোখ টেলিভিশনের পর্দায় হলেও আজ আবার গ্যালারিতে দর্শক দেখবে, শুনবে তাঁদের করতালি-চিৎকার, এটা ভাবতেই যে কী রোমাঞ্চ লাগছে!

করোনাকালের একটা বড় শিক্ষা বোধ হয় এটাও। 'টেকেন ফর গ্র্যান্টেড' কত কিছুর মূল্যই না বুঝিয়ে দিচ্ছে তা! টেস্ট ম্যাচে গ্যালারিতে দর্শক দেখব—এটা ভেবে এমন রোমাঞ্চ বোধ করার কথা কস্মিনকালেও কি ভেবেছিলাম নাকি!