সত্তর দশকেও আত্মরক্ষামূলক ক্রীড়ায় নারীদের অংশগ্রহণ খুব একটা ছিল না। তখন তো আত্মরক্ষামূলক ক্রীড়া বলতে বোঝাতো মূলত জুডো-কারাতেকে। এই খেলায় নারীরা অংশ নেবেন, তখনকার সামাজিক প্রেক্ষাপটে এমন ভাবাটা একটু কঠিনই ছিল। মনোভাবটা ছিল এমন, নারী হবে নমনীয়, কমনীয়, সহনীয়। লাজুকতা, কোমলতা, ভীরুতাই হবে তার চরিত্রের ভূষণ। সে চোখ তুলে তাকাবে না। কোনো বিষয়ে উচ্চবাচ্য করবে না। প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রশ্নই আসে না। এর ব্যত্যয় ঘটুক, সমাজ তো বটেই অভিভাবকরাও তা একদমই চাইতেন না। প্রচলিত এই ধারণা যাঁরা ভেঙে দেন, তাঁদের অগ্রদূত হলেন কামরুন নাহার হীরু। 

নমনীয়তা, জড়তা, ভীরুতা পরিহারের পাশাপাশি পান থেকে সংস্কারের চুন খসানোর প্রত্যয় নিয়ে আত্মরক্ষার ক্রীড়া জুডোতে এগিয়ে আসেন সাহসী এই নারী। আত্মবিশ্বাস, নির্ভীকতা ও হিম্মতের সঙ্গে এই মার্শাল আর্টে তিনি নিজেকে সঁপে দেন। হাত ও পায়ের সাহায্যে অর্থাৎ জুজুৎসু প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে কাবু করার পাশাপাশি চিরন্তন সমাজ ব্যবস্থাকেও বড় একটা ধাক্কা দেন। ঘুচিয়ে দেন সামাজিক জাড্য, জড়তা ও রক্ষণশীলতাকে। স্থাপন করেন নতুন এক দৃষ্টান্ত। জুডো বললে এখনও সবার আগে উঠে আসে তাঁর নাম। 

জুডো ও কারাতে শুধু একটা খেলা নয়। এটা খেলার চেয়েও বেশি কিছু। এর মাধ্যমে শারীরিক শক্তি ও মানসিক দৃঢ়তার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সক্ষমতারও প্রকাশ ঘটে। নিজস্ব প্রতিরক্ষার জন্য এটি তুলনারহিত।  সাধারণ দৃষ্টিতে জুডোকাকে মারদাঙ্গাবাজ জাতীয় কিছু মনে করা হলেও এটি আত্মসংযমের একটি খেলা। একজন জুডোকার অকারণে কাউকে আঘাত কিংবা মাস্তানি করার সুযোগ নেই। তাঁকে মেনে চলতে হয় নিয়মানুবর্তিতা। সংযম প্রদর্শন, নম্রতার শিক্ষা ও শ্রদ্ধাবোধের দীক্ষা নিতে হয়। হীরুর মধ্যে এই গুণাবলীর সবটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জাপানি মার্শাল আর্ট হিসেবে পরিচিত জুডো মূলত আত্মরক্ষার তালিম দেয়। এ কারণে সাম্প্রতিককালে নারীদের সুরক্ষিত থাকার একটি প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠেছে খেলাটি। 

হাল আমলের মতো নারীদের ইভ টিজিং কিংবা নিগৃহীত করার চল তো নানান আঙ্গিকে সব সময়ই ছিল। সে সময় কেউ রুখে দাঁড়ানোর কথা চিন্তাই করতে পারতেন না। অথচ পথে ঘাটে উত্যক্ত বা অপদস্থ হওয়ার হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য জুডো ও কারাতের চেয়ে ভালো মাধ্যম আর কী হতে পারে? এখন তো বিভিন্ন রকম মার্শাল আর্ট দারুণভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিভাবকরা তো বটেই, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আত্মরক্ষার জন্য মেয়েদের মার্শাল আর্ট শেখানো হচ্ছে। আর এ ক্ষেত্রে পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন হীরুর মতো উদ্যোগী, অকুতোভয় ও শিক্ষিত মেয়েরা। 

কিন্তু শুরুতে বিষয়টি এত সহজ ছিল না। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। মেয়েদের রাস্তাঘাটে নাজেহাল হওয়াকে নিঃশব্দেই হজম করা হতো। এটাকেই মেনে নেওয়া হতো বিধির লিখন হিসেবে। এমনকি ঝুট-ঝামেলা সামাল দেওয়ার জন্য মেয়েকে রাখা হতো ঘরবন্দি। কোনো প্রতিকার করার কথা ভাবাই হতো না। যে কারণে প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদত। চুপচাপ সয়ে যাওয়ার সেই সময়ে নারীদের জুডো-কারাতে চর্চা ও প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটাও সুদৃষ্টিতে দেখা হতো না। তবে সমাজ তো এগিয়ে যায় কারও না কারও দুঃসাহসিক উদ্যোগ বা প্রচেষ্টায়। সামাজিক ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে জুডোতে এগিয়ে আসেন হীরুর মতো সপ্রতিভ মেয়েরা। আর এ ক্ষেত্রে নিরঙ্কুশ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছেন পরিবারের। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির দিক দিয়ে তাঁদের পরিবার ছিল অন্যদের চেয়ে আলাদা। এটাই তাঁকে চিরায়ত প্রথা ভেঙে সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। 

জুডো ও কারাতের প্রধান চর্চাকেন্দ্র ছিল ঢাকার আজিমপুর ও সংলগ্ন এলাকায়। বলা যায়, আওলাদ হোসেন, হাসানুজ্জামান মণিদের মতো নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের উদ্যোগে খেলাটির প্রচলন হয়। কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করতেন হীরু। সেই সুবাদে তিনি জুডোতে আকৃষ্ট হন। নবম শ্রেণির ছাত্রী থাকাবস্থায় ১৯৭৭ সালে পল্টনের ঢাকা জেলা ক্রীড়া সমিতিতে আয়োজিত জুডো প্রশিক্ষণে তিনি অংশ নেন। অল্প সময়ের মধ্যে খেলাটি রপ্ত করে নেন। তবে নানান রকম ভ্রুকুঞ্চন উপেক্ষা করেই তাঁকে এগিয়ে যেতে হয়েছে। 

১৯৭৮ সালে চতুর্থ জাতীয় জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথমবার নারীরা অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তারপর থেকে আত্মরক্ষার এ খেলাটি নারীদের কাছে পছন্দের হয়ে উঠে। একদম শুরুতে চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন ঢাকা জেলা, কুমিল্লা জেলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা। সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে হীরু ঢাকা জেলার হয়ে +১১০ পাউন্ডে স্বর্ণপদক জয় করেন। এই সাফল্যের পর তাঁর ধ্যান-জ্ঞান-সাধনা হয়ে ওঠে জুডো। এগিয়ে যান সামনের দিকে। জাতীয় জুডো প্রতিযোগিতায় +৫২ কেজিতে ১৯৮০ ও ১৯৮১ সালে, +৪৮ কেজিতে ১৯৮২ ও ১৯৮৩ সালে, ১৯৮৪ সালে +৪৮ কেজি ও ওপেন বিভাগে স্বর্ণপদক জয় করেন। এছাড়াও সাফল্য পেয়েছেন মহানগরী জুডো প্রতিযোগিতা, জাপান কাপ জুডো চ্যাম্পিয়নশিপসহ স্থানীয় বিভিন্ন টুর্নামেন্টে। ধাপে ধাপে বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে অর্জন করেছেন কাঙ্খিত ব্ল্যাক ব্লেল্ট। চলার পথে ইভ টিজারদের শায়েস্তা করার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে। 

If you see me comin', better step aside 
A lot of men didn't, and a lot of men died

সর্বকালের অন্যতম সেরা মার্শাল আর্টশিল্পী ব্রুস লি'র দুর্ধর্ষতা সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য লোকজ একটি  গানের এই দুটি লাইন প্রয়োগ করা যেতেই পারে। তাঁর ক্ষিপ্রগতি, শক্তিমক্তা আর কৌশল ছিল ভয়ঙ্কর সুন্দর। তিনি গানের ভাষ্যটাকে সত্যে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা রাখতেন। এই গানের মতো বিপজ্জনক না হলেও হীরুকে দেখলে অনেক রোমিও আগেভাগেই কেটে পড়তো। তা না হলে তো তাদের জন্য ইজ্জত কা সওয়াল হয়ে দাঁড়াত। 

প্রথম নারী হিসেবে বিদেশের মাটিতে পদক জয়ের কৃতিত্বও হীরুর। সে সময় আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় পদক পাওয়া ছিল অনেক বড় ব্যাপার। কড়ে আঙুল গুনে বলে দেওয়া যেত, কে কে পদক পেয়েছেন। তখনকার প্রেক্ষাপটে ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় চতুর্থ এশীয় জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে হীরুর পদক পাওয়া ছিল আলোচিত একটি ঘটনা। সেটাও খুব সহজ ছিল না। মেয়েদের বিদেশে খেলতে পাঠানোর ব্যাপারে দোনামোনা ছিল ফেডারেশনের। এক রকম লড়াই করে নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কিন্তু নিজের ওয়েট ক্যাটাগরিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। সেটা পেলে আরো ভালো করতে পারতেন। তারপরও হাল ছেড়ে দেওয়ার মেয়ে নন হীরু। আট কেজি ওজন কমিয়ে তিনি ওপেন ক্যাটাগরিতে অংশ নেন। ফিলিপাইনের মারিয়া তেরেসাকে হারিয়ে তাইওয়ানের প্রতিযোগীর সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। দেশের বাইরে এশিয়া পর্যায়ে এই পদক জয় করে সূচনা করেন নতুন এক দিগন্তের। বাঙালি একজন নারী হয়ে মার্শাল আর্টে আন্তর্জাতিক পদক ছিনিয়ে আনাটা ছিল অসাধারণ একটা ঘটনা। তাঁর এ সাফল্যে অনুপ্রাণিত হন পরবর্তী প্রজন্ম। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মার্শাল আর্টে এখন তো অনেকেই পদক জয় করছেন। ১৯৮৪ সালে রেঙ্গুনে শুভেচ্ছামূলক প্রতিযোগিতায় তিনি ৬৫ কেজিতে দ্বিতীয় হন। 

১৯৮১ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় এশিয়ান জুডো চ্যাম্পিয়নশিপে ইন্দোনেশিয়ার ফার্স্ট লেডি মিসেস সুহার্তোর কাছ থেকে ব্রোঞ্জ পদক নিচ্ছেন কামরুন নাহার হীরু

খেলা ছাড়ার পর কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন হীরু। দীর্ঘ দিন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে জুডো কোচ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯৮৯ সালে ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত তৃতীয় দক্ষিণ এশিয়া জুডো চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০০৩ সালে ম্যাকাওতে এশিয়ান জুনিয়র জুডো, ২০০৪ সালে ভারতের লক্ষ্মৌতে রাজীব গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল জুডো প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ দলের কোচ ছিলেন। ২০০২ সালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কোতে জুডো ইউনিয়ন অব এশিয়া আয়োজিত রেফারি পরীক্ষায় বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে ‘বি’ লাইসেন্স পেয়েছেন। ২০০৩ সাল থেকে এশিয়ান জুডো ফেডারেশনের ‘স্পোর্টস কমিশন মেম্বার’ এবং সাউথ এশিয়ান জুডোর ‘স্পোর্টস ডিরেক্টর’ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ কারণে তাঁকে বিভিন্ন দেশে জুডো টুর্নামেন্ট পরিচালনা করতে হয়। এটাও কিন্তু কম গৌরবের নয়। তিনি সংশ্লিষ্ট আছেন বিভিন্ন ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গেও। স্বীকৃতি পেয়েছেন ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতির সেরা জুডোকা হিসেবে এবং ২০০২ সালে পেয়েছেন জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার।

শারীরিক ফিটনেস আর মানসিক প্রশান্তি তো বটেই, সেই সঙ্গে জুডোর মাধ্যমে যে আত্মরক্ষা করা যায়, এই আত্মবিশ্বাস নারীদের মধ্যে সঞ্চার করার মাধ্যমে ইতিহাস হয়ে আছেন কামরুন নাহার হীরু। তাঁর এই উদ্যোগ ও উদ্যম এখনও থেমে নেই। জুডোর যে কোনো আয়োজনেই ছুটে যেতে দ্বিধা করেন না তিনি।