টেস্ট ম্যাচ সবচেয়ে বেশি দর্শকের রেকর্ডটা আমি আপনাদের জানাতে পারি। সবচেয়ে কম দর্শকের রেকর্ডটা জানা থাকলে আমাকে জানাবেন। ইন্টারনেটে আঁতিপাতি করে খুঁজেও যে তা পেলাম না।

সবচেয়ে বেশি দর্শকের রেকর্ডটা আগে জানিয়ে দিই। ১৯২৬ সালে মেলবোর্নে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড টেস্ট ম্যাচের পাঁচ দিন মিলিয়ে মাঠে দর্শক ছিল ৩,৫০,৩৫৪। ম্যাচে সবচেয়ে বেশি দর্শকের মতো টেস্ট ক্রিকেট এক দিনে সবচেয়ে বেশি দর্শকও দেখেছে মেলবোর্নই । ১৯৬০-৬১-তে ফ্রাঙ্ক ওরেলের ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর রিচি বেনোর অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে মহাকাব্যিক সেই সিরিজে। অঙ্কটা ৯০,৮০০।

আপনি কী ভাবছেন, অনুমান করতে পারছি। ক্যারিবীয় কড়চায় ভালোই গালগল্প চলছিল, এই লোক হঠাৎ অঙ্ক-টঙ্ক নিয়ে পড়ল কেন? পড়েছি, কারণ সেন্ট ভিনসেন্ট থেকেই প্রশ্নটা মনে খুঁচিয়ে  যাচ্ছে। বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ এই সিরিজটিই কি টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে কম দর্শকের রেকর্ড করে ফেলল?

সেটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই প্রবল। কিন্তু নিশ্চিত হতে হলে তো পুরোনো রেকর্ডটা জানতে হবে। একই রকম জরুরি, এই সিরিজের দর্শকসংখ্যাটাও জানা। সেন্ট ভিনসেন্টের পাঁচ দিন আর গ্রেনাডার তিন দিন মিলিয়ে সংখ্যাটা হাজার-বারো শর বেশি হবে কি না সন্দেহ! কিন্তু এটা তো অনুমান, নিশ্চিত হওয়ার উপায় কী? কেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের কাছে জানতে চাইলেই তো হয়।

তা হলেই হয়েছে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটের আজ যে দুরবস্থা, সেটির কারণ আপনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকাণ্ড দেখলেই পেয়ে যাবেন। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট যেন পুরো ক্রিকেট বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। বিশ্ব ক্রিকেটে প্রথা হয়ে যাওয়া সব নিয়মকানুনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মধ্যযুগে পড়ে থাকবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। নইলে এই সিরিজের দর্শকসংখ্যা জানতে চেয়ে এমন হতভম্ব করে দেওয়া অদ্ভুত জবাব পাব কেন?

আরেকটি উইকেট নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়া মাহমুদউল্লাহকে জড়িয়ে ধরেছেন অধিনায়ক সাকিব। এই দৃশ্য দেখতে গ্রেনাডার গ্যালারিতে কয়েক শ দর্শকও ছিলেন কি না সন্দেহ! ছবি: গেটি ইমেজেসবিশ্বের বেশির ভাগ দেশে ম্যাচ চলাকালেই প্রেসবক্সে এসে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হয় দর্শকসংখ্যা। উপমহাদেশে হয়তো ম্যাচের সময়ই তা জানা যায় না, তবে কয়েক দিনের মধ্যে তো অবশ্যই। অথচ কাল সকালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বোর্ডের মিডিয়া অ্যাক্রিডিটেশনের দায়িত্বে থাকা ভদ্রমহিলা ব্রেন্ডা লির কাছে এই সিরিজের দর্শকসংখ্যা জানতে চাওয়ায় কার সঙ্গে যেন ফোনে কথা বলার পর তিনি জানালেন, 'এটা বলা যাবে না। টিকিট বিক্রি গোপন রাখা ডব্লিউআইসিবির অফিশিয়াল পলিসি।'

শুনে হতভম্ব হয়ে পড়ার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা সামলে হেসে বললাম, 'ঠিকই আছে। এটাই তো হওয়া উচিত। দর্শকসংখ্যার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যাপার জড়িত, এটা গোপন না রাখলে কী হয়।' ভদ্রমহিলা মানুষ ভালো। নইলে এখানে আসার পর থেকে প্রেসবক্সে নানা অব্যবস্থা নিয়ে তাঁর সঙ্গে যে আচরণ করেছি, তাতে হাসিমুখে কথা বলার কথা নয়। তবে রসিকতা একদমই বোঝেন না। এখানেই যেমন আমি ভুল লিখতে যাচ্ছি ভেবে সংশোধন করে দিলেন, 'না, না, এটা রাষ্ট্রের কোনো ব্যাপার নয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের নিজস্ব পলিসি।'

বাকি ক্রিকেট-বিশ্বে প্রচলিত প্রথাকে পাত্তা না দিয়ে সাংবাদিকদের কাজ যতটা সম্ভব কঠিন করে তোলাটাও মনে হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের আরেক পলিসি। সেন্ট ভিনসেন্টে আর্নস ভেল প্রেসবক্সের দুরবস্থার কথা আপনাদের সবিস্তার জানিয়েছি। গ্রেনাডায়ও খুব বেশি উন্নতি নেই। টেলিভিশন পাওয়া গেছে, তবে স্কোরার নয়। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টের পাঁচ দিনের জন্য যে ইন্টারনেট সেবার দাম ছিল ৪০ ডলার, সেটি এখানে ৯৫ ডলার!

টেস্টের প্রথম দিন সেই ইন্টারনেট আবার 'অলি বারবার ফিরে যায়, বারবার ফিরে আসে' গানের কলি মনে করিয়ে দিল। সেই সেন্ট ভিনসেন্ট থেকে নানা বিষয়ে অবশ্যই যৌক্তিক অভিযোগ করে আসছি, আর অভিযোগ করতে নিজেরই এখন কেমন যেন সংকোচ লাগে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, বুঝে গেছি এখানে এসব বলে টলে লাভ নেই। ইন্টারনেট উধাও হয়ে যাওয়ার পরও আমি তাই চুপচাপই আছি। চুপ থাকার আরেকটা কারণ, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট দল ও এই সিরিজের স্পনসর ডিজিসেলের মিডিয়া ম্যানেজার ইমরান খান পুরো দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

এটা কি ফাজলামো নাকি! এত টাকা দেওয়ার পরও ইন্টারনেট এমন হবে! একটা ম্যাচের জন্য ৯৫ ডলার--এটা তো রাজপথে ডাকাতির মতো। ইমরানের এত উত্তেজনার আসল কারণ, প্রেসবক্সে ইন্টারনেট সেবা বিক্রি করছে ডিজিসেলের ঘোর ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বী কেবল অ্যান্ড ওয়্যারলেস। ইমরানের দাবি, ডিজিসেল সিরিজের স্পনসর বলেই ইন্টারনেটের এমন উচ্চমূল্য নির্ধারণ করেছে ওরা।

২০০১ সালে ক্যারিবিয়ানে ডিজিসেলের আবির্ভাবের আগে এই অঞ্চলে টেলিফোন ব্যবসায় একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল কেবল অ্যান্ড ওয়্যারলেসের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। জ্যামাইকাতে ডিজিসেল ইন্টারনেট ব্যবসাও করে, বাকি সব দ্বীপে শুধুই মোবাইল। কেবল অ্যান্ড ওয়্যারলেসের ব্যবসার ক্ষেত্র অনেক বিস্তৃত। সেটি বোঝাতে তারা নাম নিয়েছে 'LIME'। এল মানে ল্যান্ডলাইন, আই মানে ইন্টারনেট, এম মানে মোবাইল, ই মানে এন্টারটেইনমেন্ট। শেষটা প্রমাণ করতে শুক্রবার রাতে দারুণ জমজমাট 'লাইম' পার্টির আয়োজন করে তারা।

কথায় কথায় কোথায় চলে গেলাম। গ্যালারিতে দর্শকহীনতার মতো প্রেসবক্সেও যে এই সিরিজে একটা রেকর্ড হয়ে গেছে, সেটি আর লেখার জায়গাই নেই। আরেকটি ডায়েরির জন্য তোলা থাক, নাকি!

২০ জুলাই ২০০৯, গ্রেনাডা।