আমিনুল ইসলাম বুলবুল
অসাধারণ এক অনুভূতি। আমি বলব, এটি একটি ঐতিহাসিক জয়। যা বাংলাদেশের ক্রিকেটকে অনেকখানি এগিয়ে দেবে। তবে আমার একটাই দাবি, আমাদের যেসব পুরস্কার-টুরস্কার দেয়া হচ্ছে, সেসব কিছুই চাই না, আমাদের একটা মাঠ দেয়া হোক।

খালেদ মাহমুদ সুজন
জীবনের স্মরণীয়তম ম্যাচ। এসিসি ট্রফির ফাইনালেও ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছিলাম। আজ এই স্মরণীয় জয়েও হলাম তা। তবে এতে অবদান দলের সবারই। আমি কখনোই হারতে পছন্দ করি না। ‘সম্মানজনক পরাজয়ে’ বিশ্বাস নেই আমার। আজ এমন একটা জয় শুধু আমাদের নয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটের আগামী প্রজন্মকেও আত্মবিশ্বাস যোগাবে যে, ‘আমরা যে কোনো দলকে হারানোর ক্ষমতা রাখি।’

ম্যাচ-সেরা খালেদ মাহমুদ। ছবি: অলস্পোর্ট

মিনহাজুল আবেদীন নান্নু
আমি ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না কেমন লাগছে। শুধু বলব, একটা স্মরণীয় জয় দিয়ে আমার ক্যারিয়ারটাও স্মরণীয় হয়ে থাকল। ২২৩ রান করার পর ওরা যখন শুরুতেই দুটি উইকেট হারায়, তখন আমি আকরামকে বলেছিলাম, আমার তো মনে হয় পাকিস্তান হেরে গেছে। এই বিশ্বকাপে আসার আগে আমি বলেছিলাম, ক্যারিয়ার-সেরা খেলাটা খেলব। আমার পারফরম্যান্সে আমি সন্তুষ্ট। বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে আমার সর্বোচ্চ রান, বোলিংও ভালো করেছি, ফিল্ডিংও ভালো হয়েছে আগের চেয়ে। সুখী একজন মানুষ হিসেবে অবসর নিচ্ছি আমি।

আকরাম খান
আইসিসি ট্রফি জয়ের পরই আমি বলেছিলাম, বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্বপ্ন দেখি। হুট করে কথাটা বলিনি। আমি জানতাম, পাকিস্তানকে হারানোটা আমাদের দেশের জন্য বেশি আনন্দের হবে। ’৭১-এর স্মৃতির কারণেই এই জয়টা আরও বেশি স্মরণীয়। আমাদের জয়ের মূল কারণ হিসেবে আমি বলব পজিটিভ ব্যাটিংয়ের কথা। ওরা যখন ব্যাট করতে নামে, তখনই কেন যেন একটু অন্য রকম লাগছিল। প্রথম উইকেট পড়ার পরই আমি সবাইকে বলেছিলাম, আজ একটা কিছু হবে। এরপর ইজাজ আহমেদ যখন আউট হয়ে গেল, তখন আমি পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যাই। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সব ইতিহাসেই আমি থাকতে পারলাম, এটাই আমার বাড়তি আনন্দ।

আইসিসি ট্রফি জয়ের পরই আকরাম খান বলেছিলেন, 'বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর স্বপ্ন দেখি'। ছবি: পোপারফটো

খালেদ মাসুদ পাইলট
ওয়াসিম আকরাম আউট হয়ে যাওয়ার পর আমি নিশ্চিত হয়ে যাই জয়ের ব্যাপারে। এর আগেও মনে হচ্ছিল যে চান্স আছে, তবে বড় দলগুলোর বিপক্ষে এর আগে এ রকম অবস্থাতেই নিয়মিত হেরে এসেছি আমরা। হয়তো ৩টি উইকেট পড়ে গেল দ্রুত, এরপর দাঁড়িয়ে গেল ওদের কেউ। যখন ২/৩ উইকেট বাকি আছে, তখন তো জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেছি, তখন চিন্তা ছিল স্টাম্প নিয়ে, কে কোনটা নেবে। আমাকে আবার কয়েকজন বলে রেখেছিল, ‘আমাকে একটা দিবি, আমাকে দুইটা দিবি।’ ওই টেনশনেই ছিলাম তখন।

মেহরাব হোসেন অপি
আমি খুশিতে পাগল হয়ে গেছি। আজ প্রথম ক্যাচটি আমি ধরেছি, শেষ রান আউটটিও করেছি আমি, দারুণ আনন্দ লাগছে।

শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ
গত দুই ম্যাচ খেলতে না পারায় মন খারাপ ছিল। এখন বলতে হচ্ছে, সময় মতোই দলে ফিরেছি আমি। স্মরণীয় একটা জয়ের অংশ হতে পারলাম। আজ আমরা শুরু থেকেই পজিটিভ খেলেছি। বিশ্বকাপ এবং পাকিস্তানের বোলিং বিবেচনায় আজ আমার ৩৯ রানকেই বলব আমরা ক্যারিয়ারের সেরা ইনিংস।

নাঈমুর রহমান দুর্জয়
গ্রেট! টেস্ট প্লেয়িং কোনো দেশের বিপক্ষে প্রথম জয় এবং এই জয়টি খুবই প্রয়োজন ছিল। কারণ আইসিসি ট্রফির পর গত দুই বছর আমরা খুব ভালো খেলিনি, এই জয় দিয়ে আমরা খুব ভালোভাবে ট্র্যাকে ফিরে এসেছি। আমাদের ব্যাটিংয়ের সময়ই কেন যেন মনে হচ্ছিল, একটা কিছু হয়ে যেতে পারে। আমাদের ব্যাটসম্যানরা টপ ক্লাস বোলিংয়ের বিপক্ষে এত ভালো খেলছিল যে, তখনই মনে হয়েছিল, এটা আমাদের দিন হতে পারে। নিজের কথা বললে, ব্যাটিংয়ে তেমন কিছু করতে পারিনি। ভালো ব্যাট করছিলাম, তবে দিনের সেরা বলটি পেয়ে গেছি আমি। এরপর প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আরও দুটি বিভাগ তো আছে আমার, সেগুলোতে ভালো করতে হবে। ফিল্ডিংয়ে বাড়তি চেষ্টা করেছি। সাঈদ আনোয়ারকে রান আউট করতে পেরে খুব খুশি হয়েছিলাম, কারণ ওর মতো ব্যাটসম্যানকে তাড়াতাড়ি ফিরিয়ে দিতে পারা যেকোনো দলের জন্যই বড় এক অ্যাডভান্টেজ। এরপর ওদের শেষ ব্যাটসম্যান মঈন খানের ক্ষমতা ছিল ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার, ওকে আউট করার পর আমি জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে যাই।

আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে... ছবি: এমপিকস
মোহাম্মদ রফিক
আমরা ভালোই একটা স্কোর করেছিলাম। শুরুতে ওদের ২/৩ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর আমরা যে চাপটা দিয়েছি, কাজ হয়েছে তাতেই। আমরা কিন্তু ওদের সিঙ্গেল নিতে দেইনি, রান নিতে হলে আমাদের বিট করে মারো—এই ছিল আমাদের চ্যালেঞ্জ। এ রকম চাপে পড়লে যত বড় দল আর যত বড় খেলোয়াড়ই হোক না কেন, সমস্যা হবেই। আজ এই চাপে পড়েই ওদের তিনটা রান আউট হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে আমরা আগেও খেলেছি, কোনোদিন হারাতে পারিনি, আজ জায়গামতো হারিয়েছি। বিশ্বকাপে জিতে প্রমাণ করেছি যে, আমরাও খেলতে পারি। আমার আরও বেশি আনন্দ লেগেছে একটা কথা ভেবে, এই সাকলায়েন (মুশতাক) গতবার ঢাকায় গিয়ে আমার সামনে একজনকে বলেছিল, বাংলাদেশ যে বিশ্বকাপে খেলবে, এটা ও জানে না। আজ আমরা এর জবাবটা দিয়ে দিলাম—দেখ্, বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলছে।

সফিউদ্দিন আহমেদ বাবু
এর আগে চারটি ম্যাচেই বাইরে বসে ছিলাম। এ নিয়ে অবশ্য আমার কোনো ক্ষোভ নেই, কারণ শান্ত ও মঞ্জু খুব ভালো বোলিং করছিল। আজ যখন সুযোগ পেলাম, তখন ভালো কিছু করতে হবে—এই প্রতিজ্ঞাটা ছিল। শুরুতে সাদা বল কন্ট্রোল করতে একটু সমস্যা হচ্ছিল, কিন্তু যখন একটা উইকেট পেলাম, তখন থেকে ঠিক হয়ে গেল সব। সবাই আমাকে খুব উৎসাহও দিয়েছে। আর জয় সম্পর্কে কী বলব—ওটা তো বলে বোঝাতে পারব না।

নিয়ামুর রশীদ রাহুল
আমার কোচ ইমরান স্যার প্রায়ই বলেন, আমি খেললেই নাকি একটা কিছু হয়ে যায়। আমার বিকেএসপির বন্ধুরাও এটা বলে। আজ খেলা শুরু হওয়ার আগে আমি শান্তকে বলেছিলাম, এই ম্যাচটা আমরা জিতে যাব। মার্চে দেশে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আমার যে ম্যাচে অভিষেক হয়েছিল, সেটিও প্রায় জিতে গিয়েছিলাম। আর আজ দ্বিতীয় ম্যাচে তো জিতেই গেলাম।

বাংলাদেশের সমর্থকদের উল্লাস বাঁধ মানবে কেন!

ফারুক আহমেদ
আমি দারুণ খুশি যে, এই বিজয়ের একটা অংশ হতে পেরেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে এর আগে তো মাইলস্টোন ছিল আইসিসি ট্রফিতে সাফল্য এবং কেনিয়ার বিপক্ষে একটি জয়। টেস্ট প্লেয়িং কোনো দেশকে হারানোটা বড় স্বপ্ন ছিল আমাদের। আমরা তা করেছি এবং করেছি দারুণভাবে, বিশ্বকাপের মতো জায়গায় হারিয়েছি ওদের। আমি অবসর নিচ্ছি শেষে ভালো কিছু পেলাম এই আনন্দ নিয়েই।

এনামুল হক মনি
জাতীয় দলে আর খেলব না—এই ঘোষণা দিয়ে দেয়ার পর ক্যারিয়ারের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্বকাপে দুটি ম্যাচ জিতলাম আমরা। আজ আমি খেলিনি, তাতে কোনো দুঃখ নেই। পাকিস্তানের মতো দলকে হারাতে পেরেছি, সেই আনন্দের তুলনা হয় না। আজ খেলোয়াড়েরা অনেক বেশি স্পিরিটেড ছিল, একাত্মতা ছিল দলে। আগের রাতে আমরা মিটিংয়ে আলোচনা করেছি, আমরা কেন জিততে পারব না? দক্ষিণ আফ্রিকাও তো হেরে গেল জিম্বাবুয়ের কাছে। আমরাও চেষ্টা করে দেখি না, হয় কি না। সেটাই হয়েছে।

হাসিবুল হোসেন শান্ত
আজ আমি খেলিনি, সে জন্য কোনো দুঃখ নেই। দল জিতেছে, তা-ও পাকিস্তানের বিপক্ষে। জীবনের স্মরণীয় দিন এটি। তবে এতদিন মাঠে থেকে টেনশন করেছি, আজ বাইরে থেকে বুঝলাম, ড্রেসিংরুমে টেনশনটা আরও বেশি। শেষ দিকে আমি গিয়ে মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। ইচ্ছে ছিল, জয়ের পর ছুটে গিয়ে ওদের জড়িয়ে ধরব, কিন্তু দর্শকদের কারণে তা পারলাম না।

মঞ্জুরুল ইসলাম
আমার অনুভূতির কথা বলে বোঝাতে পারব না। ওয়াসিম আকরাম আউট হওয়ার পরই আমি লাফিয়ে উঠেছিলাম, এরপর মঈন খান আউট হওয়ার পর নিশ্চিতই হয়ে যাই। দর্শকেরা মাঠে ঢুকে যাওয়ায় ঠিক সুযোগ পেলাম না, চেয়েছিলাম, ওদের গিয়ে জড়িয়ে ধরব।

..........................

সংযোজন: শেষ চারজন পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচে খেলেননি। নান্নু, ফারুক, রফিক ও মনি এই ম্যাচের আগেই জাতীয় দল থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। শেষ দুজন অবশ্য পরে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন।