মুত্তিয়া মুরালিধরনের বদলি হিসেবে ল্যাঙ্কাশায়ারে খেলতে গিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কায় ফিরেছেন গত মঙ্গলবার। কাল সকালে প্র্যাকটিস শেষে শ্রীলঙ্কার বাকি খেলোয়াড়রা হোটেলে ফিরল বাসে, তিনি ঝকঝকে নতুন সাদা একটি ল্যান্ড ক্রুজার চালিয়ে। কাউন্টি ক্রিকেট খেলে পাওয়া টাকা দিয়ে নতুন কিনেছেন গাড়িটা? 

সনাৎ জয়াসুরিয়া হাসলেন। ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনোটাই বোঝা গেল না তাতে। তবে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজটিকে যে ৩৮ বছর বয়সেও নিজেকে ‘চিরসবুজ’ প্রমাণ করার আরেকটি চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছেন, সেটি পরিষ্কার বোঝা গেল প্র্যাকটিসে তাঁর ধ্যানমগ্নতা দেখে।

মাঝখানে অবসর নিয়ে ফেলেছিলেন। আবার ফিরে আসার পর তাঁর ব্যাটে আগের চেয়েও বেশি রানের ফল্গুধারা। মোহাম্মদ আশরাফুল অবাক হয়ে বলছেন, ‘ওর বয়স যত বাড়ছে, খেলা ততই ভালো হচ্ছে!’ ওয়ানডে ক্রিকেটে তাঁর চেয়ে বেশি ম্যাচ কেউ খেলেনি, তাঁর চেয়ে বেশি রান আর সেঞ্চুরিও আছে শুধু একজনের—শচীন টেন্ডুলকারের। ৩৯৫ ম্যাচে ২৫টি সেঞ্চুরি ও ৬৪টি হাফ সেঞ্চুরিসহ ১২০৬৩ রানের চেয়েও বড় বিস্ময় ৯০-এর ওপরে স্ট্রাইকরেট। ওয়ানডেতে দশ হাজারি ক্লাবের আর কারও ম্যাচের পর ম্যাচ এমন ঝড়োগতিতে রান তুলে যাওয়ার কৃতিত্ব নেই।

সনাৎ জয়াসুরিয়া নামটি শুনলে ওই মারমার-কাটকাট ব্যাটিংয়ের কথাই সবার আগে মনে হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বোলিংয়ের কথা যে মনেই হয় না, সেটি তো বড় অন্যায়! বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজেই তাঁর তিন শ ওয়ানডে উইকেটের মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলাটা প্রায় নিশ্চিত, এ জন্য প্রয়োজন আর মাত্র ৫টি উইকেট। ওয়ানডেতে তাঁর চেয়ে বেশি উইকেট আছে মাত্র আটজনের, ওয়ানডের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারের স্বীকৃতিটা জয়াসুরিয়ারই প্রাপ্য।

ব্যাট হাতে জয়াসুরিয়াকে কোনোদিনই মাঠের বাইরের লোকটির সঙ্গে মেলানো যায়নি। মাঠের বাইরে তিনি বিনয়ী, মৃদুভাষী, একটু বোধ হয় লাজুকও। বাঁহাতি স্পিনার হিসেবে প্রাপ্য স্বীকৃতিটা না পাওয়া প্রসঙ্গেও দেখা দিলেন সেই জয়াসুরিয়াই, ‘আমি যতভাবে পারি, দলকে জেতাতে সাহায্য করতে চাই। বোলিংটা তারই অংশ।’ অবসর থেকে ফিরে আসার কারণ বলতে গিয়েও নিজের আগে দল, ‘শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটে অবদান রাখার সুযোগ আছে বলেই ফিরে এসেছি।’

ওয়ানডে সিরিজে জয়াসুরিয়াকে পেয়ে মাহেলা জয়াবর্ধনে অবশ্যই খুশি, তবে বাংলাদেশ দল হয়তো ভাবছে—ও না ফিরলেই ভালো হতো! জয়াসুরিয়ার ব্যাটের আগুনে পোড়ার অভিজ্ঞতা যে অনেকবারই হয়েছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ১৪ ইনিংসে জয়াসুরিয়ার ৩টি সেঞ্চুরি, ব্যাটিং গড় ৬০.০৮। গত বিশ্বকাপে দু দলের সর্বশেষ ওয়ানডেটি বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের রূপ নেওয়ার মূলেও তিনিই। জয়াসুরিয়ার ৮৭ বলে ১০৯ রানের বিধ্বংসী এক ইনিংসের ওপর ভর করেই শ্রীলঙ্কা তুলেছিল ৪ উইকেটে ৩১৮। জবাবে বাংলাদেশ ১১২ রানে অলআউট।

বোলারদের মার খাওয়ার প্রতিযোগিতার পর ব্যাটিংয়েও এক মোহাম্মদ আশরাফুল ছাড়া আর কেউ দাঁড়াতেই পারেননি। সাত নম্বরে নেমে ৪৫ রানে অপরাজিত থাকা আশরাফুল সে ম্যাচের স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে কাল বললেন, ‘শ্রীলঙ্কা সব সময়ই এ রকম, প্রথম বল থেকেই ওরা অ্যাটাক করে। অন্য দলের গেমপ্ল্যান এলোমেলো করে দেয়।’

ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশের ‘একটা কিছু’ করতে আশরাফুলের কাছে তাই সবচেয়ে জরুরি বলে মনে হচ্ছে ‘শুরুটা ভালো করা’। বোলিংয়ে শুরুটা ভালো করায় সবচেয়ে বড় বাধা ওই জয়াসুরিয়াই। শুরুর ঝড়টা পেসারদেরই সামলাতে হবে, তবে টিকে গেলে জয়াসুরিয়া পেসার-স্পিনারে কোনো বাছবিছার করেছেন বলে কেউ অপবাদ দিতে পারবে না। সবচেয়ে ভালো বলতে পারবেন আবদুর রাজ্জাক। বিশ্বকাপের ওই ম্যাচে জয়াসুরিয়া-তাণ্ডব হয়তো বাংলাদেশের বাঁহাতি স্পিনারের ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন হয়েও দেখা দিয়েছে। ১০ ওভারে ৮৬ রান, জয়াসুরিয়ার ৭ ছক্কার ৫টিই ছিল তাঁর বলে। তারপরও রাজ্জাকের একটা সান্ত্বনা আছে, ‘সেদিন আমি যে খুব খারাপ বোলিং করেছি তা নয়। ও আসলে বেশি ভালো ব্যাট করেছে। সেই ম্যাচে অবস্থাটা এমন ছিল যে, জয়াসুরিয়া যা ইচ্ছা তা করে যাচ্ছে, আর আমাদের যেন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু করার নেই।’

উইকেটটা জয়াসুরিয়ার বলেই রাজ্জাক একটু বেশি খুশি। ২০০৭ সালে শ্রীলঙ্কা সফরের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে। ছবি: এএফপিসেই ম্যাচের পর আজই আবার প্রথম দেখা হচ্ছে জয়াসুরিয়ার সঙ্গে, রাজ্জাকের মনে প্রতিশোধ নেওয়ার একটা ইচ্ছা থাকাটাই স্বাভাবিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যত ব্যাটসম্যানের বিপক্ষে বোলিং করেছেন, তাঁদের মধ্যে জয়াসুরিয়াকেই সবচেয়ে কঠিন বলে মানেন। প্রতিশোধের কথাও তাই জোরেশোরে বলতে পারছেন না, রাজ্জাক শুধু প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা করার’। মোহাম্মদ রফিক নেই বলে বাংলাদেশের স্পিন বোলিংয়ের দায়িত্বটা এবার তাঁর কাঁধে। সেটাই যথেষ্ট চাপ, জয়াসুরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে সেটি আরও বাড়াতে যাবেন কেন?
জয়াসুরিয়ারও বাংলাদেশের বিপক্ষে ওই সেঞ্চুরিটা আলাদাভাবে মনে আছে, ‘ওই ম্যাচটা ছিল বিশ্বকাপে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। বাংলাদেশ আগের ম্যাচেই ভারতকে হারিয়েছিল। হেরে গেলে আমাদের সুপার এইটে ওঠাটা অনিশ্চিত হয়ে যেত।’

সেটি না হয় বিশ্বকাপ, সুপার এইট নিশ্চিত করার তাড়না। জয়াসুরিয়ার উদ্দীপ্ত বোধ করার কথাই। কিন্তু এটি তো শুধুই আরেকটি সিরিজ, এটিতে নিজেকে উদ্দীপ্ত করছেন কী বলে? জয়াসুরিয়ার চোখমুখ দেখেই বুঝলাম, প্রশ্নটা তাঁর কাছে অদ্ভুত বলে মনে হচ্ছে। উজ্জীবনী-মন্ত্রের কথা কি তিনি আগেই বলে দেননি? শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে অবদান রাখা!

সংযোজন: ওই সিরিজে জয়াসুরিয়া আর জয়াসুরিয়ার রূপে দেখা দিতে পারেননি। তিন ম্যাচে করেছিলেন ২১, ২৪ ও ৮। দ্বিতীয় ম্যাচে তাঁকে আউট করে বিশ্বকাপের জ্বালা কিছুটা হলেও মিটিয়েছিলেন রাজ্জাক।