১৪৪, ৬৭, ৯৮*, ১০, ৮৪, ১২৫।

সংখ্যাগুলো লিখে একটা ধাঁধা দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিলাম, বলতে পারবেন, এই সংখ্যাগুলো কী?

সঙ্গে সঙ্গেই মনে হলো, কোনো অর্থ হয় না। শুরু আর শেষের সংখ্যা দুটি দেখেই যে কারো বুঝে ফেলার কথা, এগুলো মুশফিকুর রহিমের রান। মাঝের সংখ্যাগুলো হয়তো ধাঁধায় ফেললেও ফেলতে পারত, কিন্তু লেখার হেডিংয়ে মুশফিকের নাম দেখে সেই ধাঁধার উত্তর মিলিয়ে ফেলা এমন কঠিন কিছু নয়। 

হ্যাঁ, উপরের ছয়টি সংখ্যা শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে মুশফিকুর রহিমের সর্বশেষ ছয়টি ইনিংস। দেখতেই পাচ্ছেন, ছয় ইনিংসে মাত্র একবারই ব্যর্থ। বাকি পাঁচ ইনিংসে সর্বনিম্ন রান ৬৭, দুটি সেঞ্চুরি,  দুটি প্রায় সেঞ্চুরি। এই দুটির একটিতে সেঞ্চুরি না পাওয়ায় মুশফিকের নিজের দায় ছিল। এই সিরিজেরই প্রথম ম্যাচে পরিস্থিতির দাবি মেটাতে গিয়ে রিভার্স সুইপে মৃত্যু। অন্যটিতে তাঁর কোনো দায় নেই। কারণ তাঁকে অন্য প্রান্তে ৯৮ রানে অপরাজিত রেখে বাংলাদেশ অলআউট হয়ে যায়।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এই ছয় ইনিংসের ব্যাটিং অ্যাভারেজ হিসেব করলে তা অতিপ্রাকৃত রূপ নেয়। ১০৫.৬০ ব্যাটিং অ্যাভারেজের কিছুটা মাহাত্ম্য অবশ্য ওই ৯৮ নট আউটেই লুকিয়ে। শ্রীলঙ্কান বোলাররা যে মুশফিকুর রহিমকে এরই মধ্যে চরম অপছন্দ করতে শুরু করেছেন, তা না বললেও চলে। এ থেকেই উল্টো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যেতেও তাই সময় লাগে না। মুশফিকুর রহিমের প্রিয় প্রতিপক্ষের নাম শ্রীলঙ্কা।

দাঁড়ান, দাঁড়ান, মুশফিককে তা বলতে যাবেন না যেন। পাবলিক মেমোরি শর্ট হতে পারে, তবে ক্রিকেটাররা সাফল্য-ব্যর্থতার স্মৃতি এত সহজে ভোলেন না। শ্রীলঙ্কা তাঁর প্রতিপক্ষ, এ কথা বললে মুশফিকের তাই আপনাকে জানিয়ে দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা যে, এই শ্রীলঙ্কা তাঁকে কম যন্ত্রণা দেয়নি।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ২৬ ম্যাচের ২৪ ইনিংসে দুটি ফিফটি থাকলেও বাকি ২২ ইনিংসের বেশির ভাগ এমনই হতশ্রী যে, কথিত প্রিয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে মুশফিকের ব্যাটিং অ্যাভারেজ ছিল ১৯.৩৩। ১৩টি ইনিংসে আউট হয়ে গেছেন এক অঙ্কের রানেই, যার তিনটি শূন্য, সর্বশেষটি আবার 'গোল্ডেন ডাক'। ২০০৭ বিশ্বকাপের পরপর শ্রীলঙ্কা ট্যুরে সিরিজের শেষ দুই ম্যাচে দুই শূন্যের যন্ত্রণা সেখানেই শেষ হয়নি। সেটিই ওয়ানডেতে মুশফিকের ভয়াবহতম অভিজ্ঞতার দুযার খুলে দেয়। মাস ছয়েক পর নিউজিল্যান্ড ট্যুরে প্রথম ওয়ানডেতে কোনো রান করার আগেই দ্বিতীয় বলে আউট হয়ে গিয়ে 'শূন্যের হ্যাটট্রিক' করে বসেন মুশফিক।

প্রথম ম্যাচে ৮৪ রানের পর আজ দ্বিতীয় ম্যাচে ১২৫। শ্রীলঙ্কান বোলাররা তো মুশফিককে অপছন্দ করবেই। ছবি: রতন গোমেজ/বিসিবি

২০১৩ ও ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় পরের দুটি ট্যুরে এই দ্বীপদেশে প্রথম ট্যুরের সেই দুঃস্বপ্ন ভুলবেন কি, উল্টো চার ইনিংসে ৩, ৯, ১ ও ০ তা আরও প্রবল প্রতাপে ফিরিয়ে আনে মুশফিকের মনে। শ্রীলঙ্কার এই দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়েরই সেই ব্যর্থ মুশফিকের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। তাঁদের কাছে বরং মুশফিক মানেই 'নামবেন আর রান করবেন' জাতীয় ব্যাপার-স্যাপার। এই দুই মুশফিকের মাঝে পরিষ্কার একটা বিভাজন-রেখা টেনে দেওয়া যায়। সেই রেখাটার অন্য নাম ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। এ দিনই এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মুশফিকের ১৪৪ রানের ওই ইনিংস। এমন অসাধারণ ব্যাটিং করেছিলেন যে, ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের সেরা ইনিংস নিয়ে আলোচনায় অবধারিতভাবেই এটিকে রাখতে হবে। কেউ এক নম্বরে রাখলেও তা নিয়ে ভুরু কোঁচকানোর কিছু নেই।

তারপরও দুবাইয়ের ওই ম্যাচের কথা উঠলে মুশফিকের আগেও অনেকের মনে পড়ে যায় তামিম ইকবালের কথা। ব্যাটিংয়ের সময় আঙুল ভেঙে যাওয়ার পরও যিনি এক হাতে ব্যাটিং করতে নেমে গিয়ে সব আলো নিজের দিকে টেনে নেন। এতটাই যে, এক সময় তামিম নিজেই এ নিয়ে আপত্তি জানাতে শুরু করেন। মাস কয়েক পর সিলেটে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজের সময় তামিমের ইন্টারভিউ করছি। যে ইন্টারভিউয়ের একটা অংশ ছিল, কথিত পঞ্চপান্ডবের বাকি চারজনকে নিয়ে তাঁর মূল্যায়ন। মুশফিকুর রহিমকে নিয়ে বলতে গিয়ে তামিম নিজে থেকেই ফিরে গিয়েছিলেন দুবাইয়ের ওই দিনে। বলেছিলেন, 'প্রথমে ভালো লাগলেও একটা পর্যায়ে আমার খারাপ লাগতে শুরু করে। যখন দেখলাম, মুশি এমন অসাধারণ একটা ইনিংস খেলল, অথচ তা নিয়ে কেউ কথা বলছে না, সবাই শুধু বলছে আমাকে নিয়ে।'

দুবাইয়ে এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওই মহাকাব্যিক ১৪৪ রানের ইনিংসে। তারিখটাও মনে রাখা উচিত। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। ছবি: এএফপি

ভাঙা আঙুলের তামিমকে নিয়ে সেদিন শেষ উইকেটে ৩২ রান যোগ করেছিলেন মুশফিক। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে টানা তৃতীয় ছক্কা মারতে গিয়ে লং অনে দুর্দান্ত এক ক্যাচে পরিণত হওয়ার আগে এই ৩২-ই তাঁর ব্যাট থেকে। বলতে গেলে মুশফিকের একক কৃতিত্বধন্য জয় এশিয়া কাপ ফাইনালে পথেও অনেকটাই এগিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। বাকি পথটুকু পেরোনোতেই বড় ভূমিকা ছিল মুশফিকেরই। আনঅফিসিয়াল সেমিফাইনালে পরিণত পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়েও তিনিই ম্যান অব দ্য ম্যাচ। যদিও পুরস্কারটা নেওয়ার সময় মুশফিকের আনন্দের হাসিতে এক টুকরো বিষাদও মিশে ছিল। ৯৯ রানে যে আউট হয়ে গিয়েছিলেন।

এর আগে-পরের পারফরম্যান্সের বৈপরীত্যের কারণে ওই ১৪৪ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই মুশফিকের মধ্যে পরিষ্কার বিভাজন-রেখা টেনে দিয়েছে বলছিলাম। মুশফিকের ওয়ানডে ক্যারিয়ারেও ওই ১৪৪-এর অনেক তাৎপর্য। এর আগে ১৮৭ ম্যাচে মুশফিকের ব্যাটিং অ্যাভারেজ ছিল ৩৩.০৬। পরের ৩৯ ম্যাচে সেটিই ৫৭.৫০। প্রথম ১৮৭ ম্যাচে সেঞ্চুরি ছিল ৫টি। আর এই ৩৯ ম্যাচেই পাঁচ সেঞ্চুরি হয়ে যাচ্ছিল প্রায়। রেকর্ড আপনাকে বলবে, ৩টি সেঞ্চুরি ও ১১টি হাফ সেঞ্চুরি। কিন্তু ওই ১১ হাফ সেঞ্চুরির ২টি 'হাফ' তো নয়ই, প্রায় সেঞ্চুরি। এই 'প্রায় সেঞ্চুরি' কথাটা আগেও একবার ব্যবহার করেছি, তবে এবার আরও বেশি আক্ষরিক অর্থে। একবার ৯৮ রানে নট আউট, আরেকবার ৯৯ রানে আউট...সেঞ্চুরির এর চেয়ে বেশি কাছে যাওয়া আর কীভাবে সম্ভব!

শ্রীলঙ্কায় প্রথম তিনটি ট্যুরের দুঃস্বপ্নের কথা বলেছিলাম না, সেটিকে কবর দেওয়ার কাজটাও করেছেন এই ১৪৪ পরবর্তী সময়েই। ২০১৯ সালের জুলাইয়ে শ্রীলঙ্কায় সর্বশেষ ট্যুরের প্রথম দুই ম্যাচে ৬৭ ও অপরাজিত ৯৮ রানের দুই ইনিংসে।

মুশফিকুর রহিমকে নামতে দেখলেই শ্রীলঙ্কান বোলাররা যে এখন প্রমাদ গোনে, এতে তাই অবাক হওয়ার কিছু নেই। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম সিরিজ জয়ে মুশফিকুর রহিমেরই যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা, এতেও যেমন একটুও অবাক হচ্ছি না। বরং মনে হচ্ছে, দুবাইয়ের ওই রোদতপ্ত দিনটির পর থেকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মুশফিকের যে পারফরম্যান্স, তাতে এটা না হলেই বোধ হয় বেখাপ্পা লাগত!