শ্রীলঙ্কার ড্রেসিংরুমে প্রথম দিনটির কথা মনে হলে এখনো একই রকম শিহরণ জাগে তাঁর মনে। ‘কিছুদিন আগেও যাদের টেলিভিশনে দেখেছি, বিশ্বকাপ জয়ের পর যাদের ছবি নিয়ে রাস্তায় দৌড়েছি, তাঁদের সঙ্গে এক ড্রেসিংরুমে! আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না।’ প্রায় দশ বছর পর, যখন তিনি শ্রীলঙ্কাকে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে অর্জুনা রানাতুঙ্গার পাশে, তখনো মাহেলা জয়াবর্ধনের মুখে খেলা করে যায় সেই রোমাঞ্চের অনুভূতি।

মাহেলা জয়াবর্ধনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকটাও রোমাঞ্চ জাগানোর মতোই ছিল। অভিষেক টেস্টে যখন ব্যাট করতে নামলেন, শ্রীলঙ্কার স্কোর ৪ উইকেটে ৭৯০! শ্রীলঙ্কাকে রেকর্ড ৯৫২ রানে পৌঁছে দেওয়ায় অবদান ছিল তাঁর ৬৬ রানের ইনিংসটিরও। ওয়ানডে অভিষেক এর মাস ছয়েক পর। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সে ম্যাচে করলেন ৭৪, জয়সূচক রানটিও এল তাঁর ব্যাট থেকেই। সেই কৈশোর থেকে জয়াবর্ধনেকে যাঁরা দেখে এসেছেন, তাঁদের কারও কাছেই এটি কোনো বিস্ময় হয়ে আসেনি। শুরু থেকেই ‘বালক প্রতিভা’ হিসেবে তাঁর পরিচিতি। স্কুল ক্রিকেটে খেলার সময়ই শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটে ফিসফাস শুরু হয়ে যায়, ‘আসছে একজন!’ শুধু ব্যাটিং নয়, স্কুল ক্রিকেটে তাঁর নেতৃত্বগুণ দেখে ‘ভবিষ্যৎ শ্রীলঙ্কান অধিনায়ক’-এর তকমাটাও লেগে গিয়েছিল গায়ে।

প্রত্যাশা আর প্রাপ্তি সব সময় এক বিন্দুতে মেলে না। মাহেলা জয়াবর্ধনের ক্ষেত্রে মিলেছে। রানাতুঙ্গা-যুগের পর তলিয়ে যেতে থাকা শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটের পুনর্জাগরণ হয়েছে তাঁর হাত ধরেই। ২০০৫ সালের অক্টোবরে ভারত সফরে গিয়ে ১-৫ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজ হেরে আসার পর রীতিমতো দিশেহারা মনে হচ্ছিল যে শ্রীলঙ্কা দলকে, সেই শ্রীলঙ্কাই মাস আটেকের মধ্যে ইংল্যান্ডের মাটিতে ইংল্যান্ডকে ওয়ানডে সিরিজে ৫-০ ম্যাচে হোয়াইটওয়াশ করার অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলল! সেই একই দলই তো।

সেমিফাইনালে সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। ছবি: এএফপিএকই দল, কিন্তু পার্থক্য একটাই, ইনজুরির কারণে খেলতে না পারায় মারভান আতাপাত্তুর বদলে অধিনায়ক মাহেলা জয়াবর্ধনে। টেস্ট সিরিজ ১-১-এ ড্র হলো, তাতেও অধিনায়কের ব্যাটের বড় অবদান। লর্ডসে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় ৬১ আর ১১৯ রানের দুটি ইনিংস। এক সময় সহ-অধিনায়কত্বটাই যাঁর কাছে বাড়তি চাপ বলে মনে হয়েছিল, তাঁর কাছেই অধিনায়কত্বটা হয়ে গেল বাড়তি অনুপ্রেরণা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ সর্বোচ্চ ইনিংসটি (৩৭৪) খেলার সময়ও তো তিনি অধিনায়ক। আইসিসি ক্যাপ্টেন অব দ্য ইয়ার পুরস্কার জেতাতে দলীয় সাফল্যের সঙ্গে বড় ভূমিকা ছিল এই ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সেরও। পুরস্কারটা হাতে নিয়ে জয়াবর্ধনে বলেছিলেন, তিনি শুধু ঠেকা কাজ চালাচ্ছেন, আতাপাত্তু দলে ফিরলেই অধিনায়কত্ব তুলে দেবেন তাঁর হাতে। আতাপাত্তু ঠিকই ফিরলেন, কিন্তু জয়াবর্ধনে তাঁকে অধিনায়কত্ব ফিরিয়ে দিতে চাইলেও শ্রীলঙ্কা তা মানবে কেন?

অধিনায়কত্ব যে তাঁর ব্যাটিংকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, এই বিশ্বকাপই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আগের দুটি বিশ্বকাপেও খেলেছেন। ২০০৩ হয়ে আছে দুঃস্বপ্ন, সাত ইনিংসে করেছিলেন ২১ রান! বাদও পড়তে হয়েছিল দল থেকে। ১৯৯৯-ও খুব ভালো কিছু ছিল না। পাঁচ ইনিংসে মোট ১০২ রান। সর্বোচ্চ ৪৫। এবার ৫২৯ রান করা হয়ে গেছে, সামনে আছেন শুধু ম্যাথু হেইডেন। সেমিফাইনালে অপরাজিত ১১৫ রানের যে ইনিংসটি খেলেছেন, সেটি ঢুকে গেছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সেরা ইনিংসগুলোর সংক্ষিপ্ততম তালিকাতেও। জয়াবর্ধনের সামনে এখন অরবিন্দ ডি সিলভাকে ছোঁয়ার সুযোগ। শ্রীলঙ্কার ১৯৯৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল-পূর্ব অংশটা যদি সনাৎ জয়াসুরিয়ার হয়, সেমিফাইনাল-ফাইনাল ছিল অরবিন্দ ডি সিলভার। সেমিফাইনালে ৬৬ আর ফাইনালে ১০৯, দুটিতেই ম্যান অব দ্য ম্যাচ। সেমিফাইনাল তো জিতিয়েছেনই, ফাইনালেও যদি এমন একটা ইনিংস খেলতে পারেন, শুধু ডি সিলভাকেই ছোঁবেন না, কোনো অধিনায়কের সেমিফাইনাল আর ফাইনালে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার প্রথম ঘটনাটিও ঘটবে।

অরবিন্দ ডি সিলভাকে ছোঁয়ার কথা বলছিলাম। সেটি শুধু বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে। এমনিতে তো ডি সিলভাকে আগেই ছাড়িয়ে গেছেন জয়াবর্ধনে। এই স্বীকৃতি স্বয়ং অরবিন্দ ডি সিলভারই। শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান হিসেবে মানা হতো তাঁকেই, সেই ডি সিলভাই দিয়ে দিয়েছেন রায়, ‘আমি নই, শ্রীলঙ্কার সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যান মাহেলা জয়াবর্ধনে। ও আমার চেয়ে অনেক ভালো।’

ছোট্ট মাহেলা আর ধিশাল। ছবি: সংগৃহীত

শ্রীলঙ্কানরা অবশ্য ব্যাটসম্যান জয়াবর্ধনের চেয়েও এগিয়ে রাখতে চান মানুষ জয়াবর্ধনেকে। তারকাসুলভ কোনো অহমিকা তো নেই-ই, তাঁর কাছে সাহায্য চেয়ে কেউ ফিরে গেছে এমন ঘটনা নেই। মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড় হচ্ছে না, জয়াবর্ধনের কাছে গেলেই হলো। অর্থাভাবে ছেলের পড়াশোনা আটকে গেছে, শুধু জয়াবর্ধনে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলেই হলো। ম্যাচের টিকিট লাগবে? শুধু জয়াবর্ধনেকে বলতে হবে। শ্রীলঙ্কানরা জয়াবর্ধনেকে যতটা সম্মান করে, ভালোবাসে তার চেয়েও বেশি।

‘হোপ’ প্রকল্পে অবদান আরও বেশি শ্রীলঙ্কানদের হৃদয়ে বসিয়ে দিয়েছে তাঁকে। ‘হোপ’ শ্রীলঙ্কার মহারাগামায় ৭৫০ শয্যার একটি ক্যান্সার হাসপাতাল বানানোর প্রকল্প। জয়াবর্ধনে নিজে তাতে টাকা দেন, টাকা তুলতে সাহায্য করেন। তাঁর কারণে পুরো শ্রীলঙ্কা দলই জড়িয়ে গেছে এটির সঙ্গে। জয়াবর্ধনেকে জড়িয়েছে অকালপ্রয়াত ছোট ভাইয়ের স্মৃতি। দুই ভাই যখন একসঙ্গে খেলতেন, ধিশাল জয়াবর্ধনেকে মাহেলার চেয়ে ভালো ব্যাটসম্যান বলে মানতেন অনেকেই।

সেই ধিশালকে মাত্র ১৬ বছর বয়সে নিয়ে গেছে ক্যান্সার। এই শোকে তখন স্কুল দলের অধিনায়ক মাহেলা জগৎ-সংসার সম্পর্কে এমনই নিস্পৃহ হয়ে পড়েছিলেন যে, ক্রিকেটই ছেড়ে দিয়েছিলেন। শুভানুধ্যায়ীরা বুঝিয়ে-শুনিয়ে আবারও ফেরান তাঁকে। ধিশালের বিয়োগব্যথা এখনো মাঝে-মধ্যেই কাঁদায় তাঁকে। জয়াবর্ধনে সহজে তা কাউকে বলেন না। আজ বিশ্বকাপ ট্রফিটা হাতে নিতে পারলেও হয়তো প্রকাশ্যে কিছু বলবেন না। তবে মনে মনে নিশ্চয়ই বলবেন, ‘ধিশাল, এই ট্রফিটা তোর জন্য!’