লেখার শিরোনামটা শুনে আমিনুল আপত্তি করলেন। ‘না, না, শত্রু কেন? বিপ্লবকে আমি এখনো ভালো বন্ধু বলে জানি। ভবিষ্যতেও তা-ই জানব।’

কিন্তু বিপ্লব! বিপ্লব কী বলেন? সরাসরি ‘শত্রু’বলতে তাঁরও আপত্তি, তবে কণ্ঠে বন্ধুত্বের জয়গানটা আমিনুলের মতো জোরালো নয়।‘আমি চাই, আমিনুল যেন ভালো খেলে। সবকিছুর ওপরে তো দেশ।’

দেশ তো অবশ্যই সবার ওপরে। কিন্তু এই বৃহত্তর ছবিটা থেকে বেরিয়ে প্রসঙ্গ যখন আমিনুলের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব, তখন আর বিপ্লব সবার পরিচিত প্রাণোচ্ছল-আমুদে বিপ্লব নন। তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভ, তিক্ততা, বিশ্বাসভঙ্গের কষ্ট মিলেমিশে একাকার। কিন্তু এত দিনের বন্ধুর ওপর রাগ হলেও তাতে কি একটু অভিমানও মিশে থাকার কথা নয়!‘আমি তো আমিনুলকে সব সময়ই বন্ধু ভেবে এসেছি। কিন্তু কার মনে কী আছে, এটা কি আর বোঝা যায়!’—এ কথায় অভিমানের ছোঁয়া খুঁজে পেতে চাইলে পেতেও পারেন।

তবে বিপ্লবের পরের কথাটাই যে ধাক্কা দিয়ে আপনাকে জানিয়ে দেবে, ব্যাপারটা আর দুই বন্ধুর মান-অভিমানের পর্যায়ে নেই। আমিনুলের বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ এনে বিপ্লবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত,‘আসলে মন থেকে ও (আমিনুল) কখনোই আমাকে সহ্য করতে পারেনি।’

এ তো বিরাট এক আবিষ্কার! ‘কার মনে কী আছে’, এটা বোঝা আসলেই সহজ নয়। তাই বলে কি এমনই কঠিন যে, তা বুঝতে ১৩-১৪ বছর লেগে যাবে! সেই ১৯৯৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ বাংলাদেশ দলে খেলার সময় দুজনের পরিচয়, বন্ধুত্ব হতেও একদমই সময় লাগেনি। এর পর অনূর্ধ্ব-১৯ হয়ে মূল জাতীয় দল—গোলকিপারের একটা মাত্র জায়গা নিয়ে দুজনের মধ্যে মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা...তার পরও অমলিন দুজনের বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্বের কত জয়গান লেখা হলো পত্রপত্রিকায়। বিপ্লব-আমিনুলের হাসিমুখ যুগল ছবি হয়ে গেল অনাবিল বন্ধুত্বের অনুচ্চার ঘোষণা। আমরা মনে মনে হাততালি দিলাম—দেখো, দলে একটাই জায়গা, সেই জায়গাটা নিয়ে লড়াই করেও কেমন বন্ধু থাকা যায়! জয় বন্ধুত্বের জয়!

অথচ সেই বন্ধুত্বের অবশিষ্ট কঙ্কালটা যে এখন মুখ ব্যাদান করে সবার দিকে তাকিয়ে! বিপ্লব যে নিঃসংশয় হয়ে সিদ্ধান্তটাও ঘোষণা করে দিচ্ছেন, ‘আমিনুল আমাকে মন থেকে কখনোই সহ্য করতে পারেনি!’ যা শুনে আমিনুলের দুঃখ পাওয়া স্বাভাবিক, তবে সেই দুঃখকে ঢেকে রাখতে চাইলেন যুক্তির আবরণে, ‘ও হয়তো বাদ পড়ায় খুব আপসেট। এ কারণেই এসব বলছে। তবে ওর কাছ থেকে আমি এসব কথা আশা করিনি।’

আশা করার তো প্রশ্নই ওঠে না, আমিনুল কখনো ভাবেননি, এমন কথাও অনেকই বলেছেন বিপ্লব। তার মধ্যে সবচেয়ে ভদ্রস্থটি হলো—আমিনুলের মতো কোচকে‘তেল’ দিতে না পারাটাই তাঁর বাদ পড়ার কারণ। সমস্যা হলো, এটিতে সাফ ফুটবলের দল থেকে বিস্ময়করভাবে তাঁর বাদ পড়ার পুরো ব্যাখ্যা হয় না। একাদশে না হয় একজনই খেলবে, স্কোয়াডে তো আরও দুজন গোলকিপারের জায়গা আছে। বিপ্লব এই ফাঁকটা ভরে দিচ্ছেন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে—আমিনুলই তাঁর বাদ পড়ার ব্যাপারে কলকাঠি নেড়েছেন।

শুনে আমিনুল যারপরনাই ব্যথিত, ‘আপনিই বলুন, আমার কী ক্ষমতা আছে বিপ্লবকে বাদ দেওয়ার? বরং ও বাদ পড়ায় আমি খুবই অবাক হয়েছি। আমি মনে করি, ওর বাদ পড়া ঠিক হয়নি। কোচকে আমি জিজ্ঞেসও করেছি, বিপ্লবকে কেন বাদ দিয়েছেন?’এত বছর দুজন একসঙ্গে খেলতে পারলে এখন কেন বিপ্লবকে বাদ দেওয়ার‘চক্রান্ত’ করবেন, এই যৌক্তিক প্রশ্নটাও তুললেন আমিনুল।

তা বিপ্লবকে ফোন করে তাঁর ভাষায়‘ভুল বোঝাবুঝি’টা মিটিয়ে ফেললেই পারেন আমিনুল। আমিনুল হাসলেন, ‘আমি তো ওকে চিনি। ও এখন কিছুই বুঝতে চাইবে না। বিপ্লব একটু চঞ্চলমতি, ও হুটহাট অনেক কিছু বলে ফেলে। এর আগে আপনাদের পত্রিকাতেই তো বিদেশি কোনো কোচ এলেই আমাকে কেন পছন্দ করে—এটা নিয়ে ওর ক্ষোভের কথা বলেছে। বলুন, এটা কি আমার দোষ?’

বিপ্লবকে চঞ্চলমতি বলছেন, তবে বন্ধুর প্রতি একটু প্রশ্রয়মিশ্রিত ভালোবাসার ছোঁয়াও কি থাকল তাতে! আট বছর আগে প্রথম আলোয় ছাপা হওয়া দুই বন্ধুর গল্পে এটাকেই তো বিপ্লবকে পছন্দের কারণ হিসেবে দেখিয়েছিলেন আমিনুল, ‘বিপ্লবকে কে না পছন্দ করে! চঞ্চল-প্রাণবন্ত...পুরো দলকে ও মাতিয়ে রাখে।’এবার বিপ্লব দলে নেই বলেও তো আমিনুলের আক্ষেপ, ‘বিপ্লব ছাড়া জাতীয় দল আমি চিন্তাই করতে পারি না। মাঠের বাইরের মজাটাই তো আর আগের মতো থাকবে না।’

আট বছর আগে বিপ্লবও বলেছিলেন, ‘আমিনুলকে আমি বেশি পছন্দ করি, কারণ ও খুব ভালো ছেলে।‘ আট বছর অনেক সময়। পারস্পরিক এই ভালোবাসায় ঘুণ তো ধরতেই পারে। তা সেটি ধরল কখন? আমিনুল মনে করতে পারেন না। বিপ্লব পারেন। বিকেএসপিতে শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে আট ফুটবলারকে কোচ ডিডোর দল থেকে আলাদা করে দেওয়ার ঘটনা থেকেই তাঁর আমিনুল-বিরাগের শুরু। বিপ্লবের অভিযোগ, তিনি বারবার বলার পরও কোচের সঙ্গে কথা বলে আমিনুল ব্যাপারটা মিটিয়ে ফেলার কোনো উদ্যোগ নেননি। আমিনুলের বক্তব্য, এ ব্যাপারে কোনো অনুরোধ না করতে কোচ তাঁকে পরিষ্কার নিষেধ করে দিয়েছিলেন।

তা হলে কী হবে এই লেখার উপসংহার—একটি বন্ধুত্বের মৃত্যু? দাঁড়ান, দাঁড়ান, এখনই এই গল্পের এমন বিয়োগান্ত সমাপ্তি টেনে ফেলবেন না। আমিনুল যে ‘বন্ধুত্বের মৃত্যু’ কথাটা শুনেই আঁতকে উঠলেন, ‘তা কেন হবে? ও ভুল বুঝেছে। সময় হলে ঠিকই সব বুঝবে।’ আমিনুল সম্পর্কে এত বিষোদগারের পরও বিপ্লবের শুভকামনা,‘আমি উইশ করি, আমিনুল যেন সারা জীবন খুব ভালো থাকে।’ 

কী বুঝলেন?

পুনর্মিলনের দৃশ্য বড় সুন্দর। আমরা না হয় সেটিরই অপেক্ষায় থাকি!