আমাকে চেলসির বোর্ডে নিয়ে নেওয়া হোক। প্রতি মৌসুমে চেলসি চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলবে। 

না, না, চেলসিতে কোনো রাজনৈতিক নির্বাচন হচ্ছে না। নির্বাচনী ইশতেহারও এ নয়। কিন্তু ঘোষণাটাও একেবারে অমূলক মোটেও নয়! 

চেলসিকে প্রতি মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে তোলার 'নিঞ্জা টেকনিক' তো হাতের কাছেই আছে। কামরুপ-কামাক্ষায় গিয়ে তন্ত্র-মন্ত্র সাধনা করে পাওয়া নয়, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বের করা অব্যর্থ কৌশল।

কৌশলটা একেবারে সহজ! দল কেমন করছে সেটা দেখতে হবে না, খারাপ করলে তো কথাই নেই, ভালো করলেও বুকে পাথর বেঁধে শুধু মৌসুমের মাঝপথে ঘ্যাচাং করে কোচকে চাকরি থেকে ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। 

এত সহজ একটা ফর্মুলা কেন যে চেলসি কর্মকর্তাদের মাথায় ধরে না! 

হেঁয়ালি মনে হচ্ছে? তথ্য-প্রমাণ না দিলে তা মনে হওয়া দোষের নয়। আচ্ছা, তথ্য-প্রমাণ দেওয়াই যাক। ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে নামছে চেলসি। চ্যাম্পিয়নস লিগের ইতিহাসে ক্লাবটার তৃতীয় ফাইনাল। এবার মৌসুমের মাঝপথে ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডকে ছাঁটাই করে টমাস টুখেলকে নিয়ে এসেছে চেলসি। 

 দুই দলের মধ্যকার সর্বশেষ দুই ম্যাচে জয় কি আজকের ফাইনালে এগিয়ে রাখবে চেলসিকে? ছবি: চেলসি

আর আগের দুবার? ২০১২ সালে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতার মৌসুমের মাঝপথে পর্তুগালের তরুণ কোচ আন্দ্রে ভিয়াস-বোয়াসকে বরখাস্ত করে চেলসি দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল রবার্তো দি মাত্তেওকে। ইতালিয়ান কোচের অধীনে চেলসি যে ফুটবল খেলে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে, শিরোপা বাদ দিয়ে শুধু ফুটবলের ধরন নিয়ে চলচ্চিত্র হলে 'হরর ফিল্ম' হয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু শিরোপার পথে চেলসির কীর্তিগুলো দেখুন। একেবারে গোবরে পদ্মফুল! ওই কৌশলের ফুটবলেই নাপোলির বিপক্ষে প্রথম লেগে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা চেলসি (ওই হারের পরই চাকরি হারান ভিয়াস-বোয়াস) দ্বিতীয় লেগে ৪-১ গোলে জিতে ওঠে কোয়ার্টার ফাইনালে। সেমিফাইনালে হারায় সে সময়ে ইউরোপ মাতানো পেপ গার্দিওলার বার্সাকে। ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে ৮৮ মিনিটে সমতা ফেরানোর পর টাইব্রেকারে জিতেই গেল! 

এর আগের ফাইনালটাও টাইব্রেকারে গিয়েছিল। ২০০৭-০৮ মৌসুম, চেলসির ইতিহাসের প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতা, টাইব্রেকারে ওদিকে রোনালদো ব্যর্থ হলেন, এদিকে পা পিছলে পড়ে গেলেন চেলসি অধিনায়ক জন টেরি। হয়তো 'রোনালদোও পেনাল্টিতে ব্যর্থ হন' তথ্যটা তখনো চাক্ষুষ হতে দেখার ধাক্কা কাটেনি তাঁর। যা-ই হোক, শট নিতে গিয়ে তিনি পিছলে পড়ায় ধাক্কা লাগে চেলসির গায়ে। টাইব্রেকারে ৬-৫ ব্যবধানে হেরে গেল চেলসি। সেবার মৌসুমের মাঝপথে ক্লাবের মালিকপক্ষের সঙ্গে মতদ্বৈধতায় জোসে মরিনিও ক্লাব ছেড়েছিলেন, দায়িত্ব নিয়েছিলেন আভরাম গ্রান্ট। 

দেখলেন তো, শুধু কোচ বদলেই কীভাবে সাফল্য এনে দেওয়া যায়! শুধু আমাকে মোটা মাইনে দিয়ে দায়িত্বটা দিয়ে দিলেই হবে। চেলসির কর্তাব্যক্তিদের কেউ কি লেখাটা পড়ছেন?

২০১২ সালে চেলসির চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ে মিশে ছিল মহা নাটকীয়তা। দিদিয়ের দ্রগবাও ছিলেন যেটির কুশীলব ম্যানচেস্টার সিটির ক্ষেত্রে এভাবে বলে-টলে লাভ হবে না সম্ভবত। তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো ধারা বের করা যাচ্ছে না। একক ঘটনার ক্ষেত্রে আবার ধারা কিসের! এত বছরের সাধনার আর কোটি কোটি পাউন্ড খরচের পর এবারই প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠতে পারল সিটি। যাক, এখন অন্তত নিজেদের ইউরোপের কূলীনদের কাতারে ভাবতে পারে আবুধাবির তেলে ধন্য ক্লাবটা। 

দুটি ক্লাবেরই এখানে কত মিল! শুধু মালিকানায় ভিন্নতা, পথ-পাথেয় প্রায় একই। রুশ ধনকুবের রোমান আব্রামোভিচ ২০০৩ সালে চেলসির মালিকানা নেওয়ার পর দলটাকে ইংল্যান্ড-ইউরোপে সেরা বানানোর নেশায় ছুটেছেন। পাউন্ডের বান বললে কম হবে, সুনামি বইয়ে দিয়েছেন খেলোয়াড় কেনায়। নামীদামি সব কোচ এনেছেন, কিন্তু কারও ব্যাপারেই তাঁর ধৈর্য কুলায়নি। একটু এদিক-ওদিক হয়েছে, তো কোচ বরখাস্ত। সে কোচের নাম আনচেলত্তিই হোক বা জোসে মরিনিও কিংবা লুই ফেলিপে স্কলারি। শিশুর খেলনা পছন্দ না হলে সেটি ছুড়ে ফেলার মতো। শিশুর খেলনা ফেলে দেওয়ায় নতুন খেলনায় মজে যাওয়ার ইচ্ছা থাকে, আব্রামোভিচের কোচ ছুঁড়ে ফেলায় ছিল শুধু দলকে আরও সফল হতে দেখার বাসনা। প্রক্রিয়াটা নিষ্ঠুর, কিন্তু সফল যে নয়, এমন দাবি কে করবে?

সিটির মালিক শেখ নাহিয়ানের আবার ধৈর্যের কমতি নেই। তারা এখানে এসেছে অনেক ধীরেসুস্থে পরিকল্পনা করে। আর যখনই দরকার হয়েছে, ট্যাঁক থেকে পয়সা বের করতে কার্পণ্য সিটি কখনোই করেনি। বরং এদিকটাতে চেলসির আব্রামোভিচের চেয়েও বেশি দিলদরিয়া শেখ নাহিয়ান। পেট্রো-ডলারে ভাসছেন, নাহিয়ানের দিলদরিয়া হতে সমস্যা কী! 

কিন্তু এর পেছনে পরিকল্পনার ছাপও আছে। পেপ গার্দিওলাকে আনার চেষ্টায় সফল সিটি ২০১৬ সালে হয়েছে, কিন্তু চেষ্টা তো করে গেছে আরও তিন-চার বছর আগ থেকে। গার্দিওলা যখন বায়ার্নে, তখন তাঁর সিটিতে ঢোকার পথে লাল গালিচা বিছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা এঁটেছে সিটি। গার্দিওলা বার্সেলোনায় যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছেন, সেই ক্রীড়া পরিচালক জিকি বেগিরিস্তেইনকে এনেছে, তার আগে বার্সেলোনার সাবেক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ফেরান সোরিয়ানোকে এনেছে প্রধান নির্বাহী করে। গার্দিওলা এলেন এরপর। মাঝে পাঁচ বছরে লিগে সিটির দোর্দন্ড দাপট একেবারে পাথরে খোদাই করে লেখা হলো, কিন্তু চ্যাম্পিয়নস লিগে সিটির ইচ্ছাপূরণ হচ্ছিল না। বারবার কোয়ার্টার ফাইনালে কিংবা তারও আগে বাদ পড়ছিল। একটা পর্যায়ে তো মনে হচ্ছিল, সিটির বুঝি এত করেও বেকার খাটনিই হলো! এর চেয়ে মানুয়েল পেলেগ্রিনিই ভালো ছিলেন, গার্দিওলা আসার আগের মৌসুমে তিনি অন্তত সিটিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে তুলেছিলেন। গার্দিওলা তা-ও পারেননি। মানে, এতদিন পারেননি। 

ধুর, পুরোনো কাসুন্দি! এমন মনে হচ্ছে? আচ্ছা, তাহলে ওসব কথা থাক! কথা হোক আজকের ফাইনাল নিয়ে। কে জিতবে আজ?

পেপ গার্দিওলা আছেন বলে সিটির দিকে বারবার চোখ যায়।  চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে কী লাগে, সেটা তাঁর জানা। দুবার জিতেছেন! হ্যাঁ, সেই দুবার বার্সেলোনার হয়ে কোচিং ক্যারিয়ারের প্রথম তিন বছরেই এসেছে বটে। এরপর বায়ার্ন মিউনিখে তিনবার সেমিফাইনালে বাদ পড়েছেন--মজার ব্যাপার, তিনবারই তাঁর নিজের দেশ স্পেনের তিন ক্লাবের কাছে। সিটিতে এসে তো এতদিন কোয়ার্টার ফাইনাল পার হতে পারছিলেন না। সে হিসেবে তাঁর 'চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল জেতার জ্ঞান' --এ মরিচা ধরেছে কি না, সে প্রশ্ন উঠতে পারে। 

সে ক্ষেত্রে টুখেলকে নিয়ে কী প্রশ্ন করবেন? তাঁর তো এখনো চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাই হয়নি! হ্যাঁ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে দলকে তুলতে কী করতে হয়, সে ব্যাপারে তাঁর জ্ঞান একেবারে টনটনে! গত মৌসুমে পিএসজির পর এই মৌসুমে চেলসি...চ্যাম্পিয়নস লিগ ইতিহাসে ভিন্ন দুই দলকে নিয়ে টানা দুই ফাইনালে ওঠা প্রথম কোচ এবার নিজের ক্যারিয়ারের এই অপ্রাপ্তিটা ঘোচাতে পারবেন? 

গত পাঁচ-ছয় সপ্তাহের হিসাব বলে, পারবেন! সিটি আর চেলসি এবারের চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে উঠেছে, এটা নিশ্চিত হওয়ার পর এফএ কাপের সেমিফাইনাল আর লিগে দুই দলের দেখা হয়েছে একবার করে। একই দেশের দল হলে যা হয় আর কী! সাধারণত ভিন্ন দেশের দল ফাইনালে উঠলে সেখানে একটা দলের জন্য প্রতিপক্ষকে ঘিরে অপরিচিত একটা ঘ্রাণ থাকে, ফাইনালের আগে দুই দলের দেখা হওয়ার তো কোনো সম্ভাবনাই থাকে না। কিন্তু চেলসি-সিটির এবার ফাইনালের ড্রেস রিহার্সালের সুযোগ পেল, তা-ও দুবার। দুবারই ড্রেসটা চেলসিরই গায়ে বেশি মানিয়েছে। এফএ কাপের সেমিফাইনালে চেলসি জিতেছে ১-০ গোলে, এরপর লিগের ম্যাচটাতে পিছিয়ে পড়েও জয় ২-১ গোলে। 

তাহলে আজ চেলসিই জিতছে? আহা, এত সহজে যদি বলা যেত! 

চেলসির মিডফিল্ডার কান্তে আর গোলকিপার মেন্দি খেলতে পারবেন কি না, সেটার ওপর নির্ভর করবে চেলসি কেমন খেলতে পারবে। এমনিতেই গার্দিওলার দল এলাকার মাস্তানের মতো এসে মাঝমাঠে 'দাদাগিরি' ফলাতে চায়, চেলসির বিপক্ষে দুই 'ড্রেস রিহার্সেলে'ও তা-ই দেখা গেছে, কিন্তু কান্তে না থাকলে চেলসি সেই দাদাগিরির সঙ্গে আজ পেরে ওঠার কথা নয়।

 সমর্থকদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে ম্যানচেস্টার সিটি? ছবি: ম্যানচেস্টার সিটির ওয়েবসাইটসিটির ডি ব্রুইনা আছেন, এই মৌসুমের গার্দিওলার 'নতুন মেসি' হয়ে ওঠা ফিল ফোডেন আছেন, রিয়াদ মাহরেজ-বের্নার্দো সিলভারা আছেন। তাঁরা দাপট নিয়ে খেলবেন, বলের দখল সিটির বেশি থাকবে, এটা বোধ হয় চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায়। গত ছয় সপ্তাহে দুবার সিটিকে হারানোর পথে চেলসি কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে গোল করেছে, সেটার জন্য চেলসির ভের্নার, হাভার্টজ, জিয়েশ, মাউন্টরা ঠিকই আছেন। কিন্তু কাউন্টার অ্যাটাকে ওঠার আগে সিটির অ্যাটাক তো সামলাতে হবে, সেটি সামলানোর জন্য মাঝমাঠে কান্তে না থাকলে চেলসি ভালো ঝামেলায়ই পড়বে। আর গোলপোস্টে মেন্দি না থাকার প্রভাব? সে ক্ষেত্রে চেলসির গোলপোস্টে থাকবেন ইতিহাসের সবচেয়ে দামি গোলকিপার কেপা আরিসাবালাহা, আর তিনি খেললে চেলসির সমর্থকেরাই সম্ভবত নিজেদের দলকে দশজনের ধরে নিয়ে খেলা দেখতে নামেন। 

কিন্তু খেলাটা তো ফুটবল! ম্যাচের আগের এসব হিসাব আসলে অর্থহীন। মস্তিষ্কের ভালো ব্যায়াম হয় এতে, ম্যাচের কিচ্ছু আসে-যায় না। নিরাসক্ত সন্ন্যাসীর মন্তব্যের মতো শোনাবে, কিন্তু সত্যি কথাটা হলো, ম্যাচে কী হবে, সেটা ৯০ মিনিটে দুই দল কী করতে পারে না, তা-ই ঠিক করবে। আসলে ৯০ মিনিটও লাগে না , দেখা গেল এক দল পুরো ম্যাচ ভালো খেলল, কিন্তু একটা ভুল করল, সেটাই ম্যাচে পার্থক্য গড়ে দিল! ভবিষ্যদ্বাণী করা তাই বেজায় ঝামেলা! 

তবে একটা ভবিষ্যদ্বাণী একেবারে নির্ভুল হবে বলে দেওয়াই যায়।  রাশিফল লেখায় আমার অভিজ্ঞতা নেই, হাত দেখার বিদ্যা আমার জানা নেই, ঝাঁড়ফুক-তুকতাকে আমার বিশ্বাস আসে না...তবু আমার কথাটাকেই চোখ বন্ধ করে ভবিতব্য হিসেবে ধরে নিন...

পোর্তোয় আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ইংল্যান্ডের একটা দলই জিতবে। এর আগে একই দেশের দুই ক্লাবকে লড়তে দেখা ৭টি চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালেও সে দেশেরই ক্লাবই জিতেছে। এর অন্যথা হওয়ার উপায় নেই। 

মানে, উপরের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হবে যদি কোনো কারণে ম্যাচটা বাতিল না হয়ে যায় আর কী! নাহ, একটা নির্ভুল ভবিষ্যদ্বাণী করতে গিয়েও শান্তি নেই!

আরও পড়ুন:
মহারণের টুকিটাকি
চেলসির চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়: কে লিখেছেন এই চিত্রনাট্য!