তাঁর মৃত্যুর পর স্যার জ্যাক হবস্ বলেছিলেন, 'নিঃসন্দেহে সে আমার দেখা দিনের পর দিন ধারাবাহিকভাবে সবচেয়ে দ্রুত রান করে যাওয়া ব্যাটসম্যান। একই সঙ্গে সে ছিল একজন বিগ হিটার। সে রান করতে পারবে না, এমন একটি বল করা ছিল খুব কঠিন, প্রায় অসম্ভবই। তাঁর ব্যাটিং দেখে প্রতিনিয়তই আমার দারুণ আনন্দ ও স্বস্তি হয়েছে এই ভেবে যে, আমি বোলার নই! গিলবার্ট জেসপ দর্শক টেনে আনতো মাঠে। সে ছিল একজন ক্রাউড-পুলার, এমনকি আমি বলব ব্র্যাডম্যানের চেয়েও বেশি।'

বাজে উইকেটে খেলার ব্যাপারে অনেকেই যাঁকে স্যার ডনেরও ওপর রাখতে চান, সেই জ্যাক ‘দ্য মাস্টার’ হবস্ এ কথা বলেছেন যাঁর সম্পর্কে, তিনি টেস্ট খেলেছেন মাত্র ১৮টি। একেবারেই সাধারণ রেকর্ড: ৫৬৯ রান, গড় মাত্র ২১.৮৮, একটি মাত্র সেঞ্চুরি, ৩৫.৪০ গড়ে ১০টি উইকেট এবং ১১টি ক্যাচ! তারপরও গিলবার্ট লাইরড জেসপ ক্রিকেট ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে যাওয়া মুষ্টিমেয় খেলোয়াড়দের একজন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের বিশ বছরে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক খেলোয়াড় হিসেবে তাঁর নাম বললে একদমই বিতর্ক হবে না বলে ধরে নেয়া যায়। কারণটা কী? কারণ হলো, তাঁর রান করার ধরন। আরেকটু সরাসরি বললে, তাঁর দ্রুত রান করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা।

শুধু একভাবেই ব্যাটিং করতে জানতেন গিলবার্ট জেসপ। ছবি: গেটি ইমেজেস

টেস্ট রেকর্ডটা সমৃদ্ধ না হওয়ার মূল কারণ তাঁর সমুদ্র-ভীতি। তখন তো এখনকার মতো আকাশে উড়ে বেড়াবার দিন ছিল না। সফরে যেতে হতো জাহাজে চেপে, সি-সিকনেসের কারণে বেশ ক’বার সফরে না গিয়ে বাড়িতে বসে থেকেছেন জেসপ। নইলে কম টেস্ট খেলার ওই যুগেও ১৮৯৯ থেকে ১৯০৯ সালের মধ্যে তাঁর ১৮টির বেশি টেস্ট খেলার কথা। পিঠের ইনজুরি ১৯০৯ সালের পর আর টেস্টই খেলতে দেয়নি তাঁকে। তবে তারপরও এটা সত্যি, টেস্ট ক্রিকেটে জেসপকে তাঁর সেরা ফর্মে দেখা গেছে কমই। হার্ড হিটার ক্রিকেটে কম আসেনি, এমনকি জেসপের সময়েও অন্তত তিনজনের নাম খুঁজে পাওয়া যায়, যাঁরা বলকে তাঁর চেয়েও জোরে মারতেন। স্বদেশি সি. আই. থর্নটন এবং দুই অস্ট্রেলিয়ান জর্জ বোনর ও জ্যাক লিওনসকে এই মর্যাদা দেয়ার ব্যাপারে একাধিক বইয়ের লেখককে একমত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু এঁদের কেউই জেসপের মতো দিনের পর দিন, ম্যাচের পর ম্যাচ অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে রান তুলে যেতে পারেননি।

জেসপ অন্যান্য হিটারদের ছাড়িয়ে গেছেন তাঁর স্কোর করার অলরাউন্ড ক্ষমতার দিক দিয়ে। তাঁর সেরা ফর্মে যেকোনো বল থেকে, তা যতই ভালো হোক না কেন, রান করার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল তাঁর। উচ্চতা ছিল মাত্র ৫ ফুট ৭ ইঞ্চি, তারপরও ব্যাট হাতে দাঁড়াতেন খানিকটা কুঁজো হয়। এই স্ট্যান্সের কারণেই তাঁর নাম হয়ে যায় 'দ্য ক্রাউচার'। তাঁর ফুটওয়ার্ক ছিল বিদ্যুতের মতো দ্রুত, বল একটু ওভারপিচ হলে জায়গায় দাঁড়িয়েই ব্যাট চালাতেন তিনি আর শর্ট পিচ বলকে ড্রাইভ করতে ধেয়ে যেতেন ‘ডাউন দ্য উইকেট'! লেগ সাইডে খেলার সময় প্রায় শুয়ে পড়তেন, বলের সঙ্গে দেখা হওয়ার সময় ব্যাট থাকত মাটির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল, তাতে থাকত প্রচণ্ড 'পাওয়ার'। নমনীয় কব্জির কারণে স্কয়ার কাটও খেলতেন দারুণ। রিচার্ডসন ও মোন্ডের মতো তাঁর সময়কার দ্রুততম বোলারদের বিপক্ষেও একই স্টাইলে ব্যাট করেছেন জেসপ। পালকের মতো হালকা দুটি পা তাঁকে নিয়ে গেছে বলের কাছে, অনেকটা বেরিয়ে গিয়ে করেছেন পুল অথবা স্ট্রেট ড্রাইভ। বোলারের লেংথ আর ফিল্ড প্লেসিংকে করে তুলেছেন একেবারেই অর্থহীন, অকার্যকর। এ ব্যাপারে ক্রিকেট ইতিহাসে তাঁর তুল্য কেউ নেই বলেই মানা হয় এখনো। আসলে আর কেউ এই দুঃসাহসিক পথে সাফল্য পাওয়া সম্ভব, এটা ভাবারই সাহস পাননি। তাঁর আনঅর্থোডক্স ব্যাটিং স্টাইলের চমৎকার ছবি ফুটে উঠেছে আরেক কিংবদন্তি ক্রিকেটার সি ব্রি ফ্রাইয়ের কথায়। জেসপ সম্পর্কে যিনি বলছেন, 'এমন একজন ব্যাটসম্যান, যে ব্যাটসম্যানদের করা উচিত নয় এমন প্রায় সবকিছুই করে, তা-ও দারুণ সাফল্যের সঙ্গে।'

ব্যাটিংয়ের সময় কুঁজো হয়ে দাঁড়াতেন বলে নাম ছিল 'দ্য ক্রাউচার'। ছবি: গেটি ইমেজেস

স্বাভাবিকভাবেই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটতে গিয়ে অনেক সময় নিজের উইকেটটি বিসর্জনও দিতে হয়েছে জেসপকে। উইকেটের প্রকৃতি বুঝে ওঠার আগেই, চোখকে মানিয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়ার আগেই এটি করতে গিয়ে আউট হয়েছেন জেসপ। কিন্তু তারপরও অন্য কিছু ভাবেননি তিনি। আসলে অন্য কোনোভাবে ব্যাট করার কথা জানাই ছিল না তাঁর। এমন ব্যাটসম্যানকে দর্শকরা যে ভালবাসবে, তাতে আর আশ্চর্য কি! জেসপ ব্যাট হাতে নামার সময় দর্শকদের মধ্যে যে গুঞ্জনটা উঠত, একটু কল্পনাশক্তি থাকলে কান পাতলেই তা আপনারও শুনতে পাওয়ার কথা।

জেসপের টেস্ট রেকর্ড থেকেই বোঝা যাচ্ছে, তাঁর এসব অতিমানবীয় কীর্তিকলাপ এখানে খুব একটা ঘটেনি। তাঁর ব্যাটিং দিয়ে একটা মাত্র টেস্টই জিতিয়েছেন তিনি ইংল্যান্ডকে এবং সে টেস্টটি পেয়ে গেছে অমরত্বের মর্যাদা। ক্রিকেটের একটু মনোযোগী অনুসারী মাত্রই জানেন প্রায় সেই টেস্টটির কথা। ১৯০২ সালের ইংলিশ সামার অনেকগুলো কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছিল, যার সমাপ্তি ঘটেছিল জেসপের মাধ্যমে। অন্য কীর্তিগুলো অন্য সময় মনে করা যাবে, আজ আমরা শুধু 'জেসপের টেস্ট'টি নিয়েই কথা বলি।

এজবাস্টন ও লর্ডসে অনুষ্ঠিত সেই অ্যাশেজ সিরিজের প্রথম দুটি টেস্ট বৃষ্টির কারণে ড্র হওয়ার পর তৃতীয় টেস্টটি হয়েছিল শেফিল্ড শহরের ব্রামাল লেনে। শেফিল্ডে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের একমাত্র টেস্ট। ‘অতুলনীয়’ ভিক্টর ট্রাম্পার ও বাঁহাতি 'জিনিয়াস' ক্লেম হিলের দুর্দান্ত ব্যাটিং এবং সন্ডার্স, নোবেল ও ট্রাম্বলের বিধ্বংসী বোলিংয়ে সে টেস্টে ১৪৩ রানে জিতে সিরিজে এগিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া। দলের পরাজয়ের মধ্যেও জেসপের ব্যাটে বিপক্ষ বোলারদের রক্তের দাগ ছিল, কিন্তু মাত্র ৪৫ মিনিটে খেলা তাঁর ৫০ রানের ইনিংসটিও ওল্ড ট্রাফোর্ডে অনুষ্ঠিত পরবর্তী টেস্টে দলে রাখতে পারল না তাঁকে। সে টেস্টেও জিতল অস্ট্রেলিয়া, মাত্র ৩ রানে। এই সেই টেস্ট, যাতে ফ্রেড টেট পরে মহামূল্য বলে প্রমাণিত একটি ক্যাচ ফেলে এবং অল্প কিছু রানের জন্য ব্যাট করতে নামার পর তা করার আগেই আউট হয়ে যাওয়ার পর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, 'আমার বাড়িতে একটি ছেলে আছে। আজ আমি ইংল্যান্ডের যে ক্ষতি করলাম, একদিন সে তা পুষিয়ে দেবে।'

ফ্রেড টেট আর টেস্ট খেলেননি, কিন্তু ২২ বছর পর তাঁর সেই ‘ছোট্ট ছেলে’ মরিস টেট ঠিকই খেলতে নামলেন ইংল্যান্ডের হয়ে। ৩৯ টেস্টে উইকেট নিলেন ১৫৫টি, সর্বকালের সেরা ইংলিশ বোলারদের মধ্যে তাঁর নামটাও অক্ষয় করে ফেললেন। ক্রিকেটের ছাত্রদের কাছে সুপরিচিত এই গল্প নিয়ে ভিন্ন একটা লেখা হতে পারে। আজ এটুকুই থাক, কারণ ‘জেসপের টেস্ট'-এ এসে গেছি আমরা।

জেসপের সেরাটা বেরিয়ে আসত গ্লস্টারশায়ারের হয়েই। ছবি: গেটি ইমেজেস

০-২ টেস্টে পিছিয়ে পড়ায় ওভালে সিরিজের শেষ টেস্টটি ছিল ইংল্যান্ডের জন্য কিছুটা হলেও সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই। পুনরুদ্ধার তো দূরের কথা, তা আরও ডুবতে বসল, যখন দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪৮ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ফেলল তারা। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার ৩২৪ রানের প্রথম ইনিংসের জবাবে ইংল্যান্ড তুলেছিল ১৮৩ রান। তবে ১৪১ রান লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরু করা অস্ট্রেলিয়া এবার মুখ থুবড়ে পড়ল মাত্র ১২১ রানে। জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ২৬৩, কিছুক্ষণের মধ্যেই স্কোর বোর্ডে ৫ উইকেটে ৪৮। মাঠে ঢুকলেন গিলবার্ট লাইরড জেসপ! ১৯০২ সালের ১৩ আগস্ট জেসপ খেললেন তাঁর জীবনের সেরা ইনিংসটি। ৪৮ রানে ৫ উইকেট পড়ে গেছে, এটা যেন জানেনই না তিনি, যেন খেলতে নেমেছেন উইকএন্ডে ভিলেজ-ক্রিকেটে, এমন ভঙ্গিমায় অস্ট্রেলিয়ার দুর্দান্ত বোলিং অ্যাটাককে ভাসিয়ে দিলেন পুল, কাট, ড্রাইভে। বোলারদের বন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়া উইকেটে মাত্র ৪৩ মিনিটে থাকার পর তাঁর ৫০ হলো। ষষ্ঠ উইকেট পড়ার আগে স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসনের সঙ্গে তুলে ফেললেন ১০৯ রান, হঠাৎ করেই অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলোর আভাস দেখতে পেল ইংল্যান্ড!

নতুন ব্যাটসম্যান জিওফ হার্স্ট ছিলেন আপাদমস্তক ফাইটার, তাঁর মধ্যে জেসপ পেলেন আরেকজন আদর্শ পার্টনার। বল ছুটল মাঠের চারপাশে, কিছুক্ষণের মধ্যেই চমৎকার স্কয়ার কাট করে বাউন্ডারি মারার মাধ্যমে ৯৬ থেকে ১০০-তে পৌঁছুলেন জেসপ, তখন মাত্র ৭৫ মিনিটে কেটেছে তাঁর উইকেটে, বলও খেলেছেন ৭৫টিই। বিস্ময় আর আনন্দের যৌথ উন্মাদনায় উত্তাল হয়ে উঠল পুরো স্টেডিয়াম। অভিনন্দনের সেই জোয়ার হয়তো চিড় ধরিয়েছিল জেসপের মনঃসংযোগে। মাত্র দুই বল পর তাই আরেকটি বিগ হিট নিতে গিয়ে প্লেয়ার্স ব্যালকনির সামনে ধরা পড়লেন তিনি। এর আগে দুবার বল পড়েছে এই ব্যালকনির ছাদে। আউট হওয়ার আগে আর একটি বাউন্ডারি মেরেছেন তিনি, উইকেটে তাঁর উপস্থিতির সময়টুকুতে ১৩৯ রান তুলেছে ইংল্যান্ড, যার ১০৪-ই এসেছে জেসপের ব্যাট থেকে। সময় নিয়েছেন তিনি ৭৭ মিনিট, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়া টেস্টে সময়ের দিক থেকে যা এখনও রেকর্ড। সময়ের হিসেবে জেসপের ৭৫ মিনিটে সেঞ্চুরি টেস্ট ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম। প্রায় ২০ বছর পর, ১৯২১-২২ মৌসুমে অস্ট্রেলিয়ার জ্যাক গ্রেগরি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭০ মিনিটে সেঞ্চুরি করে ভেঙে দেন জেসপের রেকর্ড।

জেসপ আউট হবার পরও ইংল্যান্ডের প্রয়োজন ছিল ৭৬ রান। জিওফ হার্স্ট (অপরাজিত ৫৮) শেষ ব্যাটসম্যান উইলফ্রেড রোডসকে নিয়ে তীব্র উত্তেজনার মধ্যে ১ উইকেটে জয় এনে দেন ইংল্যান্ডকে। জেসপ এমন একটা ইনিংস খেলার পর তাঁর দল হারলে তা বড়ো দুঃখের ব্যাপার হতো।

টেস্ট ক্রিকেটে এই একটি ইনিংস ছাড়া গিলবার্ট জেসপ তাঁর খ্যাতির প্রতি সুবিচার করতে পারেননি তেমন। তবে তাঁর পুরো ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট ক্যারিয়ারে চোখ বুলালে এমন কীর্তি দেখা যাবে অনেক। ১৮৯৪ থেকে ১৯১৪ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়া পর্যন্ত খেলে করেছেন ২৬,৬৯৮ রান (গড় ৩২.৬৩), সেঞ্চুরি করেছেন ৫৩টি। রান এবং সেঞ্চুরির সংখ্যার দিক থেকে জেসপকে ছাড়িয়ে যাওয়া ব্যাটসম্যানের সংখ্যা অনেক। কিন্তু জেসপ তো এসব কারণে স্মরণীয় নন! তাঁর ৫৩ সেঞ্চুরির প্রতিটিতে ঘণ্টায় রান উঠেছে অবিশ্বাস্য ৮২.৭ গড়ে!

এই ৫৩টি ঝড়ের ৫টি ডাবল সেঞ্চুরি, যার প্রতিটিতেই ঘণ্টায় এক শ'র সামান্য কম রান তুলেছেন জেসপ এবং প্রতিটি ইনিংসই উইকেটে তাঁর একাধিপত্যের সাক্ষী। ১৭৫ মিনিটে ২৯৬ (দলের রান ৩৩৫), ২০০ মিনিটে ২৪০ (দলের রান ৩৩৭), ১৫৫ মিনিটে ২৩৪ (দলের রান ৩৪৬), ১৫০ মিনিটে ২৩৩ (দলের রান ৩১৮) ও ১৫০ মিনিটে ২০৬ (দলের রান ৩১৭); এই হলো তাঁর পাঁচটি ডাবল সেঞ্চুরি। এর মধ্যে ২৩৩ রানের ইনিংসটি খেলেছিলেন তিনি ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে অল ইংল্যান্ড একাদশের হয়ে, বাকি চারটিই খেলা গ্লস্টারশায়ারের পক্ষে। ১৯৫৩ সালে হোভে সাসেক্সের বিপক্ষে ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর সর্বোচ্চ ২৮৬ রানের ইনিংসটি খেলার পথে জেসপের ডাবল সেঞ্চুরি আসে মাত্র দুই ঘণ্টায় মানে ১২০ মিনিটে। ৭০ মিনিটে প্রথম আর মাত্র ৫০ মিনিটে এসেছিল দ্বিতীয় শতক। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির রেকর্ড হিসেবে ৭৩ বছর এর কোনো তুলনা ছিল না। ১৯৭৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়ক ক্লাইভ লয়েড সোয়ানসিতে গ্ল্যামরগনের বিপক্ষে ম্যাচে এই রেকর্ডের সমকক্ষতা অর্জন করেন। লয়েডের প্রথম শতক এসেছিল ৮০ মিনিটে, ৪০ মিনিটে দ্বিতীয়।

শেষ পর্যন্ত ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে ভাঙে জেসপের (তখন তা লয়েডেরও) এই রেকর্ড, বোম্বের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বরোদার বিপক্ষে রঞ্জি ট্রফি ম্যাচে ১১৩ মিনিটে ১২৩ বল খেলে ডাবল সেঞ্চুরি করেন রবিশংকর জয়দ্রিথ শাস্ত্রী। এই ইনিংস খেলার পথেই তিলকরাজের এক ওভারের ছয় বলেই ছক্কা মেরে রেকর্ড বুকে স্যার গারফিল্ড সোবার্সের সঙ্গী হন ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ সময় শম্বুকগতির ব্যাটিংয়ের জন্য সমালোচিত এই অলরাউন্ডার।

জেসপ ছিলেন দুর্দান্ত ফিল্ডারও। ছবি: গেটি ইমেজেস

ব্যাট হাতে এমন সব কাণ্ডের পর স্বাভাবিকভাবেই জেসপ নামটি শুনলেই চোখে ভেসে ওঠে সব নিয়ম-কানুনকে অগ্রাহ্য করা বেপরোয়া এক ব্যাটসম্যানের ছবি। অথচ শুধু বিধ্বংসী ব্যাটিংয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না তাঁর প্রতিভা। ফাস্ট বোলার হিসেবে দীর্ঘদিন প্রথম সারির একজন হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন, ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে তাঁর উইকেট সংখ্যা ৮৭৩, তা-ও উইকেট পিছু মাত্র ২২.৭৯ রান খরচে। তবে বোলিংয়ের চেয়েও চমকপ্রদ ছিল জেসপের ফিল্ডিং, তাঁর হার্ড হিটিংয়ের মতো সেনসেশনাল। ফিল্ডার হিসেবে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে মানা হয় তাঁকে। শুরুর দিকে দাঁড়াতেন কাভারে, এরপর স্পেশালিস্ট হয়ে ওঠেন একট্রা মিড অফে। এত ডিপে দাঁড়াতেন যে, অন্য যেকোনো ফিল্ডারের ক্ষেত্রে এক রান বাঁধা ছিল ব্যাটসম্যানের জন্য। কিন্তু জেসপকে ওখানে দেখে খুব কম ব্যাটসম্যানেরই সাহস হতো দৌড়ানোর।

তাঁর ফিল্ডিং দক্ষতাটা অবশ্য প্রত্যাশিতই ছিল। কারণ গিলবার্ট জেসপ ছিলেন দুর্দান্ত একজন অলরাউন্ড অ্যাথলেট। ১০০ মিটার দৌড়াতেন তিনি ১০.২ সেকেণ্ডে। খেলতেন ফুটবল ও হকি। হকি গোলকিপার হিসেবে পেয়েছিলেন ক্যামব্রিজ 'ব্লু', ফুটবলেও 'ব্লু' প্রায় পেয়েই গিয়েছিলেন। অক্সফোর্ডের বিপক্ষে বিলিয়ার্ডও খেলার কথা ছিল তাঁর, যদিও খেলেননি শেষ পর্যন্ত। ১৮৯৬ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকেন তিনি, ক্রিকেট খেলেন চার বছর, ১৮৯৯ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কের নাম ছিল গিলবার্ট জেসপ! ১৯১৪ সালে অ্যামেচার গলফ চ্যাম্পিয়নশিপেও এই নামের একজন প্রতিযোগীর কথা জানা যায়।

গলফ খেলছেন গিলবার্ট জেসপ। ছবি: গেটি ইমেজেস

এসব তো আছেই, তার ওপর জেসপ ম্যানচেস্টারের একটি রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন হিসেবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯১৮ সালে অসুস্থ হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত খেলার মাঠের বদলে যুদ্ধক্ষেত্রেই সময় কেটেছে তাঁর। তবে এসব কিছু জেসপের মহিমায় শুধু বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে। সর্বকালের সেরা ফাস্ট স্কোরার হিসেবেই চিরদিন স্মরণ করা হবে তাঁকে, এটাই তাঁর আসল পরিচয়। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে পা রাখার মাত্র তিন বছরের মাথায়, ১৮৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়েছিলেন জেসপ (হ্যাঁ, ক্রিকেট খেলতেই!)। অবাক হওয়ার কিছু নেই, ক্রিকেটের দুর্ভাগ্য, পরবর্তী সময়ে খেলাটি আর ওই অঞ্চলে জাঁকিয়ে বসতে পারেনি, কিন্তু ইতিহাসের প্রথম প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক ম্যাচ হিসেবে যেটিকে মানা হয়, তাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা। সেই যুক্তরাষ্ট্র সফরে জেসপের ব্যাটিং দেখার পর আবেগ চেপে রাখতে না পেরে রালফ্ ডি পাইন নামে এক ভদ্রলোক ফিলাডেলফিয়ার সংবাদপত্রে একটি কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। তার চারটি লাইনেই পরিষ্কার ফুটে উঠেছে জেসপের ব্যাটিংয়ের ছবিটা। জেসপ-বন্দনা শেষ হোক সেই লাইন চারটি দিয়েই :

At one end stocky Jessop frowned,

The human catapult,

Who wrecks the roofs of distant towns

When set in his assult.

সংযোজন: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭৪ মিনিটে সেঞ্চুরি করে মিসবাহ-উল-হক দ্রুততম সময়ে সেঞ্চুরির তালিকায় গিলবার্ট জেসপকে ঠেলে দিয়েছেন তিনে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরির তালিকাতেও জেসপ এখন তিনে। ২০১৭-১৮ মৌসুমে কাবুলের হয়ে বুস্তের বিপক্ষে ১০৩ মিনিটে দ্বিশতক তুলে সবার ওপরে আছেন আফগানিস্তানের শফিকুল্লাহ শফিক।