উৎপল শুভ্র: কেমন হলো বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপ?

আমিনুল ইসলাম বুলবুল: টার্গেট অনুযায়ী আমি বলব, খুবই ভালো এক টুর্নামেন্ট। বাংলাদেশের মূল টার্গেট ছিল স্কটল্যান্ডকে হারানো। যদিও কিছু পত্রিকা বা টিভিতে ইন্টারভিউতে বলেছিলাম যে দুটি ম্যাচ জিততে চাই, তবে বাস্তব প্রত্যাশা ছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জেতা অন্য ম্যাচগুলোয় ফাইট করা। তারপরও পাকিস্তানের মতো দলকে হারানো—এটা বিরাট ব্যাপার আমাদের জন্য। এখানকার আবহাওয়া, কন্ডিশন সব কিছু মিলিয়ে আমি মনে করছি বাংলাদেশের জন্য পুরোপুরি সন্তোষজনক টুর্নামেন্ট এটি।

শুভ্র: তবে শুরুটি তো ভালো হয়নি আপনাদের। তখন কি শেষটা কল্পনা করতে পেরেছিলেন?

বুলবুল: শুরুটা কোনো দলেরই ভালো হয়নি। আমাদেরও হয়নি। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে আমাদের ব্যাটিংটা কলাপস করেছিল। আমাদের দল নির্বাচনেও কিছু ভুল ছিল, সেদিন একজন ব্যাটসম্যান কম নিয়ে খেলেছিলাম আমরা। সে ম্যাচের আগে কিন্তু আমরা ভালোই খেলছিলাম, দুটি কাউন্টি দলকে হারিয়ে মানসিকভাবে চাঙাও ছিলাম। তবে নিউজিল্যান্ডের কাছে ওভাবে হারার পর খেলোয়াড়দের মধ্যে আমি একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞার ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম। ‘এটা আমাদের প্রথম বিশ্বকাপ, আমরা স্মরণীয় কিছু করবই’—এই চেষ্টাটা সবার মধ্যেই দেখেছি।

নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে। ছবি: এমপিকস

শুভ্র: নিউজিল্যান্ডের পরই ছিল আরও বড় পরীক্ষা, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে প্রথম ম্যাচ…।

বুলবুল: ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের আগে আমাদের প্ল্যান যা ছিল, সে অনুযায়ীই খেলতে পেরেছি আমরা। এরপর মোটামুটি সবগুলো ম্যাচ খেলতে পেরেছি তা-ই। আমাদের প্ল্যান ছিল পুরো ৫০ ওভার ব্যাট করব। আমরা জানতাম, এই টুর্নামেন্টে অন্য দলগুলোও প্রথম ১৫/২০ ওভার স্ট্রাগল করছে, ৫০ ওভার খেলতে পারছে না বেশির ভাগ দলই। এ কারণেই আমরা ঠিক করি, ৫০ ওভার টিকে থাকতে হবে।

শুভ্র: ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে আপনি সন্তুষ্ট ছিলেন?

বুলবুল: অবশ্যই সন্তুষ্ট। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচের পরদিন আমাদের দলেরই অনেকেই বলেছে, এই ম্যাচটা জেতা উচিত ছিল, আমরা অনেক কম রান করেছি। অথচ নিউজিল্যান্ডের মতো দল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করেছে ১৫০, অস্ট্রেলয়ার মতো দলের ১১০ রান করতে গিয়ে ৪ উইকেট হারাতে হয়েছিল ৬০ রানে। সেই বিচারে আমার মনে হয় আমরা ভালোই করেছি।

শুভ্র: ওয়েস্ট ইন্ডিজের পরই ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ, এডিনবরায় স্কটল্যান্ড…।

বুলবুল: আমি বলব সেটি ছিল স্কটল্যান্ড বনাম নান্নু ভাইয়ের ম্যাচ। ২৬ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর নান্নু ভাই ও দুর্জয় যেভাবে ব্যাটিং করেছে, তা এক কথায় অসাধারণ। আমরা জানতাম, আমাদের যে ব্যাটিং প্রতিভা আছে, দলে যে ব্যাটিং গভীরতা আছে, তাতে আমরা পারবই। স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের পর দল আরও চাঙা হয়ে যায়। এরপর আরও দুটি ম্যাচ ছিল, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল সেগুলোতে ভালো ফাইট দেয়া। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচেও আমরা ভালো ব্যাটিং করি, যদিও আমাদের বোলিং ওদের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি। ওরা নেমেছিলই রানরেট বাড়াতে এবং মানতেই হবে, আমাদের একেবারে আউটপ্লেড করে দিয়েছে। তবে সে ম্যাচেও ভালো ব্যাটিং করেছিলাম আমরা। অবশ্য সেরা ব্যাটিংটা করেছি পাকিস্তানের বিপক্ষে। এদিন জয়ের জন্য যা যা প্রয়োজন, সবই করেছি আমরা। পজিটিভ খেলেছে প্রতিটি খেলোয়াড়।

বিশ্বকাপে প্রথম জয় এসেছিল স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। ছবি: পিএ ইমেজেস

শুভ্র:  আচ্ছা আরেকটি ব্যাপার অনেকদিন ধরেই দেখে আসছি, কোনো ম্যাচের আগে আপনি বা দলের কোচ বা ম্যানেজার সব সময়ই ’৫০ ওভার ব্যাটিং করতে হবে’, ‘২০০ রান করতে হবে’ এমন সব টার্গেটের কথা বলেন। কিন্তু বোলিং নিয়ে কিছু বলেন না। যেমন ২০০ রান করার ওদেরকে তা টপকাতে ৪৫ ওভার পর্যন্ত খেলাব—এমন কিছু। এতে কি এমন মনে হতে পারে না যে, বোলিংয়ের অংশটাকে আপনারা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না?

বুলবুল: ব্যাটিংয়ের তুলনায় আমাদের বোলিং একটু পিছিয়ে আছে। তবে এখানকার এই কন্ডিশনে আমি বলব আমাদের বোলাররা প্রত্যেকেই ভালো বোলিং করেছে। শান্ত, মঞ্জু, সুজন, মনি, রফিক, দুর্জয়, নান্নু ভাই প্রত্যেকে ভালো বল করেছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমার সব সময়ই আত্মবিশ্বাস ছিল আমার বোলারদের ওপর যে, তারাও ম্যাচ জেতাতে সক্ষম।

শুভ্র: তবে আপনারা তো বোলিং নিয়ে সেভাবে কথাই বলেননি।

বুলবুল: হ্যাঁ, বলিনি। প্রথমত আমরা তাদের বাড়তি প্রেশারে ফেলতে চাইনি। তাছাড়া দেখুন, ১৮৩ রান করতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৪৬.৩ ওভার পর্যন্ত খেলিয়েছি আমরা। তাই আমি আমাদের বোলিংকে খাটো করে দেখছি না। তবে এই কন্ডিশনে আমরা ধারণা, ব্যাটসম্যানদের চেয়ে বোলারদের এমনিতেই ভালো করা উচিত।

শুভ্র: স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে পেয়েই আপনারা খুব আত্মতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করেছিলেন বলে একটা কথা শোনা যাচ্ছিল কারও কারও মুখে। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় তো সেটিকে মিথ্যা বলে প্রমাণ করল…

বুলবুল: এটা ছিল একদমই ভুল ধারণা। কারণ বাংলাদেশ দলে যারা খেলে, তারা সব সময়ই তাদের সেরা পারফরম্যান্সটাই দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু লোক এমন বলেছে যে, আমরা আমাদের যা পাওয়ার পেয়ে গেছি, আর কিছু পাওয়ার আকাঙ্খা নেই। এ সব কথা শুনে আমরা মর্মাহত হয়েছি এবং একই সঙ্গে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছি যে, বাকি দুই ম্যাচে আমাদের ভালো করতে হবে। পাকিস্তানের বিপক্ষে নামার আগেই আমরা জানতাম, পাকিস্তান ভালো দল, তাদের হারানো খুব কঠিন। তারপরও সবার মধ্যেই ভালো কিছু করার যে জেদটা দেখেছি আমি, তা এক কথায় ফ্যানটাস্টিক।

'পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়ের অনুভূতিটা ফ্যানটাস্টিক'

শুভ্র: জয় পেয়ে যাওয়ার সঙ্গে তো সাত খুন মাফ। কিন্তু পাকিস্তানের বিপক্ষে যে দল নিয়ে খেলতে নেমেছিলেন আপনি, সেটি তো ছিল অনেক প্রশ্ন তোলার মতো।

বুলবুল:  হ্যাঁ, আসলেই সেটি ছিল প্রশ্ন তোলার মতো দল। কারণ, আমরা আমাদের মূল দুই ফাস্ট বোলার ছাড়া খেলতে নেমেছি। মনি ভালো বল করছিল, মনিকেও আমরা ড্রপ করেছি। আসলে আমাদের লক্ষ্য ছিল, বাবু ও রাহুল যারা বিশ্বকাপে একটা ম্যাচও খেলেনি, তাদের সুযোগ দেয়া। রফিকও কয়েকটি ম্যাচে বসেছিল, ওকেও আরেকটা সুযোগ দেয়া। তবে ম্যাচে সব কিছুই আমাদের ফেভারে ছিল এবং কিছু কিছু ব্যাপারে ভাগ্যও আমাদের সহায়তা করেছে।

শুভ্র: ভালো খেলার পরও এই যে মনিকে বাদ পড়তে হলো, এ থেকে কি এই প্রমাণ হয় না যে, এখনও পেশাদারি মানসিকতা গড়ে ওঠেনি আমাদের। দলের দাবি না থাকলেও কেউ খেলেনি বলেই খেলাতে হবে—এটা কেমন কথা! অধিনায়ক হিসেবে আপনার মন্তব্যটা জানতে চাইছি।

বুলবুল: আমি একা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিইনি। বোর্ড প্রেসিডেন্ট, কো-অর্ডিনেটর, ম্যানেজার সবাই জড়িত এর সঙ্গে।

শুভ্র: আপনার ব্যক্তিগত মতামতটা শুনি।

বুলবুল: আমি রফিককে খেলাতে চেয়েছিলাম, তবে মনিকেও রাখতে চেয়েছিলাম দলে। আমি দুজনকেই চেয়েছিলাম।

বুলবুল পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে রফিককে চেয়েছিলেন, মনিকেও। ছবি: এএফপি

শুভ্র: অধিনায়ক হিসেবে তো এই বিশ্বকাপ আপনার জন্য দারুণ স্মরণীয়, কিন্তু ব্যাটসম্যান বুলবুলের জন্য তো তা নয়। এ নিয়ে নিশ্চয়ই একটু আক্ষেপ আছে আপনার?

বুলবুল: মানতেই হবে, ব্যাটসম্যান হিসেবে আমি এই টুর্নামেন্টে ব্যর্থ হয়েছি অনেকের মতোই। তবে এই মুহূর্তে আমি এ নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নই। আমি জানি, রান করতে পারছি না। ভালো খেলছি, আউট হয়ে যাচ্ছি হঠাৎ। এ নিয়ে আমি খুব হতাশ নই। চেষ্টা করেছি, হয়নি।

শুভ্র: আমাদের দেশে তো এই জয়কে অনেকভাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হবে। অধিনায়ক হিসেবে আপনার ভূমিকাটা কী হবে?

বুলবুল: আমি মনে করি, এটিকে শুধু ক্রিকেটের জন্যই ব্যবহার করা হোক। আমাদের ছোট ভাই বা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য হলেও কিছু একটা করা উচিত। তাদের জন্য কোনো মাঠ নেই। একটা মাত্র মাঠ ঢাকা স্টেডিয়াম, যেখানে আমরা ক্রিকেট খেলি, সেটিও আমাদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। আমাদের যুব দলের কোনো স্ট্রাকচার নেই, স্কুল ক্রিকেটে নির্দিষ্ট কোনো ফিকশ্চার নেই। একটা করে ম্যাচ খেলে আর একটা করে স্কুল বাদ হয়ে যায়। আমাদের দেশে স্ট্রাকচার যে পর্যন্ত ঠিক না হবে, আমি মনে করি আমাদের ক্রিকেটের কিছুই হবে না। আমাদের যে টাকা-পয়সা দেওয়ার কথা হচ্ছে, সংবর্ধনা থেকে যে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা হয়েছে, আমাদের সেসব কিছুই প্রয়োজন নেই। আমাদের দরকার একটা মাঠ এবং স্কুলের বাচ্চাগুলোকে আরও খেলার সুযোগ করে দিতে পারলেই আমি মনে করব, আমাদের এই জয়টা সার্থক হয়েছে।

শুভ্র: এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জন্য খুব খারাপ একটি ঘটনা ঘটেছে গর্ডন গ্রিনিজকে নিয়ে। আপনার সাফল্য পেয়েছেন, ঠিক আছে। কিন্তু বাংলাদেশ দলে এবার অনেক বেশি সমস্যা ছিল। বিশ্বকাপে এসে কোচের সঙ্গে কর্মকর্তাদের বিবাদ তো ভয়াবহ ব্যাপার। আপনি কী বলেন?

বুলবুল:  আমি প্রায় কেঁদে ফেলেছিলাম কাল। লাঞ্চের সময় গর্ডনকে যখন বিধ্বস্ত দেখেছি, তখন আমি মানসিকভাবে পুরো ভেঙে পড়েছিলাম। তবে যাওয়ার সময় গর্ডন আমাকে তিন/চারটি কথা বলে গিয়েছেন, যা ফিল্ডিং করতে নামার পর সব সময়ই আমার কানে বেজেছে। এর মধ্যে একটি কথা ছিল, ‘বুলবুল, তুমি ক্যাপ্টেন থাকো বা নাই থাকো, বাংলাদেশকে তোমার আরও অনেক কিছু দিতে হবে। আজকের এই ম্যাচ এবং এরপর সামনে যে আরও ম্যাচ আছে, সেগুলোতে তোমাদের ভালো করতেই হবে। কারণ বাংলাদেশের ক্রিকেট তোমাদেরই, খেলোয়াড়দেরকেই তা এগিয়ে নিতে হবে।’ ও যখন কথা বলছিল, তখন ওর গলা কাঁপছিল। খেলোয়াড়দের প্রতি তাঁর যে অসীম ভালোবাসা ছিল, তা আমি কখনও ভুলব না। খেলোয়াড়রাও ওঁকে খুব ভালোবাসত। আমি ওঁর কাছে কৃতজ্ঞ।

খেলোয়াড়দের মানতে কষ্ট হচ্ছিল গ্রিনিজের বিদায় নেওয়ার ধরনটা। ছবি: এএফপি

শুভ্র: কিন্তু খেলোয়াড়রা তাঁকে এত ভালোবাসলে যেভাবে তাঁকে বিদায় নিতে হলো, সে ব্যাপারে তো আপনাদের আপত্তি থাকার কথা।

বুলবুল: এটা পুরোপুরি বোর্ডের ব্যাপার। আমি এ ব্যাপারে কিছু বলতে চাই না। শুধু এটুকুই বলব, গর্ডনের দিকে তাকাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।

শুভ্র: গর্ডনের পর তো নতুন কোচ আসছে। কেমন কোচ আপনার পছন্দ?

বুলবুল: আমি বাংলাদেশ দলে যত কোচ পেয়েছি, তাদের মধ্যে সেরা বলব মুদাসসর নজর ও গর্ডন গ্রিনিজকে। কোচ হিসেবে তাই এক্স কোনো প্লেয়ারেকই চাইব আমি।

শুভ্র: বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বকাপে আপনি অধিনায়ক। তাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে এমন একটি জয়। আর কী পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন?

বুলবুল: আমি মনে করি, আমার ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যা যা পাওয়ার কথা ছিল, তার সব কিছুই আমি পেয়ে গেছি। আমি এখন পরিতৃপ্ত মনে ক্রিকেট খেলতে চাই। আমি ক্যাপ্টেন থাকি না না থাকি, আমি মনে করি এখনও আমার জাতিকে কিছু দেয়ার আছে।

শুভ্র: এই বিশ্বকাপের দিকে যখন পেছনে ফিরে তাকান, কোন মুহূর্তটি প্রথম মনে পড়ে?

বুলবুল: পাকিস্তানের বিপক্ষে আজহার মেহমুদের রান আউটটি। এটি এখনও বারবার আমার চোখে ভাসছে। ওটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট।