এই একটা জায়গায় ইমরান খানও খালেদ মাহমুদকে ঈর্ষা করতে পারেন! ইমরান খানের সঙ্গে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়েছে জেনে খালেদ মাহমুদের পুলকিত বোধ করারই কথা। কোথায় ইমরান খান আর কোথায় খালেদ মাহমুদ! দুজনই অলরাউন্ডার—মিলটা তো এখানেই শেষ।

ইমরান ক্রিকেটের সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডারদের একজন, আর ওয়ানডে ক্রিকেট যে রাশি রাশি ‘মিনি অলরাউন্ডার’ উৎপন্ন করে, খালেদ মাহমুদ তারই প্রতিনিধি। তবে একটা জায়গায় ইমরান খানও যে মাহমুদের পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। ইমরান খানেরও যে মাঠ থেকে বিদায় নেওয়া হয়নি!

শুধু ইমরান কেন, এই উপমহাদেশের কোনো খেলোয়াড় নিজের ক্যারিয়ারের সমাপ্তির সিদ্ধান্তটা নিজেই নিতে পেরেছেন, এমন তো মনেই পড়ছে না। কপিল দেব, ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিসের মতো অলটাইম গ্রেটদেরও আক্ষেপে পুড়তে হয়েছে—শেষটা নিজের ইচ্ছেয় হলো না! বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুই মহাতারকা আকরাম খান ও আমিনুল ইসলামেরও তো মাঠ থেকে বিদায় নেওয়া হয়নি। আর দলে ফেরার সম্ভাবনা নেই বুঝতে পেরে আকরাম তা-ও সংবাদ সম্মেলন ডেকে অবসরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন, আমিনুল ক্ষোভে-অভিমানে তা-ও দেননি। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাই নতুন এক অধ্যায়েরই জন্ম দিলেন খালেদ মাহমুদ। সেই অধ্যায়ের শিরোনাম: চাইলে কেউ নিজের ইচ্ছেতেই সরে যেতে পারে!

কখন অবসর নেওয়া উচিত—এ ব্যাপারে একটা কালজয়ী তত্ত্ব আছে। অবসরটা তখনই নেওয়া উচিত, যখন সবাই বলবে—‘কেন?’ বলাবলি শুরু হবে না—‘কেন নয়?’ তবে এটি জানা থাকলেই তা অনুসরণ করার কাজটা সহজ হয়ে যায়, এমন নয়। ক্রিকেটাররাও এক ধরনের পারফরমার এবং আধুনিক যুগে খেলাটাও এক ধরনের শোবিজই। স্টেডিয়ামভর্তি দর্শকের সামনে খেলার উন্মাদনা, মিডিয়ায় প্রচার—খেলা ছাড়ার মানেই তো এক ফুৎকারে সব নিভে যাওয়া। শোবিজের সঙ্গে পার্থক্য হলো, চিত্রতারকাদের তাও পুরনো ছবির মাধ্যমে জনমানসে ফিরে আসার সুযোগ থাকে, খেলোয়াড়দের সেই সুযোগ নেই।

অলক কাপালির সঙ্গে নিশ্চয়ই ক্যাচিং প্র্যাকটিসই করছিলেন খালেদ মাহমুদ সুজন। ছবি: আবদুল হান্নান

পারফরমারদের সহজাত অহংকারও অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আরেক বাধা। শরীর আগের মতো সাড়া দিচ্ছে না, আগে যে শটে ছয় হতো, সেটি এখন মিড অফে ক্যাচ হয়ে যায়—বুঝেও এসব না বোঝার একটা গোঁয়ার্তুমি থাকে। আর থাকে একটা অন্ধ বিশ্বাস—হয়তো পারব, আর একবার সবাইকে নাড়িয়ে দিয়েই বিদায় নেব। সেই নাড়িয়ে দেওয়া আর হয় না। শেষ পর্যন্ত সেই বিদায় নিতেই হয়, তবে মুখে একটা তিক্ত স্বাদ নিয়ে।

খালেদ মাহমুদ ভাগ্যবান, তাঁকে সেই দলে নাম লেখাতে হলো না। তবে তাঁকে জিজ্ঞেস না করেই লিখে দিচ্ছি, এই সিদ্ধান্ত নিতে অনেক বিনিদ্র রাতই কেটেছে তাঁর। এই খেলাটাই যে তাঁর জীবন! তা থেকে সরে যাওয়া যে শরীরের একটা অঙ্গকে কেটে বাদ দেওয়ার মতোই। গত বছর কেন্টে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশের ইংল্যান্ড সফর শেষ হওয়ার পর টিম হোটেলে দলের একটা পার্টি মতো হয়েছিল। এক হোটেলেই থাকার সুবাদে আমিও সেই পার্টিতে আমন্ত্রিত। হাসিঠাট্টার সেই ফোয়ারার মধ্যে খালেদ মাহমুদ হঠাৎ আবেগাক্রান্ত হয়ে আলাদা ডেকে নিয়ে খুলে দিয়েছিলেন হৃদয়ের দরজা। ‘আমি জানি, আমার আর খুব বেশি দেওয়ার নেই। আমি দলে থেকে একজন তরুণ খেলোয়াড়ের জায়গা আটকে রাখতেও চাই না। কিন্তু এই যে সফরে আসছি, দলের সবাই এক সঙ্গে মিলে মজা করছি, এটা আর আমার জীবনে থাকবে না, এটাই যে ভাবতে পারি না’—বলতে বলতে খালেদ মাহমুদের কণ্ঠটা ধরে এসেছিল। শতাব্দীপ্রাচীন ফলস্টাফ হোটেলের আঙিনার ম্লান আলো নিশ্চিত হতে দেয়নি, তবে খালেদ মাহমুদের চোখ দুটি বোধহয় চিক চিক করতেই দেখেছিলাম।

খালেদ মাহমুদকে বিদায় সংবর্ধনা। ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৬। বগুড়া। ছবি: এএফপি

কাল এমন সংশয়ে ভুগতে হলো না। সংবাদ সম্মেলনে জীবন থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অধ্যায় শেষ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণার সময় খালেদ মাহমুদের দু'চোখ বেয়ে নেমে এল জলের ধারা। সেই জলে অনেক সুখস্মৃতি, অনেক লড়াইয়ের গল্প। বাংলাদেশের ক্রিকেট তাঁকে কীভাবে মনে রাখলে খুশি হবেন—এই প্রশ্নের জবাবে ‘বাংলাদেশের অধিনায়ক ছিলেন’ এটাকেই বেশি বড় করে দেখাতে চাইলেন। ২০০৩ বিশ্বকাপের পর যে ঘোর তমশায় দলের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাতে অধিনায়ক খালেদ মাহমুদকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তবে ক্রিকেটার খালেদ মাহমুদের আসল পরিচয় তো অন্য। সংকল্প, লড়াই আর দৃঢ়প্রতিজ্ঞা দিয়ে প্রতিভার ঘাটতিও যে অনেকটাই ঢেকে দেওয়া যায়—মাহমুদের ক্যারিয়ার তো তারই ডকুমেন্টারি।

খালেদ মাহমুদকে নিয়ে লেখায় ‘লড়াকু’ শব্দটা কোনো না কোনোভাবে এসেছেই। বিদায়বেলায়ও সেটিকেই মনে হচ্ছে তাঁর যথার্থ স্বীকৃতি।

বিদায় ‘লড়াকু মাহমুদ’!