এই তো, উচ্চতা মেরে-কেটে ফুট পাঁচেক হবে বোধ হয়। ফোলা ফোলা গালে ভীষণ মিষ্টি হাসি, আর সে হাসিতে বালকসুলভ নাকি শিশুসুলভ ছাপ, এই প্রশ্নেও হতে হয় দ্বিধান্বিত। কিন্তু সেই ছেলেই নর্দাম্পটনশায়ার কাউন্টি দলের বিপক্ষে মেরে দিল সেঞ্চুরি, হাস্যমুখে লর্ডসের বুকে খেলে ফেলল টেস্টও! হাতে করতালি আর অবিশ্বাসে ভরা চাউনি নিয়ে ইংলিশ মিডিয়া সম্ভবত খুঁজতে চাইছিল এই প্রশ্নের উত্তরই, 'এই পুঁচকে ছোঁড়া ক্রিকেটার হলো কেমন করে?'

সেদিনের সেই ১৬ বছরের কিশোর গড়নে ছোটখাটই আছেন এখনো। যদিও অর্জনে পুঁচকে নেই আর, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৬ বছরের পথচলায় বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য হয়ে উঠেছেন বিশাল এক বটবৃক্ষই। যার সবশেষ প্রমাণ রেখে এসেছেন আর ঘণ্টাখানেক আগেই, টানা দুটি ম্যাচ উইনিং ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে পাইয়ে দিয়েছেন নবমবারের চেষ্টায় প্রথমবারের মতো লঙ্কানদের বিপক্ষে সিরিজ জয়ের স্বাদ। 

মঙ্গলবার রাতে উৎপলশুভ্রডটকম-এর ইউটিউব চ্যানেলের নিয়মিত আয়োজন শুভ্র.আলাপে অতিথি হয়ে এসেছিলেন মুশফিকুর রহিমের কৈশোরের গুরু নাজমূল আবেদীন ফাহিম। উৎপল শুভ্র তাই অনুমিত প্রশ্নটাই করলেন তাঁকে, বিকেএসপিতে মুশফিককে প্রথম দেখার স্মৃতি মনে আছে কি না। দেখে মনে হয়েছিল কি না এই ছেলে 'স্পেশাল কেউ'।

ফাহিমের পরিষ্কার মনে আছে। কারণ সেই ছোট্টবেলাতেই মুশফিক বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, একদিন তিনি অনেক বড় হবেন। বিকেএসপিকে থেকে বেরোনো অন্য সব নামী ক্রিকেটারদের কথা উল্লেখ করে ফাহিম বললেন, 'সাধারণত কারও কথা আমার মনে থাকে না। কারণ, এত ছেলে, সবাইকে একই চোখে দেখি। বড় হলেও মনে থাকে না, টু বি অনেস্ট। কিন্তু একমাত্র মুশফিকের ব্যাপারটাই মনে আছে। সাকিবও না, আবদুর রাজ্জাককেও না, নাঈমুর রহমান দুর্জয়কেও না; একমাত্র মুশফিককে দেখেই মনে হয়েছিল এই ছেলেটা জাতীয় দলে খেলবে। ও যখন ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলো, তের-চৌদ্দ বছর বয়স, তখনই মনে হয়েছিল, ও জাতীয় দলে খেলবে।'

কেন মনে আছে, এর একটা ব্যাখ্যা দিতে হয়ে ভেবেই হয়তো যোগ করলেন, 'তখন ও কিন্তু ওপেনিং ব্যাটিং করত, সঙ্গে উইকেটকিপিংও। দুটোতেই সে বয়সেই এত চমৎকার মান ছিল, টেকনিক্যালি হি ওয়াজ ভেরি গুড।'

বিকেএসপি জীবনে মুশফিকুর রহিম (মাঝখানে, চোখে চশমা)। ছবি: মুশফিকুর রহিমের ফেসবুক পেজ থেকে

মুশফিকের সিদ্ধিলাভের কারণ হিসেবে যে 'হার্ডওয়ার্ক'-এর কথা বলেন সবাই, ফাহিম জানালেন, এই গুণটা মুশফিকের ভেতরে বলতে গেলে জন্মগতই ছিল। 'যে ওয়ার্ক এথিকসের কথা আমরা সব সময় বলি, সেটা কিন্তু ছোটবেলা থেকেই। ফিজিক্যালি খুব পরিশ্রম করতে অভ্যস্ত।'

মুশফিকের সাফল্যপ্রাপ্তির কারণ হিসেবে শৃঙ্খলারও বিরাট ভূমিকা দেখেন ফাহিম, 'হি ইজ ভেরি ভেরি ডিসিপ্লিনড। এটা শুধু ক্রিকেটেই না। ওর ঘরে যদি আমরা ঢুকি, প্রত্যেকটা বই-খাতা, প্রত্যেকটা জিনিসই কিন্তু ঠিক সোজা করে থাকবে। পেনসিলটা আঁকাবাঁকা থাকবে না। যেটা যেখানে থাকার কথা, সেখানেই থাকবে।'

এই ডিসিপ্লিনের কারণেই বিপদে পড়লেও মুশফিক ভেঙে পড়েন না বলে বিশ্লেষণ ফাহিমের। বিপদের সামনে দাঁড়িয়েও 'বিগার পিকচার'টা দিব্যচক্ষে দেখে নেন পরিষ্কার, সেখান থেকে বেরিয়েও আসার সাহসটাও তাঁর আছে।

লর্ডসে টেস্ট অভিষেকের আগে। ছবি: এএফপি

মুশফিকের শৃঙ্খলার উদাহরণ দিতে নাজমূল আবেদীন ফাহিম মাঠ ছেড়ে চলে গেলেন ব্যক্তি মুশফিকে। টেনে আনলেন পড়ুয়া মুশফিকের কথা, 'ওরা (ক্রিকেটার) কিন্তু প্রচুর ক্যাম্প করেছে। হি ইজ প্রোবাবলি দি অনলি ওয়ান, যার সাথে সব সময় তার স্কুল বা কলেজের বই থাকত। প্র‍্যাকটিস হোক বা ম্যাচ হোক, ও ঠিকই সময় করে নিয়ে ওর পড়াশোনা যা করার, সেটা করে নিত। যে কারণে ওর এসএসসি বলি কিংবা এইচএসসি বলি, সবখানেই রেজাল্ট খুব ভালো করেছে। ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পড়াশোনার সময় খুব বেশি একটা পায়নি, তারপরও ভালো রেজাল্ট করেছে। তার ডিসিপ্লিনের কারণেই সে এখনো এভাবে টিকে আছে।'

পড়াশোনার আলাপ ওঠাতেই উৎপল শুভ্রর মনে হলো, মুশফিককে বোঝাতে প্রতীকিভাবে ব্যবহার করা যায় এটিকে। নইলে তো 'ভালো স্টুডেন্ট' তকমা তো কতজনের নামের পাশেই লাগে, কিন্তু খেলার সঙ্গে সঙ্গে পড়াশোনাটাও সমানতালে চালিয়ে গিয়ে মুশফিকের মতো মাস্টার্স ডিগ্রিধারী ক’জনই বা হয়েছেন! বাংলাদেশে মুশফিকের পর্যায়ের ক্রিকেটারদের মধ্যে আর কেউই তো নন।

ইনিংস বিনির্মাণের মতো ব্যক্তিজীবনেও মুশফিক খুব ডিসিপ্লিনড। ছবি: এএফপি

ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিমের মতো মানুষ মুশফিকুর রহিমেও মুগ্ধ নাজমূল আবেদীন ফাহিম। সেই মানুষ মুশফিকের ছবি আঁকতে ব্যক্তিগত একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করলেন তিনি উৎপল শুভ্র ও শুভ্র.আলাপের দর্শকের সঙ্গে, 'এখন তো মুশফিক অনেক বড়। বিয়ে করেছে, একটা ছেলেও আছে। এখনো যদি মুশফিক দূর থেকে আমাকে দেখে, ও আমার দিকে দৌড়ে আসে। কখনো হেঁটে আসে না, কারণ ও হয়তো ভাবে, এতে আমাকে অসম্মান করা হবে।'

এটা শুধু মুশফিক ফাহিমের ক্ষেত্রেই করেন, তা নয়। ফাহিমই কথায় কথায় বললেন, বিকেএসপিতে এমন কেউ নেই যে, মুশফিক সম্পর্কে ভালো কথা বলবে না। একজন শিক্ষক বা একজন কোচ আদর্শ ছাত্র বা আদর্শ শিষ্য হিসেবে যা কল্পনা করেন, মুশফিকুর রহিম ঠিক তা-ই।

বলার সময় ফাহিমের কণ্ঠে একটু গর্বের ছোঁয়াও যেন লাগল। ছাত্রের কীর্তি, ছাত্রের বিনয় এসবেই তো আসলে প্রশিক্ষক জীবনের সার্থকতা। মুশফিকুর রহিম নিয়তই সেই অনুভূতি ছড়িয়ে যাচ্ছেন তাঁর মনে।