ক্রিকেট বিশ্বে একেবারে হইচই পড়ে যাবে তাঁর অবসর নেওয়ার খবরে, এত বড় খেলোয়াড় হয়তো ছিলেন না। তবে ‘খেলোয়াড়’ হিসেবে ‘গ্রেট’ না-ই বা হোন, ‘ক্রিকেটার’ হিসেবে রোশান মহানামাকে এমন একটা জায়গা ছেড়ে দিতে হবে, যার নাগাল আধুনিক ক্রিকেটের অনেক স্টার-সুপারস্টাররাও পাবেন না।

খেলোয়াড় আর ক্রিকেটারের আবার পার্থক্য আছে না কি? শুধুমাত্র ওয়ানডের পপ মিউজিকের আদলেই ক্রিকেটের সুর শুনে অভ্যস্তদের কাছ থেকে এই প্রশ্নটা শুনতেই হবে। তবে যাঁরা আরেকটু গভীরে গিয়ে ক্রিকেটের ধ্রুপদ রূপটির স্বাদ নিয়েছেন—তাঁরা জানেন, খেলতে পারাটা ক্রিকেটার হওয়ার একটি শর্ত মাত্র, পুরো নিশ্চয়তা নয়। ‘ক্রিকেটার’ বলতে শুধু খেলোয়াড়ি দক্ষতাই নয়, বোঝায় একটি বোধ, একটি আদর্শ। এবং এই ‘ক্রিকেটার’ হতে হলে খেলার মাঠ ছাড়িয়ে জীবনাচরণেও কিছু আবশ্যিক শর্ত পালন করতে হয়।

ক্রিকেটে যখন দিন দিন খেলার চেয়ে বাণিজ্যই মুখ্য হয়ে উঠছে, ‘দ্য নেম অব দ্য গেম ইজ কমার্শিয়ালিজম’ যখন আধুনিক যুগের ক্রিকেটের শ্লোগান, তখন এসব কথা বেসুরো শোনাতে বাধ্য। তাহলে বলতে হবে, রোশান মহানামাও ছিলেন ‘বেসুরো’—প্রচলিত সুরের বাইরে ক্ল্যাসিক্যাল ধারা আঁকড়ে ধরে রাখা এক ক্রিকেটার। প্রার্থনা করি, এরকম ‘বেসুরো’র সংখ্যা আরও বাড়ুক। এদের কেউ কেউ আছেন কলেই যুগ যুগ ধরে লালিত ক্রিকেট নামের খেলাটির প্রাণভোমরাটি এখনও মরে যায়নি।

অর্জুনা রানাতুঙ্গার সঙ্গে মহানামা। অনেক বছর আগে

তাঁর স্টাইলিশ ব্যাটিং, সঙ্গে অসাধারণ ফিল্ডিংও অনেককেই তাঁর ফ্যান করেছে। হালকা পাতলা শরীর ভুল বোঝাতে পারে, তবে এই লোকটিই (৩২ বছর বয়সে বিদায় নিয়েছেন, অথচ দেখুন, মহানামার সঙ্গে লোকটি কেমন বেমানান শোনায়, এর পরিবর্তে ছেলেটিই যেন ভালো মানায়। আর কারও ক্ষেত্রে ‘চিরতরুণ’ কথাটির এমন যথার্থ ব্যবহার হয় না) রক্ত জমাট বেঁধে কালো যাওয়া পায়ের বুড়ো আঙুল নিয়ে প্রায় দুদিন ব্যাট করে টেস্ট বাঁচিয়েছিলেন ভারতের বিপক্ষে। তবে এসব ক্রিকেটিং কীর্তির চেয়েও সম্ভবত বেশি মন জয় করেছেন তিনি অপূর্ব ওই হাসিটি দিয়ে। রোশান মহানামার একটু ঘনিষ্ঠজনরা তো বটেই, এমনকি সামান্য পরিচতজনরাও জানেন—তার সঙ্গে দেখা হওয়া মানেই শ্রাবনের বৃষ্টি ধোয়া আকাশে হঠাৎ হেসে ওঠা সূর্যের দেখা পাওয়া। 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাভার করার সুবাদে নামী-দামি ক্রিকেটার তো আর কম দেখলাম না। গত ছয় বছর মাঠে, মাঠের বাইরে অনেক চেহারাতেই দেখেছি তাঁদের। সেই অভিজ্ঞতা থেকে যদি ‘আমার দেখা সবচেয়ে ভদ্র ও বিনয়ী ক্রিকেটার’—এই তালিকা করতে বসি, অবধারিতভাবেই তাতে প্রথম নামটি হবে রোশান মহানামা। মিডিয়ার মাতামাতি আর ভক্তদের স্তবে ‘ডেমি গড' বনে যাওয়া ক্রিকেটাররা সকালে এক ঘণ্টা ইন্টারভিউ দেওয়ার পরও বিকেলে দেখা হলে যখন চিনতে না পারার অত্যাশ্চর্য ক্ষমতা ধরেন, তখন রোশান মহানামাকে কিছুটা অবাস্তবই মনে হয়। মাঝে ছয় মাস বা এক বছর কাটুক বা তার চেয়েও বেশি—এই একজন ক্রিকেটার ছিলেন যাঁর সম্পর্কে বাজি ধরে বলা যেত যে, তাঁকে আবার নতুন করে পরিচয় দিতে হবে না, বরং দেখা হলেই হাজার ওয়াটের বালবের মতো জ্বলে উঠবে সেই বিখ্যাত হাসিটা।

হঠাৎ দু’একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে শ্রীলঙ্কানরা অবশ্য জাতিগতভাবেই খুব ভদ্র ও বিনয়ী। ক্রিকেটাররাও এর ব্যতিক্রম ছিলেন না, তবে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে অপ্রত্যাশিত সাফল্য তাঁদেরও কারও কারও মধ্যে ভালোই পরিবর্তন এনেছিল। কার কতটুকু পরিবর্তন, সবিস্তারে সেই বর্ণনায় না গিয়ে এটুকু শুধু বলি—রোশান মহানামা একটুও বদলাননি। বরং তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বরাবরই মনে হয়েছে, এই লোকটার এ যুগে ক্রিকেট না খেলে খেলা উচিত ছিল ফ্র্যাঙ্ক ওরেলদের সময়ে। যখন খেলাটা শুধু জয়-পরাজয়ে আটকে ছিল না, বন্ধুত্বের সীমা বাড়ানোও ছিল অন্যতম একটা লক্ষ্য। আবার ভেবেছি, এরকম দু’একজন আছে বলেই তো রক্ষা, নইলে তো প্রায় বাণিজ্যসর্বস্ব এখনকার ক্রিকেট আরও নীরস রূপ নিত।

শ্রীলঙ্কার সাফল্য তাঁকেও যে গভীরভাবে আনন্দিত করেছিল, সেটি তো বলাই বাহুল্য। তবে গভীরে বিষাদের এক চিলতে মেঘ কি তাঁর মনের গভীরে উড়ে বেড়ায়নি কখনো কখনো! বেড়িয়েছে, ভালোই বেড়িয়েছে। মহানামাকে বলা যেতে পারে শ্রীলঙ্কার সাফল্যের বলি। নতুন নতুন তারকার জন্ম শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটকে এগিয়ে দিয়েছে সাফল্যের পথে, সেটিই আবার নিশ্চিত করে দিয়েছে, বিশ্বকাপ সাফল্যের আগে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের হাতেগোনা দু’তিনজন তারকার মধ্যে পড়া রোশান মহানামা আর কোনোদিন পূর্ণ দ্যুতিতে জ্বলে উঠতে পারবেন না।

মহানামার জন্য সবচেয়ে দুঃখের ব্যাপার হলো, এটি তাঁর অক্ষমতাজনিত কোনো কারণে নয়। ক্ল্যাসিক্যাল এক ওপেনার হিসেবেই বেড়ে উঠেছেন তিনি, শ্রীলঙ্কার নাম্বার ওয়ান ওপেনার হয়েছিলেন দীর্ঘ সময়। অথচ প্রথম ১৫ ওভারের ফিল্ডিং বাধ্যবাধকতায় ওয়ানডে ক্রিকেটে হঠাৎই পরিবর্তনের হাওয়া তাঁকে ওপেনিং থেকে ছিটকে ফেললে একেবারে সাত নম্বরে। সেখানে একজন স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যান থাকা দলের জন্য মস্ত ভরসা, কিন্তু সেই স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া-পাওয়ার স্বপ্ন যে চিরতরে শেষ!

একিদন বলেই ফেলেছিলেন দুঃখটা। ১৯৯৭-এর জুলাইয়ে এশিয়া কাপের সময় কলম্বোর তাজ সমুদ্র হোটেলের সুইমিং পুলের পাশে ইন্টারভিউ করছি মাত্রই জল থেকে উঠে আসা মহানামার। ‘কোথায় ব্যাট করতে পছন্দ’ প্রশ্নের জবাবটা শুরু করেছিলেন, ‘দল জিতলেই আমি খুশি, কোথায় ব্যাট করলাম, তা নিয়ে ভাবি না’ এসব গৎবাঁধা কথা দিয়েই। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে যখন বললাম, ‘প্লিজ, এসব টাইপড উত্তর নয়, সত্যি কথাটা বলুন তো’, বিষণ্ন একটা হাসি দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন মহানামা। এরপর সুইমিং পুলের নীল জলের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরে ধীরে বললেন, ‘আসলেই দলের জন্য আমি সব করতে রাজি। কিন্তু কখনো কখনো যখন মনে হয়, আমি যতই ভালো ব্যাট করি না কেন, আর কোনোদিন সেঞ্চুরি পাব না, তখন খুব খারাপ লাগে। তার চেয়েও খারাপ লাগে, এত স্যাক্রিফাইস করার পরও যখন নানারকম কথা শুনতে হয়। শুনতে হয় ও তো স্ট্রোক খেলতে পারে না…।’

যেকোনো পজিশনেই ফিল্ডার হিসেবে রোশান মহানামা ছিলেন দুর্দান্ত

এর চেয়ে গভীর একটা দুঃখও প্রকাশ হয়ে পড়েছিল সেদিন। অসাধারণ ফিল্ডিংয়ের প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি বলে একটা আক্ষেপ যে মহানামার ভেতরে ভেতরে এতটা গভীর, সেটি আগে অনুমানই করতে পারিনি। ‘এই ফিল্ডিংয়ের পেছনে কী পরিশ্রমটাই না করি আমি! তিন-তিনবার হাঁটুতে অপারেশন করতে হয়েছে শুধু এ কারণেই। অথচ…’

অথচ কী? রোশান মহানামা দারুণ ফিল্ডার—এ কথাটা কি সবাই বলে না? হ্যাঁ, তা বলে। তবে মহানামার অতৃপ্তির কারণটা বোঝা গেল আলোচনায় জন্টি রোডস আসতেই। ‘জন্টি রোডস অসাধারণ ফিল্ডার’—এটি প্রথমেই বলে নিয়ে আস্তে করে নিজের দাবিটা পেশ করলেন মহানামা, ‘জন্টি খুব ভালো। তবে ও তো শুধু পয়েন্টেই ফিল্ডিং করে। আমি তো সব পজিশনেই দাঁড়াই। পয়েন্টে যেমন, তেমনি স্লিপে—সিলি পয়েন্টেও দারুণ দারুণ ক্যাচ আছে আমার। জন্টি তো কখনো ক্লোজ ইন পজিশনে ফিল্ডিংই করেনি।’ তাঁর এই অলরাউন্ড সামর্থ্যের পরও ফিল্ডার হিসেবে জন্টি রোডসের তুলনায় সেভাবে আলোচিত হননি—মহানামার এই আক্ষেপটা খুব অযৌক্তিকও মনে হয়নি এ কথার পর।

শেষটাও হলো খানিকটা আক্ষেপ নিয়েই। মাঠে দাঁড়িয়ে, দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে বিদায় নেয়াটা আর হলো না। তারপরও নিশ্চিত জানি, এ কথা উঠলেও মহানামা ওই হাসিটাই দেবেন!