এমন দিনগুলো যখন আসে, মনে হয় সাংবাদিক না হলেই বোধ হয় ভালো হতো! আনন্দের স্রোত যখন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সবাইকে, আমাদের যে তখন আবেগের দরজায় তালা লাগিয়ে লেখার ‘ইন্ট্রো’ হাতড়ে বেড়াতে হচ্ছে! অথচ আবেগে আমজনতার চেয়ে আমাদের, মানে ক্রিকেট রিপোর্টারদের অধিকারটা একটু বেশিই থাকা উচিত। দুঃসময়ে বক্রোক্তি আর গঞ্জনা যে খেলোয়াড়দের সঙ্গে আমাদেরও ভাগ করে নিতে হয়।

এমন সাফল্যের দিনে ক্রিকেট দল ১৪ কোটি মানুষেরই দল হয়ে যায়। অথচ খারাপ দিনগুলোতে সেটি শুধুই খেলোয়াড় আর ক্রিকেট রিপোর্টারদের দল। ‘কী, তোমার দল তো খুব দেখাল’—মাঠ থেকে মন খারাপ করে অফিসে ফেরার পর কত দিন যে শুনতে হয়েছে সহকর্মীদের এমন ব্যঙ্গোক্তি!

শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের বাতাসে যখন উড়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশের জয়ের সুবাস, প্রেসবক্সে রসিকতা করে বলছিলাম, অন্য কোনো দেশের ক্রিকেট লেখকদেরই আমাদের মতো চাপে থাকতে হয় না। অন্য দলগুলোর জন্য জয় এমনই স্বাভাবিক ব্যাপার যে, সে দেশের ক্রিকেট লেখকদের ক্রিকেটীয় দৃষ্টিকোণ থেকে লিখলেই হয়। আবেগে থরথর পাঠকদের প্রত্যাশা মেটানোর দায় তাঁদের থাকে না। আর লিখতে বসার আগে নিজেকে আবেগ থেকে বিচ্যুত করার লড়াইটা তো শুধুই বাংলাদেশের ক্রিকেট লেখকদের একার সমস্যা।

নর্দাম্পটন, ১৯৯৯। আর কিছু না বললেও বোধ হয় চলছে। ছবি: গেটি ইমেজেস

বাংলাদেশ জয় পাওয়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় আসলে সেটিই। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভাবনীয় সেই জয়ের পর নর্দাম্পটনের রাস্তায় বাংলাদেশীদের মিছিলের অংশ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে, আর তখন আমি কী করছি জানেন? অফিসে টেলিফোন করে পড়ে শোনাচ্ছি এই ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচ রিপোর্ট। ফ্যাক্সের যে লাইন পাওয়া যাচ্ছে না!

পাকিস্তান-বধের পর প্রায় পাঁচ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে এল হারারের জয়। বাংলাদেশের চেয়ে চার ঘণ্টা আগে চলে জিম্বাবুয়ের ঘড়ি। খেলা শুরু হতে হতেই বাংলাদেশে বেজে যায় দুপুর ২টা। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই তাই শুরু করে দিতে হয় লেখা। সেদিনও এমন দুটি রিপোর্ট প্রায় তৈরি। কিন্তু বাংলাদেশের জয়ের পর সেগুলো এমনই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে যে, পত্রিকার পাতায় নয়, সেগুলোর তখন একটাই জায়গা—রিসাইকল বিন। ম্যাচ শেষ হতে হতেই রাত প্রায় পৌনে ১০টা। ডেডলাইন ঠিক রাখতে ল্যাপটপের কি-বোর্ডে পাগলের মতো আঙুল চালাচ্ছি, আর এদিকে এম এ লতিফ ডেকেই চলেছেন। হারারে স্পোর্টস ক্লাবের ড্রেসিংরুমের ঠিক পাশেই প্রেসবক্স। সাংবাদিকদেরও উৎবের সঙ্গী করে নিতে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজারের উৎসাহের শেষ নেই। তাঁকে যতই বলছি, আগে চাকরি, তারপর আনন্দ; তিনি বুঝতেই চাইছেন না। রাতে হোটেলে দেখা হতেই অভিমান ভরে বললেন, ‘তোমাকে এত ডাকলাম, তুমি এলেই না!’ তাঁকে কীভাবে বোঝাই, মন-প্রাণ সব ওদিকেই ছিল।

২০০৪ সালে  জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে যে জয়ে পাঁচ বছরের প্রতীক্ষার অবসান। ছবি: ইএসপিএনক্রিকইনফো

কার্ডিফে অস্ট্রেলিয়া-বধের পর আরেক কাণ্ড। খেলা শেষ হতেই দৌড়ে ঢুকে গেছি মাঠে। সেখানে তখন আলিঙ্গন-উৎসব! সেই উৎসবে যোগ দিয়ে দু-একবার ‘কী যেন পড়েছে’ ভান করে চোখও মুছতে হলো। প্রেসবক্সে ফিরে লিখতে বসে আবিষ্কার করলাম, আবেগের ঢেউয়ে পেশাদারিত্ব এমনভাবেই ভেসে গেছে যে, কে কী বললেন তা আর মনেই নেই। হাতের টেপরেকর্ডার অন করাই হয়নি। মনে ছিল না নোট-টোট নেওয়ার কথাও। এদিকে অধিনায়ক টিমের হোটেলে আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছেন। মন আনচান করছে সেই উৎসবে শামিল হতে। অথচ টেলিফোনে তখন অফিসের লাগাতার তাগাদা, কী হলো... আর কতক্ষণ পত্রিকা আটকে রাখব?

কার্ডিফের ওই অবিস্মরণীয় জয়ের পর বাংলাদেশ দলের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে টেপ রেকর্ডার অন করতেই ভুলে গিয়েছিলাম! ছবি: ইএসপিএনক্রিকইনফো

ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে জয়। দিবারাত্রির ম্যাচ। ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই ডেডলাইন পার। চোখের সামনে বাংলাদেশ দলের ভিক্টরি ল্যাপে আশরাফুল আর আফতাবরা ডিগবাজি দিচ্ছেন, অথচ স্টেডিয়ামে বসেও সেদিকে তাকানোর সময় নেই। পরে টেলিভিশনে দেখতে হলো সেই দৃশ্য!

গত কিছুদিনে বাংলাদেশের জয় আর বছরের পর বছর অপেক্ষার ফল হয়ে থাকেনি বলেই হয়তো কালই বরং সমস্যাটা একটু কম হলো। তারপরও সাংবাদিকদের নিজস্ব সমস্যা তো কিছু থাকেই। এমন একটা জয়ের পর ‘ওই সময় আপনি অমন একটা শট খেলে কেন আউট হলেন’—হাবিবুল বাশারকে এই প্রশ্ন করতে কার ইচ্ছে করে, বলুন? মোহাম্মদ আশরাফুলকে একই প্রশ্ন করার আগেই পাল্টা আক্রমণ! ‘প্রথম ম্যাচের পর আপনি যে লিখলেন, শ্রীলঙ্কায় তিনটি ওয়ানডেতে আমার ৪, ৯ ও ০ রান, দ্বিতীয় ম্যাচে তো আমি ৩১ করেছিলাম!’ কাল তো দেখা হলো, তখন বলেননি কেন? আশরাফুল হেসে বললেন, ‘তখন কি আর এমন জোর দিয়ে বলতে পারতাম!’

ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে জয়ের পর। ২৬ ডিসেম্বর, ২০০৪। ছবি: এএফপি​​​​​

যে কারণে আশরাফুল কাল জোর দিয়ে বলতে পারলেন, বিড়ম্বনার আগে ‘মধুর’ শব্দটাও সে কারণেই। বাংলাদেশের জন্য সর্বজনীন উৎসব বলতে তো এখন ক্রিকেট দলের এমন সব জয়ই। আর আমরা সেই জয়টা দেখি মাঠের সেরা আসনে বসে।

এতক্ষণ যা লিখেছি, ভুলে যান। আমাদের মতো ভাগ্যবান আর কে!