সত্যি কথা যদি বলি, ম্যাচটার দিকে ফিরে তাকিয়ে নিজেকে যখন জিজ্ঞেস করছি, সবচেয়ে বেশি কী এনজয় করেছ, আমার চোখে ভেসে উঠছে ওয়ানিন্দু হাসারাঙ্গার মুখ। সবার সঙ্গে মিলে যাবে, এটা আশা করি না। তবে আমার ধারণা, আপনাদের কেউ কেউ হয়তো আমার সঙ্গে একমত হলেও হতে পারেন। খেলা যদি বিনোদন হয়, তাহলে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ওয়ানডেতে তা এই শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডারের বেশি আর কে জুগিয়েছেন!

মূল পরিচয় লেগ স্পিনার, তবে ৬০ বলে ৭৪ রানের ইনিংসটি মাত্রই দেখার পর হাসারাঙ্গাকে 'অলরাউন্ডার' না বলাটা অন্যায়ই মনে হচ্ছে। ব্যাট করতে নামার সময় টিভি পর্দায় ভেসে ওঠা রেকর্ড দেখছিলাম। একটা হাফ সেঞ্চুরিও দেখি আছে! তার মানে ব্যাটিং প্রতিভার প্রমাণ হাসারাঙ্গাই আজই প্রথম রাখেননি, তবে এর আগে এমন করে নয়। ৩টি চার আর ৫টি ছয় এমন অপূর্ব টাইমিংয়ে যে, আমার মনের কথাটা দেখি আতহার আলী খান কমেন্ট্রিতে বলতে শুরু করেছেন! এত সুন্দর ব্যাটিং, তাহলে হাসারাঙ্গা কেন আট নম্বরে নামছেন?

সব দেশের সমর্থকই প্রিয় দলের জয় চায়। তবে বাংলাদেশের সমর্থকদের আবেগ দেখে মাঝেমধ্যেই মনে হয়, আর কোনো দেশের মানুষ মনে হয় আবেগে এমন টইটুম্বুর নয়। এমন হলে সমস্যা যেটা হয়, প্রতিপক্ষ দলের কোনো কিছুই আর ভালো লাগে না। তবে হাসারাঙ্গার ব্যাটিংটা শুরুর দিকে আমার ধারণা, সবাই এনজয় করেছেন। এই ম্যাচে বাংলাদেশের জয় যে ততক্ষণে এক রকম নিশ্চিত হয়ে গেছে। 'এক রকম নিশ্চিত' বলার প্রথম কারণ তো অবশ্যই খেলাটা ক্রিকেট বলে। অনিশ্চয়তা যার অন্য নাম। আরেকটা কারণ, নিশ্চিত পরাজয় জেনে ব্যাটিং করতে নামা হাসারাঙ্গা ম্যাচটা এমন একটা অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন যে, মনে হচ্ছিল, কে জানে, ক্রিকেটে কত অদ্ভুত ঘটনাই তো ঘটে। আজও তেমনই একটা দিন কি না!

বিনোদনের কথা বললে প্রথম ওয়ানডেতে তা সবচেয়ে বেশি সরবরাহ করেছে হাসারাঙ্গার ব্যাটিং। ছবি: এএফপি

নেমেছেন ১০২ রানে ৬ উইকেট পড়ে যাওয়ার পর। জয় তখনো ১৫৬ রান দূরে। আউট হয়ে যাওয়ার আগে সমীকরণটাকে নামিয়ে এনেছিলেন ৩৭ বলে ৪৭ রানে। হাসারাঙ্গা থাকলে যা হয়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু ছিল না। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে ধন্যবাদ দিতে পারেন। দেওয়াই উচিত। তবে স্কোরকার্ডে হাসারাঙ্গার ডিসমিসালের বর্ণনায় ফিল্ডার-বোলারের নামের পাশে ছোট করে হলেও 'প্রচণ্ড গরম' কথাটা লিখে রাখতে পারলে ভালো হতো মনে হয়। ছাদের নিচে ফুল স্পিডে চলতে থাকা ফ্যানের নিচে বসেও যে গরমকে অসহ্য বলে মনে হচ্ছিল, সেই গরমে রোদে পুড়ে সাড়ে তিন ঘণ্টা বোলিং-ফিল্ডিং করার পর অমন ব্যাটিং...হাসারাঙ্গার উইকেটটা নিয়েছে আসলে 'ক্লান্তি'-ই।

তবে যতটুকু করেছেন, এটা তো বোনাসই। আট নম্বর ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন ব্যাটিং কেউ আশা করে না। বাংলাদেশের জেতার কথা ছিল, বাংলাদেশই জিতেছে, তবে একেবারেই একপেশে সমাপ্তির দিকে এগোতে থাকা মরা ম্যাচে একটু প্রাণ সঞ্চার করার জন্য হাসারাঙ্গার জন্য জোরে একটা হাততালি হয়ে যাক। 

সবচেয়ে বড় হাততালিটা অবশ্যই বরাদ্দ রাখতে হবে মুশফিকুর রহিমের জন্য। টু-পেসড্ উইকেট, হাসারাঙ্গাকে ব্যতিক্রম ধরলে কোনো ব্যাটসম্যানই এখানে হাত খুলে খেলতে পারেনি। সেই উইকেটে মুশফিকের ৮৭ বলে ৮৪ রীতিমতো এক মাস্টারক্লাস। ম্যাচ-সেরার পুরস্কার নিয়ে যিনি নিজের শারীরিক আকৃতির কথা বলে কাইরন পোলার্ড আর আন্দ্রে রাসেলকে টেনে আনলেন বিপরীত উদাহরণ হিসেবে। প্রচণ্ড গায়ের শক্তি ছাড়া এই উইকেটে ইচ্ছামতো চার-ছয় মারা আসলেই অসম্ভব। সেটির অনুপস্থিতির কথা জানেন বলে মুশফিক সেই চেষ্টাও করেননি। খেলেছেন নিজের সীমাবদ্ধতা অনুযায়ীই। উইকেটের কারণেই তাঁর এই ৮৪-কে অনেক সেঞ্চুরির চেয়েও মহিমান্বিত বলে মনে হচ্ছে।

পঞ্চম উইকেটে মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে তাঁর ১০৭ রানের পার্টনারশিপটিও যে কারণে একটু বেশি নম্বর পাওয়ার দাবি জানায়। ব্যাটিং-স্কিলের সঙ্গে যা আসলে অভিজ্ঞতারও জয়গান। পরপর দুই বলে উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ ৪ উইকেটে ৯৯; ওই পরিস্থিতিতে, এই উইকেটে যা দরকার ছিল, ঠিক তা-ই করেছেন তাঁরা দুজন। চার-ছয়ের কথা বেশি না ভেবে নিরাপদ এক-দুইয়ে সচল রেখেছেন রানের চাকা। শেষ দিকে আফিফ আর সাইফউদ্দিনেরও একটু অবদানে বাংলাদেশ ২৫০ পেরিয়ে যাওয়ার পরই আসলে লেখা হয়ে গিয়েছিল এই ম্যাচের ভাগ্য। 

এই জয়ে আনন্দের চেয়ে স্বস্তিই হয়তো বেশি পেয়েছেন তামিম ইকবাল। শুধুই নির্ভেজাল আনন্দের একটা কীর্তিতেও অবশ্য আজ নাম লেখা হয়েছে তাঁর। ছবি: বিসিবি

বাংলাদেশের ইনিংসের সময়ই ভাবছিলাম, এই উইকেটে মোস্তাফিজকে খেলতেই পারবে না শ্রীলঙ্কানরা, বাংলাদেশের সাকিব-মিরাজও ভালোই ভোগাবে। মিরাজ ধারণার চেয়ে একটু বেশিই ভোগালেন। হাসারাঙ্গা অমন প্রলয় নাচন নাচতে শুরু না করলে তো ওয়ানডেতে তাঁর সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডটাই হয়ে যায়। ৮.৪ ওভার শেষে মাত্র ১৪ রানে ৪ উইকেট। উইকেট এই ৪টিই থাকল, কিন্তু রানের ঘরে যে '৩০', এর মূলে তো ওই হাসারাঙ্গাই। মিরাজের শেষ ছয় বলে ১৬ রান, যাঁর ১৫-ই হাসারাঙ্গার ব্যাট থেকে। এর মধ্যে সোজা যে ছয়টা মারলেন, তা সম্ভবত পুরো ম্যাচেরই সেরা শট। যে কারণে ওয়ানডেতে মিরাজের তৃতীয়বারের মতো 'ফোর উইকেট হল' তাঁর তৃতীয় সেরাই হয়ে থাকল। আগের দুবার ৪ উইকেট যে ২৯ আর ২৫ রান দিয়ে।

যেকোনো জয়েই আনন্দ থাকে। বাংলাদেশের এই জয়ে অবশ্য আনন্দের চেয়ে বেশি মনে হয় স্বস্তি। টানা পরাজয়ের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার স্বস্তি। টানা পরাজয় কথাটা অবশ্য ঠিক হলো না। কারণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩-০তে ওয়ানডে সিরিজ জেতার পর টেস্ট সিরিজ এবং এরপর নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা সফর মিলিয়ে জয়হীন যে দশ ম্যাচ, তার একটায় তো বাংলাদেশ হারেনি। তারপরও লেখার টানে যে টানা পরাজয়ের বৃত্ত কথাটা চলে এলো, তার কারণ আগে-পরে টানা পরাজয়ের স্রোতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম টেস্টে সেই ড্রয়ের ভেসে যাওয়ার উপক্রম!

অনেক দিন পর জয় পাওয়ার স্বস্তি তো আছেই। তামিম ইকবালের এর চেয়ে বেশি না হলেও, অন্তত সমান স্বস্তি পাওয়ার কথা এই ভেবে যে, ম্যাচটা হারলে বোর্ড সভাপতি রীতিমতো ঢংকা-নিনাদ বাজিয়ে চারপাশ আরও সচকিত করে তুলতেন। বাংলাদেশের ইনিংসশেষেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যাটসম্যানদের শট নির্বাচন নিয়ে তাঁর ফেটে পড়ার কথা নিশ্চয়ই অধিনায়কের কানে গেছে। শুধু শট নির্বাচন নিয়ে সমালোচনাতেই শেষ নয়, কোচের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন, লিটনের কোথায় ব্যাট করা উচিত...এসব নিয়েও অকাতরে নিজের মতামত দিয়েছেন তিনি। ম্যাচের মাঝখানে বোর্ড সভাপতিসুলভ কথাই বটে! নাজমুল হাসান অবশ্য কখনোই এসব রীতিনীতির ধার ধারেন না।

উইকেট নিয়েছেন একটাই। তাতেই একটা মাইলফলক ছুঁয়ে ফেলেছেন সাকিব আল হাসান। ছবি: বিসিবি

বোর্ড সভাপতির আবারও খবর হওয়ার কথা বলতে গিয়ে খেলা থেকে দূরে সরে গেলাম। তা নিয়ে অবশ্য আর বেশি কিছু বলারও নেই। শুধু দুইটা তথ্য জানিয়ে শেষ করি। ব্যাটিং-বোলিংয়ে বাংলাদেশের দুই ক্রিকেটারের দুটি মাইলফলক ছোঁয়ার কথা আর কি! হাফ সেঞ্চুরি করার পথে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দশম ওপেনার হিসেবে ১৪ হাজার রান পূর্ণ হয়েছে তামিম ইকবালের। স্বীকৃত ক্রিকেটে ৯৯৯ উইকেট নিয়ে এই ম্যাচ শুরু করা সাকিব আল হাসান সংখ্যাটাকে নিয়ে গেছেন চার অংকে।

৩৩ রানে জয়ে আনন্দ বেশি না স্বস্তি, এই প্রশ্ন তুলেছিলাম। এই দুই অর্জনের ক্ষেত্রে সেই সমস্যা নেই। এখানে শুধুই আনন্দ।