ওয়াসিম আকরাম হ্যাটট্রিকটা করলেন আর আমার প্রায় মরে যেতে ইচ্ছে হলো!

পর পর দুই উইকেট নেওয়ার পরই ভয়টা শুরু। শ্রীলঙ্কার পরের ব্যাটসম্যান যখন নামছেন, তখন দুরুদুরু বুকে আমি প্রায় দোয়া-দরুদ পড়ছি। দেখা গেল তরুণ মাহেলা জয়াবর্ধনে। তখন একেবারেই নবীন, নার্ভ হারানোই স্বাভাবিক, তবু প্রতিভার কথা যতটুকু শুনেছি তাতে ভরসা হলো যে, এই বলটা ঠেকিয়ে দেবেন। এরপর যত ইচ্ছা আউট হন, যেভাবে ইচ্ছা। আমার দরকার শুধু এই বলে ওর বেঁচে যাওয়া। বাঁচলেন না। হ্যাটট্রিক হয়ে গেল। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে তৃতীয় বোলার হিসেবে দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। কিন্তু সেটা ছাপিয়ে তিনি অনন্য হয়ে যাচ্ছেন এই জায়গায়, মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে, পর পর দুই টেস্টে হ্যাটট্রিক। তা-ও কী, এই টেস্টে প্রথম ইনিংসেই হ্যাটট্রিক করতে বসেছিলেন। আতাপাত্তু কোনোভাবে বাঁচিয়েছেন।

আকরামকে অভিনন্দন জানাতে মানুষজন ছুটছে। টিভি নেই তখন। সংবাদ সম্মেলন হয় গ্যালারির সামনে একটা চেয়ার পেতে। খেলোয়াড়টি বসেন তাতে, আমরা সাংবাদিকরা ধাক্কাধাক্কি করে দাঁড়াই। তাড়াতাড়ি যাওয়ার তাড়া সামনে দাঁড়ানোর জন্য, যাতে প্রশ্ন করা যায় এবং উত্তরগুলো স্পষ্ট শোনা যায়। অন্যদিন এই ধাক্কাধাক্কিতে আমারও সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকে। আজ আর ইচ্ছে করে না। এখন যা বলবেন আকরাম সেগুলো বরং আমার গায়ে কাঁটা হয়ে বিঁধবে। ততক্ষণে স্টার টিভিতে ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার শুরু হয়ে গেছে। আকরাম শুরুতেই বললেন, ‘ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, এই দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক নিয়ে আজও একজনের সঙ্গে আমার কথা হচ্ছিল...’

আরে! আমার কথা বলছে। একটু যেন ভার কমে গেল। আকরাম বিষয়টা আলাদাভাবে উল্লেখ করা দুঃখবোধে প্রলেপ দিল বটে, কিন্তু তাহলেও তো আমার সমস্যার পুরো সমাধান হচ্ছে না। আমার ইন্টারভিউটার কী হবে!

সেই ইন্টারভিউ! সেই চেন্নাইতে শুরু হয়েছিল, এরপর দিল্লি-কলকাতা হয়ে ঢাকা। সেখানেও প্রায় ফসকে গেছে মনে হচ্ছিল যখন, তখনই সেদিন ম্যাচ চলার সময়ই ড্রেসিংরুমের সামনে সময় দিলেন আকরাম। খেলা চলছে, এর মধ্যেই সাক্ষাৎকার। এখনকার সময়ে অবিশ্বাস্য, তখনকার সময়েও বিরল। কিন্তু এ ছাড়া তাঁর সময় হচ্ছিল না। আর আমিও কোনোভাবে পিছু ছাড়ছিলাম না। শেষে বোধ হয় আকরামেরও মনে হলো, এ যখন ছাড়বে না তখন দিয়েই দিই সাক্ষাৎকারটা, যন্ত্রণা শেষ হোক।

যন্ত্রণা শেষ হলো আমারও। প্রবল তৃপ্তিতে রেকর্ডটা বারবার বাজিয়ে শুনলাম। সঙ্গী সাংবাদিকদের কেউ এলে তাড়াতাড়ি করে রেকর্ডার বন্ধ করে ফেললাম। ফাঁকে ফাঁকে লেখাও চলল। লিখতে লিখতেই হঠাৎ বিস্ফারিত চোখে খেয়াল করি, আকরাম হ্যাটট্রিক করে বসছেন। প্রথম বলে উইকেট নেওয়ার পর ভাবলাম, আচ্ছা এ তো কত উইকেটই আকরাম নেন। পরের বলে আবার। এবং তারপর আবার। আমার পুরো ইন্টারভিউটাই ছিল তাঁর দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকের প্রসঙ্গ নিয়ে। আগের ইনিংসে যে পর পর দুই বলে উইকেট নিয়ে সম্ভাবনা জাগিয়েছিলেন, হতে হতেও কেন হলো না সেই নিয়ে অনেকগুলো প্রশ্ন। গেল। এত সাধের-সাধনার ইন্টারভিউটা মাঠে মারা যাওয়াতে শুধু কাঁদতে বাকি।

ঢাকায় হ্যাটট্রিক করার পথে ওয়াসিম আকরাম। ছবি: ইউটিউব

এরপর কী কী হচ্ছিল তা তো এতক্ষণ বললাম। এবার বলি, এর আগে কী কী হয়েছে। শুরুটা চেন্নাইতে। ১৯৯৯ ভারত-পাকিস্তান সিরিজের প্রথম ম্যাচ। ১২ বছর পর ভারতে এসেছে পাকিস্তান, মাঝখানে শিবসেনা-বাল ঠাকরেদের হুমকি, সম্ভাব্য যুদ্ধ ইত্যাদি কারণে হতে হতেও হয়নি অনেক সফর। তাই এমন নিরাপত্তার চাদরে পুরো আয়োজনকে ঢেকে ফেলা হয়েছিল যে, একেক সময় মনে হচ্ছিল ক্রিকেট কভার করতে এলাম নাকি যুদ্ধ! এর মধ্যেও আমি দ্রষ্টব্য। কারণ, বাংলাদেশের সাংবাদিক ওখানে কেন? বয়স তখন কম, লিকলিকে শরীরের কারণে দেখায় আরও কম, সব সময় জিন্স আর টি-শার্ট পরি বলে লাগে আরও কম। তাতে কারও কারও সন্দেহ, এ রকম পুঁচকে একজনকে টাকা খরচ করে কোনো পত্রিকা বিদেশে পাঠাতে পারে কি না? পুঁচকে এবং অনভিজ্ঞ হওয়ারই কিছু সুবিধা আছে। কেউ খুব গোনায় ধরে না বলে যেখানে-সেখানে চলে যাওয়া যায়। আবার, নতুনজনিত উত্তেজনাতে মান-সম্মান হারানোর খুব একটা ভয় নেই। আর এভাবেই প্রথম দিন লখিন্দরের লৌহবাসরের মধ্যে ফাঁক দিয়ে ঢুকে ওয়াসিম আকরামের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। পাকিস্তান অধিনায়কের নিরাপত্তা তখন প্রায় যুক্তরাষ্ট্র প্রেসিডেন্টের সমান। কালো সানগ্লাসের র‌্যাফ-অস্ত্র উদ্যত কমান্ডোরাও হতভম্ব বলেই একটুখানি দ্বিধান্বিত। সেই সুযোগেই আকরামকে বলে ফেললাম, ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ।’

বাংলাদেশ থেকে এখানে কী করতে? আকরামের চেহারায় সেই প্রশ্ন। মুখে সেটা না করে করলেন অন্য প্রশ্ন, ‘বাংলাদেশ! কামাল ভাই ক্যায়সা হায়?’

কামাল ভাই মানে আ হ ম মুস্তফা কামাল, তিনিই বাংলাদেশে আকরামকে খেলানোর নেপথ্য মানুষ। কামাল ভাই তখন ঠিক কেমন আছেন জানি না। আমার সঙ্গে খুব পরিচয়ও নেই সেই সময়, কিন্তু তাতে কি ঠেকে গেলে চলে? বললাম, ‘খুব ভালো আছেন। তোমার কথা খুব বলেন।’

র‌্যাফ-কমান্ডোরা ততক্ষণে অপ্রস্তুত ভাব কাটিয়ে সক্রিয় হচ্ছে। আকরামও যেতে উদ্যত। শেষ কথা হিসেবে বললাম, ‘বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য কিছু বলবে?’

যেতে যেতে উর্দুতে বললেন, ‘ওদেরকে বলো আমাদের জন্য দোয়া করতে।’

আকরাম চলে গেলেন। এমন বিশেষ কিছু কথাবার্তাও নয়, কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম এই সামান্য আলোচনায় আমার নতুন মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। ভারতীয়, বিশেষত কলকাতার সাংবাদিকরা এসে জানতে চাইছেন, ‘এই কী বলল গো?’ ‘তোমার সঙ্গে দেখলাম বিশেষ খাতির। কী করে হলো?’ বাংলাদেশের মানুষের দোয়া যে চেয়েছেন, সেটাই সবচেয়ে হিট। ‘ভারতকে হারাতে বাংলাদেশিদেরও পাশে চান আক্রম’ পরদিন কলকাতার ছোট এক কাগজের খবর।

কিন্তু আমার দুঃখ আসল ব্যাপারটাই বলা হলো না। যে হালকা মুডে ছিলেন, তাতে সাক্ষাৎকারের কথাটা বললে রাজিই হয়ে যেতেন। কলকাতার এক বন্ধু শুনে বললেন, ‘তুমি কি পাগল হয়ে গেছ নাকি, এই সিরিজে পাকিস্তান অধিনায়কের এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ! তার চেয়ে দুবাই গিয়ে দাউদ ইব্রাহিমের ইন্টারভিউ করো, সেটা সহজ।’

কী করা যায়? কী করা যায়? আকরামের সাক্ষাৎকার কঠিন জানি, কিন্তু এত টাকা খরচ করে আমাকে পত্রিকা পাঠিয়েছে। তা-ও নতুন পত্রিকা। আকরামের সাক্ষাৎকার জাতীয় বড় কিছু না করতে পারলে ঠিক জমে না। ভারতের কারও সম্ভব না, তত দিনে ওদের নিয়ম হয়ে গেছে, সিরিজ চলার সময় কোনো একান্ত সাক্ষাৎকার দেওয়া যাবে না। আকরামই সম্ভাব্য বাজি। কিন্তু পাব কীভাবে? প্রথম টেস্টটা জিতে যাওয়ার পর পাকিস্তান প্রচণ্ড খুশি। দুই পাকিস্তানি সাংবাদিকের সঙ্গে প্রাণখুলে আড্ডা মারছেন দেখে একটু কাছ ঘেঁষলাম। তত দিনে আবার নিরাপত্তাবাহিনীর কড়াকড়ির কিছু ছবি দেখে ফেলায় সতর্কতা ভর করেছে মনে; কিছু সম্মানবোধও তৈরি হয়ে গেছে। ঠিক আর কাছে যেতে পারছি না। সামিউল হাসানকে বিনীতভাবে বললাম, ‘তোমার সঙ্গে তো অনেক খাতির। একটু কি সাহায্য করা যায়?’

সামিউলের কেন যেন আমাকে শুরু থেকেই অনুপ্রবেশকারী মনে হচ্ছিল। একটু অবহেলার সঙ্গে বলল, ‘খোদই যা কর বাত কর লে না (নিজেই গিয়ে কথা বলে ফেলো না!)’

নিজে থেকে বাত করার সুযোগ আর আসে না। শেষে এলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর বাড়িতে দুই দলের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে। বিদেশি সাংবাদিক হিসেবে অকল্পনীয়ভাবে পাকিস্তানি সাংবাদিকদের সঙ্গে আমিও আমন্ত্রিত। বাজপেয়ির সুললিত ভাষায় শান্তি-ঐক্য-বন্ধুত্ব এসব শুনে আকরাম মাত্র উঠেছেন, আমি গিয়ে দাঁড়ালাম সামনে। সময় ছিল না বলে ভূমিকা না করেই বলে বসলাম, ‘একান্ত সাক্ষাৎকার চাই।’ এই জায়গায় যে কেউ সাক্ষাৎকার চাইতে পারে সেটা এমন অবিশ্বাস্য ছিল যে তিনি হতভম্ব হয়ে গেলেন। কিন্তু আমি এই সিরিজে ইতিমধ্যেই আরও অনেককে হতভম্ব করে এসেছি বলে আমার কাছে অভিজ্ঞতাটা নতুন নয়। বরং চেহারার মধ্যে চাহিদাটা তীব্রভাবে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলাম। কাজ হলো। আকরাম হেসে দিলেন। ‘কাল প্র্যাকটিসের পরে।’

অত সহজে হয়ে গেল! হলো না। কঠিন যাত্রার শুরু হলো মাত্র। রোজ আমি যাই। আকরামকে দেখি। প্র্যাকটিস শেষে কাছে ঘেঁষতে গেলেই তেড়ে আসে নিরাপত্তারক্ষীদের দলবল। ম্যাচ শেষ হওয়ার দিন প্রেস কনফারেন্স শেষে খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম, কিন্তু শেষ মুহূর্তে সাংবাদিক পালের একটা বেমক্কা ধাক্কা খেয়ে পিলার ধরে কোনো রকমে আত্মরক্ষা করলাম।

পরদিন গেলাম টিম হোটেলে। কুম্বলে-কাণ্ডে এক দিন আগে টেস্ট শেষ হয়ে যাওয়াতে ওই দিন প্র্যাকটিস নেই। হোটেলই স্টোরির জন্য ভরসা। কুম্বলের দিকেই সেদিন সবার নজর, আমার মনে হলো এই সুযোগ। অনেক অপেক্ষার পর দেখা মিলল, দুপুরের দিকে নামলেন একবার, আমি এগিয়েছি আর তখনই কলকাতার এক সাংবাদিক গিয়ে হিন্দিতে বললেন, ‘আকরাম ভাই ইতনা দিন হুয়া, ভাবিসে নেহি মিলা...(আকরাম ভাই এত দিন হয়ে গেল, ভাবির সঙ্গে এখনো আলাপ হলো না...)’

সাংবাদিকটি আকরামের বেশ পরিচিত। তাই রেগে আগুন হলেন না, কিন্তু যে চাহনি দিলেন, তাতে বুঝলাম, আজকের দিনের মতো মিশন শেষ। আমি চুপ। হঠাৎ অবিশ্বাস্যভাবে আকরাম নিজে থেকেই বললেন, ‘তুমি কোচিতে যাচ্ছ?’

‘না।’

‘ওখানে চলে আসো। আমি ম্যাচে বিশ্রাম নেব। তোমার ইন্টারভিউ হয়ে যাবে।’

তৃতীয় টেস্টের আগে ওখানে একটা প্র্যাকটিস ম্যাচ হবে। যাওয়ার প্রশ্ন নেই। কিন্তু আকরাম তখন এমনভাবে বলছেন যে ঢোক গিলে আমি বললাম, ‘অবশ্যই চেষ্টা করব। না হলে কলকাতায়।’

আকরাম কিছু বললেন না। তাঁরা চলে গেলেন কোচিতে। আমি চললাম কলকাতায়। এখানে সব বাঙালি ভাই, কেমন যেন একটা সাহস চলে এলো। এবার হয়ে যাবে।

হয় না। অবস্থা আর‌ও খারাপ। চেন্নাই-দিল্লিতে তবু দূর থেকে দেখা যেত, কলকাতায় নিরাপত্তাবাহিনী আরও কঠোর। এমন মারমুখো ভঙ্গি ওদের যে কোনো ঝুঁকি নেওয়া যায় না। এর মধ্যে প্রথম টেস্টের আগের দিন সেই ঘটনা আউটলুক পত্রিকা ফাঁস করে দিল বিচারপতি কাইয়ুমের কাছে পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের জবানবন্দি। যাতে একে অন্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত বিষোদগার। আকরামের বিরুদ্ধেও অভিযোগের তীর। এরপর সাংবাদিকরা আরও নিষিদ্ধ। আরও অনাহূত। টেস্ট শেষে আগুন নেভার বদলে বাড়ল আরও। টেন্ডুলকার-শোয়েবের ধাক্কাধাক্কির ঘটনায় আকরাম কেন টেন্ডুলকারকে ডেকে ফেরালেন না--কলকাতার পত্রিকাগুলো সেই প্রশ্ন তোলায় শেষ দিনে সংবাদ সম্মেলনকক্ষেই ক্ষোভে ফেটে পড়লেন আকরাম। ‘গলত লেখা, বহুত গলত’ বলে যেভাবে অভিজ্ঞ এক সাংবাদিকের ওপর ঝাল ঝাড়লেন তাতে এরপর এই অনভিজ্ঞ আমার আর সুযোগই নেই।

আশা শেষ। আবার নিভুনিভু করে আছেও। তিন টেস্ট সিরিজের তৃতীয়টি ছিল এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ, এর ফাইনালটা হবে ঢাকায়। সেই ফাইনালে তিনি এলেন। মাঝখানে মাস পেরিয়ে যাওয়ায় মনে থাকার কথা না, কিন্তু এত বিনিয়োগের পর এভাবে ছেড়ে দিলে তো চলে না। হোটেল সোনারগাঁওয়ে প্রথম দিন ধরলাম। মনে করিয়ে দিলাম প্রতিশ্রুতি এবং তিনি তাঁর সেই বিখ্যাত হাসি হেসে বললেন, ‘হয়ে যাবে।’

তবু সহজ হলো না। সময় দিলেন ম্যাচের দ্বিতীয় দিন হোটেলে। গিয়ে জানা গেল, রুমে ডিএনডি লাগানো। মাঠে সেটা মনে করিয়ে দেওয়াতে বললেন, ‘কাল জরুর হো জায়েগা।’ সেদিন আবার ম্যাচ শেষে এমবাসি বা কারও কোনো একটা প্রোগ্রামের তাড়া থাকায় বললেন, ‘ইয়ার অর এক দিন। কাল লাঞ্চ পে আনা।’

লাঞ্চের সময় গেলে বললেন, একটু খেতে দাও। দিলাম। খেয়ে এসে প্রায় ঢেঁকুর তুলতে তুলতে যখন বললেন, ‘শুরু করো’ তখন এত অবিশ্বাস্য লাগছিল যে, আমি রেকর্ডার বের করতে গিয়ে অতি উত্তেজনায় সেটা পকেট থেকে ফেলে দিলাম। ব্যাটারি ছিটকে গিয়ে আরেকটু হলে তাঁর গায়ে পড়ত।

বিরক্ত না হয়ে বললেন, ‘তাড়াতাড়ি করো। একটু পর আমরা বোলিংয়ে নেমে যাব।’

শুরু হলো ড্রেসিংরুমের সামনে বসেই। আগের দিন দুই বলে দুই উইকেট নিয়ে হতে হতেও যে হ্যাটট্রিক হয়নি সেটা প্রাসঙ্গিক বলে তাই দিয়ে আলাপ শুরু। তাতে না হওয়ার আফসোস, বললেন, নিজেই নাকি খুব আত্মবিশ্বাসী বোধ করছিলেন না..., আবার কবে এ রকম সুযোগ আসে তেমন আফসোসও ছিল বোধ হয়।

তখন কে জানবে যে, ঘণ্টাখানেক পরই সেই আফসোস পূরণ হয়ে যাবে! তাতে আমার অত সাধের ইন্টারভিউটা এমন প্রাসঙ্গিকতা হারাল যে একবার তো মনে হলো, এটা কি আর ছাপার যোগ্য থাকল!

থাকল। কায়দাটা করলেন ক্রীড়া সম্পাদক। হেডিং আর ইন্ট্রোর মাধ্যমে অনবদ্যভাবে শুভ্রদা (উৎপল শুভ্র) সমাধানটা করে দিয়েছিলেন।

হেডিং? ‘টেস্টে তাঁর দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকের পাঁচ ঘণ্টা আগে...’

ইন্ট্রো? ‘হ্যাটট্রিকের পর টিভি সাক্ষাৎকারে এবং ম্যাচ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনেও ওয়াসিম আকরাম আলাদা করে বলেছেন একজনের কথা। সেই একজন প্রথম আলোর মোস্তফা মামুন। টেস্টে তাঁর দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকের পাঁচ ঘণ্টা আগে নেওয়া সাক্ষাৎকারটি কাকতালীয়ভাবে শুরু হয়েছিল এই হ্যাটট্রিক প্রসঙ্গ দিয়ে।’

আর তাই যেটা ছিল হাই ক্যাচ হয়ে যাওয়ার বল, পরদিন সেটাই হয়ে গেল বিরাট স্কোরিং শট। হ্যাটট্রিকের আগে হ্যাটট্রিক নিয়ে কথা বলে আমিই যেন ওকে হ্যাটট্রিক করিয়ে দিয়েছি--এমন একটা সুর শুভাকাঙ্ক্ষী মহলে। আমিও ভাব করলাম যেন আকরামকে ফুসলিয়ে-ফাসলিয়ে ঢাকাতেই দ্বিতীয় হ্যাটট্রিকটা করতে রাজি করিয়েছি।

এই এক-দেড় মাসে কচ্ছপের ধৈর্য দেখিয়েছি, ঈগলের চোখে অনুসরণ করেছি, গণ্ডারের মতো চামড়া মোটা করে অবহেলা সয়েছি। অতগুলো প্রাণীর চরিত্রে অভিনয় করার পরিশ্রম যে করে, সে তো এক-আধটু ভাব নিতেই পারে। নাকি!