'জীবন্ত কিংবদন্তি’ কথাটা নিশ্চয়ই অনেক শুনেছেন। দেখেছেনও হয়তো কেউ কেউ।

আমি অনেক দেখেছি। আবারও দেখলাম। গত পরশু রাতে মাইকেল ফেল্‌প্‌সের সংবাদ সম্মেলনে বসে ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’ কথাটা বারবার ফিরে ফিরে আসছিল মনে। এই যে হাত চারেক দূরত্বে বসে থাকা মানুষটি, কী অসীম তাঁর ক্ষমতা! 

কোন ইতিহাসবিদ যেন ঘাঁটাঘাঁটি করে বের করেছেন, শুধু ১৮৯৬ সাল থেকে শুরু আধুনিক অলিম্পিকই নয়, খ্রিষ্টপূর্ব সময়ের প্রাচীন অলিম্পিকে ফিরে গেলেও মাইকেল ফেল্‌প্‌সের তুল্য কাউকে পাওয়া যাবে না। যা পড়তে পড়তে আমি ভাবছিলাম, উত্তর-আধুনিক বলে যদি কিছু থাকে, সেই সময়েও তো একই রকম বিস্ময় হয়ে থাকবেন ফেলপস। আজ থেকে ৪০-৫০-৬০ বছর পরে, কে জানে হয়তো তার চেয়েও বেশি, মাইকেল ফেল্‌প্‌সের কথা উঠবে আর মানুষ অবিশ্বাসে দুপাশে মাথা নাড়বে।

না, ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’তে কুলাচ্ছে না। এমন তো আমরা কতজনকেই বলি। মাইকেল ফেল্‌প্‌সের জন্য নতুন একটা কিছু দরকার। একটু আগে মিক্সড জোনে পাশ দিয়েই হেঁটে গেছেন। তার পরও কাছ থেকে দেখব বলে সংবাদ সম্মেলনে একেবারে সামনের সারিতে বসেছি। এমন না যে, এই প্রথম দেখছি। প্রথম দেখা তো সেই ২০০৪ এথেন্স অলিম্পিকেই। চার বছর পর বেইজিং অলিম্পিকে একটু দেরিতে গিয়েছিলাম। ফেল্‌প্‌সের শেষটাই শুধু ধরতে পেরেছি। এরপর লন্ডন। ফেল্‌প্‌সের কীর্তিভাস্বর আগের তিনটি অলিম্পিকে তাঁর বেশ কটি সংবাদ সম্মেলনেও ছিলাম। তখনো ফেলপসকে নিয়ে বিস্ময় ছিল, কিন্তু এখন বিস্ময়-টিস্ময় বলে ঠিক বোঝানো যাচ্ছে না। ফেল্‌প্‌সের কথা শুনতে শুনতে বরং মনে হচ্ছিল, এই লোকটা ঠিক মানুষ নয়, নিশ্চয়ই অতিপ্রাকৃত কিছু!

লন্ডন অলিম্পিকের মাঝখানে ফেল্‌প্‌সের একটা সংবাদ সম্মেলনের কথা মনে পড়ছে। ফেল্‌প্‌সের অলিম্পিক তত দিনে শেষ, মানে সাঁতার শেষ আর কি! ১৮টি সোনা আর মোট ২২টি পদক নিয়ে চলে যাচ্ছেন অবসরে। বিশাল এক হলরুমে সেই সংবাদ সম্মেলন। তার পরও অনেকে দাঁড়িয়ে। ফেলপসকে দেখার যে শেষ সুযোগ! তখন তো আর কেউ কল্পনাও করেননি, চার বছর পরের অলিম্পিকে ফেলপস থাকবেন! সেটি নিশ্চিত হওয়ার পরই বা কে ভেবেছিল, অ্যালকোহল আর পার্টিময় অবসর-পরবর্তী দুই বছর কাটিয়ে আবার সেই পুরোনো রূপেই দেখা দেবেন সুইমিংপুলে!

ফেরার সম্ভাবনা নিয়েও প্রশ্ন হয়েছিল লন্ডনে। যত দূর মনে পড়ছে, ‘প্রশ্নই ওঠে না’ জাতীয় উত্তরই দিয়েছিলেন। এদিন অবশ্য এমন প্রশ্ন হলো না। চার বছর পর টোকিও অলিম্পিকের সময় বয়স হবে ৩৫। ফেলপসকে সেখানে কল্পনা করাটা একটু না, বেশ বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। লিখতে লিখতেই মনে হলো, ফেলপস চাইলে বোধ হয় এটাও পারবেন! তাঁর অসাধ্য বলে কিছু নেই।

ওই যে বললাম না, ফেলপসকে মানুষের চেয়ে অতিপ্রাকৃত কিছু ভাবতে শুরু করেছি। কিন্তু এই অস্বাভাবিক ভাবনাটাই কি স্বাভাবিক নয়? একটা লোক অ্যাথলেটের নিয়মবাঁধা জীবন থেকে ছুটি পেয়ে ভাবলেন, ‘অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছি। এবার একটু জীবনটা উপভোগ করা যাক।’ তা করতে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলার পর মনে হলো, না, আবার সাঁতারেই ফিরে যাই। ঠিক করলেন, আরেকটি অলিম্পিকে আসবেন। এলেন এবং একের পর এক সোনা জিততে লাগলেন! নিজের চোখে দেখেই বিশ্বাস হতে চায় না, ভবিষ্যতে যাঁরা শুনবেন, তাঁদের কীভাবে হবে!

অলিম্পিকে সোনার পদককে এমনই নামের সমার্থক বানিয়ে ফেলেছেন যে, সাবেক মার্কিন মেয়ে ফুটবলার মিয়া হ্যাম টুইট করেছেন, অলিম্পিকে সোনাকে ‘ফেলপস পদক’ নাম দেওয়া হোক।

যত সহজভাবে বলা হলো, কাজটা অত সহজ ছিল না। ফিরবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অনেকবারই মনে হয়েছে, পারবেন না। সেই কঠিন সংগ্রামের দিনগুলোর কথা বলার সময় ফেলপস যেন দু-একবার শিউরেও উঠলেন। শুনতে শুনতেই তো গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল। ফেল্‌প্‌সের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষাটাও সার্থক মনে হলো। ২০০ মিটার মিডলের পরপরই সংবাদ সম্মেলনে আসবেন না, জানাই ছিল। একটু পরই ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ের সেমিফাইনাল। মাঝখানে আবার বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলায় সোনার পদক ঝোলানোর ব্যাপার আছে। যেটিকে এমনই নামের সমার্থক বানিয়ে ফেলেছেন যে, সাবেক মার্কিন মেয়ে ফুটবলার মিয়া হ্যাম টুইট করেছেন, অলিম্পিকে সোনাকে ‘ফেলপস পদক’ নাম দেওয়া হোক।

পুরস্কার বিতরণী শেষ করে কোনোমতে পোশাক বদলে আবারও পুলে। ১০০ মিটার বাটারফ্লাইয়ের ফাইনালেও উঠলেন। মিনিট পনেরোর মধ্যে সংবাদ সম্মেলন মঞ্চও প্রস্তুত। মিডলেতে পদকজয়ী তিনজন ফেলপস, কোসুকে হাগিনো ও শুন ইয়াংয়ের নাম লেখা বোর্ড বসে গেছে টেবিলে। কিছুক্ষণের মধ্যে শেষ দুজন চলে এলেন। কিন্তু যাঁর জন্য অপেক্ষা, সেই ফেলপস কই? 

আইওসির মিডিয়া কর্মকর্তা জানালেন, ফেল্‌প্‌সের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা হচ্ছে। হাগিনো-ওয়াংয়ের অংশটুকু শেষ করে ফেলার অনুরোধও করা হলো। আরও দুটি সংবাদ সম্মেলন শেষ হওয়ার পর আবার ঘোষণা এল, মিনিট পনেরো-বিশের মধ্যে আসবেন ফেলপস। শেষ পর্যন্ত এলেন রিওর রাত একটারও পরে। অলিম্পিকে সাংবাদিকেরা সব কত দূরে দূরে থাকেন। তার পরও সবাই ঠায় বসে রইলেন। সবাই কি শুধু পেশাগত কারণেই, নাকি আমার মতো এমন আরও কেউ কেউ ‘জীবন্ত কিংবদন্তি’কে আরেকবার দেখবেন বলেও!

না, না, জীবন্ত কিংবদন্তি নয়, অতিপ্রাকৃত এক মানবকে দেখবেন বলে।

আরো পড়ুন...
‘অসম্ভব’ শব্দটাই নেই ফেলপসের অভিধানে