নিতান্তই সরল-সোজা এক বাক্য। কিন্তু সহজ কথা সহজে বলা যায় না বলেই হয়তো মুশফিকুর রহিম হয়ে উঠলেন অনিন্দ্য। টানা দ্বিতীয় ম্যাচে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরষ্কার নিতে যখন ডাক পড়ল তাঁর, ১২৫ রানের আলো ঝলমলে ইনিংসটা ছাপিয়ে তিনি নজর দিতে চাইলেন যে ১১ বল বাকি থাকতে আউট হয়ে এসেছেন, সেই অপূর্ণতায়। অনভিজ্ঞ এই শ্রীলঙ্কা দলের বিপক্ষে সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি, কিন্তু নামে-অভিজ্ঞতায় বড় কোনো দলের বিপক্ষে এই ১১টা বল খেলতে না পারার আক্ষেপ যে দলকে পোড়াবে না, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। খেলাটা যখন এগারো বনাম এগারো, ব্যক্তিগত অর্জন ছাপিয়ে দলের জয়টাই তো মুখ্য। এর অন্যথা হলেই অর্জনটা কাঁটা হয়ে বিঁধে ভেতরটায়। ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফি, রেকর্ডের ঝুলি ছাড়িয়ে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এই প্রশ্নটাই, 'ইশ, আমি কেন আরেকটু ভালো খেললাম না!'

আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। ছবি: আইসিসি

কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় প্রশ্নটার এমন সরলীকরণ করা যায় কি? এক কালে ভারতীয় এক স্যাটেলাইট চ্যানেলে ‘ম্যাচ কা মুজরিম’ (ম্যাচের অপরাধী) নামে এক অনুষ্ঠান হতো সাবেক বাঁহাতি স্পিনার বিষেণ সিং বেদিকে মূল আলোচক রেখে। ভার‍ত কোনো ওয়ানডে হেরে গেলেই ভারতের পরাজয়ের জন্য একজন-দুজন খেলোয়াড়কে দায়ী করে তাদের আচ্ছামতো ধুয়ে দেওয়া হতো ওই অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশে তেমন কোনো অনুষ্ঠান নেই, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো তো আছে। ম্যাচের অপরাধী বের করে তাঁকে শূলে চড়ানোর সমস্ত যোগাড়যন্ত্র সেখানে বেশ সাড়ম্বরেই করা হয়। সব দেখে-শুনে প্রশ্ন জাগে, টিম গেমে নির্দিষ্ট একজন-দুজনকে নিয়ে এত কাঁটাছেড়া আর কোথাও কি হয়?

মঙ্গলবার রাতের শুভ্র.আলাপে উৎপল শুভ্র দৃষ্টান্ত খুঁজে নিলেন সাম্প্রতিকেই। শ্রীলঙ্কা সিরিজের প্রথম ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়ার এক ম্যাচ আগেই মোহাম্মদ মিঠুন করেছিলেন অপরাজিত ৭৩, তা-ও নিউজিল্যান্ডের কঠিন কন্ডিশনে অমন দুর্দান্ত বোলিংয়ের বিপক্ষে খেলে। ফিফটি আছে এর দুই ইনিংস আগেও। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিঠুন প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হওয়াতেই তিনি পরিণত 'জাতীয় ভিলেনে'। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকের কথাবার্তার এমনই ধরন যে, মনে হওয়া স্বাভাবিক, নির্বাচক মিনহাজুল আবেদীন কিংবা হাবিবুল বাশারের সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্রেই জাতীয় দলের পাঁচ নম্বর স্পটটা বাগিয়ে নিয়েছেন মিঠুন, এ কথা কেবল যথাযথ প্রমাণের অভাবেই মুখে বলা যাচ্ছে না। ভুল বলা হলো, অনেকে তা বলেও ফেলছেন। শুভ্র তো পরিহাসের ছলে এমনও বললেন, 'আজ মিঠুন বাদ পড়ার আগ পর্যন্ত সোশ্যাল মিডিয়া দেখে মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুইটাই সমস্যা। এক. মিঠুন। দুই. লিটন। এই দুইজনকে বাদ দিলেই বাংলাদেশের ক্রিকেট পারফেক্ট হয়ে যাবে।' 

ক্রিকেটের সঙ্গে দীর্ঘকাল জড়িত থাকার সুবাদে নাজমূল আবেদীন ফাহিম ঘুরেছেন প্রায় সব ক্রিকেটখেলুড়ে দেশেই। শুভ্র.আলাপে উৎপল শুভ্র তাই তাঁর কাছে জানতে চাইলেন, বাইরের দেশগুলোতেও এই ব্যক্তি ব্যবচ্ছেদের সংস্কৃতিটা চালু আছে, নাকি মসলিনের মতো বাংলাদেশ এই বস্তুরও জিআই স্বীকৃতি দাবি করতে পারে?

কিছুদিন আগে এই শুভ্র.আলাপে এসেই নাজমূল আবেদীন ফাহিম জানিয়েছিলেন, দলকে সবার ওপরে রাখে বলেই 'সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ' জাতীয় রেকর্ডে অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না তেমন। এদিনও জানালেন, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড দলে ব্যক্তি-চিন্তার কোনো স্থান নেই বলেই দল হিসেবে এত উৎকর্ষ লাভ করতে পেরেছে তারা। তাদের দলীয় সংস্কৃতি বোঝাতে বললেন নিউজিল্যান্ডের একটা ঘটনার কথাও, 'একবার (নিউজিল্যান্ডের ক্যাপ্টেনকে) প্রশ্ন করা হয়েছিল, তোমাদের টিমটা কেমন? ক্যাপ্টেনের উত্তর ছিল, 'আমাদের দলের ফিফটিনথ ম্যান যে, হি ইজদ্য হ্যাপিয়েস্ট পারসন।'

১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিতে জয় এসেছিল দল হয়ে খেলে। ছবি: শা. হ. টেংকুউৎপল শুভ্র মনে করিয়ে দিলেন, ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফিতে গিয়ে তাঁরও অনেকটা একই অনুভূতি হয়েছিল বাংলাদেশ দলকে নিয়ে। সে টুর্নামেন্টে জাভেদ ওমর বেলিম ম্যাচ খেলেননি একটিও, কিন্তু মিমিক্রি করে, হাসি-ঠাট্টায় সবাইকে মাতিয়ে রেখে দলের চৌহদ্দিতে দুশ্চিন্তার ছায়াও আসতে দেননি তিনি। নিউজিল্যান্ডের ফিফটিনথ্ ম্যানের মতো জাভেদকেও অনায়াসেই বলা যেত, বাংলাদেশ দলের 'হ্যাপিয়েস্ট ম্যান'।

আইসিসি ট্রফির সময় সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। চাইলেই বাকি সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দল নিজেদের 'এক লক্ষ্য, এক পরিবার' বলে ভাবতে পারত। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার এই অস্থির সময়ে এখন তো তা সম্ভব নয়। ফেসবুক-টুইটার-ইনস্টাগ্রাম হয়ে গেছে ছায়াসঙ্গী। সেখানে যার যা ইচ্ছা বলে যাচ্ছে, প্রায়শই বিলীন হয়ে যাচ্ছে শালীনতা-অশালীনতার সীমারেখা, অকারণ ব্যক্তিগত আক্রমণ, নোংরা গালাগালি..সবই যেন এখন যুগের ধর্ম। ক্রিকেটারদের গায়েও লাগছে এসব। লাগবে না-ই বা কেন, অন্তর্জালের দুনিয়ায় ক্রিকেটাররাও তো দারুণ সরব আজকাল। নাজমূল আবেদীন ফাহিম সোশ্যাল মিডিয়ার কথাবার্তাকে চাইলেও যে উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তা বোঝাতে বললেন, 'সোসাইটি ইজ অ্যা ভেরি পাওয়ারফুল টুল। সোসাইটি আমাকে কীভাবে দেখে, এটার একটা বিরাট ইমপ্যাক্ট কিন্তু আছে। আমরা এত কিছু করি, সেটা সোসাইটি আমাকে ভালো বলবে, প্রশংসা করবে বলেই। তাই সোসাইটি থেকে আমি যদি নেগেটিভ ফিডব্যাক পাই, তা আমাকে আগে বাড়তে দেবে না। আমার যেভাবে ভাবি, তা ভাবতে দেবে না।'

আর সমালোচনাটা কেবল যে অন্যকে অপছন্দের কারণে করা হচ্ছে, তা-ও তো নয়। বরং নিজের পছন্দের ব্যক্তিটির চাইতে অন্যকে খাটো করে দেখাতেও অন্দ-মন্দ কথা ছড়ানো হচ্ছে ইদানীং। ফাহিম মনে করছেন, যেকোনো পাবলিক পারফর্মারের জন্যই সমর্থকেরা একটা গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ বলে ভক্ত-সমর্থকদের খুশি করার জন্যেও অনেক সময় দলের জন্য হানিকর কিছু করতে বাধ্য হন ক্রিকেটাররা। দল হিসেবে বেড়ে ওঠার মূল বাধাটা তো এখানেই, 'আমার ফ্যান আমি হ্যাপি রাখলাম, আপনার ফ্যান আপনি হ্যাপি রাখলেন, ওর ফ্যান ও হ্যাপি রাখল; ইনডিভিজুয়াল আইল্যান্ডের মতো হয়ে যায় সবাই। টিম হিসেবে কোথাও যাওয়াটা কিন্তু মুশকিল হয়ে যায়।'

মাশরাফির এই হাসিটা দেশকে প্রথম বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা এনে দেওয়ার। এর আগে দল হয়ে ওঠারও। ছবি: এএফপি

অথচ দল হিসেবে এগিয়ে যাওয়াটা বাংলাদেশের জন্যই সবচেয়ে বেশি জরুরি। সমর্থকদের কাছে ফাহিম তাই অনুনয়ের সুরেই বললেন, ব্যক্তিপূজা নয়, দল হিসেবে এগিয়ে যাওয়াকেই যেন গুরুত্ব দিই আমরা, 'আমরা চ্যাম্পিয়ন দল না। আমরা অস্ট্রেলিয়া না, ইংল্যান্ড না। আমরা যদি দলের পাশে থাকি, তাহলে দলটা অটোমেটিক্যালিই আরও অনেক ভালো করবে। আমাদের ওপরে যাওয়াটা আরও অনেক সহজ হবে।'

নাজমূল আবেদীন ফাহিমের এই সরল বক্তব্যগুলো কবে যে আমাদের জন্য সহজবোধ্য হবে!