বিশ্বকাপ ক্রিকেট বাঙালি আরও খেলবে। কিন্তু ইংল্যান্ডে নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ এদেশের মানুষের কাছে চিরদিন অন্যরকম এক আবেগের নাম হয়েই থাকবে। বিশ্বকাপ ঘিরে আবেগে হিস্টিরিয়াগ্রস্থ হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ, গোটা জাতি। কী যে উন্মাদনা ছিল সেই বিশ্বকাপকে ঘিরে! কারণ, ওটাই ছিল বাঙালির প্রথম বিশ্বকাপ। ওটা ছিল এদেশের মানুষের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন পূরণের টুর্নামেন্ট। তবে আকাশ ছোঁয়া স্বপ্ন আর প্রত্যাশা সেখানে ছিল না। সত্যি বলতে, বাংলাদেশের স্বপ্নের সীমানা আটকে ছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একটা জয়ে। সেটাও পেয়ে যায় তারা এডিনবরায়। প্রত্যাশার ডিগ্রিতে তাও যে খুব চাপমুক্ত জয় ছিল, তা নয়। তবে ওই জয় বাংলাদেশ দলটাকে একেবারে চাপমুক্ত করে দেয়।

কিন্তু লিগ পর্যায়ের শেষ ম্যাচ খেলতে বাংলাদেশ যখন নর্দাম্পটনে, তখন পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ নয়, বড় খবর হয়ে যায় কোচ হিসেবে গর্ডন গ্রিনিজের বহিষ্কার! গর্ডন গ্রিনিজ–এই বিশাল নামের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যায় পাকিস্তান ম্যাচের আগের দিন বাংলাদেশের সব খবর। কিন্তু ম্যাচ শুরুর পর ইংলিশ আবহাওয়ার মত অতর্কিত বাঁক খেতে থাকে গোটা পরিবেশ। গ্যালারি থেকে প্রেসবক্স, সেই হাওয়া সব জায়গায়। প্রতিটি মিনিটে অধৈর্য, অবারিত জল্পনা আর আবেগঘন প্রতীক্ষা। কারণ, অতি নাটকীয়তা ছাড়া তখন পাকিস্তানের পক্ষে ম্যাচ জেতা সম্ভব ছিল না! কিন্তু দলটার নাম তো পাকিস্তান! নাটকীয়তাকেও বাউন্ডারি লাইনের বাইরে পাঠিয়ে অতি নাটকীয়তার আমদানি ঘটিয়ে তারা ম্যাচ জিতেছে বহুবার।

তবে নর্দাম্পটনের গ্যালারিতে পাকিস্তানিদের আওয়াজ তখন ক্ষীণ হতে শুরু করেছে।' বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!’ শব্দটা আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তুলছে। সেই শব্দের আবেগ চড়তে চড়তে অদ্ভুত এক মেরুকরণ শুরু হয় প্রেসবক্সেও। বাইশ বছর পর স্বীকার করতে অসুবিধা নেই, ওই মুহুর্তে নিজের সাংবাদিক সত্বা হার মেনেছিল আবেগের কাছে। পাকিস্তানের হার আর বাংলাদেশের জয় এই দুয়ের এটা পর্যালোচনা দাবি করে রিপোর্টারের কাছে। সেই দাবির কথা সেদিন ভুলে বসেছিলাম প্রচন্ড আবেগে!

নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের পর বাংলাদেশের অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে লেখক (ডান থেকে দ্বিতীয়)আজ স্মৃতির জানালা উসকে দিয়ে উৎপল শুভ্র একটা লেখার কথা বললেন তাঁর নিজের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জন্য। তাতে একটা লাভ হলো বটে। সাংবাদিক হিসেবে নিজের ব্যথর্তার দায় স্বীকারের একটা সুযোগও পাওয়া গেল। পরিস্থিতির দাবি মিটিয়ে নিজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে যা লেখা উচিত ছিল, তা লিখতে পারিনি। প্রত্যেকটা ম্যাচের স্কোরশিট যেমন আলাদা, তেমনি আলাদা প্রতিটা ম্যাচের প্রেক্ষিত। কিন্তু আমার মস্তিস্ক সেদিন ভারি হয়ে গেল নতুন ইতিহাসের বোঝায়। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম জয়! তা-ও বিশ্বকাপে! যেখানে বাংলাদেশ প্রথম খেলছিল। হ্যাঁ, ইতিহাস। আর প্রেসবক্সে বসে সেই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া মানে ইতিহাসের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া উচিত ছিল নির্মোহভাবে। কিন্তু আমি ছিলাম জয়ে মোহগ্রস্থ! রিপোর্ট হিসেবে সেদিন যা লিখেছিলাম, তা কী রিপোর্টার সত্ত্বার এক ধরনের 'সুইসাইডাল নোট' ছিল কি না, সেই প্রশ্ন এখনো নিজের মনে ঘুরপাক খায়!

টেলিভিশন অফিসে নিজের ডেস্কে বসে এই লেখাটা লিখতে বার বার স্মৃতিকে রোটেড করতে হচ্ছে। অফিসের নানা ঝামেলা সামলে পুরোনো দিন নিয়ে লেখা কঠিন। আর সেটাকে কঠিনতর করে দিয়েছেন উৎপল শুভ্র নিজেই। ফোনের শেষ বাক্যটা ছিল, ‘ছোট করে হলেও খুব তাড়াতাড়ি পাঠান।' মর্মার্থ দাঁড়ায়, 'বাউন্ডারি দরকার নেই। সিঙ্গেলস- ডাবলস নিয়ে স্ট্রাইক রোটেড করেন।'

স্মৃতি রোটেড করতে গিয়ে দেখছি, নর্দাম্পটনে পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ শুরুর আগে একটা ওভার বাউন্ডারি মারার আনন্দ নিয়েই প্রেসবক্সে ঢুকেছিলাম। সেটার উল্লেখ না থাকলে সাংবাদিক হিসেবে নিজের স্কোরশিটটাই ইরেজ করে ফেলা হবে।

ওই দিন সকালেই এক ভদ্রলোকের একান্ত সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। মিনিট ত্রিশেক কথা বলেছিলেন তিনি। সময়টা আগেই নেয়া ছিল। ম্যাচ শুরুর আগে প্রেসের ডাইনিং হলে ব্রেকফাস্ট করতে করতে কথা বলবেন। উদ্দেশ্য ছিল, গোটা তিনেক বিষয় নিয়ে তাঁর সাথে কথা বলব। এক. বাংলাদেশ ক্রিকেটের উন্নতির জন্য তাঁর প্রেসক্রিপশন কী। দুই. বিশ্বকাপ কোন দলের জেতার সম্ভাবনা বেশি। তিন. ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেটে কাশ্মীর থেকে কার্গিলের ছায়া কতোটা গাঢ় হয়ে দেখা দিচ্ছে।

বিশ্বকাপ শুরুর আগেই ইমরান বলেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সব রকম সম্ভাবনাই আছে ওয়াসিম আকরামের পাকিস্তানের। ছবি: গেটি ইমেজেস

রীতিমতো প্রাক্তন ক্রিকেটার তিনি। কিন্তু ক্রিকেটীয় দ্যুতি তার তখনও হীরের মতো জ্বলজ্বলে। কারণ, তিনি ইমরান খান। ক্রিকেট ছেড়ে আসার সাত বছর পরও অসম্ভব ফিট। তবে ব্রেকফাস্ট টেবিলে একে একে যেভাবে খাবারগুলোকে হাওয়া করে দিলেন, তাতে ইন্টারভিউ নেয়ার সময় মনে হচ্ছিলো, এই পরিমাণ খাবার খাওয়ার পরও ভদ্রলোক এরকম ফিটনেস ধরে রাখেন কীভাবে! শুধু জিম করে? তা ছাড়া ইমরান খানের অন্যরকম নৈশ-জীবন নিয়েও তো কত কথা!  তবে ইন্টারভিউ শেষে ভদ্রলোক, আমার কাছ থেকে দুটি সাদা পৃষ্ঠা নিয়ে সেই সময় 'ভোরের কাগজ’-এর জন্য নিজের হাতে একটা কলাম লিখে নিচে সইও করে দিয়েছিলেন। যদ্দুর মনে পড়ে, সাইফুর রহমান খোকন সেটা অনুবাদ করেছিলেন প্রথম পাতার জন্য। যেখানে কলাম শেষে স্ক্যান করা ইমরানের খানের সইও ছাপা হয়েছিল।

ইমরান খান বিশ্বকাপ নিয়ে ভবিষদ্বাণী করেছিলেন, ভারত-পাকিস্তান-অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে কেউ জিতবে। সেই বিশ্বকাপে সবার আগে সুপার সিক্স নিশ্চিত করা পাকিস্তান দলটা ছিল দুর্দান্ত। আকরাম-ওয়াকার-শোয়েব-সাকলায়েন-মুশতাক-রাজ্জাক...কী বোলিং! সঙ্গে দারুণ এক ব্যাটিং লাইন আপ। সেটা মাথায় রেখেই ইমরানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ফাইনাল তো অনেক দূর, কিন্তু আজকের ম্যাচটা কী হতে পারে? ইমরানের কথা শুনে একটু চমকেই গিয়েছিলাম। 'যে কেউ জিততে পারে।' কোনো হেলদোল ছাড়াই কথাটা বলে দিলেন বিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান অধিনায়ক। ধাক্কা না খেয়ে উপায় কী!

ইমরান খানের ভবিষ্যদ্বাণীটা অমোঘ হয়ে দাঁড়াল পরোক্ষভাবে। ‌ 'যে কেউ!’ তার মানে তো বাংলাদেশও জিততে পারে। এই 'যে কেউ'-এর মধ্যে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা কোনো বাংলাদেশ সমর্থকও সেদিন দেখেছিলেন কি না, সন্দেহ এখনও আছে। কারণ, পুরোনো অভিজ্ঞতা মানে ইতিহাস বলছিল, বাংলাদেশ পাকিস্তানেক হারায়নি কখনো। কিন্তু সেদিন ছিল ইতিহাস আর বাস্তবের এক দারুণ সংঘর্ষ। যে সংঘর্ষ শেষে জিতেছিল বাস্তবতা।

বাস্তবতাটা কী হলো, ক্রিকেট সব সময়ই ভিন্ন বলের খেলা। প্রতিটি বলই নতুন। সেই নতুন বলেই নতুন ইতিহাসের জন্ম হয়। আর ইতিহাস মানে অতীত। কিন্তু কিছু কিছু অতীত কখনো কখনো বাস্তবের চেয়ে অনেক তৃপ্তি নিয়ে সামনে আসে দাঁড়ায়। তবে পাকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের ম্যাচটার কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ইমরান খান নামের এক ভদ্রলোকের মুখ। যিনি টসের আগেই বলেছিলেন, জিততে পারে, দু'দলের যে কেউ!