মুত্তিয়া মুরালিধরনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। বিশ্বকাপে শেষ ম্যাচ শচীন টেন্ডুলকারের। এই দুই ডামাডোলে কারও মনে রাখারই অবকাশ হয়নি, আরেক কীর্তিমানেরও হয়তো বিশ্বকাপে শেষ ম্যাচ এই ফাইনাল।

শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটসম্যানের স্বীকৃতিটা তিনিই পান। অথচ ফাইনালের আগে শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং নিয়ে আলোচনায় কোথায় তিনি! কুমার সাঙ্গাকারা, তিলকরত্নে দিলশান, এমনকি উপুল থারাঙ্গাকে নিয়েও যত কথা হয়েছে, তাঁকে নিয়ে এর অর্ধেকও নয়। কে জানত, এই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার প্রথম তিনের ছায়ায় ঢাকা পড়ে যাওয়া মাহেলা জয়াবর্ধনে মনে মনে বিশ্বকাপে তাঁর শেষ ম্যাচটা রাঙিয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করছেন!

বিশ্বকাপ জয়াবর্ধনের কাছে নানা রং নিয়েই এসেছে। কখনো সাদা-কালো, কখনো বা রঙিন। ২০০৩ বিশ্বকাপে ৭ ইনিংসে ২১ রান করার পর দল থেকেই বাদ পড়েছিলেন। এর চার বছর আগে প্রথম বিশ্বকাপও মনে রাখার মতো কিছু ছিল না। পাঁচ ইনিংসে মাত্র ১০২ রান। ২০০৭ বিশ্বকাপে অধিনায়ক। মাহেলা জয়াবর্ধনের ব্যাটের ঝলকও সেই বিশ্বকাপেই প্রথম। ফাইনালের আগেই করে ফেলেছিলেন ৫২৯ রান। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ১১৫ রানের ইনিংসটি মায়াঞ্জন বুলিয়ে দিয়েছিল সবার চোখে। সবাইকে মানতে হয়েছিল, ওয়ানডেতেও শুদ্ধ ও শিল্পিত ব্যাটিংয়ের জায়গা আছে।

শ্রীলঙ্কা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠেছিল সেই ইনিংসে ভর করেই। ফাইনালে গিলক্রিস্টের সঙ্গে পেরে ওঠেননি। নিজেও করতে পেরেছিলেন মাত্র ১৯ রান। বারবাডোজের দুঃখ ভোলার সুযোগ হয়ে এল মুম্বাই। ফাইনালের আগে কত রকম সমীকরণ নিয়ে আলোচনা হলো। জয়াবর্ধনের কথা যেন কারও মনেই পড়ল না। অথচ এবারও শুরুটা সেঞ্চুরি দিয়ে। কিন্তু পরের পাঁচ ইনিংসে ২, ২৩, ৯, ৬৬ ও ১। মোট রান ২০১। কিন্তু কানাডার বিপক্ষে সেঞ্চুরির চেয়ে পরের ৫ ইনিংসে ১০১ রানই তো বেশি চোখে পড়বে।

ফাইনালে প্রথম তিনের বিদায়ের পর শ্রীলঙ্কা যখন শুধুই তাঁর দিকে তাকিয়ে, তখনই দেখা দিলেন জয়াবর্ধনীয় রূপে। সেই রূপ স্নিগ্ধতায় ভরা। জয়াবর্ধনের পেলব কবজির মোচড় হাতের ব্যাটকে সব সময়ই তুলি বলে ভুল করিয়ে এসেছে। বিশ্বকাপ ফাইনালের মতো চাপ, চাপ, আরও চাপের ম্যাচেও জয়াবর্ধনে চোখের জন্য একই রকম প্রশান্তি। তারপরও ৪৯ বলে প্রথম ফিফটি। দ্বিতীয় ফিফটি মাত্র ৩৫ বলে। প্রথম ১০ ওভারে মাত্র ৩১ রানের সূচনা থেকে শ্রীলঙ্কা যে শেষ পর্যন্ত ২৭৪, সেটি তো ৮৮ বলে জয়াবর্ধনের ১০৩ রানের সৌজন্যেই। এমনই সেঞ্চুরি যে, ৯০ শতাংশ ভারতীয় সাংবাদিক-অধ্যুষিত প্রেসবক্সও তুমুল করতালিতে অভিনন্দন না জানিয়ে পারলেন না।

জয়াবর্ধনে সেঞ্চুরিটা করেই শূন্যে লাফ দিয়েছেন। মুখ তুলে তাকিয়েছেন আকাশের দিকে। সবাই জানেন, টেন্ডুলকার এমন করে মেঘের মধ্যে বাবাকে খোঁজেন। মাহেলা জয়াবর্ধনে? জয়াবর্ধনে কাকে খোঁজেন?

বিশ্বকাপটা প্রহেলিকাই হয়ে রইল জয়াবর্ধনের জন্য। ২০০৭-এ যেমন, ২০১১-তেও। ছবি: এএফপি

খোঁজেন ছোট ভাই ধিশালকে। দুই ভাই যখন একসঙ্গে খেলতেন, অনেকেই বলতেন ধিশালটা মাহেলার চেয়েও ভালো। সেই ধিশালকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তুলে নিয়ে গেছে ক্যানসার। এই শোকে ক্রিকেটই প্রায় ছেড়ে দিয়েছিলেন মাহেলা। শুভানুধ্যায়ীরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে ফিরিয়ে আনেন তাঁকে। আসলে ফেরেন অন্য কারণে। যে জগতেই থাকুন, ধিশালও এটাই চাইছেন ভেবে। ধিশালের বড় একটা ছবি সব সময় সঙ্গে থাকে। সেঞ্চুরি-টেঞ্চুরি করলে প্রথমেই চোখে ভেসে ওঠে ধিশালের মুখ। বছর কয়েক আগে এটা জানিয়ে যোগ করেছিলেন, শুধু সেঞ্চুরি করার পর কেন, প্রতিটি মুহূর্তেই আমার ধিশালকে মনে পড়ে। আমি কোনো দিন ওর সমাধিতে যাইনি। মনে হয়, ও আমার সঙ্গেই আছে।

একান্তই ব্যক্তিগত ব্যথা বলে ধিশালকে নিয়ে বেশি কথাও বলেন না। তবে বিশ্বকাপ ফাইনালে সেঞ্চুরির ষষ্ঠ কীর্তির পর মনে মনে হয়তো ঠিকই বলেছেন, ধিশাল, এটা তোর জন্য!

ধিশালকে যে বিশ্বকাপটা উপহার দিতে পারলেন না, এই দুঃখ তো আছেই। চিরদিনই থাকবে।

সংযোজন: গ্রেটদের নিয়ে শেষ কথা নাকি বলতে নেই। মাহেলা জয়াবর্ধনে তা প্রমাণ করেছিলেন আরও একবার। ২০১১ সালের এ লেখায় মাহেলার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের এপিটাফ লিখে দিয়েছিলাম, মাহেলা খেলেছেন ২০১৫ বিশ্বকাপেও।