চেয়েছিলাম ইউরো, পেয়েছিলাম উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের কাঙ্ক্ষিত ‘অ্যাক্রিডিটেশন’!

২০০৮ সালে সেবার ইউরো অস্ট্রিয়া-সুইজারল্যান্ডে। শুনেছিলাম, কিছুতেই ইউরো ‘কাভার’ করতে যাওয়ার ‘অ্যাক্রিডিটেশন’ পাওয়া যায় না। বিশেষত, ভারতীয়দের জন্য বন্ধই থাকে উয়েফার জানালা। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ামক সংস্থা, অ-ইউরোপীয়দের দিতে অরাজি সেই ছাড়পত্র। ২০০৪ সালে পর্তুগালে প্রতিযোগিতার আগেও একবার আবেদন নামঞ্জুর। হাল ছাড়িনি। তাই আবারও উয়েফার রেজিস্টার্ড ইমেল-এ ২০০৮-এর জন্য সনির্বন্ধ অনুরোধ।

পর্তুগালে ইউরোর সময় কোনো উত্তরই পাইনি! চার বছর পর কিন্তু চটপট উত্তর। ইউরো হবে না, সাফ লেখা। আলোর ঝলক অবশ্য শেষাংশে। ‘চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল কাভার করতে আগ্রহী? জানাবেন তাহলে’, লিখল উয়েফা-র মিডিয়া বিভাগ।

সঙ্গে সঙ্গেই ফিরতি ইমেল-এ জানতে চাওয়া, আবেদন জানানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে। উত্তরে এল প্রয়োজনীয় লিঙ্ক। নতুন করে নাম নথিভুক্তকরণ উয়েফার মিডিয়া বিভাগে এবং আবেদন, যেতে চাই মস্কো।

ঝামেলা একটু হলেও শেষ পর্যন্ত মস্কোয় ফাইনাল কাভার করার সুযোগটা এসেই গেল

তখনো চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল শেষ হয়নি। চেলসি-লিভারপুল একদিকে, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড-বার্সেলোনা। প্রথম পর্বের শেষে দুটিই অমীমাংসিত। ইংল্যান্ডের একটি দল ফাইনালে থাকবে নিশ্চিত। অন্য দিকে?

বার্সেলোনা পারল না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ফাইনালে নিয়ে গেলেন পল স্কোলস আর অ্যালেক্স ফার্গুসন ম্যাচ শেষেই জানিয়ে দিলেন, মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে ফাইনালে তাঁর দলের প্রথম এগারোয় থাকবেন স্কোলস। বাকি দশজনকে বেছে নেবেন ম্যাচের আগে।

কিন্তু, আমি কি থাকব সেই ম্যাচ মাঠে বসে দেখতে?

ফাইনাল ছিল ২১ মে। আমার ‘কনফর্মেশন’ এল ৭ মে নাগাদ! হাতে সাত-আট দিন মাত্র। কারণ, ফাইনালের সকালে তো আর পৌঁছানো যায় না! দিন চারেক আগে যেতে হবে। পাসপোর্ট নিয়ে সমস্যা নেই, ভিসা পাওয়া যাবে তো? টিকিট, হোটেল? পাগল-পাগল অবস্থা!

বাকি সবই হয়ে গেল, ঝামেলা ভিসা নিয়ে। উয়েফার ‘কনফর্মেশন’-এ পরিষ্কার লেখা, জার্নালিস্টদের ভিসা দিয়ে দিতে হবে তৎক্ষণাৎ। দিন দুয়েক গেল টিকিট পেতে। জানা গেল, কলকাতা থেকে মস্কোর সরাসরি ফ্লাইট নেই, যেতে হবে দিল্লি হয়ে। তা-ই সই। এবার ভিসা। কলকাতার রুশ দূতাবাস-এ যে দিন গেলাম, তার দুদিন পর আমার দিল্লি যাওয়া সকালে, সেখান থেকে রাতের ফ্লাইটে মস্কো। যেহেতু লেখা ছিল, ভিসা পেতে সমস্যা নেই, ভাবিইনি কিছু। গিয়ে জানলাম, কলকাতা থেকে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে!

জানতে চেয়েছিলাম কারণ। দায়িত্বে-থাকা রুশ ভদ্রলোক জানিয়ে দিয়েছিলেন, জার্নালিস্টদের ভিসা দিতে হবে, জানেন। কিন্তু, তাঁর কাছে বা কলকাতা অফিসে এ-ব্যাপারে কোনও লিখিত ‘অর্ডার’ নেই রুশ সরকারের। যা আছে, দিল্লিতে। সুতরাং, আমার নাকি একটাই কাজ তখন – পরের দিনই দিল্লি চলে গিয়ে রুশ দূতাবাস থেকে ভিসা নিয়ে তারপর মস্কো যাওয়া। মাথায় বাজ!

মস্কোয় উয়েফার মিডিয়া ম্যানেজার যিনি ছিলেন, আলা গোনচারোভা, নাম ভুলিনি। ওঁকে টেলিফোনে ধরে ফেলি তখনকার দিনের আইএসডি পিসিও থেকে। সব জানাই। ব্যবস্থা নেবেন, আশ্বাস দিয়েছিলেন। পরের দিন সকালেই কলকাতার রুশ দূতাবাস থেকে ফোন, চলে আসুন, আপনার ভিসা রেডি। ১৬ মে, পাসপোর্টে ছাপ, স্বস্তি!

১৭ মে গভীর রাতে (ইংরেজি মতে ১৮ মে, আড়াইটে নাগাদ) বিমানে উঠে ভাবনা শুরু, কী লিখব, কীভাবে ধরা উচিত। এত ক্লান্ত শেষ কয়েকদিনের ক্রমাগত দৌড়োদৌড়িতে, ভাবার সুযোগ পাইনি যদিও। ঘুম নেমে এসেছিল। বিমানসেবিকারা জাগিয়ে দিলেন সময়মতো। নামার আগে শুনতে পেলাম, বাইরে বৃষ্টি, তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড আর আমার পরণে দিল্লি থেকে যাওয়ার কারণে পাতলা ফুলস্লিভ শার্ট!

চমক অবশ্য আরও বাকি। শেরেমেতিয়েভো বিমানবন্দরে সফল অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেই বিমানজুড়ে উড়ল হাততালির পায়রা! আগে অন্য কোথাও গিয়ে যা শুনিনি-দেখিনি। সঙ্গী হই আমিও সহযাত্রীদের। অজানা দেশে পা-রাখার শুরুটা ভালোই।

কিন্তু বাইরে যে বৃষ্টি এবং আমার কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ, বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর উপায়হীন! তখন আবার বিমান থেকে নেমে ৩০-৪০ গজ হাঁটতেও হত, এখনকার মতো বাস থাকত না। সারিবদ্ধ হাঁটা অর্থহীন, যা-হয়-হবে, আমি সোজা দৌড়েই নিরাপদ আশ্রয়ে, ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে!

বিমানবন্দরে ঢুকেই সামনে বিরাট পোস্টার গাস হিডিঙ্কয়ের। রাশিয়াকে তিনি নিয়ে গিয়েছেন ইউরোর মূলপর্বে। যে দেশকে হারিয়ে, ইংল্যান্ডেরই দুটি ক্লাব আবার ইউরোপে ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের চূড়ান্ত খেলায় মুখোমুখি! চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের পোস্টার অনেক পরে দেখেছিলাম রাস্তায়। ইউরো আর হিডিঙ্কের ছবিতে সয়লাব!

***

উঠেছিলাম লেনিন হোস্টেলে। একে তো হোটেল পাচ্ছিলাম না, তার ওপর রাশিয়ায় গিয়ে লেনিনের নামাঙ্কিত হোস্টেলে কয়েক রাত থাকার লোভ সামলানো দায়। সাংবাদিকতার কিছু অলিখিত নিয়ম থাকে। ভোর-ভোর মস্কো পৌঁছে সকাল-সকাল হোস্টেলে বাক্সপ্যাটরা ফেলে রেখেই তাই রাস্তায়। আগামী পাঁচ দিনের অবশ্য-গন্তব্য লুঝনিকি স্টেডিয়ামটা দেখে আসতে হবে। স্বাগত-ডেস্কে থাকা ইংরেজি জানা ছাত্রের সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ এবং জানাশোনা বাড়িয়ে বাইরে বেরিয়ে এবার আমি অসহায়!

রাস্তার পরিচিতি, পথনির্দেশ, সময়, নাম ইত্যাদি যেগুলো দিয়ে চেনা সম্ভব–সব রুশ ভাষায়। আমার হাতে মস্কোর বিখ্যাত মেট্রো-র ম্যাপ, গুগল থেকে পাওয়া ইংরেজি প্রিন্ট তখন অচল পয়সা। যাকেই শুধোই, হাত নেড়ে কী বলছেন বোঝা কম্মো নয়! পুলিশকে জানাতে গেলেও একই দশা। মেট্রো মাটির নিচেই চলে, এটুকু জানা। কিন্তু স্টেশনটা কোথায়, কী করে জানব? ফুটপাথ দিয়ে বার দুয়েক নিচে নেমে সাবওয়ে পেলাম। এত ফাঁকা, ভয়-ভয়ও লাগল। বিভুঁই, ভাষা জানি না, কাউকে বোঝাতে পারছি না, আবার কি ফিরে যাব হোস্টেলে? একটা জায়গায় অমন নিচে যাওয়ার মুখে দেখি, অনেক যুবক-যুবতী, হাতে বিয়ার এবং সিগারেট, আড্ডায় মগ্ন। একটু দূরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ। সিগারেট ও বিয়ার শেষ করেই দেখলাম দল বেঁধে নিচে নেমে গেল। আমিও অনুসরণ করি। নিচে পৌঁছে দেখি, মেট্রো স্টেশন। পড়ে গিয়েছিলাম, ১৯ রুবলের টিকিট কাটতে হবে। কাউন্টারে রুবল দিয়ে বোঝানোর চেষ্টায় আবারও ব্যর্থ। টিকিট অবশ্য চলে এল হাতে। ঢুকে পড়ি ভেতরে। এবং, আবারও সমস্যা–দুদিকের লাইনে কোন দিকের মেট্রোয় উঠব?

ফাইনালের সাজে লুঝনিকি স্টেডিয়াম

অন্তত কুড়িজনের কাছে জানতে চেয়েও ব্যর্থ এবং মরিয়া, একটায় উঠে পড়ি। হাতে সেই ইংরেজি মেট্রোর ম্যাপ। দু-দিকের স্টেশনের নাম পড়তে পড়তে মুখস্ত। অবশেষে হাসি ফুটল যখন ঘোষণা হল পরের স্টেশনের নাম। সবই রুশ ভাষা হলেও প্রপার নাউন, নামটা শোনামাত্রই মগজে বিদ্যুৎ--আমি তো ঠিক উল্টো দিকের মেট্রোয় উঠেছি। নেমে প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকে এবং এবার আমি ঠিক পথে!

মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে স্টেডিয়াম যাওয়া আরও এক বিপত্তি। যাই হোক, কোনোরকমে পৌঁছনো, বহু পথ হেঁটে। গিয়ে দেখি সদর দরজা বন্ধ। দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে লেনিনের মূর্তি। ছবি তুলে ফেলি। কিন্তু মিডিয়া অফিসটা কোথায়? কাকে বোঝাব? কী করে বোঝাব? এক সাহেব এলেন গাড়ি হাঁকিয়ে। আমার মতোই, দরজার ফাঁক দিয়ে হাত গলিয়ে ছবি তুললেন। দৌড়ে জানতে চাই, ইংরেজি বোঝেন কি না। হেসে ফেললেন, আমিও জলমগ্ন আর্কিমিডিসের মতোই বলে ফেলি ‘ইউরেকা’!

তাঁর গাড়িতে মিডিয়া সেন্টার। হেঁটে পৌঁছতে হলে আমি যেখানে ছিলাম, সেখান থেকে দিনটাই কেটে যেত প্রায়! কিন্তু, পৌঁছলাম, কার্ড পেলাম। জানানো হলো, দু-দিন পরের সন্ধেয় অনুশীলনে আসবে দুটি দল, সরকারি সাংবাদিক সম্মেলন হবে। পরের দিন থেকেই খুলে যাবে প্রেস সেন্টার। তার ফাঁকে ঘুরে দেখে নিতে পারি রেড স্কয়ার। সেখানে আবার মেলা বসেছে উয়েফার, ‘দেখে আসুন, ভাল লাগবে।’ সাহেবকে অবশ্য ছাড়িনি। ওঁর গাড়িতেই আবার মূল ফটকে ফেরত। মেট্রোয় নামের ‘চিহ্ন’গুলো এঁকে রেখেছিলাম, ফেরার পথ সেগুলো দেখে মিলিয়ে চলতে চলতে, মোটামুটি নির্বিঘ্নে ঘরে ফেরত।

লিখতে বসে আবারও সমস্যা! আমার ল্যাপটপের থ্রি-পিন প্লাগ ইউরোপে নাকি অচল সাত-আট বছর আগে থেকেই! লিখব কী করে? হোস্টেলের ডেস্কটপে বাংলা সফটওয়্যার কাউকে না জানিয়েই ইনস্টল করে ফেলি নিজের মনে করে। মাঠে অবশ্য কনভার্টার পাওয়া গিয়েছিল পরদিন থেকেই।

কিন্তু প্রথম রাশিয়া সফর আমার অভিজ্ঞতায় সমস্যাসঙ্কুল। প্রতি পদে হোঁচট। রাত আটটাতেও সূর্য জ্বলজ্বল করছে। আমাদের আবার সূয্যি না ডুবলে লিখতে বসার অভ্যেস নেই। প্রথম দিন তো আকাশ দেখতে দেখতে ডেডলাইনই মিস করে ফেলি প্রায়!

ভাস্কর্যে অমর লেভ ইয়াসিন

সকালে রাস্তায় ইংরেজি কাগজ খুঁজে পেলাম না। লেভ ইয়াসিনের বাড়ি খুঁজতে গিয়ে আরও একদফা। পৌঁছে গিয়েছিলাম ডায়নামো মস্কো ক্লাবে। অনুশীলন চলছিল, গ্যালারিতে বিনাবাধায় প্রবেশ। মাঠেও ঢুকে পড়লাম। দু-তিনজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এমনভাবে তাকালেন, আমি ভিনগ্রহের, বুঝতে একটুও অসুবিধে হযনি। ক্লাবের দুই রিসেপশনিস্ট ভদ্রমহিলাকে বহু চেষ্টায়ও বোঝাতে পারিনি, আমি লেভ ইয়াসিনের বাড়ির ঠিকানা চাই! তাঁরা একটাই উপকার করেছিলেন। কিংবদন্তি ইয়াসিনের মূর্তির সামনে আমার ছবি তুলে দিয়ে। আকারে-ইঙ্গিতে সেটা বোঝানো গিয়েছিল, তার বেশি কিছুই নয়। আমিও বাধ্য হয়েই ইংরেজি ছেড়ে মাতৃভাষায় ফিরে এসেছি। রাস্তায় যাঁর সঙ্গেই কথা বলি, নিপাট বাংলায়। ওঁদের কাছে ইংরেজি আর বাংলার কোনও তফাত নেই। দুটোই বুঝবেন না যখন, আমি কেন আমার জিভকে কষ্ট দেব?

***

পাঁচতলায় প্রেসবক্স, লাগোয়া প্রেস সেন্টার। সেটাও আবার দুটো তলা জুড়ে। অন্তত হাজার দুয়েক প্রতিনিধি কাজ করছেন। হইহই কাণ্ড। বিশ্বকাপে হয়, চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনাল ঘিরেও এমন উত্তেজনা? ততক্ষণে কাজ করা সহজ। ইংরেজরা চলে এসেছেন। সাংবাদিকরা যেমন, দর্শকেরা, ভক্তরা। রেড স্কোয়ার দখল করে ফেলেছে লাল আর নীল পতাকা। হেঁড়ে গলার চিৎকার-চেঁচামেচি-চুম্বন। বিয়ার-ভোদকার ফোয়ারা। আমার সান্ত্বনা, যে-ভাষায় কথা, বুঝতে পারছি, বলতেও পারছি। ফুটবলারদের তো পাব না, ভক্তরাই সই। দেদার আড্ডা ওঁদের সঙ্গেই। পল নিউবার্ট বলে এক তুমুল ম্যানচেস্টার ভক্ত-র সঙ্গে আলাপ। বয়স সাতান্ন। ম্যানচেস্টারেই থাকেন, বাড়ি তৈরির কাজ করেন। তাঁর শখ? ইংলিশ ক্লাব চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে উঠলেই ছুটে যান মাঠে। সে বারই প্রথম দুটি ক্লাবই ইংল্যান্ডের। যিনি ১৯৬৮ সালে বুসবি বেবস-এর স্বপ্ন পূরণ হতে দেখে আনন্দের মাঝেও কেঁদেছিলেন তাঁর নায়ক ডেনিস ল খেলতে পারেননি বলে, এমন ফাইনাল থেকে দূরে থাকবেন কী করে? ইস্তাম্বুলের গল্প নতুন করে শোনাচ্ছিলেন। তিন গোলে পিছিয়ে স্টিভি জেরার্ডের রূপকথা। কিংবা ১৯৯৯, কাম্প ন্যু, বার্সেলোনায় অতিরিক্ত সময় তাঁর প্রিয় ক্লাবের দু-গোল। নিজেকে ইউনাইটেডের অন্ধ ভক্ত বলেও নিউবার্টের ফুটবল-মন স্বীকার করে ফেলে, ইস্তাম্বুলে এসি মিলানের বিরুদ্ধে লিভারপুলের সেই জয়ের ধারেকাছে ছিল না বায়ার্ন মিউনিখকে হারিয়ে তাঁর ক্লাবের জয়ও। জিতে যায় ফুটবল, ক্লাব-জার্সির সীমানা পেরিয়ে!

ফাইনাল শুরুর আগে লুঝনিকি স্টেডিয়ামে

বুসবি-বেবস অবশ্য বারবার আলোচনায় তখন। মিউনিখে সেই মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার সেবার ৫০ বছর। ফার্গুসন তো তাঁর দলকে সাজঘরে অবিকল কলকাতার পিকে ব্যানার্জির মতোই ভোকাল টনিকে উদ্দীপ্ত করেছিলেন, বুসবি বেবস-এর জন্য ট্রফিটা দাও ইউনাইটেড ভক্তদের, আবেদন রেখে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ওয়েন রুনি, রায়ান গিগসরা কেঁদে ফেলেছিলেন সেই ছবি দেখে। ফার্গুসন আবার কথা বলার জন্য নিয়ে এসেছিলেন ববি চার্লটনকেও, বুসবি বেবস-এর অন্যতম যিনি।

প্রেস সেন্টারের বাইরে বেরিয়ে এসে ধূমপান, ভেতরে যথারীতি নিয়ম নেই। তাই পাঁচতলা নেমে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরিয়েছি সবে, একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। দরজা খুলে বেরলেন কিনা স্যর অ্যালেক্স ফার্গুসন! কী-করি কী-বলি ভাবতে ভাবতেই একেবারে কাছে। কেউ নেই ক্যামেরাটা যাঁর হাতে দিয়ে ছবি তোলার অনুরোধ করতে পারি। সেলফির সময় তখনও আসেনি। আমার সাধারণ মোবাইল, সেই ১৩ বছর আগে। সঙ্গে সোনির ছোট একটা ডিজিটাল ক্যামেরা। নিজেই উলটো দিকে ঘুরিয়ে আন্দাজে শাটার টিপে ফেলি। জীবনে প্রথম সেলফি-র ইতিহাস আমার! কলকাতায় ফেরার পর এই ছবি দেখে প্রাক্তন ফূটবলার সুভাষ ভৌমিক বলেছিলেন, 'স্যর অ্যালেক্স তোমায় সিগারেট ধরিয়ে দিচ্ছিলেন, করেছটা কী!'

উল্টো দিকের শিবিরে আবার প্রথম ইউরোপীয় ট্রফি জয়ের চাহিদা। মরিনিও চলে গিয়েছেন তত দিনে, মালিক আব্রামোভিচের ইউরোপ জয়ের স্বপ্ন সফল করতে না-পেরে। এসেছিলেন আভরাম গ্রান্ট এবং প্রথম বছরেই চেলসি ফাইনালে! ইংল্যান্ডের কাগজে লেখা হয়েছিল লিভারপুলের বিরুদ্ধে সেই সেমিফাইনালের দ্বিতীয় পর্বের আগে–আব্রামোভিচ নাকি রাশিয়ায় নিয়ে যেতে বদ্ধপরিকর দলের সবাইকে। জিতলে মস্কো, হারলে সাইবেরিয়া! দিদিয়ের দ্রগবা, ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ড, জন টেরি, মাইকেল বালাকরা বাড়তি উদ্দীপ্ত, মালিকের দেশে মালিকের স্বপ্নপূরণে। ম্যাকেলেলে আর এসিয়েনের কড়া শাসনে চেলসি মাঝমাঠ, বিপক্ষে স্কোলস আর ক্যারিকের কাঁধে ইউনাইটেডকে ম্যাচে ভাসিয়ে রাখার দায়িত্ব।

ফার্গুসন-ফার্দিনান্দের কথা শুনে তাঁদের অনুশীলন দেখতে গ্যালারিতে, পরে ল্যাম্পার্ড-টেরির ক্ষেত্রেও একই। যদিও সেই পনেরো মিনিটে ওঁরা প্রায় কিছুই দেখান না কখনও, গা-গরম চলতে থাকে, ইউরোপের অন্যতম সেরা দুটি ক্লাবের সেই অনুশীলন দেখার মুহূর্তগুলোও ভোলা যায় না। সাংবাদিক সম্মেলনের ঘরটায় চ্যাম্পিয়নস লিগের সেই বিরাট ট্রফিটা। কাছে যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেও উপায় নেই। সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন এক মুশকো চেহারার ভদ্রলোক। আগেই জনাদুয়েক ট্রফির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করতেই যেভাবে ধমকে ছিলেন, সরে আসি সভয়! সামনের দিকে আসনগুলোও ইউরোপীয়দের। একেবারে পেছনের সারিতে গিয়ে বসার সুযোগ পাই, অ্যাক্রিডিটেশন পাওয়া ১৭৮০ সাংবাদিকের একমাত্র ভারতীয়!

ফাইনাল শেষে...

প্রবল বৃষ্টি আর শূন্যের নিচে তাপমাত্রার সেই প্রথম অল-ইংল্যান্ড ফাইনাল। পরে লিভারপুল-টটেনহামের পর আজ রাতে তৃতীয়বারে আবারও চেলসি আছে, সামনে ম্যানচেস্টারও, তবে নীলরঙা সিটি। ২০০৮-এর সেই ফাইনালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো প্রথমে এগিয়ে দিয়েছিলেন ইউনাইটেডকে, ল্যাম্পার্ডের গোলে সমতা। আর গোল হয়নি। অতিরিক্ত সময়ে ভিডিচের গালে চড় মেরে দ্রগবার লাল কার্ড। হয়ত ম্যাচের ভাগ্য স্থির হয়ে গিয়েছিল তখনই।

টাইব্রেকারে নাটক চরমে। পেনাল্টি-নষ্ট করে রোনালদো লুঝনিকির ঘাসে সেই যে মুখ লুকিয়ে শুয়ে পড়েছিলেন, ওঠেননি খেলা শেষ হওয়ার আগে পর্যন্ত। দ্রগবা ছিলেন টাইব্রেকারেও চেলসির অন্যতম ভরসা। কিন্তু, তিনি বেরিয়ে যাওয়ায় চরম অনিচ্ছাসত্ত্বেও টেরিকে নিতে যেতে হয়েছিল পঞ্চম শট। অবস্থা এমন, টেরি গোল করলেই ট্রফি চেলসির। কিন্তু পা পিছলে গেল টেরির, চেলসিরও। ইতিহাস সৃষ্টির মুহূর্তে যে-নেতার পা পিছলে যায়, ট্রফি কী করেই বা উঠবে তাঁর হাতে? তাই নিকোলাস আনেলকার শট বাঁচিয়ে নায়ক ফন ডার সার, ফার্গুসনের দ্বিতীয় এবং শেষ ট্রফি ইউরোপে। গ্যালারি থেকে অঝোর ধারায় ভিজতে ভিজতে নেমে এসেছিলেন ববি চার্লটন, কোট-টাই পরিহিত। তাঁর ঠিক পেছনেই রোনালদোরা একে-একে, ট্রফি হাতে নিয়ে উৎসবে মেতে উঠতে। আয়োজকেরা নানা রঙের বেলুন ছেড়েছিলেন মাঠে, সেই বৃষ্টির মধ্যেই। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আমাদের ডানদিকে চেলসি-গ্যালারি তখন জনমানবহীন, বাঁদিকে লালে-লাল ইউনাইটেড সমর্থকেরা গান গেয়েই চলেছেন ভিজতে ভিজতে!

চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালে লুঝনিকির প্রেসবক্সে লেখক

ব্যক্তিগত গল্প আরও একটা, শেষেও। সেই ফাইনালের রাতে আমার হোস্টেলে জায়গা ছিল না। ব্যাগপত্তর রেখে চলে এসেছিলাম, পরের দিন আবার গিয়ে উঠব বলে। প্রিভিউ লিখতে গিয়ে বারবারই মনে হয়েছিল, ম্যাচ টাইব্রেকারে যাওয়ার সম্ভাবনা, লিখেও ছিলাম। রাত দশটা পঁয়তাল্লিশে খেলা, টাইব্রেকার হলে অর্ধেক রাত কাবার। ম্যাচ শেষে সরকারি সাংবাদিক সম্মেলনে ফার্গুসন-গ্রান্টদের কথা শুনে লিখতে বসে গিয়েছিলাম ওখানেই। লেখা হয়ে যাওয়ার পর রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়ি মেট্রো স্টেশনের উদ্দেশে, জেনেই যে, ভোর ছ’টার আগে গেট খুলবে না। কিন্তু সেই ঘণ্টা দুয়েক ইউনাইটেড সমর্থকদের যে উদ্দাম-উল্লাস দেখেছিলাম মেট্রো স্টেশনে, সেই ভোররাতে–মনের মণিকোঠায় থেকে গিয়েছে চিরকালীন হয়ে। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষে ওই একই লুঝনিকি স্টেডিয়ামের প্রেস কনফারেন্স-এর ঘরে পল পগবার বারবার তিনবার হানা এবং কোচ দিদিয়ের দেশমকে বারবার ভিজিয়ে দিয়ে প্রেস কনফারেন্স ভণ্ডুল করে দেওয়া এবং প্রতিবারই হেসে ক্ষমা চাওয়ার সেই ভঙ্গির সঙ্গেই যা তুলনীয়! বিশ্বকাপজয়ী কোচের সাংবাদিক সম্মেলন যদি ঘণ্টাখানেক পিছিয়ে না-যায়, অন্য কোন সাফল্যের পর হবে আর তেমন!

বারবারই মনে হয় এখন, আমরা এই উপমহাদেশে ফুটবলের উৎসবও ওভাবে প্রাণ খুলে করতে পারি না বলেই হয়তো আমাদের ফুটবলে প্রাণের এত অভাব!