ম্যানচেস্টার সিটি:চেলসি: ১ (হাভার্ট ৪২)

ফুটবল এমনই। দেয় যেমন, নেয়ও!

পেপ গার্দিওলার ফুটবলে দৃষ্টিসুখের উল্লাস থেকে ছিনিয়ে নিল কৌশলের মুকুটটা। পরিয়ে দিল একদা-শিষ্য টমাস টুখেলের মাথায়। নাকি, গার্দিওলাই হাতে করে তুলে দিলেন, স্বেচ্ছায়?

খেলা শুরুর আগে বিপক্ষের প্রথম এগারো দেখেই মনে মনে গুরুকে ধন্যবাদ দিয়েছিলেন টুখেল। তাঁর সেরা ফুটবলার এনগোলো কান্তেকে মাঝমাঠে বিনা বাধায় রাজ্য বিস্তারের এমন অযাচিত সুযোগ দেবেন গার্দিওলা, ভাবতেই পারেননি। ফার্নান্দিনহো নেই, রদ্রিও নেই! আজকের ফুটবলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছাড়া দল সাজানো যায়! তা-ও আবার চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে, এমন দলের বিরুদ্ধে যাদের কাছে পরপর দুটি হার স্মৃতিতে টাটকা!

গার্দিওলার ইগোর কারণেই পরাজয় সিটির!বিশ্বসেরা ট্যাকটিশিয়ান হওয়ার কিছু নেতিবাচক দিকও থাকে। জ্বালা, গোঁয়ার্তুমি। নিজেকেই নিজের চ্যালেঞ্জ। দেখাই যাক না, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ছাড়াই খেলব, জিতে দেখাব। ছজনই আক্রমণাত্মক ঘরানার। বার্নার্দো সিলভা, ইলকায় গুন্ডোগান, ফিল ফোডেন, রিয়াদ মাহরেজ, কেভিন ডি ব্রুইনা এবং রাহিম স্টার্লিং। জার্মান গুন্ডোগানকে দেওয়া হলো ফার্নান্দিনহোর ভূমিকা। ফলে, শারীরিক হতে চাইলেন গুন্ডোগান। ছন্দ নষ্ট নিজের, দলের। বাকিরা কেউই বিপক্ষকে আটকানোয় দড় নন। খেল খতম!

না, ব্রাজিলীয় ফার্নান্দিনহো কোনোভাবেই ক্লদ ম্যাকেলেলে নন, এককালে জিনেদিন জিদান যাঁকে বলতেন ‘রিয়াল মাদ্রিদের ইঞ্জিন’! ২০১৪ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মনে আছে? বেলো হরিজোন্তের এস্তাদিও মিনেইরাও-তে প্রথমার্ধেই থিয়াগো সিলভাহীন ব্রাজিল ০-৫ পিছিয়ে যখন, লুই ফেলিপে স্কলারি সবার আগে যাঁকে তুলে নিয়েছিলেন দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর মুখে, তিনি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনহো। সিটিতে তিনি কিংবদন্তি, গার্দিওলার ঘোষিত অধিনায়কও। মৌসুমের শেষ দিনই শুধু কোচ মনে করলেন, ক্যাপ্টেনকে ছাড়াই চলতে পারে দল এবং সর্বনাশ!

ম্যাকেলেলে কিন্তু এখনও আছেন চেলসিতেই। ‘টেকনিক্যাল মেন্টর’ পদে। কান্তের রমরমা কেন, বোঝা সহজ। গত বছরের মহামারী বাদ রাখুন। ২০১৮-এ ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ, ২০১৯-এ চেলসিকে ইউরোপা লিগ দেওয়ার পর ২০২১-এ চ্যাম্পিয়নস লিগ। ফাইনালে এবারও সেরা ফুটবলার। সেই ইঞ্জিন যা তরুণ তুর্কিদের দিশা দেয় আক্রমণে, রক্ষণে জোগায় ভরসা। প্রয়োজনে বিপক্ষ বক্সে এসে হেড গোল লক্ষ্য করে বা জোরালো শটও। আর সবচেয়ে বড়, ডি ব্রুইনাদের নিতান্ত নিরামিষ রাখতে পারেন, দরকার পড়লেই। তাই গত ছ’সপ্তাহে চেলসির কাছে তৃতীয়বার পর্যুদস্ত হয় ম্যানচেস্টার সিটি, ইউরোপ জয়ের রাতে ম্যাচের সেরা কান্তে!

কান্তে, অন্তত এদিনের বেস্ট!

ঠিক দশ বছর আগে শেষবার ইউরোপ জয় করেছিলেন গার্দিওলা। তাঁর ফলস নাইন ধরতেই পারেননি অ্যালেক্স ফার্গুসন, ওয়েম্বলিতে। স্বীকার করেছিলেন ফার্গুসন পরে, কৌশলের দিক থেকে এত বড় মাত আর কখনো হতে হয়নি। সেই গার্দিওলা, নিজের তৃতীয় ইউরোপীয় ফাইনালে, মন্ত্রী খাইয়ে দিলেন শুরুতেই! অকারণ আত্মবিশ্বাস, কাতালান-ইগোর গোঁ। যে যুক্তিতে একদা তিনি বড় চেহারার কারণেই বাতিল করেছিলেন ইয়াইয়া তোরেকে, শরীর-সর্বস্ব ফুটবলকে কোনোভাবেই তোল্লাই দেব না বোঝাতে চাওয়ার এই দুর্নিবার ইচ্ছেটুকু আরও একটি দিন সংবরণ করতে পারলে আখেরে লাভই হয়ত হতো সিটির।

ম্যাচ বলতে টুখেলের পাঁচজনের ডিফেন্সের দু'পাশে ডানা মেলতে তৈরি জেমস আর চিলওয়েল। পরপর চিলওয়েল-মাউন্ট দৌড়লে সিটি রক্ষণে হাহাকার। টিমো ভার্নার, জার্মান কোচের আরও এক জার্মান ফুটবলার, প্রথমেই বার দুয়েক নিশ্চিত গোলের সুযোগ না হারালে আরও অপমানজনক হার সইতে হতো গার্দিওলাকে।

চেলসির মাঝমাঠ থেকে গোলের পাস বাড়ালেন মাউন্ট। ফুটবল ইতিহাসে আগ্রহী পাঠকের মনে থাকতে পারে ২০১০ বিশ্বকাপে হল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ফিলিপে মেলোর অবিকল একই রকম পাসের কথা, যা থেকে গোল ছাড়া আর কিছু করতে পারেননি এমনকি রবিনহোও! সেই ম্যাচে তারপর যা যা করেছিলেন মেলো, সব ভুল। সে অবশ্য অন্য প্রসঙ্গ। এখানে মাউন্টের পাস থেকে বল মাটিতে প্রায় ৪০ গজ গেল, সিটির মাঝমাঠই হোক বা রক্ষণের কেউ, নাগাল পেলেন না! প্রায় বিনা বাধায় একুশের জার্মান হাভার্ট গোল করে গেলেন, গোলকিপার এডারসনকে পেছনে মাটিতে ফেলে অসহায়, মুখ তুলে সামনে ফাঁকা গোল দেখে ঠেলে দিলেন শুধু। পজেশন থাকলেও মাঠে সিটি আদৌ ছিল না ফাইনালে, এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী?

চেয়ে দেখছেন সিটি খেলোয়াড়রা, হাভার্টের সামনে উন্মুক্ত গোলপোস্ট।পাস খেলার জন্য বিখ্যাত কোচের দল বলার মতো আক্রমণ করেছিল গোলকিপার এডারসনের লম্বা বল রাহিম স্টার্লিংয়ের পায়ে ফেলে। ইংরেজ স্টার্লিং বেরিয়ে এসেছিলেন অফসাইড ফাঁদ এড়িয়ে। কিন্তু ততটাই খারাপ প্রথম ছোঁয়া, যা সুযোগ এনে দেয় জেমসের কাছে, বল বের করে দেওয়ার। স্টার্লিং তারপরও তাঁকে প্রথম দলে রাখার যৌক্তিকতা বোঝাতে অক্ষম। আর আগুয়েরো যখন নেমেছিলেন, সিটি বিক্ষিপ্ত, বিধ্বস্ত। ইংল্যান্ডের লিগে আগুয়েরো যেমন খেলেছেন, ইউরোপে তেমন ভাল কখনো নন বলেই তো সিটি প্রথমবার ফাইনালে উঠেছিল তাঁর শেষ বছরে!

তবুও সমতা ফেরানোর সুযোগ এসেছিল ৯৬ মিনিটে। মাহরেজ শট নিয়েছিলেন যখন, এদুয়ার্দো মেন্দির হাঁটু মাটিতে। তিন কাঠিতে রাখতে পারলে গোল, মাহরেজের শট গেল বাইরে। শেষ বাঁশি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই।

জানুয়ারিতে এসে টুখেল কী করেছেন? চেলসির জয়ের ইচ্ছেতে শান দিয়েছেন রক্ষণ দৃঢ় করে। ম্যাচে একবারই ডি ব্রুইনা-ফোডেন জুড়ি বিপজ্জনক। ফোডেন গোলে শট নিচ্ছেন, এগিয়ে এল রুডিগারের পা। ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায়। এই রুডিগারের প্রত্যাবর্তন টুখেলের আমলে। থিয়াগো সিলভার মতো অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার চোট পেয়ে উঠে যাওয়ার পর মাঠে নেমে ক্রিস্টেনসেন বুঝতেই দিলেন না! ২০১২তে চেলসি জিতেছিল, ঠিক। কিন্তু সেই জয়ে অদক্ষতার জয়গান ছিল, যে কলঙ্ক ধুয়েমুছে সাফ নয় বছর পরের ফাইনালে, খাতা-কলমের হিসাবে সেরা দলকে মাঠে স্রেফ দর্শক বানিয়ে। এদুয়ার্দো মেন্দি, সেনেগালের গোলরক্ষককে চেলসির তিন কাঠির তলায় ফাইনালে একবারও পরীক্ষায়ই ফেলতে পারল না সিটি!

জানুয়ারিতে এসে দলের খোলনলচেই বদলে দিলেন টুখেল
১৬৫০০ দর্শক ফিরলেন দো দ্রাগাওতে। একুশের হাভার্ট-জেমস, বাইশের মাউন্ট, চব্বিশের চিলওয়েল, পঁচিশের ভার্নারদের ভুলবেন না তাঁরা, টেলিদর্শকরাও। জার্মান টুখেলকে কৃতিত্ব দিতে এক ফোঁটাও কার্পণ্য না দেখিয়ে তবু বলে রাখা জরুরি, এই চেলসি আসলে হাতেগড়া এক চেলসি-কিংবদন্তির। আনন্দের এই দিনে ফুটবল-ইতিহাস যদি ভুলে থাকে ‘কোচ’ ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে, বড্ড অন্যায় হবে!

ম্যানচেস্টার সিটি: এডারসন; ওয়াকার, স্টোনস, রুবেন দিয়াজ, জিনচেনকো; বার্নার্দো সিলভা (ফার্নান্দিনহো ৬৪), গুন্ডোগান, ফোডেন; মাহরেজ, ডি ব্রুইনা (জেসুস ৬০), স্টার্লিং (আগুয়েরো ৭৬)

চেলসি: মেন্ডি; জেমস, আজপিলিকুয়েতা, থিয়াগো সিলভা (ক্রিস্টেনসেন ৩৯), রুডিগার, চিলওয়েল; জর্জিনিও, কান্তে; হাভার্ট, মাউন্ট (কোভাচিচ ৭৯); ওয়ার্নার (পুলিসিচ ৬৬)

রেফারি: আন্তোনিও মিগেল মাতেও লাহোজ (স্পেন)।

আরও পড়ুন:

ফিলিপ লামের চোখে: ডাগআউটের দ্বৈরথ