আরে! আলিসন করছেনটা কী!

অস্ফুটে শব্দগুলো বেরিয়ে গেল।

ওয়েস্ট ব্রমের মাঠে তখন ম্যাচের ৯০ মিনিট তো শেষই, যোগ করা চার মিনিট সময়ের চতুর্থ মিনিট চলছে। লিভারপুল তখনো ১-১ সমতায়, কিন্তু আগামী মৌসুমের চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে লিগে নিজেদের ৩৭তম ম্যাচে এসে দলটার জন্য তখন জয় ছাড়া অন্য কিছু ভাবার সুযোগ নেই!

পয়েন্ট হারালে একেবারে সব যে শেষ হয়ে যেত, তা নয়, তবু জয় মানে শেষ ম্যাচের আগে লিগের সেরা চারে থেকে চ্যাম্পিয়নস লিগে যাওয়ার সমীকরণে নিজেদের ভাগ্য নিজেদের হাতেই রাখতে পারবে লিভারপুল। এ-ই যখন পরিস্থিতি, কর্নার পেল লিভারপুল। নিজের গোলপোস্ট ছেড়ে গোলের খোঁজে ওয়েস্ট ব্রম বক্সে চলে গেছেন লিভারপুল গোলকিপার আলিসন। গোলের সম্ভাবনা ছিল, তার হাত ধরে শঙ্কাও কি ছিল না? তখনো তো ম্যাচের কয়েক সেকেন্ড বাকি! যদি কর্নার থেকে গোল করার বদলে উল্টো পাল্টাআক্রমণে গোল খেয়ে যায় গোলপোস্ট খালি রাখা লিভারপুল?

দুরু দুরু কম্পমান বুকে অবিশ্বাস মাখানো সুখানুভূতি দিয়ে গেল পরের কয়েকটি সেকেন্ড।

লিভারপুর গোলকিপার আলিসন বেকারের হেডে বল গোলে ঢুকল বলে...আলিসন ওয়েস্ট ব্রম বক্সে ঢুকলেন কি ঢুকলেন না, ট্রেন্ট আলেক্সান্ডার-আরনল্ডের কর্নার ভেসে এল। পড়বি তো পড় আলিসনেরই মাথায়! ব্রাজিলিয়ান গোলকিপারের বাতাসে ভাসানো হেড, বল জালে! ম্যাচের শেষ শটে, গোলকিপারের গোলে দল জিতল!

সিএনজিতে বাসায় ফেরার পথে মোবাইলে কোনো একটা আরবি ভাষায় ধারাভাষ্য দেওয়া অ্যাপে খেলা দেখতে থাকা লিভারপুল সমর্থক মনের অবস্থাটা তখন কী, তা সহজেই বোধগম্য। ধারাভাষ্যের আগামাথা কিচ্ছু অবশ্য বোঝার উপায় ছিল না, কিন্তু বোঝার দরকারও কি ছিল!  

ফুটবল মাঝে মাঝে এমনই রোমাঞ্চ ছড়ানো! এ রোমাঞ্চ শব্দে বাঁধা কঠিন,  অনুভবে তো বাধে না!

একেবারে উন্মাতাল না হলেও বেশ রোমাঞ্চ ছড়ানো একটা ইউরোপিয়ান লিগ মৌসুমের শেষে পেছনে তাকিয়ে ওই গোলটার দিকেই বারবার মন ফেরার কারণ হয়তো এই চোখের সামনে অবিশ্বাসকে বাস্তব হতে দেখার এই অনুভূতি।

না হলে গল্পের খোঁজে ছবির অভাব ছিল নাকি! বার্সেলোনার খেদানো লুইস সুয়ারেজের আতলেতিকো মাদ্রিদে গিয়ে শিরোপা জিতে বার্সাকে কড়া জবাব দিয়ে দেওয়া, তার চেয়েও বেশি করে নিজেকে প্রমাণের আনন্দে উরুগুইয়ান স্ট্রাইকারের মনে গেঁথে যাওয়ার মতো কান্না, আতলেতিকোর সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের – তারও কিছুদিন আগ পর্যন্ত বার্সেলোনারও – শিরোপা লড়াইয়ে ধুন্দুমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা, দেশে দেশে লিগ জেতাকে তুড়ি মারার মতো সহজ বানিয়ে ফেলা দলগুলোকে হতাশ হতে দেখা... করোনায় জুবুথুবু বিশ্বেও ইউরোপিয়ান লিগগুলো দারুণ দেখাল বটে!

দেখুন না, সময়ের সেরা ফুটবলারদের নাম ‘লিস্টি’ করতে গেলে আপনি কোন নামগুলো সবার আগে লিখবেন? মেসি, রোনালদো, নেইমার, এমবাপ্পে, হরলান্ড, লেভানডফস্কি...এগুলোই তো? এর মধ্যে শেষেরজনকে বাদ দিন, বাকি কারও ভাগ্যে এবার লিগ জেতার সুযোগ হয়নি।

দলগত খেলা ফুটবলে ব্যক্তির হিসাবে যেতে বাধছে? তাহলে দলের হিসাবে বসা যাক। বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্টাস, পিএসজি, বায়ার্ন মিউনিখ...এখানেও শুধু বায়ার্নকে বাদ দিন, বাকি কূলীনদের ভাগ্যে এবার লিগ জোটেনি।

বার্সেলোনা মৌসুমজুড়ে তেমন কোনো বড় দলকেই হারাতে পারেনি, মাঝেমধ্যে ছোট দলের কাছেও হেরেছে। মেসি কেন এখনো ক্লাবটার নিকট ভবিষ্যতে শিরোপামঞ্চে থাকতে পারার সামর্থ্য নিয়ে সন্দিহান, কেন এই ৩৩ গড়িয়ে ৩৪-এ পা দেওয়ার পথে তিনি বার্সায় তাঁর এই মৌসুমে শেষে শেষ হতে যাওয়া চুক্তি এখনো নবায়ন করেননি (যদিও শেষ পর্যন্ত তাঁর বার্সায়ই থাকা ভবিতব্য বলে মনে হচ্ছে)...সেসব বুঝিয়ে দেওয়া মৌসুমে বার্সা লিগের শিরোপা-দৌড় থেকে ছিটকে গেছে লিগ শেষের সপ্তাহ দুয়েক আগে। ওহ, মাঝে হ্যাঁচোড়-প্যাঁচোড় করে স্প্যানিশ কাপটা জিতেছে বার্সা।

রিয়াল মাদ্রিদের আবার সেই সৌভাগ্যও হয়নি। ২০০৮-০৯ মৌসুমের পর প্রথম কোনো শিরোপাহীন মৌসুম। ভাগ্য এবার এতটাই মুখ ব্যাদান করে রেখেছে রিয়ালের দিকে যে, ৯৩২৫৪৮ চোট সামলেও জিনেদিন জিদান যে এবার দলটাকে শেষ দিন পর্যন্ত লিগের শিরোপার লড়াইয়ে রেখেছিলেন, শুধু সে জন্যই জিদানের বিশেষ ভাস্কর্য সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সামনে বানিয়ে রাখা যায়!

পেপে গার্দিওলার হাতে লিগ ট্রফি, ম্যানচেস্টার সিটির আরেকটি ট্রফি...ছবিটা তো সবার পরিচিতই হয়ে গেছে

ভাষ্কর্যের কথা যখন এল, পেপ গার্দিওলাকে নিয়ে এমন কিছু ম্যানচেস্টার সিটি বোধহয় বানিয়েই ফেলবে। শুধু একবার চ্যাম্পিয়নস লিগটা জিতে নিক সিটি! সেই ২০০৮ সালে আবুধাবির তেলে ধন্য হয়ে পরিচয় বদলানোর শুরুর দিন থেকে এদিকে নজর ছিল সিটির। সে জন্য কয় শ বিলিয়ন পাউন্ড খরচ করেছে তারা, সে হিসাবে গেলে মাথার চুল পেকে যেতে পারে। তার চেয়ে বর্তমানে নজর ফেরানো যাক। যা বলবে, সিটির এত অর্থ, সময়, শ্রম ব্যয়ের সাফল্য এল বলে! প্রথমবার চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে ওঠা সিটির সামনে ফাইনালে ইউরোপিয়ান শ্রেষ্ঠত্বের ট্রফিটা দ্বিতীয়বার জেতার স্বপ্নে বিভোর চেলসি।

লিগে তো সিটির চ্যাম্পিয়ন হওয়া নিয়ে শঙ্কা কারও ছিল বলে জানা যায়নি, মাঝে গত মৌসুমে লিভারপুলের দাপট বাদ দিলে গত চার মৌসুমে তৃতীয়বার লিগ শিরোপা ঘরে তুলল গার্দিওলার দল।

জার্মানিতে বায়ার্নের তুলনায় এ অবশ্য দুগ্ধপোষ্য শিশু! টানা নবম লিগ জিতল দলটা। জার্মানরা কেন যে বুন্দেসলিগার লড়াইটা দ্বিতীয় স্থান থেকে শুরু করে না!

ইতালিতে এ প্রশ্নটা গত মৌসুম পর্যন্তও করা যেত, এই মৌসুম সে হিসাব বদলে দিল। চড়া মূল্য দিয়ে জুভেন্টাস বুঝল, ক্লাবের সাবেক মিডফিল্ডারকে কোচ বানিয়ে দিলেই তিনি ‘জিনেদিন জিদান’ হয়ে যান না! গত নয় মৌসুম লিগ জেতা জুভ এবার কোচিংয়ে আনকোরা আন্দ্রেয়া পিরলোকে দায়িত্ব তুলে দিয়েছিল, হয়তো মনে মনে আশা ছিল, রিয়ালে প্রথম দফায় দায়িত্ব নিয়েই জিদান যেমন রিয়ালকে টানা তিন চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতিয়েছিলেন, তেমন কিছুই হবে। হলো অশ্বডিম্ব! লিগ-চ্যাম্পিয়নস লিগে মুখ থুবড়ে পড়া জুভেন্টাস শেষ পর্যন্ত শেষ ম্যাচে নিজেদের জয় আর ভাগ্যের কিছুটা জোরে চ্যাম্পিয়নস লিগে যে জায়গা করে নিয়েছে, তার আগে ইতালিয়ান কাপটা জিতেছে, এ-ই ঢের!

লিগ জিতলে না পারলেও ট্রফিশূন্য ছিলেন না ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ছবি: এএফপি

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য শেষটা সুন্দর হলো না, আর কী! এই মৌসুম শেষে রোনালদোর জুভেন্টাস ছাড়তে যাওয়ার গুঞ্জনের পালে এখন ঝোড়ো বাতাস। শেষ পর্যন্ত গুঞ্জন সত্যি হলে রোনালদোর মনে কাঁটা হয়ে থাকবে এই তথ্যটা যে, এবার লিগে শেষ ম্যাচে বাঁচা-মরার সমীকরণে তাঁকে নামানইনি জুভ কোচ পিরলো! তাঁকে ছাড়াই জুভেন্টাস সেদিন বোলোনিয়াকে হারিয়ে দিল ৪-১ গোলে।

রোনালদো জুভেন্টাসে যাওয়ার সময়ই বলা হতো, এই জুভেন্টাসকে লিগে বাড়তি কিছু দেওয়ার নেই রোনালদোর। পর্তুগিজ যুবরাজ চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতাতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তো হলোই না–রোনালদোর তিন মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগে আগেভাগেই বাদ পড়েছে জুভেন্টাস, পাশাপাশি রোনালদো যাওয়ার আগে টানা সাতবার লিগ জেতা জুভ রোনালদোকে নিয়ে গত দুই মৌসুমেও লিগ জেতার পর এবার তা-ও পারেনি।

সেটা না হয় দলগত ব্যর্থতা, কিন্তু গত রোববার লিগের অমন গুরুত্বপূর্ণ শেষ ম্যাচে রোনালদোকে এভাবে বেঞ্চে বসিয়ে রাখার কী ব্যাখ্যা? শুধু রোনালদো আজ ৩৬-এর ‘বুড়ো’ বলে, তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটু আগে কোনো কোচ এমন কিছু করার সাহস দেখালে সেটা ফৌজদারি অপরাধ বলেই গণ্য হতো! তাঁর চোট ছিল না। টানা খেলার ধকলের কথা বলবেন? যে রোনালদো ২০১৪ চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে হালকা চোট নিয়েও পুরো ১২০ মিনিট খেলেছেন বলে শোনা যায়, তিনি বাঁচা-মরার একটা ম্যাচে ভাঙা পা নিয়েও মাঠে নেমে পড়তে চাইবেন না–এমনটা ভাবা দুষ্কর।

লিগ হারানোদের টেবিলে রোনালদোর পেয়ালাসঙ্গী নেইমারও। এমবাপ্পেও। পিএসজির ফরাসি লিগ জেতার জন্য তো আর নেইমার-এমবাপ্পেকে লাগে না, কিন্তু এবার নেইমার-এমবাপ্পেকে নিয়েই পুঁচকে লিলের কাছে শিরোপা হারাল পিএসজি। লিগের মাঝপথে কোচ বদলেছে, টমাস টুখেলের বদলে এনেছে মরিসিও পচেত্তিনোকে, তাতেও ইতরবিশেষ হলো না!

গত মৌসুমে নিজেদের ইতিহাসে প্রথম চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে খেলা পিএসজি এবার সেখানে সেমিফাইনালে বাদ পড়েছে, লিগেও শেষ দিন পর্যন্ত লড়েও  লিলের ‘নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী’ হিসেবে তাদের শিরোপা উচ্ছ্বাস দেখেছে শুধু। ফ্রেঞ্চ কাপ জিতে কোনো রকমে মান বাঁচিয়েছে পিএসজি, মৌসুমটাতে বড় শিরোপাহীন থাকেনি।

ইতালিতে যেভাবে মান বাঁচিয়েছে রোনালদোর জুভেন্টাস, স্পেনে মেসির বার্সেলোনা। করোনা কীভাবেই না মিলিয়ে দিল সময়ের ফুটবলের সেরাদের! দুহাত ভরে দিল শুধু লেভানডফস্কিকে। গত বছর করোনার কারণে মাঝপথে থেমে যাওয়া মৌসুমে ফিফার বর্ষসেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন লেভা, এবার জার্ড মুলারের রেকর্ড ভেঙে জার্মান বুন্দেসলিগায় এক মৌসুমে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটা নতুন করে লিখলেন (৪১ গোল)। বুঝিয়ে দিলেন, অন্তত এদিক থেকে করোনার চেয়েও তিনি শক্তিশালী!

কিন্তু সবাই কি আর লেভানডফস্কি? সব দল কি আর বায়ার্ন?

রিয়াল-বার্সাকে পেছনে ফেলে আবারও লড়াইয়ের জয় ঘোষণা করেছে অ্যাটলটিকো মাদ্রিদ

একদিক থেকে দেখলে করোনা একটা সামাজিক বিপ্লবই ঘটিয়ে দিল! দেখুন না, ইউরোপে লিগে লিগে শিরোপা জিতে আসা দলগুলোর দাপট একযোগে কীভাবে ভেঙে গেল! স্পেনে রিয়াল-বার্সার দাপট ভেঙে অ্যাটলেটিকোর শিরোপা-উচ্ছ্বাস হলো সাত বছর পর, পর্তুগালে বেনফিকা-পোর্তোর শিরোপা-উচ্ছ্বাস দেখায় অভ্যস্ত চোখ কচলাতে বাধ্য করল রোনালদোরই প্রথম ক্লাব স্পোর্টিং লিসবন, ১৯ বছর পর লিগ গেল তাদের ঘরে; ফ্রান্সে লিলের শিরোপা-উচ্ছ্বাস দশ বছরের বিরতি দিয়ে, ইতালিতে ১১ বছর পর ইন্টার মিলানের শিরোপায় অবসান জুভেন্টাসের একাধিপত্য, স্কটল্যান্ডে সেল্টিকের ‘বাপ-দাদার সম্পত্তি’ হয়ে যাওয়া লিগ কেড়ে নিল রেঞ্জার্স–তিন বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে লিভারপুলের কিংবদন্তি অধিনায়ক স্টিভেন জেরার্ডের প্রথম শিরোপা, সেটাও আবার তাঁর দল জিতেছে পুরো মৌসুম অপরাজিত থেকে!

কত রঙ্গ জানো ফুটবল, কত রঙ্গ জানো!