ঘরে ঘরে টেলিভিশনের পর্দায় সেঁটে থাকবে লাখো চোখ। টেলিভিশনের দোকানের সামনে রাস্তায় উৎসাহী জনতার জটলা। রেডিওতে কান পেতে থাকবে হাজারো কান। চার-ছয় হলে হর্ষধ্বনি উঠবে। প্রতিপক্ষের উইকেট পড়লে উচ্ছ্বাস।
এ আর নতুন করে বলার কী আছে! বাংলাদেশের ক্রিকেট ম্যাচে এসব তো অনেক দিনই চেনা ছবি হয়ে আছে। তাহলে কেন তা আবার বলা?

কারণ, ওপরে সাজানো টুকরো টুকরো ছবিগুলো শুধু বাংলাদেশেরই নয়, আফগানিস্তানেরও! জীবন যেখানে খেলনা, আত্মঘাতী বোমার ভয়কে সঙ্গী করে জীবনের প্রতিটি দিন পাড়ি দেওয়া, সেই আফগানিস্তানে মোহাম্মদ নবীদের যেকোনো ম্যাচই এখন জাতীয় উৎসবের উপলক্ষ। 

পেশোয়ারের উদ্বাস্তু শিবিরে ক্রিকেটে হাতেখড়ি হওয়া আফগান তরুণদের বিশ্ব ক্রিকেটের সিঁড়ি বেয়ে তরতর করে উঠে আসা রূপকথার গল্পকেও হার মানানোর মতো। এমনই এক গল্প যে, বারবার চর্চিত হয়েও যেটি পুরোনো হয় না। পুরোনো হবেই বা কেন, সেই গল্পে নতুন নতুন অধ্যায়ও যে সংযোজিত হয়েই চলেছে। যেটির সর্বশেষ এই ২০১৫ বিশ্বকাপের অংশ হওয়া। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচে বিশ্বকাপ অভিষেকের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনেও তাই মোহাম্মদ নবীকে আবারও উদ্বাস্তু শিবিরের সেই দুঃসহ দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করতে হলো। এ এমন গল্প, যা মানুষ বারবার শুনতে চায়।

এখানে বাংলাদেশের উত্থানের সঙ্গে কোনো মিল নেই। কিন্তু ক্রিকেট নিয়ে উন্মাদনায় দুই দেশে আশ্চর্য মিল। আফগানিস্তানের ইংলিশ কোচ অ্যান্ডি মোলস যখন বলছেন, ‘এই খেলাটা দেশের সবাইকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়। খেলোয়াড়েরা জানে, একটা ভালো পারফরম্যান্স তাদের দেশের মানুষকে কেমন সুখানুভূতি দিতে পারে, পুরো দেশকেই কীভাবে জাগিয়ে তুলতে পারে’—মনে হলো, আরে, বাংলাদেশের কথা হচ্ছে না তো?

কদিন আগেই এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ নবী বলেছেন, ‘যে দেশের বিপক্ষেই আমরা খেলি না কেন, দেশের মানুষ আমাদের জয় চায়।’ এটাও তো বাংলাদেশের চিত্রই।

কাবুলে টেলিভশনে আফগানিস্তানের ম্যাচ দেখছেন উৎসাহী দর্শক। ছবি: এএফপি

আফগানিস্তানের ম্যাচ কাভার করতে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস এক আফগান সাংবাদিককেই পাঠিয়েছে। আফগানিস্তান থেকে এসেছেন এক রেডিও সাংবাদিক। দুজনই সবিস্তারে বলছিলেন, যে দেশের বেশির ভাগ মানুষ কয়েক বছর আগেও কয় বলে ওভার হয় জানত না, সেই দেশেই কীভাবে ফুটবলকে সরিয়ে ক্রিকেট এক নম্বর খেলা হয়ে গেছে। ক্রিকেট অজ্ঞতার অংশটুকু বাদ দিলে এটাও তো বাংলাদেশেরই প্রতিলিপি।

অ্যান্ডি মোলস কাবুলেই থাকেন। হোটেল থেকে মাঠ, মাঠ থেকে হোটেল—এই হলো তাঁর জীবন। বিরুদ্ধ পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে আফগানদের অবলীলায় লড়াইয়ের কাহিনি তাঁকে রীতিমতো চমৎকৃত করে। একদিন অনুশীলনে এক খেলোয়াড় দেরি করে এসেছেন। এসে খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে মোলসকে জানালেন, তাঁর ভাইকে জঙ্গিরা গুলি করে মেরে ফেলেছে বলে আসতে দেরি হলো। মৃত্যু সেখানে জীবনেরই অংশ। 

মোহাম্মদ নবীর নিজের জীবনেও তো এমন গল্প আছে। জালালাবাদ থেকে কাবুলে প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যোগ দিতে যাচ্ছেন। পথের পাশে দেখলেন তাঁর বাবার গাড়ি, সেটিকে ঘিরে পুলিশ। যাদের কাছ থেকে জানলেন, তাঁর বাবাকে অপহরণ করা হয়েছে। ভাইকে ফোন করলেন। ভাই বললেন, ‘তুমি যেখানে যাচ্ছ, যাও।’ আফগানিস্তান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ নূর নবীকে ফোন করে বললেন, ‘তুমি এখন আর শুধু তোমার বাবার সন্তান নও। পুরো জাতির সন্তান। পরিবারের সীমানা ছাড়িয়ে তুমি এখন দেশের কথা ভাবো।’
নবী তা-ই ভাবলেন। বিশ্বকাপে আসার সিঁড়ি নামিবিয়ার টুর্নামেন্টেও যখন খেলতে গেলেন, বাবার কোনো খোঁজ নেই। কিছুদিন পর দুই লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করল অপহরণকারীরা। মোহাম্মদ নূর প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইয়ের শরণাপন্ন হলেন। তিন সপ্তাহ পর মুক্তি পেলেন নবীর বাবা। এই বোঝা মাথায় নিয়েই নামিবিয়ায় প্রথম ম্যাচে ৪৫ বলে ৮১, অফ ব্রেক বোলিংয়ে ১২ রানে ৫ উইকেট। পরের ম্যাচে অপরাজিত ৪৬। 

মোহাম্মদ নবীর নিজের জীবনের গল্পও তো সব প্রতিকূলতা জয় করে সামনে এগোনো আফগান ক্রিকেটের প্রতীকি রূপ। ছবি: ইন্ডিয়াডটকম

এমন প্রতিকূলতার সঙ্গে যেখানে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ, ক্রিকেট তো নিছকই একটা খেলা। মাঠে আফগান খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সেও সেটিরই প্রতিফলন। আফগানিস্তানের এই ভয়ডরহীন খেলাটা তামিম ইকবালের বড় পছন্দ। ‘ওদের কথাবার্তায়, শরীরী ভাষায় প্রচণ্ড একটা আত্মবিশ্বাস আছে। নিজেদের ওরা কারও চেয়ে ছোট মনে করে না। নিজেদের বড় ভাবে। কারও কাছে এটা হয়তো ভালো না-ও লাগতে পারে। তবে আমার এটা খুব পছন্দ। নিজেকে বড় না ভাবলে আপনি বড় হবেন কীভাবে?’ ব্যাটিং-বোলিংয়ের চেয়ে এটাকেই আফগানদের বড় শক্তি বলে মনে হয় তামিমের। এতে শুরুর দিকের তামিমের ভয়ডরহীন ব্যাটিংয়ের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে বলেই কি?

যুদ্ধ-মৃত্যু-ধ্বংসযজ্ঞ এসবের মাঝে ক্রিকেট আফগানদের জন্য মুক্তির এক খোলা জানালা। এ কারণেই হয়তো নিজেদের এমন মেলে ধরতে পারা। সুদীর্ঘ কোচিং ক্যারিয়ারে কত দলের সঙ্গেই না ছিলেন অ্যান্ডি মোলস। তার পরও আফগান ক্রিকেটারদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর কণ্ঠে বিস্ময়, ‘খেলাটির প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা আছে ওদের। যে দলের বিপক্ষেই খেলা হোক না কেন, ওরা বিশ্বাস করে মাঠে নামে যে, ওরা জিততে পারে।’ বলার পর অন্য দলগুলোকে একটা সতর্কবাণীও শুনিয়ে দিলেন, ‘আমরা এখানে সংখ্যা পূরণ করতে আসিনি। যেকোনো দলকে আমরা চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা রাখি।’

হয়তো কথাটা ঠিক। হয়তো নয়। তবে সাফল্যের জ্বালাও কিন্তু টের পেতে শুরু করেছেন মোহাম্মদ নবী। এত দিন ছিল মনের আনন্দে খেলা। এখন আর তা নয়। প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট থেকে এক টানে তুলে নিয়ে যায় বলে সব ম্যাচেই জয় চায় আফগানিস্তানের মানুষ। মাঠে নামার সময় এখন তাই চাপটাও ছায়াসঙ্গী হয়ে হেঁটে যায় তাঁর সঙ্গে। বাকি দশ আফগান ‘যোদ্ধা’র সঙ্গেও।

এখানেও কি বাংলাদেশের সঙ্গে আফগানিস্তানের মিল নেই? বাংলাদেশও তো পেট্রলবোমা, হরতাল, ক্রসফায়ারের ধু ধু মরুভূমির মাঝে ক্রিকেট নামের মরূদ্যান খোঁজে!

আরও পড়ুন: আফগান রূপকথা!