সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশিবার উচ্চারিত হওয়া নাম। এই কথার সাথে দ্বিমত হওয়ার মতো লোক কি খুঁজে পাওয়া যাবে? উত্তর 'না'-ই ধরে নিলাম। দেশের ক্রিকেটের বেশির ভাগ অর্জনেই তো এই নামটা কমন পড়েছে। বিশ্ব ক্রিকেটে অলরাউন্ডারদের নাম নেওয়ার সময়েও কি সবচেয়ে বেশিবার এসেছে এই নাম? অন্তত তাঁর সময়ে? আইসিসি র‍্যাঙ্কিং কিন্তু এই নামটাই রেখেছে সবচেয়ে বেশি বার। সাকিবের পারফরম্যান্স তো তা-ই রাখতে বাধ্য করেছে।  

প্রতি সিরিজ শেষে কিংবা একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিং হালনাগাদ করে। আইসিসিকে এক্ষেত্রে সবচেয়ে কম কষ্ট দিয়েছেন সাকিবই। ঠাট্টা করে কষ্টের কথা বললাম। প্রতিবার র‍্যাঙ্কিংয়ে নানা পরিবর্তন এলেও একটা নামই থেকে যেত আগের মতো। সেই নামটা সাকিব। 

র‍্যাঙ্কিংয়ে পরে ফিরি। শুধু র‍্যাঙ্কিং দিয়ে সাকিবের একচেটিয়া দাপট বোঝানো দায়। পরিসংখ্যানে আশ্রয় নিই। কার্ডাস সাহেব বেঁচে থাকলে বলেই ফেলতেন, এই আসছে গাধা নিয়ে। ওই যে মনে নেই, ভিক্টর ট্রাম্পারকে পরিসংখ্যানের পাল্লায় না মেপে তাঁর শৌর্য বোঝাতে ক্রিকেট সাহিত্যের জনক স্যার নেভিল কার্ডাস বলেছিলেন, 'ক্রিকেটের পরিসংখ্যান আস্ত গাধা।'

ওয়ানডে ক্রিকেটে সাকিবের অভিষেক ২০০৬ সালের ৬ আগস্ট। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডের আগে সাকিবের রান ৬৪৫১, উইকেট ২৬৯। তাঁর অভিষেকের পর থেকে সাকিবের চেয়ে বেশি রান করতে পেরেছেন ১৩ জন ব্যাটসম্যান। সাকিবের চেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন মাত্র একজন। সাকিবের অলরাউন্ডার সত্তা বোঝাতে আরও কিছু পরিসংখ্যান যুক্ত করি। সাকিবের চেয়ে বেশি রান করা তের ব্যাটসম্যানের মোট উইকেট ৯৬টি। সাকিবের চেয়ে ১৭৩ উইকেট কম। সাকিব যে ব্যাটে-বলে সমান অবদান রেখেছেন, তা নিশ্চয়ই বোঝা যাচ্ছে।

বাংলাদেশের বেশির ভাগ জয়েই তো এমন অপার হয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় সাকিবের দিকে। ছবি: গেটি ইমেজেসব্যাটে-বলে সমানতালে সাকিবের অবদানের ধারেকাছেও কেউ নেই। ‘ধারেকাছে’ শব্দটা ঔদ্ধত্য বোঝালেও আদতেই কিন্তু নেই। সাকিবের মোট রান উইকেটের অর্ধেকের চেয়ে কম ধরে একটা তালিকা দেখতে গেলাম। সাকিবের অভিষেকের পর থেকে ওয়ানডে ক্রিকেটে ৩০০০ রান ও ১২০ উইকেট নেওয়া অলরাউন্ডার সাকিব ছাড়া রয়েছেন মাত্র তিনজন। রান, উইকেট বাড়িয়ে আরেকটু বিস্তৃত করে ৪০০০ রান ও ২০০ করা হলেই সাকিব ছাড়া অন্য কেউ নেই। সাকিবের মোট রান আর উইকেট মনে আছে তো? এ থেকেই বোঝা যায়, অন্যরা কতটা পিছিয়ে!

শুধু ‘সাকিবের অভিষেকের পর’ এই সময়সীমা বেঁধে দিলে এতে শুভঙ্করের ফাঁকি থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাহলে পুরো ওয়ানডে ইতিহাসের আয়নাতেই দেখা যাক। তা দেখতে গেলেও, সাকিবের চেয়ে রান ও উইকেট--দুটিই বেশি আছে মাত্র তিনজন অলরাউন্ডারের। সনাৎ জয়সুরিয়া, জ্যাক ক্যালিস ও শহীদ আফ্রিদি। তিনজনই সাকিবের চেয়ে শতাধিক ওয়ানডে বেশি খেলেছেন। ব্যাটিংয়ে পিছিয়ে থাকলেও উইকেটে সাকিবের তিনজনকেই টপকানো সম্ভব। যদিও কাজটা কঠিনই, অন্তত জয়সুরিয়ার ৩২৩ ওয়ানডে উইকেট। আফ্রিদিকে টপকাতে সাকিবকে মনোযোগী হতে হবে অবশ্য ব্যাটিংয়ে। সঙ্গে বাংলাদেশ আর সাকিবকেও খেলতে হবে  আরও বেশি সংখ্যক ওয়ানডে। 

শুরুতে বলেছিলাম, র‍্যাঙ্কিংয়ে পরে ফিরি। ফেরার সময় বোধ হয় হলো। র‍্যাঙ্কিংয়ে দাপুটে সাকিবকে বোঝাতে ক্রিকেটের জনপ্রিয় ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোর সাহায্য আবশ্যক। ২০১৭ সালে তারা সাকিবকে উৎসর্গ করে র‍্যাঙ্কিং নিয়ে বেশ কিছু দারুণ ফ্যাক্টস দেয়। নিতান্ত শখের বশে সেসব টুকে রেখেছিলাম, এখন দেখছি কাজে লাগানো যায় এ লেখায়।

বলে রাখি, সাকিবই ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র অলরাউন্ডার. যিনি ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে একই সময়ে অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে ছিলেন। সেটাও ছিলেন কমপক্ষে ৩৮ সপ্তাহ। ওয়ানডে ক্রিকেটে সাকিব শীর্ষে ছিলেন ৩২৪ সপ্তাহ ধরে। যা ক্রিকেট বিশ্বের সব বড় অলরাউন্ডারদের থেকে অন্তত এক শ সপ্তাহ বেশি। কাছাকাছি আছেন যিনি, ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সেই ক্যালিস শীর্ষে ছিলেন ২০৩ সপ্তাহ।

সাকিবের সঙ্গে বাকিদের পার্থক্যটা দেখছেন? ছবি: ইএসপিএন ক্রিকইনফোইএসপিএনক্রিকইনফো সাকিবের দাপট বোঝাতে তুলনা দিয়েছিল, টেনিসের দুই কিংবদন্তি সেরেনা উইলিয়ামস ও রজার ফেদেরারের সাথে। সেরেনা শীর্ষে ছিলেন ৩১৬ সপ্তাহ, রজার ফেদেরার ২৩৭ সপ্তাহ। 

সাকিবের র‍্যাঙ্কিং নিয়ে আলোচনায় অদ্ভুতভাবে টেনিস চলেই আসে। ক্রিকেট যদি একক খেলা হতো, তাহলে কি সাকিব সন্দেহাতীতভাবে সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হয়ে যেতেন? উত্তর হ্যাঁ বা না যাই হোক, ক্রিকেট যেহেতু দলগত খেলা এবং এতেই এর সৌন্দর্য আর মহত্ত্ব--তাই দলের জেতার বিকল্প নেই। ছোট্ট উদাহরণ দেই, সর্বশেষ ক্রিকেট বিশ্বকাপে ৬০৬ রান আর ১১ উইকেট নিয়ে সাকিবকে নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি হয়েছে ফাইনাল জেতানো স্টোকস নিয়ে। এটি স্বাভাবিকও, কারণ সাকিবের দল হয়েছে অষ্টম আর স্টোকসের দল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। 

সাকিবের পিছিয়ে পড়া এখানেই। না হলে বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে অমন পারফর্ম করার পরে সাকিব তো ক্রিকেট ইতিহাসের অংশই হয়ে যেতেন। বলে রাখা ভালো, সাকিবই ক্রিকেট ইতিহাসের একমাত্র অলরাউন্ডার, যাঁর বিশ্বকাপে হাজার রানের সঙ্গে ৩০ উইকেট রয়েছে। বিশ্ব ক্রিকেটের মানদণ্ডে সাকিব খানিক অবহেলিত হলেও অমন পরিসংখ্যান দেখলে যে কেউ চোখ কচলাবে। হয়তো মেনেও নেবে সাকিবের ইতিহাসের অংশ হওয়া।

সাকিবকে গ্রেটনেস বোঝাতে আশ্রয় নিতে হয় ক্রিকেট ছাপিয়ে টেনিসে, সেখানেও তো এমন একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না কারও। ছবি: গেটি ইমেজেসযেকোনো খেলায় মানুষ জয়ীদেরই মনে রাখে। ক্রিকেটে বোধ করি তা আরও বেশি। তা বাংলাদেশ জিতেছে, এমন ওয়ানডে ম্যাচে সাকিবের অবদান কেমন? বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে জয়ের সেঞ্চুরির সামনে দাঁড়িয়ে সাকিব। ৯৯ ম্যাচে তাঁর ৩৩৮০ রান ও ১৫৩ উইকেট। রান আর উইকেটের চেয়ে চোখে লাগার মতো ব্যাপার, সাকিবের ব্যাটিং আর বোলিং গড়। ৫১ ব্যাটিং গড়ের সাকিবের বোলিং গড় ২২।

ক্রিকেট ইতিহাসের বড়-বড় কিছু নামের সাথে মিলিয়ে দেখলাম। রিকি পন্টিং, জয়সুরিয়া, কুমার সাঙ্গাকারা, ক্যালিস, মাহেলা জয়াবর্ধনে, অ্যাডাম গিলক্রিস্ট--জয়ী ম্যাচে এদের ব্যাটিং গড় সাকিবের চেয়ে কম। বিতর্ক শুরু হওয়ার আগেই বলে দিই, স্রেফ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছি, অন্য কিছু বোঝানো এখানে উদ্দেশ্য নয়। এরা যে সাকিবের চেয়ে বহুগুণ ভালো ব্যাটসম্যান, তা বোধ করি না বললেও চলছে।  

ক্রিকেট ইতিহাসে জয়ী ম্যাচে কমপক্ষে ৩০০০ রান ও ১৫০ উইকেট নিয়েছেন সাকিবসহ মাত্র চারজন অলরাউন্ডার। এদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং গড় সাকিবের, সবচেয়ে ভালো বোলিং গড়ও সাকিবের। দলের জয়ে সাকিব খুব একটা খারাপ করেননি মনে হচ্ছে।

সাকিবের গ্রেটনেস আরও স্বীকৃতি পাবে, যদি দলও ঠিকঠাক সমর্থন দিয়ে যায় তাঁকে। ছবি: গেটি ইমেজেসআবার র‍্যাঙ্কিংয়ে ফিরি। ২০০৬ সালে অভিষেকের চার মাস পর ওয়ানডে অলরাউন্ডারদের র‍্যাঙ্কিংয়ে ছিলেন ৫১ নম্বরে ছিলেন সাকিব। পরের বছরের মার্চেই ৩০ ধাপ এগিয়ে ২১ নম্বরে। এর পরের বছরই সেরা দশে। ২০০৮ সালে সাকিব ছিলেন নয় নম্বরে। পরের বছরই শুরু সাকিবের দাপট শুরু। ৩৮৭ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে সাকিব চলে আসেন এক নম্বরে। সেই থেকে এক দশক পরও চলছে তাঁর র‍্যাঙ্কিং-রাজত্ব। সাকিব র‍্যাঙ্কিং টাইমলাইনে নজর দিয়ে দেখলাম, প্রতি বছরই সাকিব কখনো না কখনো ছিলেন এক নম্বরে। সর্বোচ্চ রেটিং ২০০৯ সালের ৪৫৩। যা এই সময়ের পরে আর টপকাতে পারেনি কোনো অলরাউন্ডার। সর্বশেষ প্রকাশিত র‍্যাঙ্কিংয়ে সাকিব যথারীতি এক নম্বরেই। দুইয়ে থাকা বেন স্টোকসের সঙ্গে পার্থক্য ১০১ রেটিং পয়েন্ট।  

শিরোনামে 'সাকিবই ওয়ানডের সেরা অলরাউন্ডার?' বলে প্রশ্ন ছুড়েছি। সাকিবের ক্যারিয়ারের মধ্য গগনের সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়েছে, ৩৪ বছর বয়সী সাকিব যখন থামবেন, ক্যারিয়ার যখন একদম অস্ত যাবে, তখন বোধ করি প্রশ্নটা আর থাকবে না। ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে সর্বজনগ্রাহ্য স্বীকৃতি পেয়ে যাবেন সাকিব। রান, উইকেট আর একগাদা রেকর্ড তাঁর হয়ে চিৎকার করবে। তবে ট্রফি শো-কেসটা একেবারে খালি থাকতে দেখলে সাকিবের সেরা হওয়ার অর্জনেও একটা দাগ থেকে যাবে। সাথে থাকবে লম্বা দীর্ঘশ্বাসও। সেই দীর্ঘশ্বাস লেখক, পাঠকের চেয়ে সাকিবেরই বেশি হবে। তাই নজরটা বড় ট্রফিতে দিচ্ছেন তো সাকিব? নানা সাক্ষাৎকারে অবশ্য নজর দেওয়ার কথা শুনি। কবে যে জেতার পরের গল্প শুনব। তবে তা তো আর সাকিব একা পারবেন না, জেগে উঠতে হবে পুরো দলকে। 

আরও পড়ুন:

সাকিবই কি আসলেই টেস্ট ইতিহাসের সেরা অলরাউন্ডার?