এই বিশ্বকাপে মাহেলা জয়াবর্ধনে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে যা শেখাচ্ছেন—

• এটা শুধুই তরুণদের খেলা—একেবারেই ফালতু কথা। জয়াবর্ধনে এখন ৩২।

• প্রথাগত ব্যাটিং করেও এখানে রান করা যায়। তিন ম্যাচে তাঁর রান ২৭৯।

• ধুমধাড়াক্কা ব্যাট না চালিয়েও বলের চেয়ে দেড় গুণেরও বেশি রান করা সম্ভব। জয়াবর্ধনের স্ট্রাইক রেট ১৬৩.১৫।

গত পরশু (ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে, বারবাডোজে) মাত্র ২ রানের জন্য টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে দুটি সেঞ্চুরি করতে না পারার পর জয়াবর্ধনে যা বললেন, শেখার আছে তা থেকেও—ক্রিকেটে সবকিছুর আগে দল। ব্যক্তিগত অর্জন কখনোই দলের প্রয়োজনের চেয়ে বড় নয়।

এমন কব্জির মোচড়েই তো জয়াবর্ধনে করে ফেললেন একটি সেঞ্চুরি আর একটি 'প্রায়' সেঞ্চুরি। ছবি: পোপারফটো

কথাটা সব ক্রিকেটারই মুখে বলেন। কিন্তু কথা আর কাজে সবার মিল থাকে, এটা ভাবা একদমই ঠিক হবে না। জয়াবর্ধনের মিল আছে। নইলে শেষ ওভারের দ্বিতীয় বলে সিঙ্গেল নেওয়ার পর স্ট্রাইক পাওয়ার জন্য তো তাঁর প্রাণান্ত চেষ্টা করার কথা। তা তো করেনইনি, উল্টো ৯৮ রানে অপরাজিত ব্যাটসম্যান বলছেন, ‘আমি এত ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম যে, ৩০ গজও পার করতে পারছিলাম না। কাপু (কাপুগেদারা) আসায় খুব ভালো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো হতো আমি আউট হয়ে গিয়ে যদি তরতাজা দুজন ব্যাটসম্যান উইকেটে আসত।’

তারপরও ইতিহাসের এত কাছে গিয়ে ফিরে আসায় কোনো আক্ষেপ থাকবে না! জয়াবর্ধনের নেই, ‘সেঞ্চুরি পেলে তো অবশ্যই ভালো হতো। তবে আমি কখনোই সেটি নিয়ে ভাবিনি। আমার একমাত্র চিন্তাই ছিল, দলের রান কীভাবে আরও বাড়বে।’

তাঁর ব্যাটিং সব সময়ই চোখের জন্য প্রশান্তি। জয়াবর্ধনের যেকোনো বড় ইনিংসের বর্ণনায় ‘ক্ল্যাসিকাল’ কথাটাও থেকেছে সব সময়। টি-টোয়েন্টির না এর সঙ্গেই আড়ি! যত জোরে সম্ভব মেরে বলের চামড়া তুলে নেওয়ার চেষ্টার নামই না টি-টোয়েন্টি ব্যাটিং! পরশুর প্রথম ম্যাচে ডেভিড ওয়ার্নার ও শেন ওয়াটসন যেটির সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পরের ম্যাচেই জয়াবর্ধনে দেখালেন, অন্যভাবেও সম্ভব।

টি-২০ মানেই 'ধরো-তক্তা-মারো-পেরেক' ক্রিকেট নয়, এখানে বল দেখে দেখেও খেলা যায়। ছবি: এএফপিজয়াবর্ধনে চাইলেই এ নিয়ে লম্বা-চওড়া একটা লেকচার দিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি চিরকালের বিনয়ী, ‘ক্রিকেট খেলাটা হলো ব্যাট আর বলের মধ্যে লড়াই। রান পাওয়াটাই সেখানে আসল। টেকনিক নিয়ে এত আলোচনা করার কিছু আছে বলে আমি মনে করি না। ক্রিকেটকে আকর্ষক করতে সব ধরনের খেলোয়াড়ই দরকার।’

কিন্তু এই বিশ্বকাপে তাঁর এই রানের ভেলায় ভেসে যাওয়া এক ধরনের জবাবও কি নয়? টি-টোয়েন্টিতে তাঁর উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তো ছিলই। ‘জবাব’ যদি কিছু দিয়ে থাকেন, সেটি জয়াবর্ধনে নিজেই নিজেকে, ‘আমি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছি। মিডল-অর্ডারে একরকম চ্যালেঞ্জ ছিল। ওপেনিংয়ে অন্যরকম। তবে এখানে একটু বেশি স্বাধীনভাবে খেলার সুযোগ পাওয়া যায়। নিজের সামর্থ্যের সীমাটা আরও বাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। সেটি পারার একটা আনন্দ তো আছেই।’

তা করতে গিয়ে কি পরিবর্তন করেছেন ব্যাটিংয়ে? ‘খুব বেশি কিছু নয়। হ্যাঁ, অন্যরকম দু-একটা শট হয়তো খেলছি। ওটা খেলতেই হয়, কারণ প্রতিপক্ষ অধিনায়ক আপনাকে থামানোর নানা চেষ্টা-চরিত্র করবে। নানা স্ট্র্যাটেজি নেবে, নানাভাবে ফিল্ড সাজাবে। সব সময় তাই চেষ্টা করতে হবে এক ধাপ এগিয়ে থাকার। বুঝতে হবে, কোনটা আপনার জন্য কাজ করবে, কোনটা করবে না। সেটি বুঝে নিজের ওপর আস্থা রাখতে হবে।’

নিজের ওপর সেই আস্থা জয়াবর্ধনের সব সময়ই ছিল। দলেরও ছিল, নইলে তাঁকে ওপেনিংয়ে তুলে আনা কেন? শ্রীলঙ্কার অস্ট্রেলিয়ান কোচ ট্রেভর বেলিস জানালেন পেছনের চিন্তাটা, ‘টি-টোয়েন্টিতে একমাত্র ওপেনিংয়ে নামলেই বড় স্কোর করার সুযোগ থাকে। টেস্টে ওর বড় স্কোর করার অভ্যাস আছে। বড় স্কোর করার কারিকুরিটা ও জানে।’

কোচ ট্রেভর বেলিসের সঙ্গে মিলেই ওপেনিংয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন জয়াবর্ধনে। ছবি: এএফপি

এই বিশ্বকাপের শুরুতেই মহেন্দ্র সিং ধোনি টি-টোয়েন্টির ফর্ম নিয়ে ধোঁয়াশার কথা বলছিলেন, ‘৩০ বলে ৩০ করলে হয়তো আউট অব ফর্ম, আবার ১৭ বলে ২৫ করলেই বলা হবে দারুণ ফর্মে। টি-টোয়েন্টিতে ফর্ম ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার নয়।’

জয়াবর্ধনেকে নিয়ে সেই সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। তিন ম্যাচে ৮১, ১০০ ও অপরাজিত ৯৮—যেকোনো ধরনের ক্রিকেটেই ফর্মে থাকার প্রমাণ হতো, টি-টোয়েন্টিতে তো আরও বেশি। জয়াবর্ধনে কি তাহলে টি-টোয়েন্টিতে ফর্ম কাকে বলে, তার একটা মানদণ্ড ঠিক করে দিলেন?

জয়াবর্ধনে হাসেন, ‘পরের ম্যাচেই যদি প্রথম বলে আউট হয়ে যাই, তখন কী হবে! নিউজিল্যান্ডের সঙ্গেই তো প্রথম বলটাই উঠে গিয়েছিল। বলটা ব্রেন্ডন ম্যাককালামের ওপর দিয়ে চলে যাওয়ায় বেঁচে গিয়েছি। ক্রিকেটে একটু লাকও লাগে। আমি এখন ফর্মে আছি, রান করছি। জানি না কত দিন এমন থাকবে। আমি তাই যত বেশি সম্ভব রান করে নিতে চাই।’

টি-টোয়েন্টিকে হয়তো নতুন কিছু শেখাচ্ছেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। তবে ক্রিকেট যে আজকের রাজাকে পরদিন ফকির বানিয়ে দিতে পারে—এই শিক্ষাটা চিরন্তনই। জয়াবর্ধনে সেটির উদাহরণ নন। উদাহরণ তিনি, যাঁকে পরশু ম্যাচের বাইরে বসে থাকতে হলো। ‘দিলস্কুপ-টুপ’ মেরে গত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের হিরো হয়ে যাওয়া তিলকারত্নে দিলশান চেয়ে চেয়ে দেখছেন, তাঁর জায়গাটা এবার নিয়ে নিয়েছেন মাহেলা জয়াবর্ধনে। ‘জয়াস্কুপ’ জাতীয় কিছু আবিষ্কার না করেই!