৩৩ বল খেলে মাত্র ৯, প্রথম বাউন্ডারি ৪৮তম বলে—মনে হচ্ছিল অধিনায়কের ব্যাটিংই শ্রীলঙ্কা দলকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দীর্ঘ সময় যে ইনিংসটিকে মনে হচ্ছিল ওয়ানডের কলঙ্ক, শ্রীলঙ্কার ইনিংসের ৫০ ওভার শেষে সেটিকেই মানতে হচ্ছে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ইনিংস বলে। ১০৯ বলে অপরাজিত ১১৫—কে করেছেন? ৩৩ বলে ৯ রান করা ওই ব্যাটসম্যানই। মাহেলা জয়াবর্ধনে।

৩৩ বলে ৯ থেকে হিসাব করুন, শেষ ১০৬ রান করেছেন মাত্র ৭৬ বলে! শুরু আর শেষে পুরো বিপরীত এই ইনিংসই নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ-স্বপ্ন আবারও সেমিফাইনালে এসেই শেষ হয়ে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত করে দিল। আর মাহেলা জয়াবর্ধনে শুধু শ্রীলঙ্কাকে ফাইনালের দোরগোড়ায়ই পৌঁছে দিলেন না, চার বছর ধরে বয়ে বেড়ানো একটা যন্ত্রণাকেও কাল স্যাবাইনা পার্কে কবর দিয়ে দিলেন।

শুরুটা করেছিলেন বড্ড ধীর, পরে চড়লেন সুপারসনিক ট্রেনে। ছবি: গেটি ইমেজেস

যন্ত্রণাটার নাম ২০০৩ বিশ্বকাপ, জয়াবর্ধনের ক্যারিয়ারে যা হয়ে আছে কালো এক দাগ। হঠাৎই ব্যাটিং ভুলে গিয়েছিলেন, ৭ ইনিংস খেলে করেছিলেন ২১ রান। সেই কালো দাগ মুছে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছিলেন এবারের বিশ্বকাপে। কালকের ম্যাচের আগেই কাজ কিছুটা এগিয়ে রেখেছিলেন। ইরেজার দিয়ে পুরো মুছে দেওয়ার কাজটা করলেন আসল সময়ে। সেমিফাইনালে।

৩০ ওভার শেষে শ্রীলঙ্কার স্কোর ৩ উইকেটে ১২৯। ৪০ ওভার শেষে ৪ উইকেটে ১৮৭। স্টিভেন ফ্লেমিং টার্গেটটা কত হবে ভেবেছিলেন? ২৩০? ২৪০? শেষদিকে দু-একটা ওভারে একটু বেশি রান হয়ে গেলে না হয় ২৫০-ই হলো। ফ্লেমিং কীভাবে ভাববেন, একসময় যে জয়াবর্ধনে আউট না হলেই তাঁর দলের জন্য ভালো বলে ভাবছিলেন, তাঁর ব্যাটেই এমন আগুনের ফুলকি ছুটবে। জয়াবর্ধনের অবিশ্বাস্য এক ব্যাটিং প্রদর্শনীতে শেষ ১০ ওভারে উঠল ১০২ রান। শেষ ৫ ওভারে ৫৬।

হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন ৭৬ বলে, যাতে মাত্র ৩টি চার। দ্বিতীয় ফিফটি এল মাত্র ২৮ বলে, ৬টি চার ও ২টি ছয় থেকেই ৩৬। রাসেল আরনল্ডের সঙ্গে ষষ্ঠ উইকেটে ফিফটি পার্টনারশিপ মাত্র ২৬ বলে। আরনল্ড শুধু স্ট্রাইক বদল করে গেলেন, যা করার করলেন জয়াবর্ধনেই।

টসে জিতে জয়াবর্ধনে যখন ব্যাটিং নিলেন, একটিই ব্যাখ্যা ছিল তাঁর। পরের দিকে এই উইকেট স্লো হয়ে যাবে, মুরালিধরনকে লেলিয়ে দেওয়ার সেটাই উপযুক্ত সময়। তবে এর আগে বড় অঙ্কের একটা রান তো জমা করতে হবে স্কোরবোর্ডে। সেটাই শ্রীলঙ্কা পারবে বলে মনে হচ্ছিল না। মাহেলা জয়াবর্ধনের ইনিংসটির অমন ভোজবাজির মতো বদলে যাওয়ার আগে এক উপুল থারাঙ্গা ছাড়া আর সবার ব্যাটিংই শ্রীলঙ্কার ড্রেসিংরুমের গুমোট ভাবটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

জয়াসুরিয়া তাড়াতাড়ি ফেরত গেলেও টলেননি জয়াবর্ধনে। ছবি: গেটি ইমেজেস

স্যাবাইনা পার্কের উইকেটের বাড়তি বাউন্সই শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের কাল হবে বলে হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন স্টিভেন ফ্লেমিং। শেন বন্ড ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন সনাৎ জয়াসুরিয়াকে তাড়াতাড়ি তুলে নেওয়ার। টসে হেরেও উইকেটের বাউন্সকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেয়ে ফ্লেমিং নিশ্চয়ই খুশিই হয়েছিলেন। তৃতীয় ওভার আসতে আসতে শেন বন্ডও খুব খুশি। মাত্র ১ রান করেই জয়াসুরিয়া বোল্ড। বন্ডের কাজ করে দিয়েছেন ফ্রাঙ্কলিন, তাতে কি! কাজটা তো হলো।

কুমার সাঙ্গাকারা ধুঁকতে ধুঁকতে ৪২ বলে ১৮ করে মিড অনে ফ্লেমিংকে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করালেন। ভরসা হয়ে ছিলেন যে থারাঙ্গা, ২৬তম ওভারে তিনিও ভেট্টোরিকে সুইপ করতে গিয়ে বোল্ড হয়ে যাওয়ার পর শ্রীলঙ্কাকে মনে হলো অকূল পাথারে। জয়াবর্ধনের খেলা বল আর রানের ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে উঠছে। তাঁর সঙ্গে নতুন ব্যাটসম্যান। বন্ড দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে চামারা সিলভাকে এলবিডব্লিউ করে দেওয়ার পরই আসলে শুরু হলো শ্রীলঙ্কান ব্যাটিংয়ের ঝলমলে এক অধ্যায়। ‘বিশ্বের সেরা আম্পায়ার’ সাইমন টফেলের অবিশ্বাস্য এক সিদ্ধান্তে তিলকরত্নে দিলশান এলবিডব্লিউ হয়ে যাওয়ার আগে মাত্র ৬৪ বলে ৮১ রানের পার্টনারশিপ।

পঞ্চমবারের মতো সেমিফাইনালে এসেই নিউজিল্যান্ডের বিশ্বকাপ-গল্প শেষ হয়ে যাওয়াটা তখনই প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। বাকি ৫ ওভারে ‘প্রায়’ শব্দটাকেও বোধহয় মুছেই দিলেন মাহেলা জয়াবর্ধনে।