এমন কিছুই করতে হতো সাঈদ আনোয়ারকে! এখন ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিংয়ের কোনো আলোচনাই আর তাঁকে বাদ দিয়ে হবে না। এই বাঁহাতি ওপেনারের ব্যাটে দ্যুতির অভাব হয়েছে খুব কমই, অথচ তাঁকে ঘিরে তারকাখ্যাতির বলয়টা বিস্ময়করভাবে সে রকম বড় হয়নি কখনও। একজন ব্রায়ন লারা বা একজন শচীন টেন্ডুলকারের মতো সুপারস্টার তিনি কখনোই ছিলেন না। যদিও সাঈদ আনোয়ারের কথা উঠলে সবাই স্বীকার করেছেন, লারা-টেন্ডুলকারের তুলনায় খুব বেশি পিছিয়ে নেই তিনি। আর এখন এসব স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকতে হবে না সাঈদ আনোয়ারকে। বরং লারা-টেন্ডুলকাররা এখন ইন্টারভিউ দিতে বসলেই একটা অবধারিত প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন, ‘সাঈদ আনোয়ারের রেকর্ডটি ভাঙার ব্যাপারে আপনি কতটুকু আশাবাদী?’

ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে দীর্ঘজীবি রেকর্ডটি ভেঙেছেন সাঈদ আনোয়ার। অধুনা চেন্নাই নামে পরিচিত মাদ্রাজের চিদাম্বরম স্টেডিয়ামে গতকাল গড়েছেন এই ইতিহাস। ২৬ বছর বয়সী ওয়ানডে ক্রিকেটে এক ইনিংসে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ডটি এখন তাঁর। কাল ইন্ডিপেন্ডেন্স কাপে ভারতের বিপক্ষে দারুণ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচটির আগে ১১৯টি ওয়ানডের ১১৮টি ইনিংসে আনোয়ারের ১১টি সেঞ্চুরি থাকলেও তাঁর একটিও ভারতের বিপক্ষে ছিল না। ভারত ও পাকিস্তানের ক্রিকেটাররা সব সময় তাঁদের সেরা খেলাটা ভারত-পাকিস্তান ম্যাচেই খেলতে চায়। সাঈদ আনোয়ারও হয়তো বড় কিছু করবেন বলে এর আগে সেঞ্চুরিই করেননি ভারতের বিপক্ষে!

ক্রিকেট বইয়ে যত শট আছে, সবই সেদিন খেলেছিলেন সাঈদ আনোয়ার

মাত্র ৬ রানের জন্য সেই ‘বড় কিছু’ ডাবল সেঞ্চুরিতে রূপ পায়নি। ইনিংসের ৪৭তম ওভারে আউট হয়ে গেছেন ১৯৪ রানে। ওয়ানডে ক্রিকেটের ২০০৬ ম্যাচের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের ইনিংস। সাঈদ আনোয়ার ভেঙেছেন ভিভ রিচার্ডসের রেকর্ড। ১৯৮৪ সালের ৩১ মে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওল্ড ট্রাফোর্ডে অপরাজিত ১৮৯ রানের যে অতিমানবীয় ইনিংসটি খেলেছিলেন রিচার্ডস, প্রায় তের বছর পর সেটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ইনিংসে পরিণত করলেন আনোয়ার। টেন্ডুলকারের বলে ব্যাকওয়ার্ড স্কোয়ার লেগে সৌরভ গাঙ্গুলীর দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত হওয়ার আগে খেলেছেন ১৪৬ বল, চার মেরেছেন ২২টি, ছয় ৫টি।

৮২ বলে পূর্ণ হওয়া তাঁর সেঞ্চুরিটিতে ছিল ১২টি চার ও ২টি ছয়। এর মধ্যে ৪৪ বলে আসে সেঞ্চুরির প্রথম ফিফটি ( ৭টি চার, ১টি ছয়), ৩৮ বলে দ্বিতীয়টি (৫টি চার, ১টি ছয়)। সেঞ্চুরির পর বাকি ৯৪ রান করতে তাঁকে বল খেলতে হয়েছে মাত্র ৪৫টি। ষাটের ঘরে যাওয়ার পরই পায়ের পেশিতে টান পড়ে, দলে ফেরার আগে দীর্ঘদিনের অসুস্থতার ক্লান্তিও ছিল, তাই ইনিংসের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি রানার নিয়ে ব্যাট করতে হয়েছে তাঁকে। তবে চার আর ছয়ের দিকেই বেশি মনোযোগী হয়ে রানার শহীদ আফ্রিদিকে খুব একটা কষ্ট দেননি আনোয়ার।

সতীর্থের আলিঙ্গনে

সেঞ্চুরি করার পর অনিল কুম্বলের এক ওভারে সাঈদ আনোয়ার দেখা দেন সবচেয়ে প্রমত্ত রূপে। ওভারে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বলে ছক্কা মারার পর শেষ বলে মারেন চার। সেই ওভারটিতে রান ওঠে ২৬। সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের সঙ্গে আরও একটি রেকর্ডও গড়েছেন। ইনিংসে সবচেয়ে বেশি চার (২২টি) মারার রেকর্ডটিও কেড়ে নিয়েছেন রিচার্ডসের কাছ থেকে। অপরাজিত ১৮৯ রানের ইনিংসটিতে রিচার্ডসের ২১ চারের রেকর্ডটি অবশ্য স্পর্শ করেছিলেন ব্রায়ান লারা ( ১৯৯৩ সালের ৫ নভেম্বর শারজায় পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৫৩ রানের ইনিংসটিতে)।

ভিভ রিচার্ডসের রেকর্ডটা টিকে ছিল তের বছর। সাঈদ আনোয়ারের রেকর্ডটা কতদিন টিকবে, কে জানে! তবে এটা নিশ্চিত, বেশ কিছুদিনের জন্য বিশ্বের বাকি সব ব্যাটসম্যানের স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে গেলেন সাঈদ আনোয়ার। ‘আমার স্বপ্ন আনোয়ারের রেকর্ড ভাঙা’– এ কথা শোনা যাবে এখন সব স্টার-সুপার স্টারের মুখেই।