সকাল থেকেই ডব্লিউ জি গ্রেসের মেজাজ খুব চড়া। একে ধমকাচ্ছেন, ওকে ধমকাচ্ছেন। দাড়িওয়ালা বুড়োকে মাঝেমধ্যেই এমন খেপে উঠতে দেখাটা অভ্যাস হয়ে গেছে বলে কেউ তা গায়ে মাখছে না। বরং দু-একজন মুচকি হাসার মতো অপরাধ করে ফেলেছে। করে কড়া ধাতানি খেয়েছে।

এসব সময়ে বুড়োর মেজাজ ঠান্ডা করতে আলফ্রেড শর ডাক পড়ে। একসঙ্গে ক্রিকেট খেলেছেন। বয়সে বছর ছয়েকের বড়। এই স্বর্গধামেও গ্রেসের বছর আটেকের সিনিয়র। এসবই কারণ কি না কে জানে, তবে একমাত্র শকেই গ্রেস একটু সমঝে চলেন।

আজ অবশ্য আলফ্রেড শকে ডাকতে হলো না। তিনি এদিকেই আসছিলেন। বেশ দূর থেকেই ডব্লিউ জির বাজখাঁই গলা কানে যাওয়ায় তাঁর চলার গতি একটু দ্রুত হলো। এই রে, বুড়ো খোকাটা আবার খেপেছে!

ডব্লিউ জিকে ‘ওল্ড বেবি' বলেই ডাকেন শ। সেই প্রথম পরিচয়ের দিন থেকেই দেখে আসছেন, দশাসই ওই শরীরটার মধ্যে ছোট্ট একটা শিশুর বাস। জেদি, খেয়ালি, অবিবেচক–আবার একই সঙ্গে দয়ালু ও কৌতুকপ্রবণ ।

আলফ্রেড শকে দেখেই ডব্লিউ জির দাড়িগোঁফের জঙ্গলে এক চিলতে রোদ ঝিলিক দিল। শ মনে করার চেষ্টা করলেন, ডব্লিউ জির এই হাসির সঙ্গে তাঁর কত দিনের পরিচয়...দেড় শ বছরেরও বেশি হয়ে গেল দেখছি! ছোট্ট বালক বয়াম থেকে চুরি করে কিছু খেয়ে মায়ের কাছে ধরা পড়ে গেলে যে হাসিটা দেয়, ঠিক তেমন হাসি।

সেটিকে পাত্তা না দিয়ে তিনি বললেন, 'কী হে ওল্ড বেবি, তুমি দেখি পুরো স্বর্গ মাথায় তুলে ফেলেছ। রাতে তোমার ভালো ঘুম হয়নি, এটা অন্য কারও দোষ নাকি?'

ডব্লিউ জির মুখের হাসিটা নিভে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠল রাগ, 'আরে না, ঘুমটুম নয়, এর চেয়েও অনেক গুরুতর ব্যাপার। দুপুরে ক্রিকেট মাঠে গিয়ে দেখি, কদিন আগে এখানে আসা তিন-চার ছোকরা মিলে টেস্ট ইতিহাসের সেরা বোলারদের নিয়ে আলোচনা করছে। আমি বললাম, তোমাদের মুখে অনেক নাম শুনলাম, কিন্তু জর্জ লোহম্যানের নামটা উচ্চারিত হয়েছে বলে তো মনে পড়ছে না। ভেবেছিলাম, কোথায় লজ্জা পেয়ে জিবে কামড় দেবে, উল্টো ছোকরাগুলো বলে কিনা, লোহম্যানটা আবার কে? নামই তো শুনিনি। আপনিই বলুন, এ কথা শোনার পর কারও মেজাজ ঠিক থাকে??

আচ্ছা, ঘটনা তাহলে এই। আলফ্রেড শ বুঝতে পেরে হাসলেন। ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে অজ্ঞতা ডব্লিউ জি একদমই সহ্য করতে পারেন না। তাঁকে আরেকটু খেপানোর জন্য শ বললেন, 'লোহম্যানকে না চিনলে না চিনুক, ওই ছোকরাগুলো তোমাকে চিনতে পেরেছে তো?”

এই প্রশ্নটার কী প্রতিক্রিয়া হবে, আলফ্রেড শ তা জানতেন। জানতেন, ডব্লিউ জি খুব আশ্চর্য হয়ে বলবে, 'আরে, আমাকে চিনবে না মানে!'

ডব্লিউ জি গ্রেস

তবে বলার সময় গর্বের বদলে মুখে রাগ দেখে একটু অবাক হলেন। ডব্লিউ জি গজগজ করতে করতে বললেন, 'ভারি বেয়াদব ছোকরাগুলো, আমাকে বলে কিনা বুড়ো দাদু! ওতে অবশ্য আমি মাইন্ড করিনি; বরং এরপর যখন বলল, মর্ত্যলোকে যেখানেই ক্রিকেট খেলা হয়, সেখানেই নাকি আমার দাড়িওয়ালা মুখটা দেখলেই সবাই চিনে ফেলে; খুশিই হয়েছিলাম। কিন্তু এরপরই একটা ছোকরা কী বলল, জানেন? বলল, এক উইকেটকিপার যে বলেছিলেন, আপনার চেয়ে অপরিচ্ছন্ন কোনো ব্যাটসম্যানের পেছনে জীবনে দাঁড়াননি, তা দাদু কি এখনো সে রকমই আছেন, নাকি সপ্তাহে এক দিন স্নান-টান করা হয়? আরেকটা বিচ্ছু বলে, না, না, দাদু এখন মনে হয় স্নান করেন; তবে সেটি শুধু লিপইয়ারে। চিন্তা করে দেখুন, কেমন বেয়াদব!’

আলফ্রেড শ হো হো করে হেসে ফেললেন, 'তার মানে তো ছোঁড়াগুলোর ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা আছে। উইকেটকিপারটার নামটা যেন কী, নামটা যেন কী... আহা মনেই করতে পারছি না। তবে ও তো আসলেই বলেছিল, ডব্লিউ জি হ্যাড দ্য ডার্টিয়েস্ট নেক আই হ্যাভ এভার কেপ্ট টু। বলো, বলেনি?'

ডব্লিউ জি কথাটা না শোনার ভান করে বললেন, 'ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা আছে, না ছাই। পড়াশোনা থাকলে জর্জ লোহম্যান নামটা শুনে অমন ক্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকত নাকি? আরে, যে লোকটা মাত্র ১৮ টেস্টে ১১২ উইকেট পেয়েছে, তার নাম জানবি না! রেকর্ড-টেকর্ড নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করলেও তো নামটা চোখে পড়ার কথা। টেস্টে বোলিং গড় ১০.৭৫, স্ট্রাইক রেট ৩৪.১–কমপক্ষে ২০০০ বল করেছে এমন বোলারদের মধ্যে এখনো তো এই দুটি সেরা। অথচ জর্জ শেষ টেস্টটা খেলেছে কিনা প্রায় সোয়া শতাব্দী আগে। গড়ে ৩৪ বলে এক উইকেট–কেউ ভাঙ্ না দেখি এই রেকর্ড!'

জর্জ লোহ‌ম্যানের ব্যাপারে ডব্লিউ জির দুর্বলতার কথা আলফ্রেড শর খুব ভালো করেই জানা। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে লোহম্যানের অকালমৃত্যুটা শকেও খুব কষ্ট দিয়েছিল। তবে গ্রেসের কষ্টটা ছিল অনেক বেশি। কাউন্টিতে লোহম্যানের বিপক্ষে খেললেও টেস্টে কখনো তাঁর সঙ্গে খেলেননি শ। গ্রেস শুধু খেলেনইনি,লোহম্যানের শেষ টেস্টে তিনিই ছিলেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক। সারের কমিটির সঙ্গে গন্ডগোল ও ভগ্নস্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার—এই দুটি কারণ মিলিয়ে লোহম্যান দেশত্যাগী হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় চলে যান। বছর ছয়েক পর, ১৯০১ সালে আবার ইংল্যান্ডে ফিরেছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকা দলের ম্যানেজার হয়ে। এর কিছুদিন পরই যক্ষ্মায় মৃত্যু।

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম বলটি করেছিলেন ‌আলফ্রেড শ, টেস্ট ক্রিকেটের উদ্বোধন তো তাহলে তাঁর হাতেই। ছবি: উইকিপিডিয়ালোহম্যানের মৃত্যুর বছর ছয়েকের মধ্যেই অবশ্য তাঁর সঙ্গে আলফ্রেড শর দেখা হয়েছে। দেখতে দেখতে এক শ বছরেরও বেশি হয়ে গেল, অথচ স্বর্গে প্রথম দিনটির কথা ভাবলে মনে হয়, এই তো সেদিন! শর সঙ্গে স্বর্গবাসী সব ক্রিকেটারকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন লোহম্যান। সেই পরিচয় পর্বের শুরুতে একটা লাইন ছিল কমন—এই যে আলফ্রেড শ, টেস্ট ক্রিকেটের উদ্বোধক। যাঁরা বুঝতে পারেননি, তাঁদের বুঝিয়েও বলেছিল উদ্বোধনের ব্যাপারটা। ১৮৭৭ সালের ১৫ মার্চ মেলবোর্নে ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচের প্রথম বলটি করেছিলেন ইংল্যান্ডের এই ডান হাতি স্লো মিডিয়াম বোলার। তার মানে তো ওনার হাতেই টেস্ট ক্রিকেটের উদ্বোধন, তাই না?

শুনতে শুনতে শর গর্বই লাগছিল। তাঁর হাতেই টেস্ট ক্রিকেটের উদ্বোধন—এভাবে তো ভাবেননি; বরং এত দিন টেস্টে প্রথম বলটি করার গর্বের চেয়ে টেস্টে প্রথম উইকেটটি না পাওয়ার দুঃখই বেশি বড় হয়ে ছিল তাঁর মনে। সেটি পেয়েছিলেন তাঁর নতুন বলের সঙ্গী অ্যালান হিল, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনার নাথানিয়েল টমসনকে বোল্ড করে। টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ক্যাচ নেওয়ার কৃতিত্বও হিলের, তাতে অবশ্য হিলের চেয়ে শ-ই বেশি আনন্দে ভেসেছিলেন। হিলের নেওয়া ওই ক্যাচটিই যে প্রথম টেস্ট উইকেটের স্বাদ দিয়েছিল তাঁকে।

অভিষেকেই ৮ উইকেট নিয়ে শুরু টেস্ট ক্যারিয়ার, অথচ পরের ৬ টেস্টে মাত্র ৪ উইকেট! এটা নিয়েও শর মনে আক্ষেপ ছিল। লোহম্যানের কথা শুনে তা উধাও। সত্যিই তো, অনেকে অনেক রেকর্ড করবে, কিন্তু টেস্টে প্রথম বলটি করার গৌরব তো আর কারও হবে না। এটি চিরদিন আমারই থাকবে।

শর টেস্ট ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার চার বছর পর লোহম্যানের টেস্ট অভিষেক। তবে ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার শেষ একই বছরে, সেই ১৮৯৭ সালে। শ ভাবতেই পারেননি, তাঁর ক্যারিয়ারের খুঁটিনাটি লোহম্যানের এমন মুখস্থ। স্বর্গবাসীর কাছে এমন সাড়ম্বরে সেটির বর্ণনা দিচ্ছিলেন যে, শর একটু লজ্জাই লাগছিল। আবার একটু গর্বও যে হচ্ছিল, সেটি স্বীকার না করাটা ভণ্ডামি হবে। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে কমপক্ষে ২০০০ উইকেট পেয়েছেন, এমন বোলারদের মধ্যে তাঁর ১২.১৩ বোলিং গড়ই যে সবচেয়ে কম, এটা শুনলে কার না গর্ব হবে!

জর্জ লোহ্ম্যান: এখনো বিস্ময় জাগায় তাঁর রেকর্ড

শর বোলিংয়ের আরেকটি বিশেষত্বের কথাও সবিস্তারে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিলেন লোহম্যান। অভিষেক টেস্টে যত ওভার বোলিং করেছিলেন, রান দিয়েছিলেন তার চেয়েও কম। ৩৩ বছরব্যাপী ফার্স্ট ক্লাস ক্যারিয়ার শেষেও ওভার আর রানের এই অনুপাতটা ঠিক ছিল। এসবই যে চার বলের ওভার, এটি বলতেও ভোলেনি ছোঁড়াটা। লোহম্যানের করিয়ে দেওয়া সেই পরিচয় পর্বের কথা মনে করে আলফ্রেড শর মুখে সস্নেহ হাসি ফুটে ওঠে।

নিজের কথা নিজে বলাটা কেমন দেখায়, তারপরও শ দু-একটা তথ্য যোগ না করে পারেননি। একটি-দুটি নো বল করলেও করে থাকতে পারেন, কিন্তু ক্যারিয়ারেই কখনো ওয়াইড বল করেননি। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে এক ম্যাচে দুটি হ্যাটট্রিকের প্রথম কীর্তিটাও তাঁর। ১৮৭৪ সালে সেটি আবার 'বুড়ো খোকা'র দল গ্লস্টারশায়ারের বিপক্ষেই।

হাসতে হাসতে বলেছিলেন, 'আরেকটি প্রথম-ও আছে আমার। আমি টেস্ট ক্রিকেটে স্টাম্পড হওয়া প্রথম ব্যাটসম্যান।' ১৮৭৫ সালে এমসিসির বিপক্ষে নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে তাঁর বিখ্যাত বোলিং পারফরম্যান্সের কথাটাও সবাইকে জানিয়ে দিতে চাইছিলেন। কিন্তু নিজের ঢাক নিজে পেটাতে লজ্জা লাগল। আশা করেছিলেন, লোহম্যানই বলবে। বলল না। ওর তখন ১০ বছর বয়স, হয়তো সেভাবে খেয়াল করেনি। নইলে শর ওই পারফরম্যান্স তো ভোলার মতো নয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৬ বল করে মাত্র ৭ রানে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট।

সামনে তখনো গজগজ করতে থাকা ডব্লিউ জি গ্রেসের দিকে তাকিয়ে শ হাসলেন। লর্ডসের ওই ম্যাচে দুই ইনিংসেই ডব্লিউ জিকে বোল্ড করেছিলেন, এটাও খুব তৃপ্তির ব্যাপার ছিল। ডক্টরকে আউট করা সহজ ব্যাপার ছিল নাকি! তাঁর সময়ে বোলারদের সবচেয়ে প্রার্থিত উইকেট ছিল এই দাড়িওয়ালারটাই। স্বর্গে এসে 'ওল্ড বেবি' ডাকেন, তবে পৃথিবীতে ডব্লিউ জিকে শ 'ডক্টর' বলেই ডাকতেন, বেশির ভাগ সময় সংক্ষেপে 'ডক' বলে। আনমনা আলফ্রেড শকে হাসতে দেখে ডব্লিউ জি ঘটনা কী জানতে চাইলেন। শ একবার ভাবলেন, লর্ডসে দুই ইনিংসেই বোল্ড করার কথাটা মনে করিয়ে দিয়ে বুড়ো খোকা'কে চেতিয়ে দেবেন কি না। নিজেকে সামলালেন; থাক, বেচারা এমনিতেই রেগে আছে।

মুখে মৃদু হাসি রেখেই বরং বললেন, স্বর্গ প্রবেশের দিনটিতে লোহম্যান তাঁকে কেমন সাড়ম্বরে সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেই দৃশ্যটা চোখের সামনে ভাসছে।

'ওল্ড বেবি, তোমাকে কি বলেছি, সেদিন জেমস সাদারটন আমাকে কী বলেছিলেন?'

শর মুখে এই গল্প প্রতি সপ্তাহেই একবার শুনতে হয় এবং প্রতিবারই ডব্লিউ জি গ্রেস তা প্রথম শুনছেন, এমন একটা ভান করেন। আজও তা-ই করলেন। গল্পটা এ রকম—লোহ্ম্যন যখন শর হাতে টেস্ট ক্রিকেটের উদ্বোধনের কথা বলছেন, জেমস সাদারটন এগিয়ে এসে বললেন, 'বৎস, তোমার একটা কীর্তি যেমন অবিনশ্বর, আমার তেমন কীর্তি দুটি। এর মধ্যে একটা যে চিরদিনই অবিনশ্বর হয়ে থাকবে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই।'

সাদারটনকে শ ভালো করেই চেনেন। ইতিহাসের প্রথম দুটি টেস্ট ম্যাচে তাঁর সতীর্থ ছিলেন। টেস্ট অভিষেকের সময়ই রীতিমতো 'বুড়ো', বয়স ৫০ ছুঁই-ছুঁই। সবচেয়ে বেশি বয়সে টেস্ট অভিষেক হওয়ার এই রেকর্ড হয়তো কোনো দিনই ভাঙবে না। কিন্তু অবিনশ্বর আরেকটা কোন কীর্তির কথা বলছেন সাদারটন?

শর প্রশ্নমাখা চোখের দিকে তাকিয়ে সাবেক অফ ব্রেক বোলার বললেন, 'দ্বিতীয় টেস্টটা খেলার বছর তিনেক পর, ১৮৮০ সালে আমি এই স্বর্গে এসেছি। আমি হলাম মৃত্যুকে উইকেট দেওয়া প্রথম টেস্ট ক্রিকেটার। তোমার টেস্টে প্রথম বল করার কীর্তি যেমন অবিনশ্বর, আমার এই রেকর্ডও তা-ই। যত প্রতিভাবানই হোক না কেন, আমার আগে তো আর কোনো টেস্ট ক্রিকেটার মরতে পারবে না...হা হা হা।'

জেমস সাদারটন: সবচেয়ে বেশি বয়সে টেস্ট অভিষেক, সবার আগে মারা যাওয়া টেস্ট ক্রিকেটার

প্রতিবারই গল্পটা শেষ করে সাদারটনের অনুকরণে হা হা হাসি দেন আলফ্রেড শ। সেটির সঙ্গে ডব্লিউ জি গ্রেসেরও সংগত করার নিয়ম। আজও নিয়মের ব্যতিক্রম হলো না। দুজনই হা হা করে হাসতে লাগলেন। হাসির দমক একটু কমে আসার পর ডব্লিউ জি গ্রেস বললেন, 'আমার মনটা ভালো করে দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। আজকের দিনটা খুব হাসিখুশি থাকব বলে ঠিক করে রেখেছিলাম, কিন্তু ওই ছোকরাগুলোর কথায় মেজাজটা খিঁচড়ে গিয়েছিল। শ জানতে চাইলেন, 'আজকের দিনটির কী এমন মাহাত্ম্য?

আজ ১৭ মে। এই দিনেই আমি সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি করেছিলাম, কত বছর আগের কথা বলো তো...সেই ১৮৯৫ সালে–ডব্লিউ জি গ্রেসের দৃষ্টি সুদূরে হারিয়ে। সমারসেটের বিপক্ষে ২৮৮ রানের ইনিংসটি যেন মনশ্চক্ষে দেখতে পাচ্ছেন।

ব্রিস্টলে সেদিন কী কনকনে ঠান্ডা! তুষারপাতও হচ্ছিল। ব্যাটিংয়ের সময় দাড়িতে আটকে যাচ্ছিল তুষারের কণা। পুরো মাঠ উন্মুখ হয়ে আছে শততম সেঞ্চুরির অভূতপূর্ব কীর্তির সাক্ষী হতে। ৯৮ রানে গিয়ে এমন হাত-পা কাঁপছিল! জীবনে আর কখনো এত নার্ভাস লাগেনি। এর মধ্যেও বোলার স্যাম উডসকে দেখে হাসি পাচ্ছিল। ওর অবস্থা তো দেখি আরও খারাপ। বলই করতে পারছে না। আরে বাবা, তোর সমস্যা কী!

পরে ও বলেছিল, ওর সমস্যাও কম জটিল ছিল না। এত মানুষ আমার সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি দেখতে এসেছে। এখন যদি ও ২ রান বাকি থাকতে আমাকে আউট করে দেয়, পাবলিক ওকে আস্ত রাখবে নাকি! ইচ্ছা করেই কিনা, উডস লেগ স্টাম্পে মোয়ার মতো একটা বল দিল, চার মেরে ৯৮ থেকে ১০২-এ চলে গেলাম।

সেঞ্চুরিটা হয়ে যাওয়ার পরই উডস আবার তেড়েফুঁড়ে বল করতে শুরু করল। ওর কথাটাও কানে এসেছিল, 'এবার শয়তানটাকে আউট করব!' আউট করবি, আয় দেখি কেমন পারিস।

সেঞ্চুরির পর যেমন ইচ্ছা মেরেছিলাম। ট্রিপল সেঞ্চুরি থেকে ১২ রান দূরে থাকতে ওয়াইডিশ মিড অফে ক্যাচ দেওয়ার আগে ইনিংসে কোনো কালিমাচিহ্ন নেই। বয়স তখন ৪৭ ছুঁই ছুঁই, শীতটা বড় ভুগিয়েছিল সেবার, তারপরও মের মধ্যেই এক হাজার রান পূর্ণ করতে পেরে বড় তৃপ্তি লেগেছিল।

ব্যাটিংয়ের প্রথম ব্যাকরণটা ডব্লিউ জি গ্রেসেরই তৈরি করা। ছবি: উইকিপিডিয়া

১৮৭১ থেকে ১৮৭৬ যৌবনের উচ্ছ্বাসভরা সেই দিনগুলো যেন ফিরে এসেছিল ১৮৯৫ সালের ওই বিকেল-বসন্তে। ১৮৭১ সালে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে করেছিলেন ২৭৩৯ রান। গড় ৭৮.২৫। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যাটিং গড় ছিল সে সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান রিচার্ড ডাফের। সেটি কত পরিষ্কার মনে আছে ডব্লিউ জির। ৩৭.৬৬!

সেবারই এক ম্যাচের পর কোন পত্রিকায় যেন রেজাল্ট ছাপা হয়েছিল, মিস্টার গ্রেস ৭ উইকেটে জিতেছেন। ওটা নিয়ে সতীর্থরা খুব পেছনে লেগেছিল। মনে পড়ছে, ১৮৭৬ সালে ওই স্বপ্নের মতো আটটি দিন–১১ আগস্ট থেকে ১৮ আগস্ট। মোট রান করেছিলেন ৮৩৯। পরপর তিনটি ইনিংস ছিল ৩৪৪, ১৭৭ ও অপরাজিত ৩১৮ রানের। অ্যাভারেজ নিয়ে দুষ্টুমি করে তিনি বলতেন, ফোর হানড্রেড নাইনটিন অ্যান্ড হাফ!

ভঙ্গিটা দুষ্টুমির, তবে অঙ্কটা সত্যি। ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেটে প্রথম ট্রিপল সেঞ্চুরি তাঁর৷ সাত দিনের মধ্যেই দ্বিতীয়টিও। টানা ওই তিনটি ইনিংসের সময়ই এক সতীর্থ অভিযোগ করেছিলেন, 'মিস্টার গ্রেসের সঙ্গে ব্যাটিং করে কোনো মজা নেই। সব সময় তাঁর রানের জন্যই দৌড়াতে হয়।'

ডব্লিউ জিকে অতীতে ডুব দিতে দেখে আলফ্রেড শও অতীতচারী হয়ে গেলেন। ক্রিকেট মাঠে ডব্লিউ জির অনেক কাণ্ডকীর্তি নিজের চোখে দেখেছেন। যত দেখেছেন, শুনেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। কাউন্টিতে তো আর এক দলে খেলতেন না। তিনি খেলতেন নটিংহ্যামশায়ারে, গ্লস্টারশায়ারে ডব্লিউ জি। কিন্তু নটসের হয়ে অন্য কোনো দলের বিপক্ষে খেলার সময়ও কীভাবে কীভাবে যেন ডব্লিউ জি হাজির হয়ে যেত। খবর আসত, হয় সেঞ্চুরি করেছে ডক্টর, নয় তো ১০ উইকেট নিয়েছে।

একবার তো এক ম্যাচেই এই যুগল কীর্তির চূড়ান্ত রূপ। ব্যাটিংয়ে সেঞ্চুরির সঙ্গে বোলিংয়ে প্রতিপক্ষ ইনিংসের ১০ উইকেটও নিয়ে নিলেন। সেটি ১৮৮৬ সালে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিপক্ষে ম্যাচ, ডব্লিউ জি খেলছিলেন এমসিসির হয়ে। এসব তো শুধু খেলার ব্যাপার, এর বাইরেও ডক্টরকে ঘিরে কত মজার ঘটনা যে মুখে মুখে উড়ে বেড়ােত।

গ্রামের কোন খেলায় আম্পায়ার আউট দিয়েছে। ডব্লিউ জি গ্রেস আম্পায়ারকে কড়কে দিয়ে বললেন, 'এই ছোঁড়া, দশ গ্রাম থেকে দর্শক এসেছে কি তোমার আম্পায়ারিং দেখতে, নাকি আমার ব্যাটিং দেখতে!' বলে দিব্যি ব্যাট করতে লাগলেন।

এই গল্পের কত রকম সংস্করণই যে শোনা গেছে। কোনোটাতে ডব্লিউ জি বোল্ড হয়ে গেছেন, নির্বিকার ভঙ্গিতে স্টাম্পে বেল বসিয়ে কিছুই হয়নি ভঙ্গিতে আবার ব্যাটিং শুরু করেছেন। আবার কোনোটাতে আম্পায়ার এলবিডব্লু ঘোষণা করে তর্জনী তুলে দেওয়ার পর গ্রেসের ওই বাণী ।

গ্রেসকে জিজ্ঞেস করলে হাসি দিয়ে বলেন, 'সবগুলো গল্পই আমার পছন্দ । আমি তাই কোনোটাই স্বীকার বা অস্বীকার করছি না।'

১৮৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের ইংল্যান্ড দল। ছবির মাঝখানে বসে ডব্লিউ জি গ্রেস

এমন আরও কত গল্প! স্টাম্পে বল লেগে বেল পড়ে গেছে। ডব্লিউ জি গ্রেস আবার তা তুলে বসাতে বসাতে আম্পায়ারের দিকে হাসি দিয়ে বললেন, 'আজ বড্ড বেশি বাতাস!” আম্পায়ারও হেসে বললেন, 'ঠিক বলেছেন। আশা করি, এই বাতাস গুড ডক্টরকে প্যাভিলিয়নে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।

আরেক ম্যাচে সে সময়ের আগুনে গতির বোলার এসেক্সের জেমস কর্টরাইট গ্রেসের প্যাডে বল লাগিয়ে কয়েকবার আপিল করে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন। আম্পায়ারের প্রত্যাখ্যানের চেয়ে গায়ে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে গ্রেসের টীকা-টিপ্পনী। শেষে একটা বলে গ্রেসের দুটি স্টাম্প উপড়ে ফেললেন।

গ্রেস চলে যাচ্ছেন, কর্টরাইট বললেন, ‘সেকি, ডাক্তার, চলে যাচ্ছ কেন? একটা স্টাম্প তো এখনো দাঁড়িয়ে—!’

গ্রেসকে ঘিরে এমন কত গল্পগাথা! কিন্তু ক্রিকেটার ডব্লিউ জি গ্রেসকে তা আড়াল করে দেবে এমন সাধ্য কি!

ওই কর্টরাইটও তো পরে বলবেন, 'ডক্টর গ্রেস? অদ্বিতীয়, সবার সেরা। যে বলই দেওয়া যাক, চূর্ণ করে দেন।

টানা ৪৪ বছর ফার্স্ট ক্লাস ক্রিকেট খেলেছেন। রান করেছেন ৫৪ হাজারেরও বেশি, ২৮০০-এর বেশি উইকেট। ডব্লিউ জির ১২৬টি সেঞ্চুরির কথা ভাবতে ভাবতে শর মনে বিস্ময় জাগে, কোথায় ব্যাটিং করে তা করেছেন ডক্টর, উইকেট তো নয়, যেন চষা খেত!

গ্রেস খেলা ছাড়ার কয়েক বছর পর যখন অন্যদের সঙ্গে তাঁর তুলনা শুরু হলো, শ তাই বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন, 'যখন আমি ডক্টর ডব্লিউ জি গ্রেস এবং বর্তমান সময়ের কিছু গ্রেট ব্যাটসম্যানের তুলনা করতে শুনি, আমার এটা মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি মনে হয়, ডক্টরকে শুধু এর চেয়ে ভালো বোলারদেরই খেলতে হয়নি, খেলতে হয়েছে এর চেয়ে অনেক জঘন্য জঘন্য উইকেটেও।'

ডব্লিউ জি গ্রেসকে আউট করেছেন অনেকবারই, তবে তাঁর হাতে নাজেহালও কম হতে হয়নি। ডব্লিউ জির দিকে তাকিয়ে শর মনে পড়ল একবার তাঁর সম্পর্কে কী বলেছিলেন, 'আমি যেখানে চাই, বলটা সেখানেই করি, আর বুড়োটা যেখানে চায় সেখানেই সেটিকে পাঠিয়ে দেয়।'

নিজের প্রশংসা শুনলে ডব্লিউ জি এখনো খুব খুশি হন। শ কথাটা তাই জোরেই বললেন। শুনে ডব্লিউ জির দাড়িগোঁফের জঙ্গলের মাঝে সেই রোদের ঝিলিক, 'ক্রিকেটটা বোধ হয় খারাপ খেলতাম না, তাই না?'

(লেখকের 'কল্পলোকে ক্রিকেটের গল্প' বই থেকে)।