একটা বিশ্বকাপের জন্য ইংল্যান্ডের ৩৫ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটল। ঘটালেন কারা? দুই দক্ষিণ আফ্রিকান! 

দুই দক্ষিণ আফ্রিকান সামনে। নেপথ্যে এক জিম্বাবুইয়ান! বিশ্বকাপ-অতৃপ্তি ঘোচার মুহূর্তে উইকেটে পল কলিংউডের সঙ্গী এক আইরিশ। চারটি ফাইনালে শূন্য হাতে ফেরার পর ইংল্যান্ডের প্রথম কোনো বৈশ্বিক শিরোপায় এমনই বহুজাতিক অবদান!

জয়ের রানটা অবশ্য এক ইংলিশ-ম্যানের ব্যাট থেকেই এল। ডাগ আউট থেকে পুরো ইংল্যান্ড দল তখন পল কলিংউডের দিকে ছুটছে। সবার আগেও এক দক্ষিণ আফ্রিকান—কেভিন পিটারসেন। স্বদেশি ক্রেইগ কিয়েসওয়েটারের সঙ্গে যাঁর ৬৮ বলে ১১১ রানের জুটিটিই এমন প্রতীক্ষিত ফাইনালকে একেবারেই একতরফা বানিয়ে দিল।

ফাইনাল-পূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক মাইকেল ক্লার্ককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘ইংল্যান্ড দলে প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানের মধ্যে অধিনায়ক ছাড়া ইংলিশ কেউ নেই। এমন কোনো অস্ট্রেলিয়া দলের যদি অধিনায়কত্ব করতে হয়, যেখানে আপনিই একমাত্র অস্ট্রেলিয়ান—কেমন লাগবে তাতে?’

ক্লার্ক এখনো স্টিভ ওয়াহ বা রিকি পন্টিংয়ের মতো প্যাঁচগোচ বোঝেন না। ইংল্যান্ডকে খোঁচা দেওয়ার মোক্ষম এই সুযোগটা ওই দুজনেরই কেউই মিস করতেন না। অথচ ক্লার্ক কি না বললেন, ‘ইংল্যান্ডের পক্ষে খেলে ওরা নিশ্চয়ই গর্ব অনুভব করে!’

ইংল্যান্ডকেও এখন গর্ব অনুভব করার সুযোগ করে দিলেন কিয়েসওয়েটার আর পিটারসেন। আর বাড়িয়ে দিলেন দক্ষিণ আফ্রিকানদের জ্বালা। 

প্লেয়ার অব দ্য টুর্নামেন্ট ট্রফি হাতে ইংল্যান্ডের কেভিন পিটারসেন

আগামী বুধবার ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজ শুরু হয়ে যাচ্ছে বলে দক্ষিণ আফ্রিকা দল এই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিয়েও এখনো ক্যারিবিয়ানেই। কাল অ্যান্টিগায় বসে টেলিভিশনে ম্যান অব দ্য ম্যাচ কিয়েসওয়েটারের ৪৯ বলে ৬৩ দেখতে দেখতে গ্রায়েম স্মিথের কাটা ঘায়ে নিশ্চয়ই নুনের ছিটা পড়েছে। কিয়েসওয়েটারকে দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যেতে বলেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলে খেলা কিয়েসওয়েটার শোনেননি। এর আগে পিটারসেনও না।

এই দুজনের সামনেই কাল উধাও অস্ট্রেলিয়ার প্রবল প্রতাপ। বারবাডোজে টেইট-জনসন-ন্যানেসদের বিপক্ষে ১৪৮ রানের টার্গেটও নেহাত কম বলে মনে হচ্ছিল না। দ্বিতীয় ওভারেই মাইকেল লাম্বকে (আরেক দক্ষিণ আফ্রিকান!) ফিরিয়ে দিয়ে যেন সেই ঘোষণাই দিয়েছিলেন শন টেইট।

কিয়েসওয়েটারের সঙ্গে যখন যোগ দিলেন পিটারসেন, স্কোরবোর্ডে মাত্র ৭। লেগ স্পিনার স্মিথকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে যখন আউট, সেটি দেখাচ্ছে ১১৮। প্রায় ৭ ওভার বাকি তখনো। অথচ বিশ্বকাপ কে জিতছে—এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেছে ততক্ষণে। ৪১ বলে দরকার ৩০ রান, হাতে ৮ উইকেট—ইংল্যান্ড চাইলেও এই ম্যাচ হারা প্রায় অসম্ভব।

ম্যাচের শেষটা আসলে শুরুরই প্রতিচ্ছবি। টসে জিতে অস্ট্রেলিয়াকে যখন ব্যাটিংয়ে পাঠিয়েছেন, বোলারদের কাছে ভালো কিছুর প্রত্যাশা নিশ্চয়ই ছিল কলিংউডের। তবে প্রথম তিন ওভারেই উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে ৩ উইকেটে ৮ বানিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন অবশ্যই দেখেননি। শেন ওয়াটসন তৃতীয় বলেই আউট। ওয়ার্নার গেলেন রান আউটে। হাডিনের উইকেটটি অবশ্য সাইডবটম নন, নিলেন আম্পায়ার। বল তাঁর কোমরে লেগে পেছনে। হাডিন সেটি দেখালেনও। কিন্তু আম্পায়ার কট বিহাইন্ডের সিদ্ধান্তে অটল।

১০ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ৪৭। ক্লার্কও ফিরে গেছেন এরই মধ্যে। সেখান থেকে শেষ ১০ ওভারে ঠিক ১০০। অবদান ক্যামেরন হোয়াইট আর দুই হাসি ভাইয়ের। হোয়াইটের ১৯ বলে ৩০ (৪টি চার, ১টি ছয়)। ডেভিড হাসির ৫৪ বলে ৫৯ (২টি চার, ২টি ছয়), মাইক হাসি ১০ বলে ১৭ করে অপরাজিত। 

১৪৭ খুব বড় স্কোর নয়। কিন্তু একসময় অসম্ভব মনে হতে থাকা এই রানই তো অস্ট্রেলিয়াকে জাগিয়ে তোলার কথা। আর অস্ট্রেলিয়া জেগে উঠলে কী হয়, সেটি তো সবার জানাই।

ফাইনালের নায়ক কিয়েসওয়েটার। ছবি: পপারফটো/গেটি ইমেজেস

তবে এবার হয় অস্ট্রেলিয়া জেগে উঠল না। অথবা জেগে উঠেও কাজ হলো না। পল কলিংউড ফাইনালের আগে দাবি করেছিলেন, তাঁর খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস এখন আকাশছোঁয়া। শুধুই যে অধিনায়কের কথার কথা নয়, তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত কিয়েসওয়েটার আর পিটারসেনের (৩১ বলে ৪৭, ৪টি চার ও ১টি ছয়) ব্যাটে। 

ওরা দক্ষিণ আফ্রিকান, তাতে কি আসে যায়! ইংলিশ নির্বাচকদেরও কি কৃতিত্ব নেই। পিটারসেন না হয় খুব সহজ সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু কিয়েসওয়েটার তো ছিল বড় একটা বাজি। সেই বাজিতে জয়েই তো এই বিশ্বকাপ জয়!

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

অস্ট্রেলিয়া: ১৪৭/৬ (ওয়াটসন ২, ওয়ার্নার ২, ক্লার্ক ২৭, হাডিন ১, ডেভিড হাসি ৫৯, হোয়াইট ৩০, মাইক হাসি ১৭*, স্মিথ ১*; সাইডবটম ২/২৬, সোয়ান ১/১৭, রাইট ১/৫)। 

ইংল্যান্ড: ১৫১/৩ (লাম্ব ২, কিয়েসওয়েটার ৬৩, পিটারসেন ৪৭, কলিংউড ১৫*, মরগান ১৫*; টেইট ১/২৮, জনসন ১/২৭, স্মিথ ১/২১)। 

ফল: ইংল্যান্ড ৭ উইকেটে জয়ী।  ম্যান অব দ্য ম্যাচ: কিয়েসওয়েটার।  ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট: কেভিন পিটারসেন।

 

আরও পড়ুন: ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ-দুঃখ ঘুচবে এবার?