সাকিব আল হাসানের কাছে টেস্ট ক্রিকেটটা একেবারেই নতুন। চট্টগ্রামে মাঠে নামার সময় বাংলাদেশের বাকি খেলোয়াড়দের কাছেও কি টেস্ট ক্রিকেটটা নতুন লাগেনি? সাকিব আল হাসানের সঙ্গে পার্থক্য বলতে ওই ‘একেবারে’ শব্দটাই। গত আট মাসে ৩১টি ওয়ানডে খেলে ফেলার পর টেস্ট অভিষেক হচ্ছে সাকিবের, তাঁর কাছে টেস্ট ক্রিকেট মানে এক অজানা-অচেনা ভুবনে পা রাখা। দলের বাকিদের জন্য তা নয়, তবে দীর্ঘ ১৩ মাস টেস্ট ক্রিকেটের সঙ্গে কোনো সংস্রব না থাকায় তাঁদের কাছেও টেস্ট ক্রিকেটটা নতুন নতুন মনে হওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক।

টেস্ট অভিষেকের আগে সাকিব, ১৩ মাস পর টেস্ট ক্রিকেটে ফিরছিল বাংলাদেশও। ছবি: এএফপি

২.

গত বছর এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজটি শেষে এরপর টেস্ট খেলতে ১৩ মাস অপেক্ষা করতে হবে শুনে হাবিবুল বাশারের খুব মন খারাপ হয়েছিল। ‘আমরা টেস্ট ক্রিকেটটা একটু বুঝতে শুরু করলাম, আর এখনই এই লম্বা বিরতি! আবার নতুন করে শুরু করতে হবে সব’—অধিনায়কের কথার দ্বিতীয় অংশটার সঙ্গে তো যে কারোরই বিনাবাক্যে একমত হতে হতো। প্রথম অংশটার সঙ্গেও দ্বিমত করার উপায় ছিল না। টেস্ট ক্রিকেটটা বুঝতে শুরু করার ওই দাবির পেছনেই যে একেবারে সজীব একটা স্মৃতি। মাত্রই বাংলাদেশ দল তাঁদের ইতিহাসের সেরা টেস্ট ম্যাচটা খেলেছে!

মিরপুর স্টেডিয়াম তৈরি হয়ে যাওয়ার পর ফতুল্লায় আর কোনো দিন টেস্ট ম্যাচ হবে কি না, কে জানে! যদি না-ই হয়, বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা আরও অনেক দিন তীর্থ দর্শনের মতো করে ফতুল্লা থেকে ঘুরে আসতে পারেন। গত বছর ৯ থেকে ১৩ এপ্রিল এই মাঠেই রচিত হয়েছে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের স্মরণীয়তম মহাকাব্যটি, একমাত্র টেস্ট জয়ের গৌরবও যেটির পাশে ম্লান। প্রবল পরাক্রান্ত অস্ট্রেলিয়াকে চার দিন নতজানু করে রেখেও বাংলাদেশ যে শেষ পর্যন্ত জিততে পারেনি, সে জন্য রিকি পন্টিংয়ের সেঞ্চুরিকে কারণ বলতে পারেন। বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংসে হাবিবুল বাশারের হেলতে-দুলতে রান আউট হয়ে যাওয়া, লং লেগে পন্টিংয়ের দেওয়া ক্যাচটি মাশরাফি বিন মুর্তজার ধরতে না পারা...এ রকম টুকরো কিছু দৃশ্যকেও বলতে পারেন স্বপ্নপূরণ আর স্বপ্নভঙ্গের পার্থক্য। তবে সবকিছুর পর সেই ম্যাচে বাংলাদেশের জিততে না পারার আসল কারণ বোধ হয় অন্য। টেস্ট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে দিচ্ছি—বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিজেদের কাছেই তা 'অবিশ্বাস্য' বলে মনে হওয়া।

সাকিবের অভিষেকের আগে বাংলাদেশের সর্বশেষ সিরিজে প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়া। ফতুল্লায় প্রথম টেস্টে বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছিল রিকি পন্টিংয়ের ব্যাট। ছবি: এএফপি

৩.

টেস্ট ক্রিকেটে ১৩ মাসের বিরতি বাংলাদেশ দলের মতো বাংলাদেশের সাংবাদিকদেরও বড় একটা সমস্যা করেছে! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্টের সেই দুঃস্বপ্নের ওপর কোনো প্রলেপ পড়েনি। ১৩ মাস বাংলাদেশের সর্বশেষ টেস্ট হয়ে থেকেছে সেটি, আর বাংলাদেশের সাংবাদিকদের মনে ফিরে ফিরে এসেছে পুলিশের নারকীয় তাণ্ডবের ওই অবিশ্বাস্য দৃশ্যগুলো। নাইটওয়াচম্যান হিসেবে ব্যাট করতে নেমে জ্যাসন গিলেস্পির ডাবল সেঞ্চুরি, মাইক হাসির ১৮২, মোহাম্মদ রফিকের দুই চার আর ছয় ছক্কায় সাজানো ৬৫-তে উজ্জ্বল বাংলাদেশের ৩০৭ রানের দ্বিতীয় ইনিংস রেকর্ড-বইয়ে আছে, বাংলাদেশের কোনো সংবাদপত্রের পাতায় নেই। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কোনো টেস্ট ম্যাচ বয়কট করার ওই ঘটনা ‘বিশ্ব রেকর্ড’, কিন্তু সেটি লজ্জার বিশ্ব রেকর্ড।

চট্টগ্রামের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্টেডিয়ামে আবারও টেস্ট ক্রিকেট ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছে সেই দুঃস্বপ্নের স্মৃতি। অবশ্য এবারের সুব্যবস্থাপনা দেখে সেই অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড শিক্ষা নিয়েছে বলেই মনে হয়েছে। তবে এক ফোঁটা গো-চনা যেমন কড়াইভর্তি দুধকে নষ্ট করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট, তেমনি বিসিবির সব উদ্যোগকে মূল্যহীন করে দিতে বসেছে বিদ্যুতের লুকোচুরি খেলা। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম দিন প্রেসবক্সে কতবার যে বিদ্যুৎ চলে গেছে, সেটির হিসাব রাখতে আরেকজন স্কোরারের প্রয়োজন ছিল! সারা দিন মিনিট তিন-চারের মধ্যে তা ফিরে এলেও রাতে সাংবাদিকদের সবার যখন ডেডলাইনের তাড়া, তখন প্রায় এক ঘণ্টা অন্ধকারে ডুবে রইল প্রেসবক্স। একটা টেস্ট ম্যাচ চলাকালে স্টেডিয়ামে কেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা যাবে না—ভারতীয় সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে অধোবদন হয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

৪.

চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিন ভারতীয় বোর্ড প্রেসিডেন্ট শারদ পাওয়ার দলবল নিয়ে চট্টগ্রামে আসছেন শুনে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা মহা উৎসাহী। সব দেশে বাংলাদেশের টেস্ট সিরিজ খেলা হয়ে গেল, একমাত্র ভারতেরই কেন বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানোর সময় হলো না—এই প্রশ্নের উত্তরটা তারা শারদ পাওয়ারের কাছ থেকে নিয়েই ছাড়বেন।

বাংলাদেশের ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলতে যেতে না পারার ব্যাপারটা এ দেশের ক্রিকেট-সাংবাদিকদের খুব প্রিয় বিষয়। পত্রপত্রিকায় প্রায়ই এ নিয়ে জ্বালাময়ী সব লেখা দেখা যায়। তাতে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় বোর্ডকে গালমন্দ থাকে। তবে এখন বোধ হয় সময় এসেছে, ভারতীয় বোর্ডকে না করে প্রশ্নটা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে করার। এই যে বাংলাদেশকে ভারতে টেস্ট সিরিজে আমন্ত্রণ না করা নিয়ে এত হইচই, বিসিবির কোনো কর্তাব্যক্তিকে এ নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করতে দেখেছেন? যে ভারত আন্তর্জাতিক সূচির বাইরে গিয়ে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টটাকে কয়েক মাস এগিয়ে দিয়েছিল, যে ভারত আড়াই বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গ সফরে এল, বাংলাদেশকে নিজেদের দেশে টেস্ট সিরিজ খেলতে আমন্ত্রণ না জানানোর মূলে কি শুধুই তাদের অনাগ্রহ, নাকি বিসিবিরও সামান্য অবদান আছে তাতে!

ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ টেস্ট পেয়েছে অভিষেকের ১৭ বছর পরে। ছবিটি অবশ্য ২০০৭ সিরিজের সময়কার। ছবি: এএফপি

ভারত সফর হলো কি না হলো, তা নিয়ে বিসিবির কতটুকু আগ্রহ, তা নিয়ে যথেষ্টই সংশয় আছে। বাংলাদেশ দল ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলতে গেলে যে বিসিবির কোনো লাভ নেই। বরং ভারত যত বেশি বাংলাদেশে আসে, ততই লাভ। টিভি-স্বত্ব বিক্রির সময় বিসিবিকে প্রথমেই যে প্রশ্নটির উত্তর দিতে হয়, তা হলো, যে সময়কালের জন্য টিভি-স্বত্ব বিক্রি হচ্ছে, এর মধ্যে ভারত ক'বার বাংলাদেশে আসবে? ভারতের বিপক্ষে একটি হোম সিরিজ মানেই বিসিবির কোষাগারে কোটি টাকার নিশ্চয়তা। আর ভারতকে নিয়ে একটি ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ আয়োজন করতে পারলে তো কথাই নেই। বাংলাদেশ দলকে আমন্ত্রণ জানানোর বদলে ভারতীয় বোর্ড যদি অতিরিক্ত একবার বাংলাদেশ সফরে আসার প্রতিশ্রুতি দেয় অথবা বাংলাদেশে একটি ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্টে খেলতে ‘সদয়’ সম্মতি জানায়, তাহলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আপত্তি করার বদলে ধন্যবাদ দিতে দিতে মুখে ফেনা তুলে ফেলার কথা। কে জানে, বাংলাদেশ দলের ভারতে টেস্ট সিরিজ খেলার সুযোগ না পাওয়ার আসল রহস্য হয়তো এটাই!

৫.

ওয়ানডেতে মাঝখানে প্রায় যে পাঁচ বছর বাংলাদেশ জয়হীন ছিল, সে সময়েই কিন্তু টেস্ট ম্যাচ প্রায় জিতেই ফেলেছিল একটা। মুলতানে ইনজামাম-উল হকের দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি আর কিছু বিতর্কিত আম্পায়ারিং সিদ্ধান্ত জিততে দেয়নি বাংলাদেশকে। তখন এমনও বলাবলি শুরু হয়েছিল, বাংলাদেশ ওয়ানডের চেয়ে টেস্টেই বেশি ভালো। গত বছর আড়াইয়ে সেই তর্কের সমাপ্তি হয়েছে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দলকে হারিয়ে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে, ওয়ানডেতে বাংলাদেশ আর হেলাফেলার দল নয়। টেস্ট ক্রিকেটেও এমন হতে হলে বাংলাদেশকে আরও অনেকটা পথ হাঁটতে হবে এবং সেই পথ যথেষ্টই বন্ধুর।

টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলিং ২০ উইকেট নেওয়ার মতো ছিল না, চৌদ্দ বছর বাদেও পরিস্থিতি বদলায়নি খুব একটা। ছবি: এএফপি

ওয়ানডেতে নির্দিষ্ট একটা দিনে ভালো খেললেই জেতা সম্ভব। প্রতিপক্ষের খারাপ দিন তো সেখানে বড় সহায় হয়ে আসে। টেস্টে ভালো করতে টানা পাঁচ দিন ভালো খেলতে হয়। একটা খারাপ দিন এলেও প্রতিপক্ষের ম্যাচে ফেরার সুযোগ থাকে। ফতুল্লায় যেমন ফিরেছিল অস্ট্রেলিয়া। ওয়ানডেতে প্রতিপক্ষকে অলআউট না করেও জেতা যায়, টেস্ট জিততে নিতে হয় ২০টি উইকেট। বাংলাদেশের বোলিং এখনো তেমন নয়। তিন বাঁহাতি স্পিনার নিয়ে ওয়ানডে জেতা যায়, কিন্তু টেস্টে বোলিং-বৈচিত্র্যটা বড় জরুরি। কোনো অফ স্পিনার নেই, নেই কোনো লেগ স্পিনার, মাশরাফি-শাহাদাতের মতো আক্রমণাত্মক আরেকজন পেস বোলার নেই...টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বোলিংয়ে শুধু নেই আর নেই। নেই বলে বসে না থেকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের উচিত, সম্ভাবনাময় উদীয়মান অফ স্পিনার-লেগ স্পিনারদের বাছাই করে প্রয়োজনে ক্যাম্প-ট্যাম্প করা। এটা এখন খুবই জরুরি। ভারত আমাদের টেস্ট সিরিজ খেলতে ডাকল কি ডাকল না, এ নিয়ে আলোচনার চেয়েও।