প্রকৃতপক্ষেই তাঁর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। ছিল না বলাটা বোধ করি ঠিক হলো না। তিনি নিজেই ছিলেন নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। ক্রমাগত নিজেকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে গেছেন প্রতিটি মুহূর্তে। জয়ের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য তাঁকে অনেক কঠিন ত্যাগ, কঠোর তিতিক্ষা আর একাগ্র সাধনা করতে হয়েছে। পরাজয়কে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন বলে বিজয়ী হতে নিজেকে নিংড়ে দিয়েছেন। পেয়েছেন তার পুরস্কারও। মাঝারি ও দূরপাল্লার দৌড়ে তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সে সময় নিজেকে প্রমাণিত করার জন্য জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতাই ছিল উপযুক্ত মঞ্চ। তাতে তিনি বছরের পর বছর আধিপত্য বিস্তার করে রাখেন। প্রায় দুই দশক শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রাখার জন্য যে ইচ্ছাশক্তি, যে সহিষ্ণুতা ও যে লড়াকু মনোভাব দেখিয়েছেন, তা নজিরবিহীন। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে অ্যাথলেট হিসেবে মোস্তাক আহমদ ছিলেন রীতিমতো আইকন।

ছোটবেলা থেকেই দৌড়ের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন সিলেটের সন্তান মোস্তাক। সেই আকর্ষণ কখনো থিতিয়ে যায়নি। স্কুলে পড়ার সময় অ্যাথলেটিকসে অংশ নেন। ১৯৭০ সালে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর)-এ সৈনিক হিসেবে ভর্তি হলে তাঁর ক্রীড়াচর্চার পথ সুগম হয়। ইপিআরের দল গঠনের জন্য ঢাকার পিলখানায় ৪০০ মিটার স্প্রিন্টের ট্রায়ালে অংশ নেন। দৌড় শুরুর পর একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যান তিনি। তারপরও দ্বিতীয় হন। কিন্তু মূল দলে সুযোগ পান প্রথম স্থান অধিকারী। এই ব্যর্থতা তাঁকে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে তোলে। হেরে যাওয়ার এই যন্ত্রণা তাঁর বুকের মধ্যে রয়ে যায় সুপ্ত অবস্থায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাতে সক্রিয়ভাবে তিনি অংশ নেন এবং সম্মুখ যুদ্ধে সাহসিকতার পরিচয় দেন। স্বাধীনতার পর সুযোগ পেয়ে সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, খেলাধুলায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা পাওয়া। সে সুযোগ তিনি পেয়ে যান। নিজেকে ধীরে ধীরে মেলে ধরেন। তবে শুরুর দিকে সিনিয়ররা তাঁকে মেনে নিতে পারেননি। তাঁকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়। তাতে তিনি মোটেও দমে যাননি। 

মোস্তাক কোনো সাতপাঁচে থাকতেন না। তাঁর লড়াই ছিল নিজের সঙ্গে। তাঁকে লক্ষ্য করে যে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য কিংবা কোনো অন্যায় করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে হজম করে নিতেন। তারপর ভিতরে ভিতরে নিজেকে প্রস্তুত করতেন। মোক্ষম জবাবটা দৌড়ের মাধ্যমেই দিয়ে দিতেন। এজন্য তাঁকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছে। সেনাবাহিনীতে সকালবেলা পিটি হয়। পিটি শুরুর আগে ভোরবেলা সবার আগে মাঠে গিয়ে তিনি একা একা দৌড়াতেন। তাঁর এই নিবেদন, একাগ্রতা ও উৎসর্গীকৃত মনোভাব অন্যদের চেয়ে তাঁকে আলাদাভাবে চিনিয়ে দেয়। ইন্টার কোম্পানি ও ইন্টার ব্যাটালিয়ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য পাওয়ায় তাঁর প্রতি বিশেষভাবে যত্ন নেওয়া হয়। এর প্রতিদান তিনি কড়ায়-গণ্ডায় মিটিয়ে দিতে কার্পণ্য করেননি। তাঁর কৃতিত্বে সেনাবাহিনী অনেকবার জাতীয় অ্যাথলেটিকসে পদক তালিকায় শীর্ষে স্থান করে নেয়। 

১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় আলোচনায় উঠে আসেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে জীবন-মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে তাঁকে যখন ছুটতে হয় দীর্ঘ পথ, তখনই নিজের জীবনীশক্তি সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যান। যে কারণে মাঝারি ও দূরপাল্লার দৌড়ের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। জাতীয় অ্যাথলেটিকসে অভিষেকেই পাঁচ হাজার ও ১০ হাজার মিটার দৌড়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। আঘাতজনিত কারণে ১৫০০ মিটারে রৌপ্যপদক নিয়ে সন্তষ্ট থাকতে হয়। এরপর কেবলই সামনে এগিয়ে যাওয়ার নিরন্তর প্রয়াস। পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি উচ্চতার এই অ্যাথলেট খালি পায়েই এগিয়ে যান দুরন্ত গতিতে। তিনি হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য এক দৌড়বিদ। অসুস্থতা ও ইনজুরির কারণে কখনো সখনো পদক হাতছাড়া হলেও তা পুনরুদ্ধার করতে তাঁকে খুব বেশি বেগ পেতে হয়নি। 

১৯৯১ সাল পর্যন্ত তিনি যে মাইলফলক গড়েন, তাকে অভাবনীয়ই বলা যায়। ৮০০ মিটারে সাতটি স্বর্ণ, তিনটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদক, ১৫০০ মিটারে ১৪টি স্বর্ণ, দুটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদক, পাঁচ হাজার মিটারে ১৬টি স্বর্ণপদক, ১০ হাজার মিটারে আটটি স্বর্ণ ও একটি রৌপ্যপদক এবং ম্যারাথনে একটি স্বর্ণপদক জয় করাটা চাট্টিখানি কথা নয়। তিনি ১৩টি রেকর্ডসহ অর্ধ শতাধিক পদক জয়ের অনন্য এক গৌরব অর্জন করেন। ১৯৭৪ সালে সকালে ম্যারাথনের পর চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিকেলে ১৫০০ মিটার দৌড়ে জয়ী হয়ে নিজের স্ট্যামিনা ও সামর্থ্যের স্বাক্ষর রাখেন। তবে প্রতিবার অনেকগুলো ইভেন্টে অংশ নেওয়ার কারণে দেহ-মনে তাঁকে অনেক বেশি চাপ সইতে হয়। ক্ষয় হয় জীবনীশক্তি। কিন্তু তিনি তাঁর তোয়াক্কা করেননি। 

দৌড় প্রতিযোগিতায় তিনি যেন প্রাচীন অলিম্পিক গেমসের অপরাজেয় দৌড়বিদ গ্রিসের লিওনিদাসের মতো দুর্জেয় ছিলেন। দীর্ঘ দুই যুগ একটানা সাফল্যের হাসিতে উদ্ভাসিত হওয়া মোটেও সহজ ব্যাপার নয়। বছরের পর বছর মাঝারি ও দূরপাল্লার দৌড়ের একাধিক ইভেন্টে অংশ নিয়ে সাফল্য পাওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করতে হয়েছে, যে শক্তি ক্ষরণ হয়েছে, যে ধকল সইতে হয়েছে, তা এক কথায় অবিশ্বাস্য। কোনো কিছুই তাঁর অদম্য আকাক্ষাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। 

তাঁর জীবনের একটাই মন্ত্র ছিল, দ্রুতগতিতে ছুটতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে সাফল্য পাওয়ার জন্য দিনের পর দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবিরাম দৌড়িয়েছেন। কোনও অতৃপ্তি, কোনও ক্লান্তি, কোনও হতাশা তাঁকে পরাভূত করতে পারেনি। কখনও কখনও লড়াই করেছেন নিজের অপারগতার সঙ্গে। মন সায় না দিলেও তিনি থেমে থাকেননি। একবার তো কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট থেকে দৌড়াতে দৌড়াতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চলে যান। কখন যে প্রায় ৫৫ মাইল পাড়ি দিয়েছেন, তার কোনো বোধ ছিল না। জীবনে কত কত মাইল পাড়ি দিয়েছেন, তার সঠিক হিসেব তাঁরও জানা নেই। তাঁর দৌড়ের নিজস্ব একটা ভঙ্গিমা ছিল। দূর থেকে দেখে তাঁকে সহজেই চিনে নিতে পারতেন দর্শকরা । 

একহারা গড়নের এই অ্যাথলেট দৌড় শুরু করলে তাঁর কোনো আবেগ-অনুভূতি থাকত না। দৌড়ানোটাই তাঁর কাছে ছিল নেশার মতো। তাতেই তিনি খুঁজে পেতেন অনাবিল আনন্দ। এই দৌড়ের নেশায় সংসারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারেননি। শারীরিকভাবে নিজেকে ফিট রাখতে বেতনের বড় একটা অংশ ব্যয় হয়ে যেত। এজন্য তাঁর পরিবারকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কঠিন অনুশীলনের কারণে যে কোনো দৌড়ই তাঁর কাছে সহজ মনে হতো। দৌড়ানোটা তাঁর কাছে যেমন সাধনা, তেমনিভাবে তাঁকে বলা যায় দৌড়ের নিষ্ঠাবান এক সাধক। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট প্রশিক্ষক ছিল না। তিনি নিজেই ছিলেন নিজের প্রশিক্ষক। প্রকৃতি থেকে আহরণ করেছেন উদ্দীপনা আর ছুটে চলার প্রেরণা। তবে তাঁর ছিল যে কোনো বিষয় আয়ত্ত করার সহজাত ক্ষমতা। যখন কোনো বিদেশি কোচের সংস্পর্শে গিয়েছেন, চট করে তাঁদের শেখানো নতুন কৌশল বা টোটকাগুলো রপ্ত করে নিয়েছেন।  

সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত অনারারি ক্যাপ্টেন মোস্তাক দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়। ১৯৭৫ সালে মস্কোয় স্পার্টাকেইড ক্রীড়া, ১৯৭৮ সালে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অষ্টম এশিয়ান গেমস, ১৯৮০ সালে তুরস্কের ইজমিরে প্রথম ইসলামিক সলিডারিটি গেমস, ১৯৮৫ সালে ঢাকায় দ্বিতীয় সাফ গেমসে অংশ নেন। সাফ গেমসে ১৫০০ মিটারে রৌপ্যপদক জয় করেন। এটিই তাঁর একমাত্র আন্তর্জাতিক পদক। ১৯৮৬ সালে পাকিস্তানের কোয়েটায় ২১তম পাকিস্তান জাতীয় গেমস, ১৯৮৭ সালে কলকাতায় তৃতীয় সাফ গেমস এবং ১৯৮৯ সালে কুয়েতে বন্ধুত্বমূলক ও শান্তি ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও তিনি অংশ নেন। 

বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি ১৯৭৪ সালে সেরা অ্যাথলেট, ১৯৭৫ সালে বর্ষসেরা ক্রীড়াবিদ, বিএসজেএ ১৯৭৯ সালে এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ১৯৮৯ সালে তাঁকে সেরা অ্যাথলেট হিসেবে পুরস্কৃত করে। তবে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত হন ১৯৭৭ সালে ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ পেয়ে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের সাফল্য এলেও একজন মোস্তাক আহমদ অনন্য হয়ে আছেন তাঁর আন্তরিকতা, তাঁর নিষ্ঠা, তাঁর সাধনার জন্য। সেই শুরুর দিনগুলো থেকে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাককে আরাধনার সিদ্ধস্থান মনে করে নিজেকে যেভাবে গভীরভাবে সঁপে দিয়ে এক নাগাড়ে সাফল্যের পেছনে ছুটেছেন, যে কোনো অ্যাথলেটের জন্য তা অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়।