লোকে-মুখে যত সমস্ত আলোচনা-সমালোচনা চলে, তাতে যে কারও বিভ্রান্ত হওয়াটাই স্বাভাবিক। রেকর্ড বই দেখাচ্ছে, তাঁর নেতৃত্ব মেনে বাংলাদেশ খেলতে নামছে, এমন ঘটনা ঘটেছে মাত্র নয় বার; কিন্তু এতেই 'তামিমের অধিনায়কত্ব ভালো, মন্দ নাকি বাজে' জাতীয় আলাপে বাক্যব্যয় হয়েছে অজস্র, হচ্ছে এখনো। কে জানে, তামিম যে দায়িত্ব নিয়েছেন, তাতে হয়তো আতশকাঁচের তলায় থাকাটাই নিয়তি।

আর ক্রিকেটে অধিনায়কের ওপর পাদপ্রদীপের আলোটা বাড়তি করে থাকে বলেই শুভ্র.আলাপের অতিথি হয়ে এসে নিজের অধিনায়কত্ব দর্শন ব্যাখ্যা করতে হয়েছিল তামিমকে। তামিমের আগেই যে কাজ করে গিয়েছেন তাঁর অগ্রজ নাফিস ইকবালও। যদিও ক্রিকেটীয় আলাপে 'ভাই' পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তামিমকে যে আর দশজন ক্রিকেটারের মতোই বিচার করেন তিনি, পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে বিদ্ধ হওয়ার আগেই এই তথ্য জানিয়ে দিয়েছিলেন নাফিস।

তো বিশ্লেষক নাফিসের চোখে অধিনায়ক তামিম কেমন? প্রশ্নটা অবশ্য লম্বা ভূমিকা টেনেই উত্থাপন করেছিলেন উৎপল শুভ্র, যেখানে মিশে ছিল অধিনায়ক তামিমকে নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণও। অন ফিল্ড ক্যাপ্টেনসিতে সাকিবের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করে নিলেও অধিনায়কত্বের ম্যান ম্যানেজমেন্ট অংশটায় তামিমের দক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা ঝরে পড়ছিল তাঁর কণ্ঠে। ম্যান ম্যানেজমেন্টে মাশরাফির মুন্সিয়ানা তো সর্বজনস্বীকৃত, সতীর্থদের মধ্যে 'শিষ্য' শব্দটা না খাটলেও তামিমকে ম্যান ম্যানেজমেন্টের দিকটায় মাশরাফির শিষ্যই বলতে চান উৎপল শুভ্র।

তবে এই মাশরাফি না থাকলেই কিন্তু তামিম অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেতে পারতেন আরও বছর সাতেক আগেই। সেই যে ২০১৪ শ্রীলঙ্কা সিরিজের টি-২০ আগে ছিটকে গেলেন নিয়মিত অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, তরিকা ঠিকঠাক অনুসরণ করলে সহ-অধিনায়ক তামিমেরই পা গলানোর কথা ছিল সে জুতোয়। তবে বিসিবি হেঁটেছিল অন্য পথে, হুট করে অধিনায়ক বানিয়ে দিয়েছিল মাশরাফিকে। তামিমকে তাই অপেক্ষা করতে হলো মাশরাফি দায়িত্ব ছাড়া পর্যন্ত।

তবে ঘরোয়া ক্রিকেটে দীর্ঘদিন তামিমের নেতৃত্ব দেখার অভিজ্ঞতায় নাফিস ইকবাল বলছেন, ক্যারিয়ারের যে পর্যায়ে এসে তামিম অধিনায়কত্বের দায়িত্ব পেলেন, সেটাই তাঁর জন্য আদর্শ হয়েছে। 'আমার মনে হয় তামিম এখন যে ক্যাপ্টেনসিটা পেয়েছে, একদম রাইট টাইমে পেয়েছে। ও ম্যাচিউরড হয়েছে। ওর মধ্যে অনেক চেঞ্জ এসেছে, যেটা পাঁচ বছর আগে ছিল না। ম্যানেজার হিসেবে ডোমেস্টিক ক্রিকেটে আমি তো ওর পক্ষের চেয়ে বিপক্ষেই বেশি কাজ করেছি। তো আমি দেখেছি, ক্যাপ্টেন হিসেবে ও নিজেকে কীভাবে তৈরি করেছে।'

ওয়ারডে অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফির যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জ তামিমের সামনে। ছবি: বিসিবি

অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফিকে ঠিক অনুকরণ করেন না তামিম, তবে মাশরাফির সঙ্গে তাঁর বেশ বড়সড় একটা মিলও ধরা পড়েছে নাফিসের চোখে। জাতীয় দলে খেলার সময় মাশরাফির দরজা যেমন উন্মুক্ত ছিল সবার জন্য, তামিমেরও তা-ই। '(শুভ্রদা) আপনি হয়তো জানেনও, মাশরাফির দরজা কখনো বন্ধ হতো না৷ বাইরে থেকে গিয়ে আমিও অনেক সময় ওর রুমে আড্ডা দিতে গিয়েছি৷ এখন মাশরাফি নেই, কিন্তু এখন তামিমের দরজাটা খোলা থাকে। ইটস নট দ্যাট তামিম ফলো করে, আমরা যখন একসাথে হই, ও (তামিম) কিন্তু সুন্দর একটা আড্ডা জমিয়ে ফেলে। এই একটু আড্ডা দেওয়া, সবাই একসাথে থাকা-- এগুলো ওর ক্যারেক্টারের মধ্যেই ছিল। আপনি যখন বাইরে যান, এগুলো একটা বন্ড তৈরির জন্য খুব ভালো কাজ করে। একটা দল হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য এটা খুবই ভালো সাইন।'

এই দল হিসেবে গড়ে উঠতেই কিছুটা সময় লাগে বলে তামিমের অধিনায়কত্ব বিচার করার আগে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে বললেন নাফিস। নয় ম্যাচে তামিম মাত্র তিন জয় পেলেও এখনই হা-হুতাশ করার মতো কিছু হয়েছে বলে মনে করছেন না তিনি, 'এমনি এমনি তো হয় না, আপনাকে একটা এনাফ টাইম দিতে হবে ক্যাপ্টেন হিসেবে টিমটাকে গ্রুম করার। ওই এনাফ টাইমটা যেন ও পায়।'

উৎপল শুভ্রের কণ্ঠেও অনুরণন ঘটল নাফিসের কথারই। ২০২৩ বিশ্বকাপ এখনো দু'বছর দূরে, মাঝের সময়টায় অনেক কিছুই হতে পারে-- এ সব সমীকরণ মাথায় রেখেও তিনি বললেন, 'তাঁর মনে যেন ওই কনফিডেন্সটা থাকে, এখন থেকে দেড় বছর-দু' বছর পরের পরিকল্পনা নিয়ে ভাবতে পারে।'

প্রশ্নটা হচ্ছে, বিসিবিও কি এমন করেই ভাবে?