আপনাদের তো আগেই জানিয়েছি, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কা মারার কীর্তি আছে শুধু বাংলাদেশেরই দুই ব্যাটসম্যানের। এ নিয়ে লেখাটা যদি পড়ে থাকেন এবং নাম দুটি  আপনার মনে থাকে, হয়তো একটা কারেকশন করে দেওয়ার জন্য ছটফট করছেন। 

বাংলাদেশের 'দুই ব্যাটসম্যান' লিখেছি, ক্রিকেটে সবাইকেই যেহেতু ব্যাটিং করতে হয়, টেকনিক্যালি সবাই তাই ব্যাটসম্যান। তবে কাউকে ব্যাটসম্যান বলে পরিচয় করিয়ে দিলে ধরে নেওয়া স্বাভাবিক যে, স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানের কথাই বলা হচ্ছে। এই বিবেচনায় কারেকশন করে এটা বলাই ভালো, বাংলাদেশের এক ব্যাটসম্যান ও এক বোলার। 

ব্যাটসম্যানের নাম জহুরুল ইসলাম অমি। প্রথম দুই স্কোরিং শটেই ছক্কা মারার মতো ব্যাটিং-বীরত্ব দেখানো শফিউল ইসলামের মূল পরিচয় তো পেস বোলার।

এর চেয়েও বড় একটা কারেকশন যে করার আছে, তা আপনি লেখার ভূমিকা থেকেই জেনে গেছে। সেটির বিস্তারিত একটু পরে বলি। জহুরুল-শফিউল অংশটা আগে শেষ করে নিই।

জহুরুল যখন ছক্কায় টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম রান করেন, তখন তাঁকে চোখ রাঙাচ্ছিল টেস্ট অভিষেকে 'পেয়ার'! ইংলিশ অফ স্পিনার গ্রায়েম সোয়ানকে ওভার দ্য টপ ছক্কা মেরে সেই দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি। ছয় বল পর আরেক অফ স্পিনার জেমস ট্রেডওয়েলকে আরেকটি ছক্কা। 
এটা ২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুর টেস্টের ঘটনা। এর বছর চারেক আগে থেকেই ক্রিকেট সিরিজের সময় প্রথম আলোতে 'থার্ডম্যান থেকে' নামে নিয়মিত একটা কলাম লিখি। জহুরুলের এই যুগল ছক্কায় টেস্ট ক্রিকেটে ধারাভাষ্যকারদের ভাষায় 'রানের খাতা খোলা' নিয়ে কলামটা লেখার পর তাপস চক্রবর্তী নামে এক পাঠক মনে করিয়ে দেন, মাস দুয়েক আগে ভারতের বিপক্ষে শফিউলও একই কাজ করেছেন। ভারতীয় লেগ স্পিনার অমিত মিশ্রকে মারা তাঁর দুটি ছক্কা অবশ্য ছিল দুই ইনিংসে। তাতে কি, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কার শর্ত তো তাতেও পূরণ হয়।

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কার কীর্তিিতে প্রথম শফিউল ইসলাম। ছবি: পিএ ফটোস্

কিন্তু টেস্ট ক্রিকেটে এর আগে কেউ তা করতে পারেননি, তা হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত হওয়ার পথ কী? আমি যতটা পারি, চেক করে আর এমন কাউকে পেলাম না। প্রথম স্কোরিং শটে ছক্কাই তো মেরেছিলেন এর আগে মাত্র চারজন। বাকিটা ছেড়ে দিলাম উইজডেনের হাতে। ১৯৯৮ সাল থেকে ‘ক্রিকেটের বাইবেল’-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছি। উইজডেন অ্যালম্যানাকের জন্য ভারতের বিপক্ষে ওই ২০১০ সিরিজের রিভিউ লেখাটার দায়িত্বও আমার ওপর পড়েছে। তা লিখে পাঠানোর সময় আমি শফিউল আর জহুরুলের ‘রেকর্ড’-এর কথা লিখে সঙ্গে ছোট্ট একটা নোট পাঠালাম উইজডেন সম্পাদককে। রেকর্ড-পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে নির্ভুলতার জন্যই তো উইজডেন অ্যালম্যানাকের অন্য নাম ‘ক্রিকেটের বাইবেল’, উইজডেন কনফার্ম করলেই তো আর কোনো সন্দেহ থাকে না। ২০১১ সালের উইজডেন হাতে পাওয়ার পর দেখলাম, আমি যা লিখেছিলাম, তার সঙ্গে শুধু ‘was believed to be’ যোগ করে দেওয়া হয়েছে।

ওই প্যারাটা  হুবহুই তুলে দিচ্ছি: Debutant fast bowler Shafiul Islam had not done much with the ball, but achieved a remarkable batting feat. Though he scored only 14 runs in two innings, he got off the mark with a six off leg-spinner Amit Mishra both times, and was believed to be the first player whose first two socring shots in Test cricket went for six.

উইজডেনের জন্য বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড সিরিজের রিভিউটা লিখেছিলেন ইংলিশ সাংবাদিক ডেভিড হপস। জহুরুলকে নিয়ে তাঁর লেখা লাইনটা ছিল এরকম: Jahurul Islam, who had made a duck in the first innings, emulated team-mate Shafiul Islam against India in January when his first two scoring shots in Test cricket were sixes.

জহুরুল ইসলাম অমির প্রথম দুই স্কোরিং শটেই ছক্কা নিয়ে লেখার সময় ভুলে গিয়েছিলাম, শফিউল যে কিছুদিন আগেই তা করে রেখেছেন। ছবি: এএফপি

যাক্, আমি এখন নিশ্চিন্ত, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটে ছক্কা যে শুধু শফিউল আর জহুরুলেরই, তা অফিসিয়াল স্বীকৃতি পেয়ে গেল। শফিউলের কথা ভুলে যাওয়ায় জহুরুলকে নিয়ে লেখাটাতে ছক্কায় টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম রান করায় তাঁর পূর্বসূরি পেয়েছিলাম চারজনকে। কেউই তেমন বিখ্যাত নন। এই কীর্তিতে প্রথম অস্ট্রেলিয়ার এরিক ফ্রিম্যান (১৯৬৮ সালে ভারতের বিপক্ষে ব্রিসবেনে, ৬২৬ নম্বর টেস্টে ) খেলেছেন সবচেয়ে বেশি ১১টি টেস্ট। বাকি চারজন—ওয়েস্ট ইন্ডিজের কার্লাইল বেস্ট ও ডেল রিচার্ডস, জিম্বাবুয়ের কিথ দাবেংওয়া যথাক্রমে ৮, ২ ও ৩টি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুজনকে একসঙ্গে রাখতে ডেল রিচার্ডসের নামটা আগে লিখেছি। তবে ঘটনার ক্রম হিসেবে এই ওপেনার আসেন চার নম্বরে। বাংলাদেশ আছে এখানেও। ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে ডেল রিচার্ডসের ওই কীর্তি—মাশরাফির করা ইনিংসের প্রথম তিনটি বলে রান নিতে না পারার পর চতুর্থ বলেই ছক্কা!

জহুরুল আর শফিউলকে নিয়ে পুরোনো লেখাটা সেদিন ওয়েবসাইটে দেওয়ার পর মনে হলো, এই হিসাব তো ছিল ২০১০ সাল পর্যন্ত। এখন দেখি তো, কী অবস্থা! অবস্থা দেখতে গিয়ে একটু চমকেই গেলাম। টেস্ট ক্রিকেটের প্রথম ১৩৩ বছরে মাত্র ছয়জন যে কাজটা করতে পেরেছিলেন, পরের ১১ বছরেই দেখি সংখ্যাটা দ্বিগুণ হয়ে গেছে। এটা যত না চমকে দিয়েছে, তার চেয়েও বেশি এই তথ্যটা, এই ১২ জনের চারজনই বাংলাদেশের!

টেস্ট ক্রিকেটে যে কীর্তিটা মাত্র ১২ জনের, তার চারজনই বাংলাদেশের…এই লেখাটা শুরু করার সময় মাথায় বিষয় হিসেবে ছিল শুধু এটাই। অনেকটা লিখে ফেলার পর একটা কৌতূহল হলো। সেই কৌতূহল থেকে যা পেলাম, তা রীতিমতো হতভম্ব করে দেওয়ার মতো।

শফিউল-জহুরুলের পর প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা মারার তালিকায় বাংলাদেশের আরও যে দুজন যোগ হয়েছেন, তাঁরাও পেস বোলার। আল আমিন হোসেন ও কামরুল ইসলাম রাব্বী। আল আমিন ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে মিরপুরে টেস্ট অভিষেকে শূন্য রানে অপরাজিত থাকার পর বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাটিং করারই সুযোগ পাননি। মাস তিনেক পর মিরপুরেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় বলেই রঙ্গনা হেরাথকে লং অনের ওপর দিয়ে ছক্কা মেরে টেস্টে প্রথম স্কোরিং শটেই ছয় মারা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় ঢুকে যান তিনি। প্রথম তিন ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়ার পর রাব্বীর প্রথম স্কোরিং শটেই ছক্কা ইংলিশ অফ স্পিনার মঈন আলীর বলে। ২০১৬ সালে সেই মিরপুরেই।

টেস্ট ক্রিকেটে যে কীর্তিটা মাত্র ১২ জনের, তার চারজনই বাংলাদেশের…এই লেখাটা শুরু করার সময় মাথায় বিষয় হিসেবে ছিল শুধু এটাই। অনেকটা লিখে ফেলার পর একটা কৌতূহল হলো। আল আমিন যেহেতু প্রথম ইনিংসে ওই ৬ রানেই অপরাজিত ছিলেন, তার মানে স্কোরিং শট তো ওই একটাই। দ্বিতীয় স্কোরিং শটটা কী ছিল, তা একটু দেখে নেওয়া নিরাপদ না? ও মা, দ্বিতীয় ইনিংসে দেখি আল আমিন ১৮ বলে অপরাজিত ৩২ করেছিলেন, যাতে আবার ৪টি ছক্কা! সেই ছক্কাগুলো খুঁজতে বল বাই বল কমেন্টারিতে গিয়েই বিষম চমক। প্রথম বলটা 'ডট' দেওয়ার পর দ্বিতীয় বলেই ইনিংসের চার ছক্কার প্রথমটি মেরেছেন! যার মানে, টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কার কীর্তিতে জহুরুল ও শফিউলের সঙ্গী আল আমিনও!

এমন অবাক হলাম যে, বলার মতো নয়। প্রায় দেড় শতাব্দী প্রাচীন টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কা মারার কীর্তি কিনা শুধুই তিন বাংলাদেশির! এ-ও কি সম্ভব!

টেস্টে প্রথম দুই স্কোরিং শটই ছক্কা: এই কীর্তিতে শফিউল ও জহুুরুলের সঙ্গী বাংলাদেশেরই আল আমিন হোসেন। ছবি: এএফপি

এই বিস্ময় থেকেই পুরোপুরি নিশ্চিত হতে চাইলাম। আল আমিনের ঘটনাটা যেমন প্রথমে মিস করে ফেলেছিলাম, বাকিদের ক্ষেত্রেও এমন কিছু ঘটতে পারে ভেবে তাঁর পরে যোগ হওয়া পাঁচজনের ইনিংসও বল বাই বল চেক করে দেখতে হলো। না, এই কীর্তি আর কারও নেই। নিউজিল্যান্ডের মার্ক ক্রেইগ, শ্রীলঙ্কার ধনঞ্জয়া ডি সিলভা, কামরুল ইসলাম রাব্বী, সুনীল আমব্রিস ও ঋষভ পন্তের মধ্যে শুধু মার্ক ক্রেইগেরই একটু বিশেষত্ব আছে। ২০১৪ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে কিংস্টন টেস্টে তাঁর ছক্কাটা প্রথম বলেই। দুই ইনিংসে চার-চার আট উইকেট নিয়ে পেয়েছিলেন ম্যাচ-সেরার স্বীকৃতিও। 

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম বলেই ছক্কা মারার বীরত্বে মার্ক ক্রেইগ অনন্য হতে পারেন, তবে প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কা শুধু ওই বাংলাদেশি ত্রয়ীরই। তিনজনেরই কেউই এখন বাংলাদেশ দলে নেই। যদিও প্রায় পাঁচ বছরেরও বেশি বিরতির পর ২০১৯-এর নভেম্বরে কলকাতার পিংক টেস্টে দলে ফিরেছিলেন আল আমিন। যাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের ব্যাটিং অংশটা খুবই ইন্টারেস্টিং। প্রথম দুই টেস্টের তিন ইনিংসেই অপরাজিত ছিলেন। একবার বলা হয়েছে, তারপরও আবার মনে করিয়ে দিই। প্রথম টেস্টের একমাত্র ইনিংসে একটাই বল খেলে শূন্য রানে অপরাজিত, দ্বিতীয় টেস্টে ৭ বল খেলে ওই একটা স্কোরিং শটেই ৬ রানে, দ্বিতীয় ইনিংসের ১৮ বলে ৩২ রানে ৪টি ছক্কা ও ১টি চার। ৪টি ছক্কাই দিলুওয়ান পেরেরার বলে। এই ইনিংসে তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য হলো, দ্বিতীয় বলে ছক্কাটি মারার পর দুটি ডট বল খেলে একমাত্র চারটি মারেন আল আমিন। আরেকটি ডট বলের পর ইনিংসের দ্বিতীয় ছক্কা। যার মানে টেস্ট ক্রিকেটে আল আমিনের প্রথম চারটি স্কোরিং শট: ৬, ৬, ৪, ৬!

টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম তিন ইনিংসে আল আমিনের ব্যাটিং রেকর্ডও একই রকম চমকপ্রদ। একবারও আউট না হয়ে ২৬ বলে ৩৮ রান। যার ৩৪-ই চার-ছয় থেকে (৫টি ছক্কা ও ১টি চার)। এরপর যে ৫টি টেস্ট খেলেছেন, তাতে আটবার ব্যাটিং করে আরও ১০টি চার মেরেছেন, তবে ছক্কা মারতে পারেননি আর একটাও। তাতে কি, প্রথম দুটি স্কোরিং শটেই ছক্কা মেরে ইতিহাসে তো নাম লিখিয়েই ফেলেছেন।

আল আমিন তা জানেন বলে মনে হয় না। জহুরুল ও শফিউলও কি জানেন? প্রথম আলোতে যেহেতু লিখেছিলাম, নিজেরা তা না পড়লেও কেউ না কেউ তাঁদের জানিয়েও থাকতে পারেন।

ভাবছি, তিনজনকেই ফোন করে জিজ্ঞেস করব!