তাঁদের পরে কারা?

একজন তাঁর ক্যারিয়ারের ১৭তম বর্ষে পা রাখলেন আজই, বাকি তিনজনও আছেন ধারেকাছেই। কালে কালে অনেক বেলা গড়িয়ে লগ্ন এসে যাচ্ছে বিসর্জনের। চতুর্পাশের যা হাবভাব, তাতে এমনটা ভেবে নেওয়া খুবই স্বাভাবিক, ২০২৩ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ-- এই চারের 'দ্য ফাইনাল ড্যান্স।' তাঁদের অবসরের পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে না চাইলে বাংলাদেশকে বিকল্প খুঁজে রাখতে হবে এখনই।

প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, এই চারজন থাকাকালীনই আর কারও ব্যাট ভরসার প্রতিশব্দ হয়ে উঠতে পারছে না বলে। ক্ষণে ক্ষণে ব্যাটে ঝলক দেখান কেউ কেউ, তবে তা বিদ্যুৎচমকের মতোই। কবে যে দেখা মিলবে পরবর্তী ঝলকের, তা অজানা সবারই। প্রশ্নটা তাই প্রায় সকলেরই মুখে মুখে ঘুরে ফিরছে, ওই চারের বাইরে কেউই কেন পারফর্ম করতে পারছেন না ধারাবাহিকতা মেনে?

পঞ্চপান্ডবের মাশরাফি একরকম অলিখিত বিদায় নিয়েছেন। বাকি চারজনও আর তো খুব বেশি দিন নেই

লিটন দাসের কথাই ধরুন না! শট খেলার সময় তিনি এমনই নান্দনিকতার প্রতিমূর্তি যে, নামের আগে-পরে পিকাসো-দ্য ভিঞ্চি বিশেষণ বসে যাচ্ছে হরহামেশাই। ইয়ান বিশপের মতো ক্রিকেট বিদগ্ধজনও তো বলেন, ক্রিকেট মাঠে 'মোনালিসা' নেমে আসে লিটনের ব্যাটে ভর করে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, এই সৌন্দর্যের ব্যপ্তিকাল হালফিল ৩০ রান পর্যন্ত পৌঁছুচ্ছে না। ৪৪ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে তাঁর গড় ২৮.৭৮, জিম্বাবুয়ে আর আয়ারল্যান্ডকে ধর্তব্য জ্ঞান না করলে যা নেমে যাচ্ছে ২১.৩১-এ। ওই 'ক্লাস', 'নান্দনিক' জাতীয় বিশেষণগুলো এখন তাই যতটা না ভক্ত-সমর্থকদের মুখে ওঠে, তার চেয়ে অনেক বেশি শোনা যায় নিন্দুকদের মুখে। অবশ্যই ব্যঙ্গার্থে।

কিন্তু অমিত সম্ভাবনা নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রেখে লিটন দাসের এমন নিদারুণ ব্যর্থতার কারণ কী? প্রায় সর্বজনীন হয়ে ওঠা এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছিল উৎপলশুভ্রডটকমের ইউটিউবের আয়োজন শুভ্র.আলাপে। কোচ নাজমূল আবেদীন ফাহিম আর উৎপল শুভ্র মিলে কথা বললেন বাংলাদেশের তরুণ ক্রিকেটারদের ফুল হয়ে ফুটতে না পারা নিয়ে। ফাহিমের কাছে জানতে চাওয়া হলো, তাঁর মতে এর কারণ। কথা শুরু হলো লিটনকে দিয়েই। লিটন দাসের দুটি মূল সমস্যা ধরা পড়েছে ফাহিমের চোখে। প্রথমত, ব্যাটিংয়ের ধরন বদল। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে স্ট্রোক প্লেয়ার হিসেবেই নামডাক ছিল লিটনের, সেখানে ইদানীংকালে একটু ধরে খেলা, শট কম খেলা লিটনেরই দেখা পাচ্ছেন ফাহিম। ফাহিমের মতে, 'আমি জানি না, এটা (বদলটা) ওর জন্য কতটা প্রযোজ্য ছিল। অনেক সময় যেটা হয়, কোচরা অনেকের ভেতরে না ঢুকেই একটা সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ভেতরে কার ধারণক্ষমতা কতটুকু, সেটা বুঝতে পারে না। সবাই কিন্তু সবকিছু ধারণ করতে পারে না।'

লিটন দাস যে ধারণ করতে পারেননি, তার প্রমাণ তো পরিসংখ্যানেই মিলছে। ২০২১ সালে খেলা আট ওয়ানডের তিনটিতেই আউট হয়েছেন শূন্য রানে। দুই অঙ্কের স্কোরে পা দিয়েছেন বাকি পাঁচ ম্যাচেই, কিন্তু সর্বোচ্চ মাত্র ২৫। এই পাঁচ ম্যাচের তিনটিতেই ব্যাট করেছেন ৬০-এর কম স্ট্রাইক রেটে, একবার যা নেমে গিয়েছে ৩৭-এ।

এমন হতাশ হয়ে ফেরাই গত কিছুদিনের লিটন দাস

লিটনের দ্বিতীয় যে সমস্যা ধরা পড়েছে ফাহিমের চোখে, তা পুরোটাই মানসিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলতে গিয়ে দুঃসময় আসেনি, এমন ক্রিকেটার খুঁজে বের করাটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতোই, কিন্তু যারা বড় প্লেয়ার, তারা সেই বাজে সময়টা ঠিকই কাটিয়ে এসেছেন প্রচণ্ড মানসিক দৃঢ়তার কারণে। লিটনের মধ্যে সেই মানসিক শক্তিরই অভাব দেখছেন ফাহিম। যে কারণে চতুর্পাশের সমালোচনায় ভীষণভাবে কুঁকড়ে যান লিটন, এমনটাই মনে হচ্ছে তাঁর, 'আমার মনে হয় ও প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশিই হতাশ হয়ে গেছে। তবে হতাশার কারণও আছে, যেভাবে ওর ব্যাপারে সমালোচনা হয়, সেটা হয়তো ও নিতে পারে না। সবাই তো আর সাকিব নয়। সাকিব যেমন এসব গায়ে মাখে না।'

কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলতে গেলে এই সমালোচনাগুলোর সঙ্গেই তো ক্রিকেটারদের ঘর-সংসার করতে হবে। ক্রিকেটাররা যেন সব সমালোচনার তোড় সামলে খেলাতেই মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন পুরোপুরি, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব তো বিসিবিরই। সেই কাজটা কী যথেষ্ট সার্থকতার সঙ্গে পালন করতে পারছে বিসিবি? বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনই তো খুল্লামখোলা সমালোচনার বাণে বিদ্ধ করে প্রতিনিয়ত কাঠগড়ায় তোলেন ক্রিকেটারদের। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের ইনিংস বিরতিতেই যেমন সাংবাদিকদের পাপন জানিয়েছিলেন, ইনিংস ওপেনের বদলে লিটনের মিডল অর্ডারে ব্যাট করা উচিত। নাজমূল আবেদীন ফাহিমের দৃষ্টিতে, বিসিবির নীতিনির্ধারকরাই যদি এমনভাবে কোনো একটা প্লেয়ারের পজিশন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, শট সিলেকশন নিয়ে কথা বলেন, সেটা খেলোয়াড়টির জন্য খুব একটা মঙ্গলজনক কোনো বার্তা নয়। এই কথাগুলোও খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্সে নেতিবাচক একটা প্রভাব সৃষ্টি করে।

দলে অফ-ফর্মে থাকা প্লেয়ারের মনোবল চাঙা করতে টিম ম্যানেজমেন্ট কী করে ভূমিকা রাখতে পারে, ফাহিম জানালেন সেই তরিকাও, 'একটা দলে কিন্তু একজন-দুজন এমন থাকবেই, যে ফর্ম হারিয়ে ফেলেছে। আশেপাশে যেসব খেলোয়াড় থাকবে, বা টিম ম্যানেজমেন্টে যেসব খেলোয়াড় থাকবে, তারা এমন একটা পরিবেশ তৈরি করবে যেন তার পক্ষে ফিরে আসাটা সহজ হয়। তার ব্যর্থতাটাকে সামনে না এনে আড়াল করাটাই অন্যদের কাজ হবে। "ঠিক আছে, তুমি আজকে রান করতে পারোনি, অন্যরা করেছে। তবে অ্যাজ অ্যা টিম আমরা জিতেছি। তুমিও সেই টিমের অংশ, তার মানে তুমিও জিতেছ", এই এনভায়রনমেন্টটা অনেক স্বস্তি দেয়। এই স্বস্তি যদি কেউ না পায়, তার পক্ষে ফিরে আসা অনেক কঠিন কিন্তু।'

কিন্তু বাংলাদেশ দলের সমস্যাটা তো কেবল লিটনই নন, বরং এমন 'লিটন দাসে'ই ভর্তি হয়ে গেছে বাংলাদেশ দল। প্রতিভার কথা বললে সৌম্য আছেন, মিঠুন আছেন, নাজমুল হোসেন শান্ত...। এই তালিকায় নাম রাখতে হবে আফিফ হোসেনেরও। ঘরোয়া ক্রিকেটে দেখে আফিফকে যতটা গোছানো মনে হয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিয়ে সেই তিনিই যেমন সব গুবলেট করে ফেলেন। সমস্যাটার শেকড় কি তাহলে আরও গভীরে পোঁতা? নাজমূল আবেদীন ফাহিমের কথা শুনলে অন্তত তা-ই মনে হওয়ার কথা। খেলা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তাভাবনা, চ্যালেঞ্জগ্রহণের সক্ষমতা, ডিসিশন মেকিং-- ভালো ক্রিকেটার হওয়ার এই অপরিহার্য গুণগুলো মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় থাকলেও এসব গুণের পুরোটা যে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেওয়া গেল না, তার কারণ বলতে গিয়ে ফাহিম সামনে টানলেন, 'আমাদের এমন অনেক খেলোয়াড়ই ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট কিংবা লোকাল ক্রিকেটে যে ধরনের গাইডেন্স বা মেন্টরিং পায়, সেটা কিন্তু যথেষ্ট না একটা প্লেয়ার হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য।'

মোসাদ্দেক হোসেন: এত দিনে যাওয়ার কথা ছিল আরও বহু দূর

খেলোয়াড় হিসেবে সাফল্য লাভের রাস্তা বাতলে দিতেও ব্যর্থ হচ্ছে প্রশাসন, নাজমূল আবেদীন ফাহিমের মত এমনই। সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের খেলা ইনিংস দুটির উদাহরণ টেনে তিনি তাই বললেন, 'এই ইনিংসগুলো ও (রিয়াদ) কোত্থেকে খেলল? এই পথ দিয়ে এর আগে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ অনেক দিন গেছে, এই কারণেই, এই পথে এসে আবার যখন ওকে দাঁড়াতে হলো, ও কিন্তু খেই হারায়নি। ও জানে, এই সময়ে পুরনো বল কী করতে পারে, তাঁকে কী করতে হবে...এই যে একজন প্লেয়ার ধীর ধীরে তৈরি হয়ে এখানে আসল, তৈরি হয়ে আসার কারণেই এই জিনিসটা হ্যান্ডেল করতে পারল। এখানটায়ই মনে হয়, আমরা নতুন যে খেলোয়াড়েরা আছে, তাদেরকে আমরা তৈরি করতে পারিনি। এই কারণেই তাদের সাকসেস রেটটা তুলনামূলকভাবে অনেক কম।'

সাফল্যলাভের হারটা যে কেবল স্কিল ট্রেনিং বাড়িয়েই করা যাবে না, সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এনে নিজেকে আরও পূর্ণাঙ্গ মানুষ করে তোলাটাকেও গুরুত্বপূণ বলে মন্তব্য করলেন উৎপল শুভ্র। ব্যাখ্যায় তিন এমনও বললেন,  ক্রিকেটারদের অন্য ক্ষেত্রের সফল মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করা উচিত, জানা উচিত তাঁরা কীভাবে কাজ করেন, কীভাবে টিম চালান, ম্যান ম্যানেজমেন্ট যার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নাজমূল আবেদীন ফাহিম পুরো একমত হয়ে বললেন, কেবল স্কিল ট্রেনিংয়েই সমস্ত মনোযোগ নিবদ্ধ করে সাফল্যের রাস্তা চেনানোর আসল উপায়টাই প্লেয়ারদের শেখানো হচ্ছে না, 'ওভাবে হয়তো আমরা কাউকে বই-ম্যাগাজিনও পড়তে দেখি না। গুগল সার্চ করে শেখার চেষ্টা, নিজের জ্ঞানের গভীরতা বাড়ানোর চেষ্টা, এই কালচারটা একদমই আমাদের নেই। প্লেয়ারদের দোষ দিলে হবে না কিন্তু, এভাবে যে নিজেকে ওপরে উঠিয়ে আনা যায়, আরও সমৃদ্ধ করা যায়-- এই ধারণাটাই তো ওদের দিতে পারছি না আমরা। আমরা ওদেরকে যে ধারণাটা দিচ্ছি, "তুমি আরও প্র‍্যাকটিস করো, আরও দৌড়াও, আরও খাটো, তুমি আরও ভালো প্লেয়ার হবে"। এর বাইরে তো আমরা কিছু বলছি না আনফরচুনেটলি।'

এমন যে দেশের সংস্কৃতি, অগ্র-পশ্চাতে নেই তাঁর ক্ষেত্রে বিশ্বের এক নম্বর হয়েছেন কোনো রোল মডেলও-- সেখান থেকে কী করে একজন সাকিব আল হাসান বেরিয়ে এলেন, উৎপল শুভ্রর মতো তা ভেবেই আশ্চর্য হতে হয় ক্ষণে ক্ষণে। একই সঙ্গে মনে হয়, ক্রিকেটারদের ব্যর্থতার মূল দায় তো ক্রিকেটারদেরই নিতে হবে। তবে সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে এই দায় আমাদের ক্রিকেট সংস্কৃতির, আমাদের পরিপার্শ্বের, আমাদের নীতিনির্ধারকদের চিন্তার দৈন্যও।

কোনটা কত শতাংশ, এই তর্কে গিয়ে লাভ নেই। সমাধানের পথ কী, জানতে চাই। সবার আগে মেনে নেওয়া যে, এটা বড় একটা সমস্যা। বাংলাদেশের ক্রিকেট যাঁরা চালান, তাঁদের মধ্যে কজনের চিন্তাভাবনা নাজমূল আবেদীন ফাহিমের মতো পরিষ্কার, এটাই বড় প্রশ্ন।