ওয়ানডের অলিখিত কিছু নিয়মের মধ্যে একটি হলো, হাতে উইকেট থাকলে ৩০ ওভার শেষের স্কোর ৫০ ওভারে দ্বিগুণ করা যায়। এই ‘নিয়ম’ অনুযায়ী কাল বাংলাদেশের স্কোর হওয়া উচিত ছিল ২৭০।

৩০ ওভার শেষে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ১৩৫—এটা তো বুঝেই ফেলেছেন। উইকেট? উইকেট ছিল ৭টি। অথচ বাংলাদেশ করল ৪২ রান কম—২২৮। হাতে উইকেট থাকলেই তো হবে না, সেসবের ব্যবহার করতে জানতে হবে। কিন্তু ৩০ ওভারের পর থেকেই যে একের পর এক উইকেট বিসর্জন দেওয়া শুরু হলো। সবচেয়ে বড় সর্বনাশটা করল রান আউট। শেষ ৬ উইকেটের তিনটিই এর শিকার। আশরাফুল, হাবিবুল ও শরীফ।

টানা তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশের আগে ব্যাটিং। এর মধ্যে শুধু দ্বিতীয় ম্যাচে নিজেদের ইচ্ছায়। তবে ওই টসের ফলটাই শুধু পার্থক্য, নইলে তৃতীয় ওয়ানডের শুরুটা অবিকল দ্বিতীয় ম্যাচের মতো। আগের ম্যাচে ৩ ওভারের মধ্যে পড়েছিল ২ উইকেট, কাল এক বল বেশি লাগল। তামিম ও আফতাবের উইকেটের কোনোটিই বোলারের কৃতিত্বে নয়।

কাল খেলতে নেমেই একটা ইতিহাসমতো গড়ে ফেলেছেন তামিম ইকবাল। টেস্ট-পূর্ব যুগে বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডে খেলার কৃতিত্ব আছে মিনহাজুল ও নূরুল আবেদীন ভ্রাতৃদ্বয়ের। কাল তামিমের অভিষেকে টেস্ট-যুগে বাংলাদেশের হয়ে দুই ভাইয়ের ওয়ানডে খেলার একমাত্র দৃষ্টান্তটি স্থাপিত হলো। নাফিস ইকবালের পর তামিম ইকবাল। তাঁদের চাচা আইসিসি ট্রফিজয়ী বাংলাদেশ অধিনায়ক আকরাম খান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্রিকেট পরিবারের স্বীকৃতি তাঁদের পাওনাই হয়ে গেছে। ‘খান পরিবার’ বলা হবে, নাকি ‘ইকবাল পরিবার’—সিদ্ধান্ত নেওয়ার শুধু এটুকুই।

তামিম অবশ্য ইতিহাসের পাতায় কাল অন্তত আর কিছু যোগ করতে পারলেন না। পোফুর করা ম্যাচের প্রথম বলেই স্লিপে ক্যাচ দিয়েও বেঁচে গেছেন সিবান্দার ব্যর্থতায়। দ্বিতীয় ওভারে আয়ারল্যান্ডের বলে স্কয়ার ড্রাইভ করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথম রান করলেন। শেষও ওই ওভারেই। এরই মধ্যে আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর যে যৎসামান্য নাম হয়েছে, সেটির যৌক্তিকতা প্রমাণের দায় থেকেই কি না, মাথার ওপর দিয়ে যেতে থাকা আয়ারল্যান্ডের বাউন্সারে ব্যাট ছুড়ে দিয়ে ক্যাচ দিলেন ব্যাকওয়ার্ড স্কয়ার লেগে।

এটা তামিমের অভিষেক ম্যাচের ছবি নয়। সেই ছবি কোথাও পাওয়া যায় না বলেই কাছাকাছি সময়ের একটা ছবিতে সেই সময়ের তামিমকে খোঁজা

আফতাবও আয়ারল্যান্ডের শিকার। হুক করতে গিয়ে টপ এজ করে থার্ডম্যানে ক্যাচ। শাহরিয়ার নাফীসকে কাল শুরু থেকেই অন্য রকম লাগছিল। সাকিবের সঙ্গে পার্টনারশিপটির সময় আরও বেশি। মাত্র ২৬ রানের পার্টনারশিপ, কিন্তু দুজনের খেলার ধরন শুরুর বিপর্যয়টাকে অপূরণীয় কোনো ক্ষতি মনে করতে দিচ্ছিল না। যখনই এমন মনে হতে শুরু করেছে, তখনই চিগুম্বুরাকে ড্রাইভ করতে গিয়ে সাকিব কট বিহাইন্ড। নবম ওভারে বাংলাদেশ ৩ উইকেটে ৩৬—বাংলাদেশকে তখন আবারও দ্বিতীয় ম্যাচের মতো দেখাচ্ছে।

এরপর যা হলো, তা বিস্ময়! পঞ্চম উইকেটে ঠিক ১০০ রানের পার্টনারশিপটি নয়, বিস্ময় ওই পার্টনারশিপে শাহরিয়ারের নাফীসের পার্টনার। মুশফিকুর রহিম! হাবিবুল-আশরাফুলকে বসিয়ে রেখে আগে পাঠানো হলো খালেদ মাসুদের বিশাল ছায়া মাথায় নিয়ে এই সফরে আসা উইকেটকিপারকে। সিদ্ধান্তটা যারই হোক, সেটি প্রমাণিত হলো মাস্টারস্ট্রোক বলে। জুটিটিকে ৩২তম ওভার পর্যন্ত টেনে নিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের বড় স্কোরের দারুণ একটা ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন মুশফিকুর। ব্রেন্টকে পুল করতে গিয়ে টাইমিংয়ে গড়বড় করে মিড অনে ক্যাচ দেওয়ার আগে করলেন ওয়ানডে-সর্বোচ্চ ৪২ রান। ছাড়িয়ে গেলেন আগের ম্যাচের ২৭-কে।

আউট হয়ে মুশফিকুরের নিশ্চয়ই মন খারাপ হয়েছে, তবে দলীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর বিদায়টাকে মনে হচ্ছিল শাপে বর। বাকি আছে ১৮ ওভারেরও কম, হাবিবুল-আশরাফুল বসে আছেন, এরপর আছেন চার বোলার—যাঁদের প্রত্যেকেই ধুমধাড়াক্কা ব্যাট চালাতে পারঙ্গম। আউট হয়ে মুশফিকুর বাংলাদেশের উপকারই করলেন বলে মনে হচ্ছিল। বাংলাদেশের ২৬০-২৭০ করার পূর্বশর্ত ছিল একটাই, শাহরিয়ার নাফীসের টিকে থাকা। কারণ উইকেটে নতুন দুজন ব্যাটসম্যান হয়ে গেলেই সমস্যা। দশ বলের মধ্যে তা-ই হয়ে গেল। বাঁহাতি স্পিনার দাবেংওয়াকে অনসাইডে খেলতে গিয়ে শাহরিয়ার টপ এজ তুলে দিলেন মিড অনে। ৯৬ বলে ৬৯—শাহরিয়ারের বিচারে খুব ভালো স্ট্রাইক-রেট নয়। আরেকটু থাকলে হয়তো সেটি পুষিয়ে দিতে পারতেন—আউট হয়ে ফেরার সময় বুঝিয়েও দিলেন সেই হতাশা।

হাবিবুল ও আশরাফুলের জুটিটি জমে গেলে এ নিয়ে আক্ষেপ করার কিছু থাকত না। কিন্তু সেটি স্থায়ী হলো মাত্র ৩.২ ওভার এবং তা শেষ হলো আশরাফুলের রান আউটে। হাবিবুল মিড উইকেটে বল ঠেলেই দৌড় দিয়েছিলেন, আশরাফুল একটু দেরিতে দৌড় শুরু করায় ডাইভ দিয়েও চিগুম্বুরার ডিরেক্ট থ্রোকে হারাতে পারলেন না।

৩ উইকেটে ১৩৬ থেকে ৫ ওভারের মধ্যে বাংলাদেশ ৬ উইকেটে ১৪৯—এমন একটা ধস নিয়েও এমন হাহুতাশ করতে দিল না মাশরাফির ব্যাট। হাবিবুলের সঙ্গে ৯.১ ওভারে ৫১ রানের জুটি, এর মধ্যে মাশরাফিরই ২৯। আয়ারল্যান্ডের বলে বোল্ড হওয়ার আগের বলটিতে লং অনের ওপর দিয়ে এমনই বিশাল এক ছক্কা মেরেছেন যে, স্টেডিয়ামের বাইরে গিয়ে পড়া বল আর খুঁজেই পাওয়া যায়নি। এর আগের ওভারেই উইলিয়ামসের বলে প্রথম ছক্কাটিও লং অনের ওপর দিয়ে।

বাকি ২৫ বলে ২৮ রান উঠেছে, উইকেট পড়েছে আরও দুটি। তাঁর স্ট্রেট ড্রাইভ বোলার পোফু ঠেকিয়ে দেওয়ার পরও দৌড় শুরু করে হাবিবুলের রান আউটটির দায় শরীফের। একটু পরে রান আউট হয়েছেন তিনি নিজেও। শেষ দুই ওভার খেলেছে বাংলাদেশের শেষ জুটি। রান উঠেছে ১৭, এর মধ্যে শেষ ওভারেই ১২—প্রতিটি বলেই চালিয়ে দুটিতে লাগাতে পেরেছেন তাপস। সে দুটিই ছক্কা।  স্কোরবোর্ডে ২২৮।

শুরুর কথা ভাবলে খুশি হওয়ার মতো। কিন্তু শুরুর ওই বিপর্যয় যে ভুলিয়ে দিয়েছিল শাহরিয়ার নাফীস ও মুশফিকুর রহিমের ওই জুটি। এরপর তো ২৬০-২৭০ করে ম্যাচটা শেষ করে দেওয়ার সুযোগ ছিল। ইনিংসের শেষ বলে ছক্কাও সেই সুযোগ নষ্ট করার আক্ষেপে যথেষ্ট সান্ত্বনা হতে পারে না বলে লাঞ্চের সময় থমথমেই থাকল বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম।

আরও পড়ুুন: ম্যাচ রিপোর্ট: সাকিবের বাঁ হাতই জেতাল বাংলাদেশকে